বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

কাল-সচেতন কবি ফররুখ আহমদ

মুহম্মদ মতিউর রহমান :  (গত সংখ্যার পর) ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যের প্রায় সবগুলো কবিতায়ই এ অনুপ্রেরণা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ‘সাত সাগরের মাঝি’ লেখার পূর্বেও তিনি জাগরণমূলক কবিতা লিখেছেন। ১৯৩৭ সালে হাবিবুল্লাহ্ বাহার সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ‘রাত্রি’ নামক তাঁর যে সনেট কবিতাটি প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, সেখানে এ জাগরণের বাণী স্পষ্টত লক্ষ্য করা যায়। কবিতাটি এরূপ :

ওরে পাখি, জেগে ওঠ, জেগে ওঠ রাত্রি এল বুঝি

ঘুমাবার কাল এল জাগিবার সময় যে যায়-

ওরে জাগ্ জাগ্ তবু অকারণে, রাত্রির ভেলায়-

কোন অন্ধ তিমিরের ¯্রােতে আসা নিরুদ্দেশে যুঝি’

হে বিহঙ্গ, দিক ভ্রষ্ট নাহি হোয়ো যেন পথ খুঁজি

অবেলায়। এখোন সম্মুখে আছে ঝড়, আছে ভয়

এখনো আনন্দ আছে-খুঁজিবার দূরন্ত বিস্ময়

তবু অন্ধকার এলে, দেখিলাম রিক্ত মোর পুঁজি।

এখনো যায়নি অস্ত সূর্য মোর ব্যথা আকুলিয়া-

এখনো রয়েছে তার শেষ রশ্মি পাতায় পাতায়

তবু অন্ধকার এল, এল মোর আনন্দ ভুলিয়া

অনন্ত বেদনা সম রিক্ততার তিমির শ্যামলিমা

এ আমার স্বপ্ন নহে, এই কালো মেঘ মৃত্যুসীমা। (রাত্রি)

এ কবিতায় কবি মুসলিম জাতিকে ‘পাখি’র রূপকে জাগার আহবান জানিয়েছেন। এখানেও আদর্শনিষ্ঠ, ঐতিহ্য-সচেতন কবির ব্যাকুলিত প্রাণের উদাত্ত আহবান উচ্চারিত হয়েছে। এরপর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে প্রায় সবগুলো কবিতায় এ জাগরণের বাণী সোচ্চারিত। যেমন-

কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ,

শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক,

ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ,

পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ ব’য়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক;

নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ!

(সিন্দবাদ)।   

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?

এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?

সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?

তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;

অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি। (পাঞ্জেরী)।

কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হ’ল জানি না তা।

নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।

দুয়ারে তোমার সাত-সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।

তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?

(সাত সাগরের মাঝি)।

উপরোক্ত কবিতাসমূহে কবি প্রতীকের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে জাগরণের স্পৃহা জাগ্রত করেছেন। তিনি হতাশাগ্রস্ত অধঃপতিত মুসলিম জাতিকে নবজাগরণের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। এরপর পাকিস্তান আন্দোলন যখন বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করে, তখন তাঁর ‘আজাদ কর পাকিস্তান’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় কবি স্বাধীনতা সংগ্রামে মরণপণ অংশগ্রহণের জন্য সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এ কাব্যগ্রন্থটি ক্ষুদ্রায়তনের। কিন্তু  সমকালীন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা এ কাব্যের বিভিন্ন কবিতা মুসলিম সমাজে স্বাধীনতা সংগ্রামে সকলকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করে। যেমন-

সামনে চল: সামনে চল

তৌহিদেরি শাস্ত্রীদল

সামনে চল: সামনে চল

আসুক ডর, আসুক ভয়

আসুক হিম দুঃসময়-

আসুক দুখ, পাষাণ বুক

মৃত্যুবাধা: ঝড় বাদল

সামনে চল: সামনে চল (ফৌজের গান)।  

লক্ষ্য পাথরে গড়া এ পাহাড় ভেঙে হল একাকার,

ঘুম ছেড়ে তুমি ছুটে এসো কারিগর!

চলো এক সাথে তুলে নেই হাতে পাহাড় গড়ার ভার

আজ বিরামের নাই তিল অবসর

কাঁধে কাঁধ দিয়ে গড়ে তোলো আজ কাতারে সামিল হয়ে,

বিশাল জামাত, বিপুল পাহাড় মোর,

গিরিতটচ্যুত পাথরের ব্যথা বাতাস আনিছে বয়ে

কারিগর। ভাঙ্গো সুমধুর ঘুমঘোর। (কারিগর)।

উপরোক্ত কবিতাসমূহে জাগরণের ও সংগ্রামের উদাত্ত আহবান সোচ্চারিত হয়েছে। এসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধকালে পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থার ফলে সাধারণ মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে। আধিপত্যবাদী শক্তি এবং পুঁজিবাদী স্বার্থপর মহলের চক্রান্তে সাধারণ মানুষ চরম আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়। এমন কি খাদ্যের অভাবে লক্ষ লক্ষ নিরন্ন-বুভুক্ষ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। কবি এ সা¤্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে অসহায় নিরন্ন মানুষের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাঁর বিখ্যাত ‘লাশ’, ‘আউলাদ’ প্রভৃতি কবিতা রচনা করেন। এসব কবিতা তখন জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উদাহরণ :

জানি মানুষের লাশ মুখ গুঁজে পড়ে আছে ধরণীর ’পর,

ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ নাড়ীর তাপে পড়ে আছে

নিসাড় নিথর,

পাশ দিয়ে চ’লে যায় সজ্জিত পিশাচ, নারী নর

-পাথরের ঘর,

মৃত্যু কারাগার,

সজ্জিতা নিপুণা নটী বারাঙ্গনা খুলিয়াছে দ্বার

মধুর ভাষণে,

পৃথিবী চষিছে কারা শোষণে, শাসনে

সাক্ষ্য তার রাজপথে জমিনের ’পর

সাড়ে তিন হাত হাড় রচিতেছে মানুষের অন্তিম কবর।

(লাশ : সাত সাগরের মাঝি)

১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ভারতব্যাপী বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এতে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করে। রক্ত-শোনিতে রঞ্জিত হয় বাংলার শ্যামলীম প্রকৃতি। কবি এ অমানবিক নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে শাণিত বাণী উচ্চারণ করেনঃ

এবার দেখেছি নিজের রক্ত, দেখেছি আর

রক্ত নেবার পাশবিক মত্ততা,

এবার শুনেছি, কোটি ফরিয়াদ, শুনেছি আর

শত মুমূর্ষু কণ্ঠে আকুলতা।...

শুনেছি অযুত মানুষের আহাজারি

শুনেছি দু’পাশে অসহায় হাহাকার

নিজের রক্তে ভাসায়েছি এ পৃথিবী

মৃত্যুর মুখে পথ নাই বাঁচবার।

নিজের কণ্ঠ খুঁজেছি প্রেতের মত

করেছি অন্ধ নিজের ঘরেই চুরি,

বুঝি নাই কার আদেশে ভাগ্যাহত

নিজের বুকেই নিজে চালিয়েছি ছুরি (নিজের রক্ত)

আজকে পারি না তাকাতে তোমার পানে,

দশ শতকের পরিচয় আজ লজ্জায় নত মুখ

বন্ধুকে আমি হেনেছি আঘাত অপমৃত্যুর বাণে,

কলঙ্ক-ম্লান গভীর ব্যথায় আজ ভরে ওঠে বুক।

বন্ধু আমার ক্ষমা করো অপরাধ

এসো এক সাথে মুছে ফেলি এই ভুল

তোমার স্বপ্নে জাগুক আবার আমার স্বপ্নসাধ,

চলো এক সাথে দুইজনে মিলে তুলি এ পাপের মূল।

(‘বন্ধু’ : দাঙ্গা-বিধ্বস্ত কলকাতার হিন্দু-মুসলিম মিলনের আহবান জানিয়ে ২৩ নভেম্বর, ১৯৪৬ সংখ্যা ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত) (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ