শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শিক্ষাঙ্গনে হয়রানি

তোফাজ্জল বিন আমীন : প্রতিনিয়ত হত্যা, ধর্ষণ, খুন, গুম, অপহরণের সাথে পাল্লা দিয়ে শিক্ষাঙ্গণের মতো পবিত্র জায়গায় যৌন হয়রানির খবর মুদ্রিত হচ্ছে। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি ঘটনা পূর্বের ঘটনাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। অশিক্ষিত মানুষের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। শিক্ষিত ও সভ্য মানুষেরা এখন অস্বাভাবিক ও কুৎসিত আচরণ করছে। বলা হয় শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্ত দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একশ্রেণির শিক্ষক নামের কীটেরা যখন যৌন হয়রানি করে তারই সন্তানতুল্য মেয়ে কিংবা বোনকে তখন মনে দাগ কাটে। যৌন হয়রানির হোতা হিসেবে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নামও বাদ যাচ্ছে না। এর চেয়ে লজ্জার জাতির জন্য আর কী হতে পারে! ক্ষমতাসীন শাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যত ফন্দি করে তার ছিটেফোটাও যদি মানবিক মূল্যবোধ তথা ধর্মীয় অনুশাসন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতো, তাহলে শিক্ষাঙ্গনের মতো জায়গায় নারী ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়নের খবর মুদ্রিত হতো না। এভাবে শিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়নের ক্রমধারা চলতে থাকলে উন্নয়নের জোয়ার বর্ষার বাদলে ডুবে যাবে।
দেশের সব শিক্ষাঙ্গন যৌন হয়রানির ক্ষেত্র তা বলছি না। কিন্তু পত্রিকার পাতায় যে কয়েকটি শিক্ষাঙ্গনের যৌন হয়রানির খবর মুদ্রিত হয়েছে তা একেবারে নগণ্য তাও কিন্তু নয়! ঘরে-বাইরে,মাঠে-ঘাটে,অফিস আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, হাটে-বাজারে সর্বত্র থেকে অপরাধের খবর আসছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ধর্ষণের পর খুন করা হচ্ছে। সারা দেশে ধর্ষণের যে মহামারির সিরিজ চলছে তার পেছনেও রয়েছে ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। অনেক সময় এমনও ঘটেছে যে অভিযোগকারীকে পড়াশোনা ছেড়ে বাড়িতে চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তের কোনো শাস্তি হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌন হয়রানির বেশির ভাগ অভিযোগ তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গত ৭ বছরে শিক্ষাঙ্গনে আড়াই হাজারের বেশি যৌন হয়রানির ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ বিচার অভিযোগকারী পায়নি। সাম্প্রতিক ঘটনার মধ্যে ফেনীর সোনাগাজি মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার হাতে যৌন লালসার শিকার হন হত্যভাগ্য নুসরাত। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই বিভাগের দুই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে সেখানে আন্দোলন ও হয়েছে। ওই শিক্ষককে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত শাস্তি কী হয়েছে তা আমরা কেউ জানি না। ২০১৪ সালের ৪ মে আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহফুজুর রশীদ ফেরদৌসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রীকে বিভিন্ন সময় ভয়-ভীতি দেখিয়ে, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার এবং মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন।
এক ছাত্রীর সরলতার সুযোগে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিজ বাসস্থানে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তার নগ্ন ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেন। এক পর্যায়ে মামলা করা হলে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১৯ জুন পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল রোগীকে চুমু, চিকিৎসককে অব্যাহতি। ওই প্রতিবেদন বলা হয়, রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আসায় তাকে হাসপাতাল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগে বলেন, ডা. শওকত হায়দার আপত্তিকরভাবে তার শরীর স্পর্শ করার চেষ্টা করেছেন ও চুমু খেয়েছেন। ২০১১ সালের ৫ জুলাই ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষক পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছিল। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় ২০১৫ সালে পরিমল জয়ধরকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। নেত্রকোনার এক মাদরাসার শিক্ষক ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এক মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। যা সত্যিই বেদনাদায়ক। গত ২৮ জুন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক আশরাফুল ইসলামকে ধর্ষণের অভিযোগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গ্রেফতার করেছে। ওই শিক্ষক কখনো পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া বা ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে গত পাঁচ বছরে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছে। ফাঁদে ফেলে শিক্ষার্থীর মাকেও ধর্ষণ করেছেন।
অনেকের ধারণা যৌন হয়রানি মানে শুধুমাত্র জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন। কিন্তু ২০০৯ সালের যৌন হয়রানি নিয়ে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে রায় দিয়েছেন মহামান্য হাইকোর্ট। যেমন: অনাকাক্সিক্ষত যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি, অশালীন ভঙ্গি, যৌন নির্যাতনমূলক ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, কাউকে অনুসরণ করা বা পেছন পেছন যাওয়া এবং যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা ব্যবহার করে ঠাট্টা বা উপহাস করা হলেও তা যৌন হয়রানির মধ্যে পড়বে। ফৌজদারী আইনের বিধান অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে রায় দেয়ার নিয়ম থাকলেও মামলার সুরাহার পরিবর্তে উল্টো মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কোনো কোনো মামলা ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত চলমান। অথচ এগুলোর নিষ্পত্তির হার দুঃখজনক। ২০০১ থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত যৌন নির্যাতনের দায়ের করা মামলার বিপরীতে রায় প্রকাশের হার মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় বলা আছে, কোনো নারীর শ্লীলতাহানি ও মর্যাদাহানির অভিপ্রায়ে কোনো কথা, অঙ্গভঙ্গি বা কোন বস্তু দেখালে শাস্তি হচ্ছে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড । অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১০ ধারায় যৌন নিপীড়ন ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে।
হয়রানির অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হচ্ছে। অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেউ যেন হয়রানি কিংবা ধর্ষণ করে পার পেয়ে না যায় সে বিষয়টি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে আজো পূর্ণ আইন তৈরি করা হয়নি।
হয়রানির বিষয়ে আমাদের উদাসীনতা আসলে সিরাজউদৌলা কিংবা পরিমল নামের নিপীড়ক শিক্ষকদের আরো বেপোরোয়া করে তোলে। শুধুমাত্র আইন করে হয়রানি প্রতিরোধ করা সম্ভব না। হয়রানির রুটকে বন্ধ করার পাশাপাশি আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হলে তবেই হয়রানির নিষ্ঠুরতা থেকে নারীর জীবন ও ইজ্জত রক্ষা পাবে। আশা করি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহল উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ