শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

গণপিটুনি বন্ধ হোক

‘গণপিটুনি’ কখনও কাঙ্খিত বিষয় হতে পারে না। বরং বিষয়টি সমাজ ও সমাজের মানুষ সম্পর্কে, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সৃষ্টি করে নানা প্রশ্ন। কিন্তু অনাকাঙ্খিত এই গণপিটুনির ঘটনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে দেশে। গত চার দিনে বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে সাতজনকে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব মতে, এ বছর প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। আর গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে- প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারী, মানসিক রোগী, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধাসহ নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে রাজধানীর বাড্ডায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গত শনিবার গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারালেন তাসলিমা বেগম। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই ওই দিন রাতে সাভারে গণপিটুনিতে নিহত হন আরেক নারী। এ ছাড়া রোববার নওগাঁর মান্দায় পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ছেলেধরার গুজব রটিয়ে গণপিটুনি দেয়া হয় ৬ জনকে।
গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ সদর দপ্তর গত শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ বলে গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কয়েকজনের প্রাণহাণি ঘটেছে। গুজব ছড়িয়ে ও গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা ফৌজদারী অপরাধ। দ্রুতই জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে গণপিটুনি না দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে পুলিশের ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। বিজ্ঞপ্তিতে মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করার একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বলা হয়েছে, গণপিটুনি ও হত্যার বিষয়টি ফৌজদারী অপরাধ। এমন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা এমন বক্তব্যের যথাযথ প্রয়োগ দেখতে চাই। এক্ষেত্রে যথার্থ উদাহরণ সৃষ্টি হলে উচ্ছৃঙ্খল মানুষ শৃঙ্খলায় ফিরে আসতে পারে।
গণপিটুনি প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। কোনো বিষয়ে ধৈর্য্য ধারণ করছে না। আরেকটি বিষয় হলো অপরাধ হচ্ছে কিন্তু অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, শাস্তি হয় না- এমন ধারণাও কিছু মানুষের মধ্যে ঢুকেছে। এ সব কারণে এ সব ঘটনা ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। এ সব থেকে উত্তরণের উপায় প্রসঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তার এই বক্তব্য সঠিক বলেই আমরা মনে করি। তবে পাশাপাশি সমাজ সম্পর্কে ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয়। মানুষের এ কেমন সমাজ! এ সমাজে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, পিটিয়ে মানুষকে মেরে ফেলে! অথচ মানুষকে বাক্যবানে আহত করাও একটি অপরাধ। আর আমরা এখন মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করার মতো মহাঅপরাধ করতেও কুণ্ঠিত হই না। এমন অধঃপতন তো এক দিনে হয়নি। বহুদিন ধরেই এই সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে চলেছে। ভোগবাদী পরিবার ও সমাজ এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। সাথে অব্যাহত ছিল সুশাসনের অভাব। এর ফলাফল লক্ষ্য করা যাচ্ছে এখন সমাজে। এখন প্রয়োজন বোধোদয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ