বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দেয়াল

আব্দুস সালাম  : আসলাম হোসেন আর মজিদ মিয়া একই গ্রামে বসবাস করেন। তাদের বসবাসের বাড়ি দুটি পাশাপাশি। দুই বাড়ির মাঝে রয়েছে শুধুমাত্র একটি দেয়াল। আসলাম হোসেনের এক ছেলে আর এক মেয়ে। আর মজিদ মিয়ার দুই মেয়ে। দুই পরিবারের আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা অনেক বেশি। বলতে গেলে আত্মীয়-স্বজনরা একই গ্রামে বসবাস করেন। আসলাম হোসেন গ্রামের একটি বেসরকারী হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক। পাশাপাশি তিনি রাজনীতিও করেন। তবে তিনি গ্রামে মাস্টার সাহেব নামে বেশি পরিচিত। আসলাম সাহেব বেশ কয়েকবার ইউপি চেয়ারম্যান ভোটে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একবারও পাশ করেননি। কারণ প্রতিবারই তার বিপক্ষে মজিদ মিয়া ভোটে দাঁড়ায়। এক গ্রাম থেকে দুইজন ভোটে দাঁড়ানোর কারণে গ্রামের ভোট দুই ভাগ হয়ে যায়। ফলে পাশের গ্রাম থেকে অন্য কেউ চেয়ারম্যান ভোটে পাশ করে যায়।

এদিকে মজিদ মিয়া গ্রামের বেশ প্রভাবশালী লোক। তার কথায় অনেকে ওঠে বসে। গ্রাম ও শহরে তার ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। বেশ টাকা পয়সারও মালিক। মজিদ মিয়া অনেকদিন আগে একবার ইউপি চেয়ারম্যান ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। তারপর থেকে গ্রামের লোকজন তাকে চেয়ারম্যান সাহেব বলেই চেনে। মজিদ চেয়ারম্যান নামেই বেশি পরিচিত। আসলাম হোসেনের বড় ছেলে সোহেল আর মজিদ মিয়ার বড় মেয়ে মৌসুমি একই স্কুলে পড়ালেখা করেছে। এখন তারা কলেজে পড়ে। তারা একে অপরকে পছন্দ করে। পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে তাদের মধ্যে সম্পর্কটা তেমন করে গড়ে ওঠেনি। স্কুলে তাদের মধ্যে দুই একটি কথা বিনিময় হলেও বাড়িতে অবস্থানকালে তারা কখনও একে অপরের সাথে কথা বলার সাহস দেখায়নি। সোহেল একদিন মৌসুমির সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে কলেজে যাচ্ছিল। ঠিক তখন মোসুমির বাবা দেখে ফেলে। এতে তার বাবা এতটাই রেগে যায় যে, মৌসুমির গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেনি। এদিকে আসলাম হোসেনেরও কড়া নিষেধ ছিল সোহেল যেন মৌসুমির সঙ্গে কথা না বলে। 

গ্রামের যেসব লোকজন চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মিশতো তারা আবার মাস্টার সাহেবের সাথে তেমনভাবে মিশতো না। কার্যত বলা যায় গ্রামের লোকজন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। গ্রামে কোন ক্ষয়ক্ষতি বা চুরি ডাকাতি হলে একপক্ষ অপর পক্ষের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করতো। এভাবে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বেশ কয়েক বছর ধরে চলতে থাকে। এর ফলে গ্রামবাসীদের প্রায়ই বিপদে পড়তে হতো। কিন্তু তাদের কিছুই করার ছিল না। তাদেরকে কোন না কোন পক্ষকে সমর্থন করতেই হতো। নিরপেক্ষ থাকলে তারা তেমন কোন সুবিধা পেত না। আসলাম হোসেনের বড় ছেলে সোহেল বর্তমানে ডিগ্রি শেষবর্ষের ছাত্র। আর একই কলেজে মজিদ মিয়ার মেয়ে মৌসুমি এইচএসসি ২য় বর্ষের ছাত্রী। তাদের মধ্যে গোপনে প্রায়ই দেখা সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়। কলেজ ছুটির পর তারা যে যার মত বাড়িতে চলে যায়। তাদের মধ্যে সম্পর্কটা দিনে দিনে বেশ ঘনিষ্ট হতে থাকে। এই সম্পর্কের বিষয়টি দুই পরিবারের কেউই জানতে পারলো না। 

মৌসুমি যেমন সুন্দরি তেমনি মেধাবী। তার এখন প্রায়ই বড় বড় জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু মৌসুমি বিয়েতে রাজী হয় না। বাবাও চায় মেয়ে ভালোভাবে পড়াশুনা শেষ করুক। বিয়ের বিষয়ে মৌসুমির উপর চাপ রয়েছে তা সোহেলের জানা ছিল। কিন্তু সোহেলের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না মৌসুমিকে বিয়ে করা। আর বাবা যদি জানতে পারে যে, সোহেলের সঙ্গে মৌসুমির সম্পর্ক রয়েছে তাহলে আর রক্ষা নেই। তাকে বাড়িছাড়া করবে। কিন্তু তাদের কী করা উচিৎ সে বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এভাবে আরও কিছুদিন চলে গেল। 

সামনের বছর গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। আগে থেকেই আসলাম হোসেন এবং মজিদ মিয়া নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ইতমধ্যে গ্রামের লোকজনেরা প্রায় দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। তারা সুযোগমতো নির্বাচনের প্রচারণা চালাচ্ছে। যেভাবেই হোক তাদেরকে ভোটে জিততে হবেই। প্রয়োজনে তারা এর জন্য প্রচুর টাকা-পয়সা খরচ করতেও প্রস্তুত আছে। 

একদিন সোহেল ও মৌসুমি তাদের বাবাদের প্রতিযোগিতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলো। এটা কীভাবে নির্মূল করা যায় তার একটা উপায় বের করার জন্য চেষ্টা করলো। অবশেষে তারা মনে করলো যে, আমাদের বিয়েই হতে পারে একমাত্র সমাধানের উপায়। বাবা-মা রাজী হোক বা না হোক তারা একা একা বিয়ে করে ফেলবে। তবে একা একা বিয়ে করার পূর্বে তারা চেষ্টা করবে পারিবারিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বিষয়টি সুরাহা করা যায় কিনা। যাহোক, একদিন সোহেল সাহস করে তার বাবাকে বললো: “আমি মৌসুমিকে ভালোবাসি। তাকে বিয়ে করতে চাই। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানালে খুশি হব।” ছেলের কথা শুনে আসলাম হোসেন খুব রেগে যায়। তিনি এ বিয়ে কখনও মেনে নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, তিনি মজিদ মিয়াকেও সাবধান করে দেন। মৌসুমি যেন কোনভাবেই সোহেলকে বিয়ে করার চেষ্টা না করে। মজিদ মিয়া সবকিছু জেনে মৌসুমিকে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং তাকে কড়া নজরে রাখেন। সে যেন কোনরকমে সোহেলের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে।

এভাবে আরও দুই একমাস চলে গেল। এরমধ্যে শহরের কোন এক উচ্চ বংশীয় পরিবারের একটা ছেলের সাথে মৌসুমির বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। কিছুদিনের মধ্যে ছেলেপক্ষের লোকজনেরা মৌসুমিকে দেখতে আসার কথা। মেয়ে পছন্দ হলে বিয়ে হয়ে যাবে। এই খবরটি মৌসুমি কৌশলে সোহেলকে জানিয়ে দিল। সোহেলও মৌসুমিকে একা একা বিয়ে করার প্রস্তুতি নিতে বললো। মৌসুমি তাতে রাজীও হলো। তারপর সুযোগ মত তারা একদিন পালিয়ে বিয়ে করে ফেললো। বাবা-মা আত্মীয়-সজনদের ছেড়ে তাদের চলে যেতে হল সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা এক জায়গায়। নবদম্পতি যে জায়গায় বাসা ভাড়া করে থাকে তা পাশের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের রহিম স্যার জানতো। 

মৌসুমি ও সোহেলের এভাবে বিয়ে করায় দুই পরিবারের মাথা হেট হয়ে গেল। নিজ গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামের লোকজনরাও বিষয়টি জেনে গেল। অনেকে এটি নিয়ে হাসাহাসি করলো। আবার অনেকে খুশিও হলো। সোহেল ও মৌসুমি দু’জনে ছিল রহিম স্যারের ছাত্র-ছাত্রী। পড়াশুনায় ভালো হওয়ায় তিনি তাদেরকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি তাদের বাবা আসলাম হোসেন ও মজিদ মিয়াকেও ভালোভাবে চিনতেন। রহিম স্যার গ্রামের কয়েকজন গণ্যমান্য লোকদের নিয়ে দুই পরিবারের সাথে সমঝোতার জন্য চেষ্টা করলেন। এতে তারা সফলও হলেন। উভয়পক্ষ তাদের ছেলেমেয়ের বিয়ে মেনে নিল এবং তাদের বিয়ে বাজানোর জন্য একটা দিন তারিখও ধার্য করলো। বিবাহোত্তর আনুষ্ঠানে গ্রামের সকলকে দাওয়াত দেয়া হলো। উক্ত অনুষ্ঠানের আগেরদিন দুই বাড়ির মাঝে যে দেয়াল ছিল তা দুই পক্ষের আত্মীয়-স্বজনরা ভেঙে দিল। এই বিয়ের মাধ্যমে দুই পরিবারের দীর্ঘ দিনের বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটলো। আর গ্রামবাসীদের মধ্যে যেসব ভেদাভেদ ছিল তা দূর হলো। গ্রামবাসীরা আবার একসাথে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ