মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সিরীয় কবি ওমর আবু রিশা

 

ড. কামরুল হাসান : ওমর আবু রিশা (১০ এপ্রিল ১৯১০- ১৫ জুলাই ১৯৯০) সিরীয় কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও ডিপ্লোমেট। আধুনিক যুগের অন্যতম আরবি কবি। নিসর্গ প্রকৃতি, অধুনা সংস্কৃতি, আরব মানস ইত্যাদিই ছিল তার কবিতার মৌল উপাদান। তবে সবকিছুকেই তিনি মেপেছেন আধুনিকতার আদলে, সর্বাধুনিকতার নিক্তিতে। জীবন, মন-মানস, বোধ, বিবেচনা নিয়ে তার লিখা প্রতুল ও পর্যাপ্ত। এর বাইরেও তিনি রচনা করেন নাটক, গদ্য ও প্রবন্ধ। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে তার পরিচিতি প্রকৃতি ও আধুনিকতার কবি হিসেবেই অত্যধিক।

প্রখ্যাত সিরীয় কবি আবু রিশা উত্তর সিরিয়ার মানবায নগরীতে ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে কবি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা, ভাই-বোনদের প্রায় সবাই কবি ছিল। তার সহোদরের মিন নাফিজাতি আল হুব্ব বা ভালোবাসার জানালা নামক একখানা কাব্য সংকলন ছিল। যা ১৯৮১তে প্রকাশিত হয়। তার অপর কাব্য সংকলন লাহনু আল-মাসা বা সন্ধ্যার গান। তার সহোদরা জয়নবও ছিল কবি। সিরিয়ার বিখ্যাত পত্রিকাগুলোতে প্রায়ই তার কবিতা ছাপানো হতো। তার বড় বোন সারাহ সেও ছিল কবি।

সরকারী চাকুরিজীবি হিসেবে তার পরিবারের পূর্ব খ্যাতি ছিল। বিশেষত উসমাানি খিলাফত আমলে তার পরিবারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তার বাবা শাফি ইবনু শাইখ মুস্তাফা আবু রিশা মানবায ও খলিল অঞ্চলের প্রতিনিধি ছিলেন। আসলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী তিনি প্রবাসি ছিলেন। অন্যভাবে বলা যায় লম্বা ভ্রমণে ছিলেন। ভ্রমণ বা প্রবাসন শেষে তিনি আলেপ্পোতে ফিরে আসেন। এখানেই বসবাস শুরু করেন। কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এক সময় ত্রিপলির প্রতিনিধি হবার অফার পান। কৃষিকাজ ছেড়ে দেন। ত্রিপলি চলে যান। তিনি একজন মর্যাদাবান কবি ছিলেন। শাওকি, হাফিজ ইব্রাহিম ও ওমর মুখতারকে নিয়ে তার শোকগাঁথা রয়েছে। আর তার মা খাইরাত উল্লা বিনতে ইবরাহিম আলি নুর উদ্দিন আল ইয়ুশরুতি ছিলেন ফিলিস্তিনী বংশোদ্ভূত। তার নানা ছিল শাজেলি তরিকার বিশিষ্ট শাইখ। তার মা সম্পর্কে ওমর আবু রিশা বলেন- তার বাড়িতে ছিল সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। সেখান হতে তিনি কবিতা, ছন্দ, পঙক্তি, শ্লোক, মহাকাব্য ইত্যাদি মুখস্ত করেন। অর্থাৎ তার মা ছিলেন কাব্যপ্রেমী। তবে তার মায়ের ঝোঁক ছিল বেশি সুফি বা মরমি কবিতার প্রতি। তার হতে অনেক সুফি কবিতার বর্ণনাও পাওয়া গেছে। এখান হতেই সুফিবাদের প্রতি ওমর আবু রিশার দুর্বলতার সূচনা। মাতৃকূল ও পিতৃকূল বিবেচনায় তিনি বনেদি পরিবারের সন্তান।

শাফি মুস্তাফা আবু রিশা তার সন্তানের উত্তম শিক্ষার বন্দোবস্ত প্রয়াসী ছিলেন। তিনি উমর আবু রিশাকে আলেপ্পোর মডেল প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করে দেন। ১৯২৪ সালে উমর আবু রিশা বৈরুতস্থ সিরিয়ান প্রোটেস্টেন্ট মিশনারী স্কুল হিসেবে পরিচিত আমেরিকান স্কুলে ভর্তি হোন। সেখানেই মাধ্যমিকের পড়ালেখা সমাপ্ত করেন। এরপর ১৯৩০ সালে রসায়ন শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যান। সেখানে ম্যানচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন।

ম্যানচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি ইংরেজী ও ইউরোপীয় সাহিত্যের সাথে পরিচিত হোন। সে সময় তিনি শেক্সপিয়র, মিল্টন, বোদলেয়র প্রমূখ সাহিত্যিক ও তাদের সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচিত হোন।

ওমর আবু রিশা ছিলেন ক্ষণজন্মা প্রতিভার অধিকারী। বাল্যকালেই তার লেখালেখির সূত্রপাত। তার লেখার আঙ্গিক, ঢঙ, স্টাইল এ বৈচিত্র থাকলেও তার ইংল্যান্ডের কাব্যকলা ছিল দু:খ ভারাক্রান্ত। অবশ্য এর কারণও ছিল মর্মান্তিক।

ইংল্যান্ডে পড়াশুনার সময় নুরমা নামীয় এক ইংরেজ মেমের সাথে তার পরিচয় হয়। তার প্রেমে পড়েন। গভীর প্রেমে হাবুডুবু খান। হঠাৎ করে ওমর আবু রিশা চধৎড়ঃরঃরং বা কর্ণগ্রন্থির প্রদাহ রোগে আক্রান্ত হোন। নুরমা কবির সেবায় বিনিদ্র রজনী কাটায়। তাকে সুস্থ করতে নিজেই সেবায়েৎ নিযুক্ত হয়। কবি সুস্থ হোন। কবি নুরমার সাথে তার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে সিরিয়ায় আসেন। পরিবারের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। সফল হোন। ইংল্যান্ড ফিরে আসেন। কিন্তু দু:খজনকভাবে এবার নুরমা একই রোগে আক্রান্ত হয়। সেবা, শুশ্রুষা চলে পুরো মাত্রায়। কিন্তু নুরমা সুস্থ হয় না। এ সামান্য রোগে নুরমার মৃত্যু হয়।

বন্ধু নুরমার মৃত্যুতে কবি ওমর আবু রিশা যারপরনাই ব্যথিত হোন। তাদের প্রেমের ঘটনা অমর করতে তিনি খাতিমাতু আল হুব্ব বা প্রেমের যবনিকা নামে এক অনবদ্য কবিতা রচনা করেন। বিয়োগ ব্যথায় কাতর কবি ওমর আবু রিশা তার রসায়ন পড়ার ক্ষান্ত দেন। এবার তিনি ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হোন এবং অধ্যয়ন শুরু করেন। কিন্তু বিধি বাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করতে পারেন না। আলেপ্পো ফিরে আসেন। পাবলিক লাইব্রেরির প্রশাসক পদে চাকুরি নেন। এই পদে তিনি বেশ কয়েক বৎসর চাকুরি করেন।

এরপর তিনি সিরিয়ার প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ডিপ্লোমেট পদে চাকুরির অফার পান। ব্রাজিলে সিরিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৪৯ সালে। ১৯৫০ সালে তিনি ব্রাজিলে সিরিয় রাষ্ট্রদূত পদে পদোন্নতি পান। একই সাথে তিনি সিরীয় হাইকমিশনারের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫২/৫৩ সালে তিনি আর্জেন্টিনায় সিরিয় রাষ্ট্রদুত হিসেবে নিয়োগ পান। অবশেষে ১৯৫৩/৫৪ সালে ইন্ডিয়ায় সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৯ সালে অষ্ট্রিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর কিছুদিন পর তিনি আমেরিকাস্থ সিরিয়া দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত হিসেবে সিরিয়া সরকার তাকে নিয়োগ দান করেন। সবশেষে ১৯৫৪ সালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগদান করেন এবং এ পদে থেকেই ১৯৭১ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

আর্জেটিনার অধিবাসি মুনিরা মুরাদ নামীয় এক মহিলাকে তিনি বিয়ে করেন। প্রকৃত অর্থে তাকেই জীবনসঙ্গী নির্বাচন করেন। চাকুরির সুবাদে তিনি যেখানে সেখানে সফর করেন মুনিরা মুরাদকে তিনি সাথী করেন। অবশ্য তার কোনো এক বন্ধুর এমন বর্ণনাও রয়েছে- তিনি গোপনে গোপনে ম্যাডাম সুআদ মিকারবাল না¤œীয় একজনকে ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন।

ওমর আবু রিশার বাল্যজীবন ও কর্মজীবন বিবেচনা করলে তার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রেষণা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। তার কাব্য ও সাহিত্যচর্চার পশ্চাতে প্রধানত ত্রিচৈতন্য কাজ করে। 

১. সুফি দর্শন ও মরমি চিন্তার প্রভাব। তার মা ছিল সুফিবাদের কন্যা। তার নানা ছিল মরমি দর্শনের সাধক পুরুষ। সেখান হতেই সুফি দর্শন ও মরমি ধারার কবিতার সাথে পরিচিত। পরবর্তীতে তার কাব্য কীর্তিতে মাতৃশিক্ষার এ প্রভাব লক্ষ্যণীয়। ২. উচ্চ শিক্ষাকালীন তার ইংল্যান্ড অবস্থান ও ইউরোপীয় প্রতিবেশ। এটিও তার সাহিত্য জীবনের উপর সমূহ প্রভাব বিস্তার করে। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বিরাটাংশ এখানেই কাটে। বিশেষত এখানে অবস্থানকালীন নুরমার সাথে তার সখ্য, প্রণয়, প্রয়াণ, শেষত বিয়োগ ব্যথা তার গোটা জীবনের উপরেই দাগ কাটে। তার সাহিত্য প্রেরণার অন্যতম উপাদান হিসেবেও কাজ করে। 

৩. ভিনদেশি বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, পড়াশুনা ও চাকুরির সুবাদে তিনি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার নানান দেশ ভ্রমণ করেন। ঐসব দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হোন। ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার জনমানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার সাথে তার যে পরিচয় ঘটে পরবর্তীতে তার সাহিত্যকর্মে বিশেষত কাব্যসৃষ্টিতে এর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্যণীয়।

কবি ওমর আবু রিশার জীবনের এ তিন ধারার বোধ বিবেচনা সাপেক্ষেই কেবল তার কাব্যসম্ভার হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নতুবা নয়। তার প্রত্যেকটি কবিতাই এ তিন প্রভাবের কোনোটি না কোনোটি দ্বারা প্রভাবিত।

ওমর আবু রিশা ক্ল্যাসিক ধারার কবি। তবে অধিকাংশ সমালোচকই তাকে নিউ ক্ল্যাসিক্যাল কবিদের কাতারে শামিল করেন। তারা মনে করেন তিনি আরবি কবিতাকে ক্ল্যাসিক ধারা থেকে নিউক্ল্যাসিক ধারায় নিয়ে আসেন। তবে কবিতা রচনার ক্ষেত্রে তিনি আরব প্রাচীন কবিদের ধারা অনুসরণ করেন এবং সে আলোকেই কবিতা রচনা করেন। প্রাচীন আরবি কবিতার শর্তাদি, নিয়ম, রীতি, স্টাইল ঢঙ মেনেই তিনি সকল কবিতার প্লট নির্মাণ করেন। বিদ্রোহ নয় সমঝোতার মাধ্যমেই তিনি আরবি কবিতাকে আধুনিক করার প্রয়াসে নিরত হোন। কবি ওমর আবু রিশা তার লাওয়াতুন বা আসক্তি কবিতায় বলেন-

আমার বোনের ভাবনা

কভূ তা ভুলব না,

সর্বদা সে আমাকেই লিখত।

বলেছিল সে গতকাল

পরিবারের হালচাল

ঘর ছাড়া আর প্রেমের যন্ত্রণা যত॥

কবিতার শেষে কবির আহবান-

আমার বোনের মনও

ভোলা যাবে না কখনও

সর্বদা সে আমার কল্যান চাইত।

আমার জন্য সে আত্মত্যাগী

কুরবানি করে আমার লাগি

মরেছে আলি তার সন্তান একমাত্র॥

কিংবা কবি তার মান আনতা বা কে তুমি? শীর্ষক কবিতায় বলেন:

কে তুমি?

আবির্ভূত হলে আমার দুনিয়ায়

কী দেখলে আমাতে?

তোমার দু চোখে

দেখেছি আমি জীবন

জীবনের ঝর্ণা প্রবাহিত তাতে॥

দেখেছি বিশ্ব ঔদার্যে ভরা

ইঙ্গিত তব কাঙ্খিত

জেনেছি বাল্য স্বপ্ন রেখেছি উচ্চে

যথা সম্মানিত॥

এভাবেই কবি আবু রিশা আধুনিকতার মিশ্রণে প্রাচীনত্বের অনুমানে যুগোপযোগী কবিতা রচনা নিরন্তর।

তার কবিতা পাঠে আমরা লক্ষ্য করি তিনি প্রাচীন আরবি কবিতার রীতি-কানুন-নিয়ম মেনে কবিতা রচনা করলেও বিষয়বস্তুতে এনেছেন বৈচিত্র, চেতনায় আনেছেন বহুমুখিতা। কবিতা সৃষ্টিতে ছন্দ, মাত্রা, অন্তমিল ইত্যাদির মান্য করলেও বিষয়, চিন্তা, উপকরণ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা প্রভৃতিতে এনেছেন নতুনত্ব, অভিনবত্ব। কবিতাকে করেছেন জীবনমুখি। প্রমাণ করেছেন কবিতা শুধু বিনোদনের জন্য নয় জীবনের জন্যও।

তার কাব্য কীর্তিতে আমরা রোমান্টিক কবিতার ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখি। অথচ জাহেলি বা প্রাচীন আরবি কবিতা রোমান্টিকতা মুক্ত ছিল। অর্থাৎ ওমর আবু রিশার কবিতায় আমরা পাই পুরাতনের মধ্যে নতুনের স্বাদ। প্রাচীন কবিতা ছিল চেতনা অনুভূতিলব্ধ। কিন্তু ওমর আবু রিশা এর সাথে যুক্ত করেছেন প্রজ্ঞা, মূল্যবোধ, মানবিকতা ইত্যাদি। ফলে তার কবিতা হয়েছে জীবনধর্মী, মানবিক, আধুনিক ও যুগোপযোগী।

তার অনবদ্য কবিতা আল ওয়াদাআ বা বিদায় কবিতায় কবি বলেন-

দাঁড়াও প্রিয়ো! দিও না লজ্জা আমায়

দুর্ভাগ্যের শিকার তুমি-আমি দুজনাই॥

আমাদের দু’জনকেই ছেড়ে গেছে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য

রকমারি ক্লেশ-কষ্ট কেড়ে নিয়েছে যত আনন্দ॥

বিদায় নিয়েছে সুখ স্বপ্না নেশাগ্রস্ত চোখে

প্রিয়ে! শুনিও না কভু দুর্মুখের কথা নিয়ে আমাকে॥

জানতে চাইব না কোনোদিন বঞ্চিতের কারণ আমার

নাও বন্ধু! প্রেম, দু:খ যা কিছু ভাগে জোটে তোমার॥

উল্লেখ্য প্রাচীন কবিতার বিষয়বস্তুতে রোমান্টিকতার স্পর্শে থাকলেও ধাঁচে ছিল না। অর্থাৎ কবিতাস্থিত কোনো পঙক্তি রোমান্টিক হলেও পদ্ধতি ও শাস্ত্রীয়ভাবে তা রোমান্টিক ছিল না।

কবি ওমর আবু রিশার জীবনকাল ছিল আরব বিশ্বের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দুর্ঘটনা, দৈবপাক ও বিপর্যয় বয়ে যাওয়ার সময়কাল। এ সময় গোটা আরব বিশ্বে ইউরোপীয়রা তাদের সা¤্রাজ্যবাদের নখর বিস্তারে প্রয়াসি হয়। আর ফিলিস্তিনিদের উপর চলে ইয়াহুদিবাদের আগ্রাসন। ফলে সে সময়ের আরব বিশ্বের কাব্যচর্চা কোনোভাবেই রাজনীতির স্পর্শ মুক্ত হতে পারেনি। ওমর আবু রিশার কবিতায় আমরা এর প্রভাব দেখি। বিশেষ করে ফিলিস্তিনীদের সমর্থনপুষ্ট তার একাধিক কবিতা শ্রোতৃনন্দিত হয়। এসব কবিতায় তিনি আরব নেতৃবৃন্দের নতজানু রাজনীতি, ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ না করা, নির্যাতনের মুকাবিলায় মুখ বন্ধ করে রাখার নীতির কড়া সমালোচনা করেন। স্বাধিকার, স্বাধীনতা, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত কাব্যসম্ভার আজও তাই বিশ্ববাসীর কাছে শ্রদ্ধার্ঘ।

তার প্রকাশিত অপ্রকাশিত মিলে দশটির বেশি কাব্য সংকলন রয়েছে। এর বাইরে দু’টি নাটক এবং অসংখ্য প্রবন্ধ রয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে-

ক. দিওয়ানু শি’র বা কাব্য সংকলন- আলেপ্পো: ১৯৩৬।

খ. দিওয়ানু উমর আবু রিশা বা ওমর আবু রিশার কবিতা- বৈরুত: ১৯৪৭।

গ. দিওয়ানু মুখতারাত বা নির্বাচিত কবিতা- বৈরুত: ১৯৫৯।

ঘ. গানাইতু ফি মাতামি বা শোক-দু:খে যা গেয়েছি- ১৯৭১ (কাব্য সংকলন)।

ঙ. দিওয়ানু উমর আবু রিশা বা ওমর আবু রিশা কাব্য সংকলন, ১ম খ-। দারু আল আওদাহ- বৈরুত: ১৯৭১।

চ. আমরুকা ইয়া রাব্বি- বা প্রভু তোমারই নির্দেশ- জেদ্দা, সৌদি আরব: ১৯৮০।

ছ. মিন ওয়াহই আল মারাত বা রমনীর ঐশি বাণী- দামেস্ক- সিরিয়া: ১৯৮৪।

জ. জড়ারহম অষড়হব ইংরেজিতে প্রকাশিত তার কাব্য সংকলন- দারু আল-কাশ্শাফ: ১৯৫৯।

নট্য সংকলন:

ক. জি ক্বার

খ. সামির আমিস

গ. তাজ মহল

ঘ. উবরিত আল আজাব

ঙ. মাহকামাতু আল শুয়ারা (সম্পূর্ণ ও অপ্রকাশিত)

চ. তুফান (সম্পূর্ণ ও অপ্রকাশিত)

১৯৯০ সাল। জুলাই মাস। কবি ওমর আবু রিশা তখন রিয়াদে। আকস্মিকভাবে তিনি ইৎধরহ ঈষড়ভ এ আক্রান্ত হোন। চিকিৎসারত অবস্থায় ১৪ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর তার শবদেহ বিশেষ বিমান যোগে সিরিয়ার আলেপ্পোতে নিয়ে আসা হয়। ১৫ জুলাই তার দাফনকর্ম সম্পন্ন হয়।

তিনি তার কাব্য দক্ষতা ও কূটনৈতিক নৈপূণ্যে সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হোন। তিনি বিভিন্ন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সম্মানসূচক পদবি লাভ করেন।

ক. ১৯৪৮ সালে তিনি আরবি একাডেমি সিরিয়ার সদস্য নির্বাচিত হোন।

খ. ইন্ডিয়ান বিশ্ব সংস্কৃতি পর্ষদের সদস্য মনোনীত হোন।

গ. ব্রাজিলের লিটারেচার একাডেমির সদস্য মনোনীত হোন।

ঘ. অস্ট্রিয়া কর্তৃক সংস্কৃতিক পদকে ভূষিত হোন।

ঙ. লেবাননের রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক পদক প্রাপ্ত হোন।

এছাড়াও আরব রাষ্ট্রসমূহ এবং এর বাইরে বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা অস্ট্রিয়া, লেবানন, সিরিয়ায় একাধিক জাতীয়, আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে কবিকে পদক ও ব্যাজ পরিয়ে সম্মানিত করা হয়।

কবি ওমর আবু রিশা জীবনের প্রায়োজনে কূটনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সাহিত্যের প্রতি তার ভালোবাসা আজন্মের। সেই ভালোবাসা থেকেই তার কাব্যচর্চা। সখ্য বেড়েছে কবির সাথে কবিতার। গাঢ়তর হয়েছে এ দু’য়ের সম্পর্ক। পরিণত হয়েছেন আধুনিক আরবি কবিতার প্রখ্যাতদের একজনে। জনপ্রিয় কবিদের শীর্ষে তার অবস্থান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ