শুক্রবার ২০ মে ২০২২
Online Edition

বায়ু দূষণ রোধে ঢাকার পথে পথে প্রতিদিন ছিটানো হচ্ছে আড়াই লাখ লিটার পানি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নানা কারণেই বাড়ছে রাজধানীতে বায়ু দূষণের মাত্রা। বিশেষ করে ধুলা দূষণে অসহনীয় হয়ে উঠেছে নগরজীবন। বাড়ছে হাঁপানি-শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগব্যাধিও। তা ছাড়া, ঢাকার পরিবেশ হয়ে ওঠছে বিবর্ণ। ধুলো-বালিতে ঢেকে যাচ্ছে প্রকৃত অবয়ব। এ পরিস্থিতিতে বায়ুদূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্দেশে সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদফতরকে  এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন বলছে তারা আগে থেকেই বায়ু দূষণ রোধে কাজ করছে। ঢাকার দুই সিটিতে প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার পানি ছিটানো হচ্ছে।
দুই সিটির দায়িত্বশীলদের বক্তব্য,বিশেষ করে শুষ্ক মওসুম শুরুর আগেই তারা ধুলোবালি-বায়ু দূষন রোধে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে নাগরিক জীবনে স্বস্তি বজায় রাখতে প্রতি বছরই রাজপথসহ অলিগলিতে পানি ছিটিয়ে আসছে। তবে ,এ কাজে তাদের যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকলেও জনবল আর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি-যান না থাকায় তারা কুলোয় ওঠতে পারেন না। তা ছাড়া, মাঝে মাঝে পানিরও সংকটে পড়তে হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশের পর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আজ থেকে নগরীতে পানি ছিটানোর কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাঙলা একাডেমি সংলগ্ন এলাকায় এ উদ্বোধন হবে।
ডিএসসিসি সুত্র জানায়, মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন আজ বুধবার সকাল ১১টায় বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গন হতে  কর্পোরেশনের ৯টি পানির গাড়ির মাধ্যমে নগরীর সড়কসমূহে পানি ছিটানো কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
খোঁজ খবর নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীতে প্রতিনিয়ত রাস্তা খোঁড়াখুড়ি চলছে। বর্তমানে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান কাজের পাশাপাশি সারা বছর ধরেই দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, তিতাস, ডেসকো, ডিপিডিসির খোঁড়াখুড়ি চলতে থাকে। এছাড়া পুরো নগরীজুড়ে সারাবছর ধরেই চলতে থাকে নতুন নতুন বাড়ি নির্মাণ। বাড়ি নির্মান কাজের জন্য বেশিরভাগ সময়ই ইট-বালু এনে রাস্তায় ফেলে রাখা হচ্ছে। যা পুরো রাস্তা ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন বা পরিবেশ অধিদফতর কোন প্রতিষ্ঠানকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। এ কারণে রাস্তায় ইট-বালু রেখে বাড়ি নির্মাণের প্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলেছে। দেশে বর্তমানে শীতকাল চলছে। দীর্ঘদিন থেকে রাজধানীতে বৃষ্টির দেখা নেই। এ কারণে পুরো রাজধানীর পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়েছে। ঘর থেকে রাস্তায় বের হলেই নাকে-মুখে ঢুকে যাচ্ছে ধুলাবালি। পোশাক-পরিচ্ছদ ধুলিময় হয়ে যাচ্ছে। দুদিন পরপরই পোশাক নতুন করে ধুতে হচ্ছে। এতে শারীরিক-মানসিক রোগব্যাধির পাশাপাশি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ।
বিষয়টি সম্প্রতি আদালতের নজরে আনে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। জনস্বার্থে করা এক রিটের প্রেক্ষিতে গত ২৮ জানুয়ারি প্রাথমিক শুনানি শেষে বায়ুদূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানোর নির্দেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট রুল জারি করে বলেছেন- ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে দুই সপ্তাহের রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। মনজিল মোরসেদ আরো জানান, অন্তবর্তীকালীন আদেশে বিবাদি সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদফতরকে ১৫ দিনের মধ্যে রাস্তায় এবং ঢাকা শহরে নির্মাণাধীন কাজের জায়গাকে ঢেকে দেয়ার পর কাজ করার পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। অপর এক আদেশে দুই সিটির মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সকালে এবং বিকেলে যেসব স্থানে ধুলাবালি সৃষ্টি হচ্ছে সেখানে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উভয়ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলেছেন আদালত। এ ছাড়া আদালত পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালককে সপ্তাহে দুইবার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বায়ুদূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন এবং চার সপ্তাহের মধ্যে অগ্রগতির প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে পরিবেশ দূষণ রোধে নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই সিটিতে প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার পানি ছিটানো হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সার্কেল) আনিছুর রহমান পবন দৈনিক সংগ্রামকে গতকাল বলেন, প্রতিদিন ৯টি গাড়ির মাধ্যমে  ৫০ কিলোমিটার সড়কে সকাল ও দুপুরে দুই বেলা পানি ছিটানো হচ্ছে। প্রতিটি গাড়িতে সাত হাজার লিটার পানির ধারণ ক্ষমতা রয়েছে বলে ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক গোলাম মোর্শেদ জানিয়েছেন। সে হিসেবে ডিএসসিসি প্রতিদিন এক লাখ ২৬ হাজার লিটার পানি ছিটাচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগেও প্রতিদিন সড়কে পানি ছিটানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সার্কেল) আবুল হাসনাত মো: আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, আগে মাত্র তিনটি গাড়িতে পানি ছিটানো হতো। সাবেক মেয়র আনিসুল হক আরো ১০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেন। গত ছয় মাস ধরে ১৩টি গাড়ি দিয়ে সারাদিনে পানি ছিটানো হচ্ছে। ডিএনসিসির প্রতিটি গাড়িতে ১০ হাজার লিটার করে পানি ধরে। সে হিসেবে ডিএনসিসি প্রতিদিন এক লাখ ৩০ হাজার লিটার পানি ছিটাচ্ছে বলে আশরাফুল আলম জানান। 
তবে গত কয়েকদিনে রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, ধুলা দূষণ রোধে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন কিছু সড়কে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করলেও তা যথেষ্ট নয়। পানি ছিটানোর কিছু সময় পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছে সড়কের অবস্থা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ