শুক্রবার ০২ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

তিন বছরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার কুলকিনারা হয়নি

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন (৮ কোটি ১০ লাখ) ডলার বাংলাদেশী টাকায় ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ফিলিপাইনের হ্যাকাররা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতার কারণে অল্পের জন্য রক্ষা পায় আরো প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এ চুরির ঘটনা ছিল ওই বছরের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগের ঘটনা। শুধু দেশের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল না, আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও সংবাদের শিরোনাম হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। সে আলোচনা এখনো চলমান। বিশ্বের বৃহত্তম এ রিজার্ভ চুরির পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ওই অর্থ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৮ সাল শেষে তার সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার হয়েছে। বাকি অর্থ ফেরতে দীর্ঘ তিন বছরেও কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি সরকার।
এদিকে রিজার্ভ চুরির সাথে জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউকেই চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা না হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক মাইয়া দেগুইতোকে। ফিলিপাইনের একটি আঞ্চলিক আদালত ম্যানিলাভিত্তিক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক কর্পোরেশন (আরসিবিসি) ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মাইয়া দেগুইতোকে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তবে সরকার চুরির অর্থ ফেরতের আশা এখনো ছাড়েনি। গতকাল রোববার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, রিজার্ভ চুরির অর্থ ফেরত আনতে চলতি মাসেই মামলা করা হবে।
জানা যায়, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রিজার্ভ চুরির এই ঘটনাটি ৪ ফেব্রুয়ারি ঘটলেও তা বাংলাদেশের মানুষ ৫ মার্চ জানতে পারে। ৭ মার্চ থেকে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এরপর ফিলিপাইনের তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন নতুন তথ্য। ফিলিপাইনের দৈনিক পত্রিকা ইনকোয়ারার প্রতিবেদন অনুযায়ী- চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজার্ভ ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে (জুয়ার আসরে)। আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ আরও ২০ দিন।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০০ কোটি ডলার সরাতে মোট ৩৫টি অনুরোধ পায় নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ। এর প্রথম চারটি অনুরোধে তারা ফিলিপিন্সের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ৮১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করে। এরপর স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত হয়ে ওই টাকার প্রায় অর্ধেক চলে যায় ক্যাসিনোর জুয়ার টেবিলে। পঞ্চম আদেশে শ্রীলঙ্কায় প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে একটি ‘ভুয়া’ এনজিও’র অ্যাকাউন্টে ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হলেও বানান ভুলে সন্দেহ জাগায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।
এ ঘটনায় গত বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামী করে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫)-এর ৪ ধারাসহ তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৪ ধারায় ও ৩৭৯ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন।
অর্থ চুরি যাওয়ার বিষয়টি প্রায় এক মাস চেপে রাখায় সমালোচনার মধ্যে পড়েন তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় ড. আতিউর রহমানের। ঘটনার এক মাস ৯ দিন পর দ্বিতীয় মেয়াদের পাঁচ মাস বাকি থাকতেই ১৭ মার্চ পদত্যাগ করেন। সরকার অব্যাহতি দেয় দুইজন ডেপুটি গভর্নরকে।
এরপর ১৬ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রাক্তন অর্থ সচিব ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলে কবিরকে চার বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি জানায়। নিউইয়র্কে থাকাবস্থায় নিয়োগ পাওয়া ফজলে কবির বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১তম গবর্নর হিসেবে ২০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ফিলিপিন্সে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনাই তার এখন প্রধান কাজ।
পরে ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক গবর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ তদন্তকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৭৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদের আগেই কমিটি অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট জমা দেয়।
কমিটি যে রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দেয় ওই রিপোর্ট আজও পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ফিলিপাইন সরকারও ওই রিপোর্টটি চেয়েছে বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাফ জানিয়ে দেন রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন ফিলিপাইনকে দেয়া হবে না। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। একই বছর ২৬ নবেম্বর আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল যায় ফিলিপাইনে। কিন্তু তারা শূন্য হাতে ফিরে আসে।
এ দিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য ফাঁসে বাংলাদেশ ব্যাংকে তোলপাড় শুরু হয়। এফবিআই বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার রিজার্ভ চুরিতে ব্যাংকটির ভেতরকার ব্যক্তিদের যোগসাজশ ছিল। এবং এফবিআইয়ের এজেন্টদের দাবি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এফবিআইয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে মামলা করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফটের সঙ্গে আলোচনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। ওই মামলায় তারা বাদী হবে কি না, এমন কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, অর্থ উদ্ধারের জন্য ২০১৮ সালের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ ওই দেওয়ানি মামলাটি করা হবে নিউইয়র্কে। ফেডারেল রিজার্ভ ও সুইফট কর্তৃপক্ষ এই মামলায় বাদী হবে বলে আশা বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ও সুইফটের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি।
২০১৭ সালের মতো ২০১৮ সালেও আর্থিক কেলেঙ্কারির এ বিষয়টি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সর্বশেষ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে আলোচনা চলছে। অর্থ চুরির পর থেকে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংককে টাকা ফেরতের ব্যাপারে বলা হয়েছে। প্রথমে তারা আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে গড়িমসি শুরু করে। তাই এখন শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে। রিজাল ব্যাংককে পৃথিবী থেকে বিদায় করতে চাই।
অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্যের পর ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি) জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিজেদের গাফিলতির দায় এড়াতে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসিকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাতে চাচ্ছে। ব্যাংকটি অভিযোগ করে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকটির এ ধরনের অভিযোগের খবর দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে রয়টার্স। ওই প্রতিবেদনে আরসিবিসির হেড অব লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স জর্জ ডেলা কুয়েস্তার বরাতে বলা হয়, আইনত যেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব, আরসিবিসি তার সবই ফিলিপিন্সের সিনেট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকই সবকিছু লুকিয়েছে।
এদিকে চুরি হওয়া রিজার্ভের টাকা উদ্ধারে চলতি মাসেই নিউইয়র্কের আদালতে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল রোববার সচিবালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সচিব মো. আসাদুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা মামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। এ মাসের ভেতরেই মামলা হবে। এই মামলা দেখভালের জন্য বাংলাদেশের একজন আইনজীবী রয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে আমেরিকায়ও একজন আইনজীবী আছেন। তারা যৌথভাবে সময় নির্ধারণ করে এ মামলা দায়ের করবেন। তবে কার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে এখনও সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। কতজনকে আসামী করব, কতজনকে বাদী করব এগুলো দুই দেশের আইনজীবীরা বসে ঠিক করবেন। আপনাদের আমি আশ্বস্ত করতে পারি নির্ধারিত সময়ের ভেতরেই মামলা হবে।
অন্যদিকে রিজার্ভ চুরির সাথে জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউকেই চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা না হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক মাইয়া দেগুইতোকে। চলতি মাসে (১০ জানুয়ারি-২০১৯) ফিলিপাইনের একটি আঞ্চলিক আদালত ম্যানিলাভিত্তিক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক কর্পোরেশন (আরসিবিসি) ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মাইয়া দেগুইতোকে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হওয়া আটটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে চার থেকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে ১০ কোটি ৯ লাখ ডলার জরিমানা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পাঁচটি সুইফট বার্তার মাধ্যমে চুরি হওয়া এই অর্থ ম্যানিলার আরসিবিসি ব্যাংকের একটি ব্র্যাঞ্চের একাউন্টে পাঠানো হয়। সে সময় ওই ব্যাংকের ব্যাবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মাইয়া দেগুইতো। এরপরেই ওই অর্থ ফিলিপাইনের জুয়ার টেবিল ঘুরে হাতবদল হয়।
২৬ পৃষ্ঠার শুনানিতে আদালতের তরফ থেকে জানানো হয় যে, এই অর্থ লেনদেনে তার কোন হাত ছিল না বলে মাইয়া দেগুইতো যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আদালতের ওই রায়ে আরও বলা হয়েছে, অবৈধ ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ