বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ঢাকা শহরের ক্রম:বিবর্তন

ঢাকা (পারিসরিক বৃদ্ধি) বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার সঙ্গমস্থলের প্রায় ১৩ কিমি উজানে অবস্থিত (২৩ক্ক-৪৩ক্ক উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০ ডিগ্রি-২৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ)। স্থানটি পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার সাথে ছোট ছোট নদী দ্বারা সংযুক্ত। ফলে দেশের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সাথে পণ্য পরিবহনযোগ্য। স্থল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ঢাকা সুবিধাজনক স্থানে, কেননা পুরানো পলল ভূমি গঠিত ভূখণ্ডের দক্ষিণ সীমান্তের নগরটি সাধারণ বন্যার সময় চারপাশের নদী সমতল থেকে উঁচুতে অবস্থিত। নগরের উত্তর অংশ লাল মাটি অঞ্চলে অবস্থিত, যা উত্তরে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত।
সাভারের সামান্য নিচে ধলেশ্বরী থেকে উদ্ভূত হয়ে বুড়িগঙ্গা নগরের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ডান দিকে বাঁক নিয়ে ফতুল্লার পরেই পুনরায় ধলেশ্বরীতে মিলিত হয়েছে। নদীটি এভাবে নগরের দক্ষিণ ও পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করে। আরও কিছু জলধারা (প্রধানত দোলাই খাল, পান্ডু নদী এবং বালু নদী) নগরীর মধ্য ও আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত। ফলে নগরের বৃদ্ধিতে একটি ভূপ্রকৃতিগত বাঁধার সৃষ্টি হয়েছে। নগরটি দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা থেকে উত্তরে প্রকৃত অর্থে টঙ্গী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এ উঁচুভূমির বিস্তার দুপাশে সমাপ্ত হয়েছে নিচু জলাভূমি এবং পুরাতন নদী-চরের মাঝে। নিচু জলমগ্ন এলাকা উঁচুভূমির একেবারে মাঝে এসে প্রবেশ করেছে, যেমন- পশ্চিম থেকে পূর্বে, মিরপুর থেকে ক্যান্টনমেন্টের নিচু ভূমিতে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে বারিধারা, খিলক্ষেত, উত্তরার নিচু ভূমিতে। ফলে নগরের পারিসরিক বৃদ্ধি খুব সহজে এবং নির্বিণ্ডে ঘটেনি। নগরটির অস্তিত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমিরূপ এর বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
প্রাক্-মুগল পর্যায় ঢাকার প্রাক্-মুসলিম অতীত অস্পষ্ট। দশম থেকে তের শতক পর্যন্ত নিকটবর্তী রাজধানী শহর বিক্রমপুরই ছিল বিখ্যাত। উক্ত সময়ে এ এলাকায় জনবসতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের (তেরো শতকের শেষার্ধ এবং চৌদ্দ শতকের প্রথম দিকে) আধিপত্য বিস্তারের পর নিকটবর্তী সোনারগাঁও প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রাক্-মুগল আমলে (চৌদ্দ থেকে ষোল শতকে) দু’টি মসজিদের উৎকীর্ণ লিপি, ধ্বংসাবশেষ এবং লিখিত দলিলে, বিশেষত বাহারিস্তান-ই-গায়েবি থেকে স্বল্প গুরুত্বের একটি ছোট শহর হিসেবে ঢাকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বুড়িগঙ্গার বাম তীরে (উত্তর) বাবু বাজারের পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ নিয়েই গড়ে ওঠে প্রাক্-মুগল ঢাকা (মানচিত্র-১)। প্রাক্-মুগল আমলে হিন্দু নাম বিজড়িত লোকালয় নিয়ে গড়ে ওঠা পুরনো ঢাকার এ অংশটিতে (যেমন- লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার, সূত্রাপুর, জালুয়ানগর, বানিয়ানগর, গোয়ালনগর, তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজার, ছুতারনগর, কামারনগর, পটুয়াটুলি, কুমারটুলি ইত্যাদি) হিন্দু কারিগর ও পেশাজীবীদের প্রাধান্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা বাণিজ্যিক গুরুত্ব সহকারে রাজধানী সোনারগাঁয়ের সন্নিকটে গড়ে ওঠেছিল। সোনারগাঁও থেকে নদীপথে যোগাযোগের উপর ভিত্তি করে প্রাক্-মুগল ঢাকার লোকালয়গুলো গড়ে ওঠেছিল। বুড়িগঙ্গা এবং দোলাই নদী এর দক্ষিণ এবং পূর্ব সীমানা নির্দেশ করত। তবে এর পশ্চিম সীমানা চিহ্নিত করা কঠিন। নসওয়ালগলি মসজিদ লিপিকে (১৪৫৯ খ্রি.) হিসাবে এনে এর প্রাপ্তিস্থানে (বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের পশ্চিম পার্শ্ব) যদি মসজিদের অবস্থান ধরা হয় এবং যদি মুগল আগমনের পূর্বেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের অস্তিত্ব থেকে থাকে, যার সম্ভাবনা যথেষ্ট, তাহলে এ ধারণা খুবই সঙ্গত যে, নগরের পশ্চিম সীমানা বাবুর বাজার ছাড়িয়েও ঢাকেশ্বরী-উর্দু রোড পর্যন্ত ছিল। মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদীর (যিনি ১৫৭৭ খ্রি. মারা যান) দরগাহর অস্তিত্ব এ এলাকায় প্রাক্-মুগল বসতি প্রমাণ করে। এটি খুবই সম্ভব যে, বুড়িগঙ্গার প্রবাহ বরাবর নগরের দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিম অংশে বসতি গড়ে ওঠে। নগরের পশ্চিম অংশটি, নদী তীরের রায়ের বাজার কুমারপাড়া হিসেবে গড়ে ওঠে, যদিও এ বসতিটির স্থাপনা সময় সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। অবশ্য নদীর তীরে গড়ে ওঠা এসব বসতি ছিল বিক্ষিপ্ত। তবে বাবু বাজারের পূর্ব অংশটিই ছিল ঘন বসতিপূর্ণ।
মুগল আমল প্রাক্-মুগল ঢাকা আকবর এর সামরিক অভিযানের সময় একটি থানায় (সামরিক ঘাঁটি) রূপান্তরিত হয়। কিন্তু এটি প্রসিদ্ধ হতে শুরু করে ১৬১০ সালে ইসলাম খান চিশতি যখন সুবাহর রাজধানী এখানে স্থানান্তরিত করে এর নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। বাহারীস্তান থেকে জানা যায় যে, ইসলাম খান চিশতীর সময়ে দুর্গ (বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার) এবং দুর্গের সোজা দক্ষিণে নদীতীরের চাঁদনিঘাট এলাকা দু’টি গড়ে ওঠে। দুর্গ এবং চাঁদনিঘাটের মধ্যবর্তী এলাকার বাজারটি (বর্তমান চকবাজার), যার পূর্বের নাম বাদশাহী বাজার, এবং দুর্গের পশ্চিমে উর্দুবাজার সম্ভবত একই সময়েই গড়ে উঠেছিল। বাবু বাজারের নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা থেকে মালিটোলা-তাঁতিবাজারের নিকটে দোলাই খাল পর্যন্ত একটি খাল খননের কৃতিত্ব ইসলাম খানের। কার্যত এ খালটিই ‘পুরানো ঢাকা’র সাথে ইসলাম খানের ‘নতুন ঢাকা’র সীমানা নির্ধারণ করত (মানচিত্র-২)। নদী তীরের সমান্তরালে বাবুর বাজার থেকে পাটুয়াটুলি পর্যন্ত এলাকাটি ইসলামপুর নামে পরিচিত ছিল। বংশাল-মালিবাগ এলাকার পুরানো মুগলটুলির অস্তিত্ব ‘পুরানো ঢাকা’য় মুগলদের প্রথম দিকের দখলদারিত্ব প্রমাণ করে।
১৭১৭ সালে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পূর্বপর্যন্ত ইসলাম খান কর্তৃক সূচিত ‘নতুন ঢাকা’ পরবর্তী সুবাহদারদের দ্বারা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। একশ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর সম্মান উপভোগ করে। প্রশাসনিক প্রয়োজনের সাথে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কর্মকান্ড যুক্ত হয়ে ঢাকা একটি ছোট শহর থেকে মহানগরে পরিণত হয়। মুগল ঢাকা নিজের ভেতরেই ‘পুরানো ঢাকা’কে গ্রাস করে পূর্বে নারিন্দা, পশ্চিমে মানেশ্বর ও হাজারিবাগ এবং উত্তরে রমনার প্রান্তস্থিত ফুলবাড়িয়া এলাকা পর্যন্ত (বর্তমান কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ-এর দক্ষিণে যেখানে এক সময় ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন অবস্থিত ছিল) বর্ধিত হয়েছে। পশ্চিম সীমান্তে গড়ে ওঠেছিল পিলখানা। পশ্চিমে দুর্গ ও পিলখানার মধ্যবর্তী স্থান এবং উত্তরে দুর্গ ও ফুলবাড়িয়ার মধ্যবর্তী স্থানে রাজকীয় কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী প্রভৃতিদের আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। পরিকল্পনাহীন ভাবে গড়ে ওঠা কুন্ডুলিপাঁকানো রাস্তাসহ (পুরনো ঢাকা নামে পরিচিত) নগরটি সুস্পষ্টভাবেই মুগল শহরের ছাপ বহন করছে। দুর্গটি ছিল শহরের প্রধান কেন্দ্র। শহরের অন্যান্য এলাকা (মহল্লা) গড়ে উঠেছিল আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। দুর্গের দক্ষিণ এবং একেবারে নদী পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে এবং উত্তর-পূর্ব  এবং  উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ছিল আবাসিক এলাকা। নগরের উত্তর সীমানা বর্ধিত ছিল মীরজুমলা (১৬৬০-১৬৬৩) কর্তৃক নির্মিত প্রধান ফটক পর্যন্ত। বর্তমানে এ তোরণটি আধুনিক সমাধিসৌধ তিন নেতার মাজারের নিকটে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গ্রন্থাগার-এর পূর্বে অবস্থিত। মীরজুমলা রাজধানী প্রতিরক্ষার জন্য দুটি দূরবর্তী দুর্গের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী রাস্তা তৈরি করেছিলেন। একটি রাস্তা ছিল উত্তরে টঙ্গী-জামালপুর দুর্গ এবং অপরটি  পূর্বে  ফতুল্লা  দুর্গ পর্যন্ত। এ দুদিকে শহরের বৃদ্ধিতে রাস্তা দুটির প্রভাব অবশ্যই ছিল।
শায়েস্তা খান এর আমলে (১৬৬৩-১৬৭৮; ১৬৭৯-১৬৮৮) ঢাকার বৃদ্ধি এবং দালান-কোঠা নির্মাণ হয়েছে ব্যাপক হারে। ১৬৬৬ সালে ঢাকায় আগত জে.বি টেভার্নিয়ার এর মতে ঢাকা ছিল একটি বিশাল শহর। তিনি বলেন ঢাকা বৃদ্ধি পায় শুধু লম্বায়, কারণ সবাই নদীর ধারেই বাস করতে চাইত। টমাস বাউরি (১৬৬৯-১৬৭৯ সময়ের মধ্যে লেখা) ঢাকার পরিধি প্রায় ৪০ মাইল বলে উল্লেখ করেছেন।  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিকের দলিল অনুযায়ী (১৭৮৬ ও ১৮০০) শহরের সীমানা ছিল- দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, উত্তরে টঙ্গী, পশ্চিমে জাফরাবাদ, মিরপুর এবং পূর্বে পোস্তগোলা। তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মীরজুমলার ঢাকা তোরণের উত্তরে লোকবসতি ছিল বিক্ষিপ্ত। ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর ফ্যাক্টরিসমূহ ছিল তেজগাঁও এলাকায়। ফুলবাড়িয়া এবং ঢাকা তোরণের মধ্যবর্তী এলাকাটি, যা বাগ-ই-বাদশাহী নামে পরিচিত ছিল, মূল মুগল শহরের বাইরে একটি বহিস্থবলয় তৈরি করেছিল। মুগল শহরের বিস্তার হয়েছিল মূলত দুর্গের পশ্চিম দিকে এবং নদীতীর বরাবর মুগল বসতি বর্ধিত হয়েছিল শহরের উত্তর-পশ্চিম দিকে জাফরাবাদ-মিরপুর এলাকা পর্যন্ত। শায়েস্তা খানের সাতগম্বুজ মসজিদ পর্যন্ত বিস্তৃত বর্তমান সাতমসজিদ সড়কটি সম্ভবত উত্তর-পশ্চিম অক্ষে মুগল বসতি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। মীরজুমলা কর্তৃক নির্মিত বাগ-ই-বাদশাহী ও টঙ্গী সামরিক ঘাটির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনকারী সড়কটি (পরবর্তীকালে ঢাকা ময়মনসিংহ সড়কের অংশ) শহরের ওই দিকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অক্ষ তৈরি করেছে।
লক্ষণীয় যে, ঢাকা ধারাবাহিক ভাবে উঁচু ভূমির ওপর অবস্থিত ছিল না। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার সমান্তরালে পূর্বে পোস্তগোলা থেকে পশ্চিমে হাজারিবাগ পর্যন্ত একফালি উঁচু ভূমি ছিল এবং এ বলয়ের উত্তর সীমানা মুগলদের বাগ-ই-বাদশাহী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ বলয়ের উত্তর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিক থেকে খাল, জলাশয় এবং নিচু জলাভূমি দ্বারা বিচ্ছিন্ন। পশ্চিম পার্শ্বের ধানমন্ডি, শ্যামলী-কল্যাণপুর এবং মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় রয়েছে নিচু জলাভূমি। অন্যদিকে পূর্ব পার্শ্বে কারওয়ান বাজারের দক্ষিণে উঁচু ভূমির মাঝে বেগুনবাড়ি খালের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে নিচু এলাকা। এ নিচু ভূমি উত্তরে অগ্রসর হয়ে গুলশান, বনানীর উঁচু ভূমি পর্যন্ত বর্ধিত। গুলশান-বনানীর এ উঁচু ভূমির বলয়টি উত্তরা ও টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত। এ এলাকাটি উভয় পার্শ্বে নিচু ভূমি ও জলাশয় দ্বারা বেষ্টিত, যা পশ্চিমে তুরাগ এবং পূর্বে বালু নদী দ্বারা প্লাবিত হয়। মুগল আমলে নগরের বৃদ্ধি স্বাবাভিকভাবেই প্রকৃতির এ প্রভাবকে অনুসরণ করেছে। ঢাকা কলেজ-নিউ মার্কেট পর্যন্ত ধানমন্ডি এলাকাটি ছিল ধানি জমি।
বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণেই ঢাকা ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করে। এদের মধ্য ছিল পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ,  ফরাসি এবং  আর্মেনীয়গণ। এরা সকলেই সতেরো শতকে ঢাকায় তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। তেজগাঁও এলাকাতে তারা তাদের ফ্যাক্টরি গড়ে তোলে, ফলে তেজগাঁও এলাকা পরবর্তী শতক এবং তারপরও বাণিজ্যিক এলাকার গুরুত্ব পেতে থাকে। কারওয়ান বাজারের উত্তরে (মুগল আমলেও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র) এবং অধুনালুপ্ত খাজা আম্বরখানা ব্রিজ-এর অক্ষ বরাবর মীরজুমলা কর্তৃক নির্মিত সড়কের উভয় পার্শ্বে ইউরোপীয় বসতি গড়ে ওঠে।
১৭১৭ সালে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে ঢাকার গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। ঢাকা হয়ে ওঠে নায়েব নাজিমের আস্তানা এবং পূর্ববাংলার মুগল সামরিক ও নৌ বাহিনীর সদর দপ্তর। তবে ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক কর্মকান্ড তখনও ঢাকাকে জীবিত রাখে, যদিও তার পারিসরিক কোনো বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয় না। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করার পর ঢাকার পতন শুরু হয়। যদিও প্রাদেশিক বিচার বিভাগ ও আপিল দপ্তর ঢাকাতেই ছিল তথাপি ১৮২৮ সাল নাগাদ নগরটি শুধু একটি জেলা সদরে পরিণত হয়। আঠারো শতকের শেষের দিকে এবং ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে সূতিবস্ত্র বাণিজ্যের পতন হলে এ ধ্বংস ত্বরান্বিত হয় এবং ১৮৪০ সাল নাগাদ এ পতন চরমে পৌঁছায়। অধিকাংশ মুগল শহরই হয় পরিত্যক্ত নয় জঙ্গলাকীর্ণ হয়েছে। ঢাকা হয়ে ওঠে সংকুচিত। একদা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হয় লোকশূন্য। ১৮৫৯ সালে প্রস্ত্ততকৃত একটি মানচিত্র থেকে দেখা যায় যে, এ সময় ঢাকা নগর দৈর্ঘ্যে সোয়া তিন মাইলের সামান্য বেশি এবং প্রস্থে সোয়া এক মাইলের মতো জায়গা দখল করে আছে (মানচিত্র-৩)।
প্রাথমিক উপনিবেশিক পর্যায় ১৮৪০ সালে মিউনিসিপ্যাল কমিটি এবং ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজের প্রতিষ্ঠা ঢাকার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ ধীরে ধীরে নগরটিকে ইউরোপীয় প্রভাবাধীন আধুনিক শহরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধটি ছিল এর পারিসরিক পুনর্জন্মের। শহর সীমানা বৃদ্ধি না পেলেও মুগল শহরটি পাকা রাস্তা, উম্মুক্ত জায়গা, রাস্তার আলো, পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ইত্যাদি সমৃদ্ধ হয়ে একটি আধুনিক শহরে পরিণত হয়। ১৮২৫ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডয়েস এ প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার পদক্ষেপের মধ্যে ছিল রমনা এলাকা পরিষ্কার করে রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) স্থাপন। রাসেল স্কিনার (ম্যাজিস্ট্রেট, ১৮৪০) এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখেন। আর্মেনীয় এরাতুন জমিদার পরিবার রেসকোর্স ময়দানের পশ্চিমে (বর্তমান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন এবং টি.এস.সি এলাকা) কিছু জায়গা কিনে একটি বাড়ি র্নিমাণ করে। ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা নওয়াব পরিবার রেসকোর্স ময়দানের পশ্চিম পার্শ্বস্থ এলাকার উন্নয়ন সাধন করে এবং বেশ বড় আকারের ভবন, কমপ্লেক্স এবং বাগান নির্মাণ করে। এলাকাটি শাহবাগ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। নওয়াবগণ (খাজা আলীমুল্লাহর পরিবার) শুধু শাহবাগই নয় শহরের উত্তর-পূর্ব অংশে দিলকুশা এবং মতিঝিল এলাকাও গড়ে তোলেন। ঐসব এলাকায় তারা বিনোদনের জন্য বাগান বাড়ি নির্মাণ করেন।
ডয়েস নওয়াবপুরের উত্তর-পূর্ব অংশ পরিষ্কার করে এলাকাটিতে সেনাছাউনি স্থাপন করেন। এ এলাকাটিই পরবর্তী সময়ে পুরানা পল্টন নামে পরিচিত হয়। অবশ্য মশার প্রকোপের কারণে ১৮৫৩ সালে সেনাছাউনিটি লালবাগ দুর্গে সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব এর পর শহরের পূর্ব সীমানায় নদী তীরের মিল ব্যারাকে সেনাছাউনি স্থানান্তরিত হয়। পুরানা পল্টন এলাকা সিপাহিদের অনুশীলনের ময়দান হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে। এর কিছু অংশ অবশ্য কোম্পানির বাগান এবং খেলার মাঠে পরিণত হয়।
ঊনিশ শতকের শেষ এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীতীর এলাকায় ঢাকার উন্নয়ন ঘটতে থাকে। এখানে ধনীরা আহসান মঞ্জিল এবং রূপলাল হাউসের মতো বেশ কিছু চমৎকার ভবন নির্মাণ করেন। বিভাগীয় কমিশনার সি.ই বাকল্যান্ড কর্তৃক নদীর উত্তর তীরে বাঁধ র্নিমাণের ফলে নদী-সম্মুখস্থ উপরের প্রশস্ত এলাকাটি একটি চিত্তাকর্ষক এলাকায় পরিণত হয়। বাকল্যান্ড বাঁধটিকে প্রকৃতি প্রেমীদের মিলনস্থলে পরিণত করে (ঊনিশ শতকের আশির দশকে তিনটি পর্যায়ে এ নির্মাণ সম্পন্ন হয়)। ঢাকা গবর্নমেন্ট স্কুল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস এবং সেন্ট টমাস চার্চ কমপ্লেক্স ছিল ঊনিশ শতকে ঢাকার উন্নয়নে কয়েকটি মাইল ফলক। রেলওয়ে প্রবর্তনের পরই নদীতীর এলাকা ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারায় এবং শহরের পশ্চাৎ অংশ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে।
ঊনিশ শতকের শেষ দিকে শহরের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে নতুন আবাসিক এলাকা হিসেবে নারিন্দা ও গেন্ডারিয়া গড়ে ওঠে। একই সময় হাজারিবাগ-নওয়াবগঞ্জ এলাকায়ও উন্নয়ন ঘটে; প্রথমোক্ত এলাকাটি হাড় ও চামড়া শিল্প এবং শেষোক্তটি পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৮৬৬ সালে সেন্ট টমাস চার্চের উল্টোদিকে জেলা কোর্ট ও সাব-জজকোর্ট এবং ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানেও এ অফিসগুলো পূর্বের স্থানেই বিদ্যমান। ১৮৮৫ সালে ঢাকার কালেক্টর ফ্রেডারিক ওয়্যার উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য ওয়ারীতে সুপ্রশস্ত রাস্তা এবং পয়ঃনিষ্কাশনের সুব্যবস্থাসহ একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেন।
১৮৮৫-৮৬ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ স্টেট রেলওয়ে স্থাপিত হয়। মুগল আমলে স্থাপিত রাস্তার প্রায় সমান্তরালভাবে স্থাপিত রেল লাইনটি ছিল টঙ্গী থেকে তেজগাঁও, কারওয়ানবাজার হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত। শাহবাগের বাগান এলাকাটি রক্ষার জন্য রেল লাইনটি রমনার চারপাশে একটি লুপের মতো তৈরি করে প্রথমে পূর্বদিকে বাঁক নিয়ে নিমতলী-ফুলবাড়িয়া এলাকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে আবার দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়ে ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জে পৌঁছায়। রেল লাইনের অবস্থিতি লাইনের দক্ষিণ এবং পূর্বে মূল শহরের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে। ফুলবাড়িয়া এলাকাটি ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনসহ একটি রেলওয়ে কমপ্লেক্সের মতো গড়ে ওঠে।
১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ পর্যায় ১৯০৫ সালে ঢাকার ভাগ্য খুলে যায় যখন একে নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী করা হয়। মুসা খান মসজিদ এর উত্তর পূর্বে বাগ-ই-বাদশাহী এলাকায় লর্ড কার্জন কর্তৃক কার্জন হল নির্মাণের মাধ্যমে ১৯০৪ সালে ‘নতুন ঢাকা’র অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল সময়ে দক্ষিণে কার্জন হল থেকে উত্তরে মিন্টোরোড পর্যন্ত এবং পূর্বে কার্জন হলের বিপরীতে পুরানো হাইকোর্ট ভবনের একটু পূর্বে স্থাপিত গভবর্নমেন্ট হাউস থেকে পশ্চিমে নীলক্ষেত পর্যন্ত রমনা এলাকাটি গড়ে ওঠে (মানচিত্র-৪)। এলাকাটিতে ইউরোপীয় রীতির দালান-কোঠা ও পাকা রাস্তার একটি পরিকল্পিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে থাকে। নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গবর্নর স্যার ব্যাম্পফিল্ড ফুলার এর নাম অনুসারে নীলক্ষেত এলাকার মধ্য দিয়ে অগ্রসরমাণ রাস্তাটির নাম দেওয়া হয় ফুলার রোড।
এ সময়ে গড়ে ওঠা আকর্ষণীয় ভবনের মধ্যে ছিল গবর্নর হাউস (পুরানো হাইকোর্ট ও বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভবন), সেক্রেটারিয়েট ভবন (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) এবং কার্জন হল। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য বেশকিছু আর্কষণীয় নকশার আবাসিক বাড়ি গড়ে ওঠে এবং ভবিষ্যতে উন্নয়ন কার্যক্রমের লক্ষ্যে কিছু এলাকা, বিশেষ করে শহরের উত্তর অংশে নির্দিষ্ট করে রাখা হয়। এ সময়ই ঢাকেশ্বরী এলাকায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য স্টাফ কলোনি গড়ে ওঠে। আমলাপাড়া নামে গড়ে ওঠা এলাকাটি ছিল একটি নতুন নগর সংস্কৃতির সূত্রধর এবং আজিমপুর স্টাফ কলোনির পূর্বসূরি। একটি সুপরিকল্পিত নতুন রাজধানীর উন্মেষ ঘটে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানানসই একটি পার্কের জন্য উত্তর পার্শ্বে সুপরিসর উন্মুক্ত স্থান নির্দিষ্ট করা হয়। পার্কটি রমনা পার্ক নামে অভিহিত হয়। পার্কটি র্নিমাণে লন্ডনের কিউ গার্ডেন থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয় ফুলের বাগান নির্মাণ, বিরল প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ এবং জলাশয় তৈরির পরিকল্পনার জন্য। একই সময়ে রমনার উত্তর-পূর্ব অংশে সিদ্ধেশ্বরী এলাকাটি পরিষ্কার করে আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ফলে বিশ শতকের ‘নতুন ঢাকা’র জন্ম হয় ব্রিটিশ শাসকদের হাতে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বেই এবং কিছু ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে নতুন একটি রাজধানী নির্মাণের সমগ্র পরিকল্পনা বন্ধ করে দেয়া হয়।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকা পুনরায় তার আগের অবস্থানে ফিরে যায়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় রমনা এলাকায় নির্মিত বেশিরভাগ নতুন ভবনগুলি নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সর্ম্পকিত বেশ কিছু নতুন ভবন গড়ে ওঠে যা শহরের শোভা বৃদ্ধিতে মাইল ফলক হিসেবে কাজ করে। এদের মধ্যে ছিল কার্জন হলের বিজ্ঞান ভবন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম ছাত্রাবাস। ১৯৪৭ সালে ঢাকা পুনরায় প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়।
পাকিস্তান পর্যায় সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং সর্বোপরি আবাসিক প্রয়োজন সব মিলিয়ে জনগণের চাহিদা নবপ্রতিষ্ঠিত প্রাদেশিক রাজধানীটির দ্রুত বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। ভারত থেকে আগত বিপুলসংখ্যক মুসলমান মোট জনসংখ্যার ১০৩% বৃদ্ধি ঘটায়। ফলে শহরের ফাঁকা জায়গাসহ শহরতলীতেও নতুন বসতি গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ১৫.৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার নগরটি দুই দশকের মধ্য ১৯৬২ সালে ৬৪.৭৫ বর্গকিলোমিটারে পরিণত হয়। প্রথমদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক সমস্যার সমাধান ঘটে রমনা এলাকার সরকারি ভবনগুলোতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব উন্নয়নের জন্যই সমগ্র নীলক্ষেত এলাকা এবং শাহবাগের কিছু অংশ দখল করে। ঢাকেশ্বরী, পলাশী ব্যারাক (সিপাহি বিপ্লব-পরবর্তী কালে ইংরেজদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত) এবং আজিমপুর এলাকায় সরকারি কোয়ার্টার গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৯৫৪ সালে নিউ মার্কেটের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। পুরানা পল্টন থেকে নয়া পল্টন, ইস্কাটন থেকে মগবাজার, সিদ্ধেশ্বরী ও কাকরাইল থেকে রাজারবাগ ও শান্তিনগর হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত, সেগুনবাগিচা সমস্ত এলাকাই দখল হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের পরে হঠাৎ করেই জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি রমনা এলাকার উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিমের সমস্ত উঁচু ভূমিতে নতুন ঢাকা গড়ে ওঠে। মুগল আমলের পুরনো ঢাকা উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে নওয়াব পরিবারের দ্বারা লালিত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির পর নতুন জীবনের স্পন্দনে জেগে ওঠে।
এক সময়ের জলাশয় ও নিচু ভূমির মতিঝিল এলাকা ১৯৫৪ সালে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়। এ সময়ের মধ্যে নওয়াবপুর রেলওয়ে ক্রসিং-এর উত্তর থেকে পুরানা পল্টন পর্যন্ত একটি উন্মুক্ত এলাকার সৃষ্টি হয়। এখানে গড়ে ওঠে স্টেডিয়াম (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) এবং এ বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত এলাকাটির পশ্চিম পার্শ্বে তৈরি হয় জিন্নাহ এভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ)। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে প্রথম বারের মতো জিন্নাহ এভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত দুই দিকে চলাচলক্ষম রাস্তা তৈরি হয়। অন্যান্য বেশ কিছু রাস্তাও প্রশস্ত করা হয়। এ এলাকায় ষাটের দশকের প্রথম দিকে বায়তুল মুকাররম বা জাতীয় মসজিদের প্রতিষ্ঠা একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তান আমলে এ এলাকাটিতে গড়ে ওঠা অন্যান্য আরও কিছু বৈশিষ্ট্যম-িত ভবনের মধ্যে ডি.আই.টি ভবন, সাততলা আদমজি কোর্ট, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স অফিস, পাকিস্তান রপ্তানি উন্নয়ন কর্পোরেশন ভবন উল্লেখযোগ্য।
প্রতিনিয়ত বেড়ে ওঠা আবাসিক চাহিদা পূরণের জন্য ১৯৫৫ সালের পর ধানমন্ডি এলাকাটিকে একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। মিরপুর সড়ককে মাঝখানে রেখে মোহাম্মদপুর ও মিরপুর পর্যন্ত রাস্তার দু’পার্শ্বের উঁচু ভূমিতেই একটি আবাসিক বসতি গড়ে ওঠে। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে সরকারিভাবেই মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় অভিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য বসতি গড়ে ওঠে। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে তেজগাঁও বিমান বন্দর ও তেজগাঁও বাণিজ্য এলাকা সরকারি প্রকল্পের মধ্যে আসে।
ধনী মুসলিম ব্যবসায়ীরা তাদের জায়গা করে নেয় নবগঠিত ইস্পাহানি কলোনি ও বিলালাবাদে। এরপরই আসে লেডিস ক্লাব পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্কাটন গার্ডেন এলাকাটি, যেখানে এক পাশে গড়ে ওঠে ব্যক্তি মালিকাধীন বাড়ি এবং অন্যদিকে সরকারি ফ্ল্যাট। এর থেকে সামান্য দূরে ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল নগরটির এতদঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটায়।
এই একই সময় রাজারবাগ এলাকায় পুলিশদের জন্য এবং শান্তিনগর এলাকায় ডাক ও তার কর্মচারীদের জন্য সরকারি ভবন গড়ে ওঠে। সিদ্বেশ্বরী, কাকরাইল এবং কমলাপুর পর্যন্ত বিশাল এলাকাটি আবাসিক কলোনী দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
বিশ শতকের ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী করার সিদ্ধান্ত করা হয় এবং তেজগাঁও ফার্ম ও বিমানবন্দরের পশ্চিমে শেরে-বাংলা নগর স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির নকশা করেন লুই আই কান। প্রকল্পটি যদিও ষাটের দশকে শুরু হয় তবে তা সমাপ্ত হয় আশির দশকের মাঝামাঝি। চারশ হেক্টর এলাকার শেরেবাংলা নগরটি দুটি লেক ও বৃক্ষ সারির মাঝে প্রশস্ত রাস্তাসহ হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এক চিত্তাকর্ষক এলাকা। এলাকাটির সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, এটি স্বল্প উচ্চতার ভবনসমৃদ্ধ একটি স্থান। ব্যতিক্রম শুধু জাতীয় সংসদ ভবন, যা ঢাকার আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের একটি মাইলফলক।
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (DIT) (১৯৮৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক-এ পরিণত) নগরের পরিকল্পিত উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়। ডি.আই.টি ১৯৬১ সালে গুলশান মডেল টাউন, ১৯৬৪ সালে বনানী, ১৯৬৫ সালে উত্তরা এবং ১৯৭২ সালে বারিধারার (১৯৬২ সালে পরিকল্পিত) উন্নয়ন ঘটায়। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাহিদা মতিঝিল সংলগ্ন দিলকুশা বাগান এলাকাটিকে গ্রাস করে। এটি লক্ষণীয় যে, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরার উন্নয়নের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছে ঢাকা টঙ্গী অক্ষের উঁচু ভূমিতে।
ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে রেল লাইনের পথ পরিবর্তন করা হয়। তেজগাঁওয়ের পর এটিকে পূর্ব দিকে ঘোরানো হয় এবং রাজারবাগ, কমলাপুর এবং বাসাবোর মধ্য দিয়ে স্বামীবাগ-যাত্রাবাড়ির নিকটে পুনরায় এটিকে পূর্বের পুরনো লাইনের সাথে সংযুক্ত করা হয়। কমলাপুরে একটি নতুন রেলস্টেশন স্থাপন করা হয়। এরপরেই পুরনো রেল লাইনটি রূপান্তরিত হয়ে ওঠে একটি সংযোগ সড়ক হিসেবে। সোনারগাঁও রোড নামে পরিচিত সড়কটি নীলক্ষেত, পলাশী, ফুলবাড়িয়া এবং ওয়ারী ও নারিন্দার উত্তরাংশের মধ্য দিয়ে কাওরান বাজারের সঙ্গে যাত্রাবাড়ির সংযোগ স্থাপন করে।
উত্তরাংশের এ সমস্ত উন্নয়ন নগরটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে এক আমুল পরিবর্তন আনে। পুরনো মুগল শহরটি আগের মতোই সরু রাস্তা সম্বলিত ঘন বসত-বাড়ি, হাট-বাজার ও দোকানপাট সমৃদ্ধই থেকে যায়। অন্যদিকে উত্তর দিকে সম্প্রসারণ ঘটে প্রশস্ত রাস্তাবিশিষ্ট পরিকল্পিত নগরীর। এ পার্থক্যই মুগল ঢাকাকে পরিণত করে ‘পুরাতন ঢাকা’য় এবং উত্তরের বর্ধিত অংশ হয়ে ওঠে ‘নতুন ঢাকা’।
বাংলাদেশ পর্যায়  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা একটি সার্বভৌম দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গৌরব ও সম্মান প্রদান করে। আর এটিই ঢাকার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সূত্রপাত করে। প্রথম দিককার পরিকল্পিত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরা পূর্ণ হয়ে ওঠে, ফাঁকা অংশ খুব কমই থাকে। সম্প্রতি রাজউকের উন্নয়নসূচির মধ্য সংযুক্ত হয়েছে নিকুঞ্জ। উত্তরা আরও বর্ধিত হয়ে উত্তর দিকে টঙ্গী নদী পর্যন্ত এবং বাম দিকে মোড় নিয়ে আশুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছায়। নিকুঞ্জ দখল করে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট ও নতুন বিমানবন্দরের মধ্যবর্তী এলাকার নিচু অংশ যা বসবাসের জন্য উপযোগী করে তুলতে মাটি ফেলে ভরাট করা হয়। উনিশ শত আশির দশকের প্রথম দিকে বিমান বন্দরটিকে স্থানান্তরিত করা হয় উত্তরার দক্ষিণ পশ্চিমে এর নতুন ঠিকানায়।
পূর্ব দিকের জুরাইন, বাড্ডা, গোরান, খিলগাঁও, রামপুরা এবং পশ্চিমে কামরাঙ্গীর চর, শ্যামলী, কল্যাণপুরল এসব নিচু এলাকা বসবাসের আওতায় আনা হয়। ১৯৭১ সালের পর থেকে ঢাকার বৃদ্ধি প্রচ-ভাবে গতিপ্রাপ্ত হয়। বেসরকারি উদ্যোগ এ উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ফলে পরিকল্পনার অভাব পরিলক্ষিত হয়। বেসরকারি পর্যায়ে পরিকল্পিত সম্প্রসারণ সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় বারিধারার পূর্ব দিকে বসুন্ধরা এলাকায়। এ নিচু এলাকাটি বসত বাড়ির জন্য উঁচু করা হয়েছে।
১৯৭১ সাল থেকে ঢাকার ওপর চাপ প্রচ-ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরে বসবাসকারীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভাসমান জনগোষ্ঠী, ফলে শহরের নির্মাণাধীন এলাকাসমূহের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় বস্তি গড়ে উঠেছে।
আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ঢাকার সম্প্রসারণ হঠাৎ করে গতিশীল হয়ে উঠে। এ সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া অনুধাবনের জন্য ঢাকার মোটামুটি ২০ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে ভৌত-কাঠামোর দিকে তাকানো প্রয়োজন। ঢাকার পূর্বদিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সূত্রাপুর, শ্যামপুর, মতিঝিল, খিলগাঁও, রামপুরা, গুলশান-বারিধারা এবং উত্তরা থেকে বালু নদী পর্যন্ত অঞ্চল ছিল নিম্ন জলাভূমি এবং বর্ষাকালে এ অঞ্চলের অধিকাংশই পানিতে প্লাবিত হয়ে যেত। এর যৎসামান্য উঁচু অংশেই কেবল জনবসতি গড়ে উঠেছিল। এ সকল অঞ্চলে ব্যক্তি মালিকানাধীন জনবসতিই বেশি গড়ে উঠছে এবং সে সঙ্গে নিম্নাঞ্চলেও মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। গত বিশ বছর বা আরো আগে থেকে (১৯৯০-২০১০) নতুন নতুন এলাকায় ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে উঠেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগণের দ্বারা যাত্রাবাড়ি, বাসাবো, মুগদা, সবুজবাগ, গোড়ান, বনশ্রী, মেরুল বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, উত্তর বাড্ডা, নদ্দা, কুড়িল, খিলক্ষেত, দক্ষিণখান এবং উত্তরখানসহ নতুন ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় উপশহরসমূহ ঘন জনবসতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ মাত্র পঁচিশ বছর আগেও ঢাকার পূর্বাঞ্চলের বিস্তৃত অংশ বর্ষা মওসুমে জলমগ্ন থাকত এবং বর্ষাকালে সেখানে প্লাবিত হওয়া ছিল একটি স্থায়ী সমস্যা (মানচিত্র-৫)।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনাধীনে ১৯৮৯ সালে ঢাকার সর্বোচ্চ ভৌত প্রকল্প হিসেবে প্রগতি সরণির কাজ শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে শহর রক্ষা বাঁধ তৈরির কাজ শুরু হয়। ফলে বন্যায় প্লাবিত হওয়া ও তাতে ক্ষতি সাধনের আশঙ্কা থেকে ঢাকা শহর শুধু মুক্ত হয়নি, সে সাথে বেসরকারি উদ্যোক্তাগণকে ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের নিচু এলাকায় নতুন আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে নতুন শহর গড়ে তুলতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। এ সময়েই ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের কাঁটাসূর, আদাবর, শেখেরটেক, দারুস সালাম, শ্যামলীর পূর্বভাগ এবং কল্যাণপুর প্রভৃতি এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে। শহরের পশ্চিমদিকের উত্তর সীমানায় শহর রক্ষা বাঁধের ঠিক লাগোয়া অংশে প্রাকৃতিক জলাশয়ের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ সময়ে জাতীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। চিড়িয়াখানা ও জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরের হ্রদ এখনো বিদ্যমান (মানচিত্র-৬)।
বিজয় সরণি থেকে পুরাতন বিমানবন্দর-এর সমান্তরালে মিরপুর ১০ নং গোল চক্কর পর্যন্ত রোকেয়া সরণি নির্মাণের পর সড়কের উভয় পার্শ্বের নিচু জমিতে স্বল্প আয়ের মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। এ অঞ্চলের জনবসতি গড়ে তোলার পেছনে বেসরকারি উদ্যোগই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে জাতীয় উদ্যান পর্যন্ত অঞ্চলের এক পার্শ্বে এবং সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকাটি গড়ে ওঠে। কিন্তু এর মধ্যবর্তী পল্লবী এলাকাটি গড়ে ওঠে বেসরকারি উদ্যোগে। পল্লবী এবং শাহজালাল বিমান বন্দরের পশ্চিম পার্শ্বের মধ্যবর্তী খালি জমি আংশিক বিমান বন্দরের রানওয়ের জন্য এবং প্রধানত প্রাকৃতিক বাধার কারণে এখনও বসবাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি।
শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ ঢাকা শহরকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় শীতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। মহাসড়কের দক্ষিণ দিকে দনিয়া, শনির আখড়া, রায়েরবাগ অঞ্চল এবং উত্তরে ডেমরা পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত নিম্ন এলাকাসমূহে নিম্ন আয়ের জনগণের বসতি গড়ে উঠেছে। তবে এসব জনবসতি গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে সেখানে নগর সভ্যতার সুযোগ সুবিধাগুলো প্রায় অনুপস্থিত।
১৯৮৯ সালে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু বা বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুটি নির্মাণের ফলে যাত্রাবাড়ী থেকে শহরের দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণের পথ উন্মুক্ত হয় এবং জুরাইন ও তদসংলগ্ন অঞ্চলে ঘন জনবসতি গড়ে ওঠে। বুড়িগঙ্গা সেতু পর্যন্ত মহাসড়কের উভয় পার্শ্বে বাজার, গোডাউন ও ব্যবসা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
বুড়িগঙ্গার উপরে নির্মিত আরো দু’টি সেতু (বাবুবাজার থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বিতীয় সেতুটি ২০০১ সালে এবং মুগল আমলে নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদের পেছনে মোহাম্মদপুর থেকে আটি বাজারকে সংযুক্তকারাী তৃতীয়টি ২০১০ সালে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে) কেরানীগঞ্জ থেকে আটি বা তারও পরের অংশে বুড়িগঙ্গার দক্ষিণের অংশে নতুন জনবসতি গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
মাত্র ২৫ বছর আগেও কেরানীগঞ্জ থেকে আটি বাজার পর্যন্ত এলাকা ছিল নিম্ন ও জলাশয়পূর্ণ গ্রাম। অথচ এখন তা পাকা  রাস্তা, উঁচু ভবন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ইত্যাদি সকল নাগরিক সুবিধাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ শহর। তবে একথা বলতেই হয় যে, বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ পার্শ্বস্থ অঞ্চলসমূহ গড়ে ওঠার ব্যাপারে যদি সতর্ক পরিকল্পনা থাকত এবং তাকে যদি ঢাকা শহরের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হতো তবে, ঢাকাকে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ হিসেবে যৌক্তিক উপস্থাপনাও সম্ভব হতো।
মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার একাংশ : ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বুড়িগঙ্গা নদীতে ধীরে ধীরে একটি চর জেগে উঠছিল। ১৮৫৯ সালের একটি মানচিত্রে এ অংশটিকে চর বাগচাঁদ এবং এর পশ্চিমাংশটি ‘চর কামরাঙ্গী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান মানচিত্রে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, হাজারীবাগ থেকে ইসলামবাগের বিপরীত অংশ পর্যন্ত ব্যাপক ভূখ-টি কামরাঙ্গীর চর হিসেবে চিহ্নিত। পূর্বমুখী বড় একটা বাঁক নিয়ে বুড়িগঙ্গার গতি পরিবর্তিত হওয়াতেই সম্ভবত এই নতুন চরটির সৃষ্টি। বর্তমানে চরের পশ্চিমাংশটি কার্যত শহরের সংলগ্ন অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত এবং খুব সরু একটি জলাশয়ের বিপরীত পার্শ্বে ইসলামবাগ অবস্থিত। কামরাঙ্গীর চর অতি দ্রুত নিম্নআয়ের বস্তিবাসীদের জনবসতি গড়ে ওঠে এবং যে কারণে এ অঞ্চলটি অনেকটা বস্তির রূপ ধারণ করেছে।
ঢাকার উত্তরা আবাসিক এলাকা রাজউক এর তত্ত্বাবধানে পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে। জলাভূমির ওপর কালভার্ট সংযোজনের মাধ্যমে দ্বিতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার অধীনে উত্তরার দশ থেকে চৌদ্দ নম্বর সেক্টরকে যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে রাজউক উত্তরার এই দ্বিতীয় পর্বের সম্প্রসারণ প্রকল্পে তৃতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারণ কাজ হাতে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ পরিকল্পনার আওতায় মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এর উত্তর পার্শ্ব হতে শহর রক্ষা বাঁধের মিরপুর-আশুলিয়ার পূর্ব অংশ সংযোজন করা হচ্ছে।
বুড়িগঙ্গা নদীর উপর বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতু : ঢাকা বিমান বন্দরের পশ্চিম অংশে অবস্থিত নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকাটিও সরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের প্রধান রানওয়ের সম্মুখভাগের ভূখ-টি ছিল নিম্নাঞ্চল এবং এটি ডিআইটি-এর উদ্যোগে (রাজউক কর্তৃক সম্প্রাদিত) ‘নিকুঞ্জ’ নামে নতুন আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। প্রাথমিকভাবে নির্দেশনা ছিল যে, নিকুঞ্জ-১ অঞ্চলে নির্মীয়মান বাড়িসমূহ দ্বিতলের ঊর্ধ্বে হতে পারবে না। তবে প্রথম অংশের উত্তরে অবস্থিত নিকুঞ্জ পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্বের অংশে (নিকুঞ্জ-২) এরূপ কোন বিধি নিষেধ আরোপিত হয়নি। কারণ বিমান বন্দরের রানওয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না বলে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষেত্রে এ এলাকার ভবনসমূহ কোন বাধার সৃষ্টি করে না।
বসুন্ধরা সিটি শপিং মল : রাজউক ইতোমধ্যে ‘পূর্বাঞ্চল নিউ টাউন’ নামে একটি নতুন শহর গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পটি ২০১২ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা। পূর্বাচলের মোট আয়তন ৬১৫০ একর এবং এ অঞ্চলকে ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা হবে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা এবং গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানায় পূর্বাচলের অবস্থান। সম্পূর্ণ এলাকাটি পূর্বদিকের উত্তরখান ও দক্ষিণখান অঞ্চল থেকে বালু নদীর পূর্ব পার্শ্ব দিয়ে পূর্বমুখী সম্প্রসারণের পথ ধরে শীতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। খিলক্ষেত হতে শীতলক্ষ্যার উপর কাঁচা ব্রিজ পর্যন্ত একটি প্রস্তাবিত রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের উপর পূর্বাচল নিউ টাউনের দক্ষিণভাগের উন্নয়ন নির্ভর করছে। অবশ্য ইতোমধ্যেই কিছু বেসরকারি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান উক্ত অঞ্চলে নতুন আবাসন প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছে। গত শতকের শেষ পর্বে কমপক্ষে চারটি প্রধান আবাসন প্রকল্প, নিম্নাঞ্চলসমূহ ভরাট করে ঢাকা শহর বৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক হিসেবে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে।
তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকা ও গুলশান সংযোগ সড়কের পার্শ্ববর্তী অংশের গুলশান লেক-এর একটি অংশের নিম্ন ভূভাগে মাটি ভরাট করে ‘নিকেতন’ নামে একটি নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে এবং ইতোমধ্যে সেখানে চমৎকার সব বাড়িও নির্মিত হয়েছে। নিকেতনের দক্ষিণ-পূর্বাংশে এবং প্রগতি সরণির পূর্বাংশ থেকে রামপুরা পর্যন্ত সম্প্রসারিত অঞ্চলের ভূভাগে মাটি ভরাট করে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘বনশ্রী আবাসিক প্রকল্প’টি বাস্তবায়িত হয়েছে। বনশ্রীর উত্তরাংশ দিয়ে প্রবাহিত একটি খাল পূর্বদিকে বালু নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। তবে গত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্প’টি ঢাকার সর্ববৃহৎ আবাসন প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রকল্পটি প্রগতি সরণির পূর্বদিকে বারিধারার ডিওএইচএস এবং বারিধারার সামান্য উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত। এখানকার জলমগ্ন নিম্নাঞ্চলকে মাটি ভরাট করেই এ বৃহৎ আবাসন প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করা হয়। বসুন্ধরা ইতোমধ্যে ঢাকার সর্ববৃহৎ বেসরকারি আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বসুন্ধরার পশ্চাৎভাগের পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তরাংশ এখনো বর্ষাকালে জলমগ্ন হয়ে পড়ে। তবে একই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প চলতে থাকলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, উত্তরের পূর্বাচল হতে দক্ষিণের তারাবো সেতু পর্যন্ত এবং পূর্বের শীতালক্ষ্যা হতে পশ্চিম দিকের বালু নদী পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভূখন্ড ভরাট হয়ে নগরায়ণ প্রকল্পের অধীনে নতুন ঢাকার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হবে। কারণ বসুন্ধরার পূর্বমুখী সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া ও অন্যান্য আবাসন প্রকল্প তারই সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছে। তবে এটি অনস্বীকার্য  যে, ঢাকা শহরের সম্প্রসারণ সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়।
সমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী বহুতল দালানসমূহ উত্তরাসহ ঢাকার প্রায় সকল আবাসিক এলাকাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে জমির মূল্য ও ফ্ল্যাটের মূল্যও দ্রুত গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। উন্নয়নের এরূপ ধারা পরোক্ষভাবে ঢাকার অপর পার্শ্বের দক্ষিণ-উত্তরমুখী সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নিম্নাঞ্চল ভরাট করে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনায় উৎসাহ যোগাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে, ঊর্ধ্বমুখী বিল্ডিং নির্মাণের এ ধারার সঙ্গে ঢাকার বিপণন কেন্দ্রসমূহও যোগ দিয়েছে। মিরপুর, সাতগম্বুজ রোড, ধানমন্ডি ২৭ নং রোড, ধানমন্ডি রোড ২ প্রভৃতি এলাকা সম্প্রতি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে বিপণন কেন্দ্র, বহুতল অফিস ভবন প্রভৃতির সঙ্গে নতুন সংযোজিত হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল প্রভৃতি।
আধুনিক বহুতল এপার্টমেন্ট ভবন, ঢাকা
ইস্টার্ন হাউজিং কোম্পানি ঢাকায় ‘প্লাজা সংস্কৃতি’ (Plaza Culture) গড়ে তোলার জন্য প্রধান কৃতিত্বের দাবিদার। কারণ তারাই ঢাকার পুরনো হাতিরপুল এলাকায় ইস্টার্ন প্লাজা নামের প্রথম শপিং কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করে, যা অন্যান্য নির্মাণ কোম্পানিকে উৎসাহিত করে তোলে। কেবল ধানমন্ডি আবাসিক এলাকাতেই না, গুলশান, বনানী, শান্তিনগর, রামপুরা রোড, মৌচাক-মালিবাগ প্রভৃতি এলাকায় এভাবে শপিং প্লাজা গড়ে ওঠে। এমনকি বিমান বন্দর সড়ক থেকে উত্তরা মডেল টাউনের মধ্যবর্তী অংশ হয়ে টঙ্গী রোড পর্যন্ত রাস্তার দু’ধার এখন নতুন রূপে সজ্জিত। কারণ এ অঞ্চলেও গড়ে উঠেছে বহুতল শপিং প্লাজা ।
ঢাকা শুধুমাত্র আকার ও আয়তনের দিক দিয়েই পরিবর্তিত হয়নি, চরিত্রগত দিক দিয়েও ঢাকার ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ঢাকার অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ দেখে আনন্দের স্থলে ভীত হতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ ঢাকাকে ‘মেগা সিটি’তে পরিণত করলেও এখানে বসবাসরত নগরবাসীদের গর্ব করার মতো কিছু অবশিষ্ট থাকেনি। ঢাকা এখন দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি বড় শহরের উদাহরণ মাত্র। পরিকল্পনাকারী ও পরিচালকদের পক্ষে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
(বাংলা পিডিয়ার সৌজন্যে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ