সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ভাসমান মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলে  মসজিদের সুউচ্চ মিনার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : সুউচ্চ মিনারের সাথে মেঘের লুকোচুরি খেলার অপরুপ সৌন্দর্য নিয়ে দন্ডায়মান রাজধানীর ‘লালবাগ শাহী মসজিদ’। ব্যস্ত ঘিঞ্চি পুরনো ঢাকার চিরায়িত পথে বর্নিল জীবন আর ঢাকার পরিচয় বহনকারী লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত লালবাগ শাহী মসজিদ আরেকটি জীবন্ত ইতিহাস। আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের দলের সাথে যেন প্রতিদিন প্রতি প্রহর খেলা করে লালবাগ শাহী মসজিদের সুউচ্চ মিনার। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্যেই সংযোজিত হয় মিনারটি। নির্মাণের পর থেকে বহুবার সংস্কারে এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। সুউচ্চ মিনার বিশিষ্ট তিন তলা এ মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় আট হাজার মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন বলে জানান মসজিদে দায়িত্বপালনকারী একজন খাদেম।

মসজিদটির নির্মাণ ইতিহাস: লালবাগ শাহী মসজিদ নির্মাণ করা হয় ১৭০৩ সালে। তৎকালীন ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম স¤্রাট আওরঙ্গজেবের প্রপৌত্র ফররুখসিয়ারের পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদের প্রবেশপথের ডিজিটাল বোর্ডেও নির্মাণ সাল প্রদর্শন করা রয়েছে। লালবাগ শাহী মসজিদের ইতিহাস পুরনো বা আরেকটি নামের সাথে জুড়ে দেয়া, আর তা হলো ফররুখসিয়ার মসজিদ। বর্তমানের এ লালবাগ শাহী মসজিদটিই পূর্বের ফররুখ সিয়ার মসজিদ বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। মূঘল বাদশাহ্ আজিমউশ-শান এর পূত্র নবাব ফররুখসিয়ার বাবার নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করতে পূর্ব বাংলায় আসার পর পরই ১৭০৩ থেকে ১৭০৪ সালের মধ্যে নির্মাণ করেন এ মসজিদটি। কথিত আছে মুঘলদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত বাংলার সালতানাতে এটিই সর্ববৃহৎ মসজিদ যাতে ১৫০ জন মুসল্লি তিনটি কাতারে জামাতে নামাজ আদায় করতে পারতো। মূল মসজিদটি ৪৭.৮৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪.৩৩ মিটার প্রস্থেও মূল মসজিদ ১০.০৭ মিটার পুরত্বের দেয়ালে মোড়ানো। ভারতবর্ষে যতো মুঘল স্থাপনা আছে তার মধ্যে লালবাগ শাহী মসজিদ সম্ভবত একমাত্র স্থাপনা যাতে কাঠের ভিম ব্যবহার করে সমতল ছাদ নির্মাণ করা হয়। 

মসজিদ সংস্কার কাজ: ঢাকার প্রভাবশালী নবাব খাজা আব্দুল গণি ১৮৭০ সালে লালবাগ শাহী মসজিদের বড় ধরনের পুনঃনির্মাণের কাজ সম্পাদন করেন। নির্মাণ কাজে ব্যবহার করেন ইট ও পাথর যা বর্তমানেও অক্ষুন্ন অবস্থায় রয়েছে। বর্তমান মসজিদটি ঐতিহ্য ইসলাম এবং আধুনিক স্থাপত্যের একটি বিরল নান্দনিক উদাহরণ। পুরো মসজিদ জুড়ে যে দিকেই দৃষ্টি ফেরানো হোকনা কেন মরিশ মাল্টিফোয়েল পিলারের সু-সজ্জিত অবস্থান যে কোনো মুসল্লি বা ভ্রমনকারীকে অন্যরকম ভালো লাগার উপলব্ধি দেবে।

বহুবার সংস্কারের ফলে একমাত্র কেল্লার ভেতরের দিকের প্রবেশপথ ছাড়া আর কিছু দেখে অনুমান করার উপায় নেই যে এটি এত পুরনো মসজিদ। এর প্রায় প্রতিটি অংশই সংস্কার করা হয়েছে। এতবার সংস্কারের ফলেই হয়তো প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করেনি। তাছাড়া বাংলাপিডিয়া বা ঢাকার ইতিহাস ভিত্তিক বইগুলোতেও এ মসজিদ সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য নেই। ১৯৮০ সালে মসজিদটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেরামত করা হয় এবং একটি বিস্তৃত চার্জারের ছাদ দিয়ে আবৃত একটি বৃহৎ সম্প্রসারণ, পূর্বের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। মসজিদ এখনও তার মূল বিন্যাসটি ধরে রেখেছে। এর বাইরের মাত্রাটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ৪৯.৯৯ মিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১৬.৪৬ মিটার। চতুর্ভুজ কোণের চতুর্ভুজাকার টাওয়ারগুলি আনুভূমিক প্যারাপেটের উপরে উঠে এবং দক্ষিণ-পূর্বের কোনের উপরে একটি ধ্বংসাত্মক অবস্থানে এখনও বিদ্যমান কঠিন ক্যোস্ক এবং কাপোলার দ্বারা উৎখাত করা হয়। কিবলা দেওয়ালের মাঝখানে একটি আধা-অষ্টভুজাকৃতির মিহরাব রয়েছে বর্তমানে বিস্তৃত। পূর্বদিকের দরজা এবং তিনটি দেওয়ালের তিনটি দরজার দেওয়ালগুলি মনে করে যে মসজিদটি অভ্যন্তরীণভাবে তিনটি অনুদৈর্ঘ্য এবং ৯ টি খন্ডে দুটি স্তরে স্তম্ভযুক্ত দুটি সারিতে বিভক্ত, প্রতিটি সারিতে আটটি। মূলত মসজিদ একটি সমতল ছাদ ছিল, কাঠ এবং প্লাংক গঠিত। ছাদ এখনও সমতল কিন্তু নির্মিত চাদর, চার দেয়ালের উপর ভারি লোহার বীম এবং ইষ্টক স্তম্ভ দুটি সারি দ্বারা সমর্থিত। 

মসজিদ সম্পর্কে কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে নাজির হোসেন লিখেছেন, ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান মসজিদের জন্য কিছু জমি দেন। তিনি মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য মাসে ২২ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে নওয়াব আবদুল গনির অর্থায়নে লালবাগ শাহী মসজিদের ছাদ পাকা করা হয়। লালবাগ শাহী মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৭২-১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মসজিদের চারপাশের আদি দেয়ালগুলো অক্ষত রেখে এটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়। সে সময় মসজিদের নতুন মেহরাব নির্মিত হয়। মেহরাবের নকশা লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গপথের একটি কারুকাজ থেকে নেওয়া হয়েছিল। 

লালবাগ শাহী মসজিদের ভেতরের দৃশ্য: মসজিদের ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাল একটি অজু খানা, গোছানো ছোট্ট পুকুর সদৃশ এ অজু খানায় যেন শাহী মসজিদের প্রান। 

হাজারো মুসলমানের পবিত্র হওয়ার চেষ্টা ও শান্তি অনুভবে মুখর। আর মসজিদের তাবৎ সৌন্দর্য যেন এ অজু খানায় আছড়ে পড়ে খেলা করছে। সুন্দরের প্রতি আগ্রহী যে কেউ বিমহিত হবে এ অজু খানা দেখে।

মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সুরা আর-রহমান খচিঁত নকশা, কুরআন প্রেমিক মানুষরা হয়তো মনের অজান্তেই গুন গুন করবে - ফাবিআয়্যি অ’ালা ই রব্বিকোমা- তুকাজ্বিবান- তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?! মসজিদটির ভিতরটি যেমন বড় ও সুন্দর তেমনি এর নকশায় স্থাপত্যের মুন্সিয়ানাও স্পষ্ট। শাহী মসজিদের মেহরাবের অলংকরণের জন্য “মুকারনাসফিল্ডণিশ” পদ্ধতি ব্যাবহার করা হয়েছে। নানা কারুকাজ; জ্যামিতিক আকার আকৃতির সমন্বয় এর মেহরাবকে আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন করেছে।

 মেঝেতে বসানো পুরনো টাইলস এর সাথে নতুন টাইলস বিন্যস্ত করে অক্ষুণœ রাখা হয়েছে এর সৌন্দর্য।

লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ দেয়াল ঘেষেঁ অবস্থিত এ মসজিদটিতে দ্বীন চর্চা ও শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন মাওলানা সমসুল হক ফরিদপুরী এবং হাফেজ্জি হজুররের মতো মনীষীরা। যে আলো আজো অব্যাহত। ঢাকাকে যদি মসজিদের শহর বলা যায় তাহলে হয়তো লালবাগ শাহী মসজিদকে সেই মসজিদগুলোর অন্যতম প্রধান উৎস বলা যাবে। 

মসজিদ পরিচালনা: বিশাল এ মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে কমিটির মাধ্যমে। মসজিদটির সংস্কার, পরিবর্ধন-পরিমার্জন, আসবাব থেকে শুরু করে সব কিছুর ব্যয়ভার কমিটির মাধ্যমেই নির্বাহ করা হয়। তবে ব্যয়ের বেশিরভাগ আসে মসজিদ দানবাক্সে মুসল্লীদের দেওয়া টাকায়। মসজিদটিতে নামাজ পরিচালনার জন্য মোট ৪ জন ইমাম রয়েছেন। এছাড়া দুইজন মুয়াজ্জিন, ১০ জন খাদেমসহ সর্বমোট ২২ জন বেতনভুক্ত কর্মচারি রয়েছে। মসজিদের একজন খাদেম জানান, জুম্মার দিনে মসজিদের নিচতলা থেকে ছাদ সব জায়গায় মুসল্লীতে ভরে যায়। একসঙ্গে প্রায় ৭-৮ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে মসজিদটিতে।

ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও: লালবাগ শাহী মসজিদের অবস্থান শায়েস্তা খান রোডে। লালবাগ যেমন লালবাগ কেল্লার জন্য বিখ্যাত, ঠিক অপরদিকে প্রায় ৩০০ বছর আগের লালবাগ শাহী মসজিদের জন্যও বিখ্যাত। লালবাগ কেল্লায় যারা ঘুরতে আসেন, তাদের অনেকেই দেখতে আসেন এ মসজিদটি। কিন্তু মসজিদটি দেখে অনুমান করা কষ্ট যে, এটি এত পুরনো মসজিদ। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত আর দশটি সাধারণ মসজিদের মতই মনে হয় এটিকে। উঁচু প্লাটফর্মের ওপরে নির্মিত মসজিদটি এখন তিন তলা বিশিষ্ট। 

একাধিক কক্ষে বিভক্ত মসজিদটির পাশেই রয়েছে একটি মাদ্রাসা। তবে মাদ্রাসাটি আলাদাভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই মসজিদের কিবলার উপর দিকে একটি গম্বুজ আছে। যা সচরাচর দেখা যায় না। মসজিদের প্রত্যেকটা মিহরাবের দিকে ৩ টি করে প্রবেশ পথ রাখা হয়েছে। আপনি যখন লালবাগ কেল্লা ঘুরতে যাবেন তখন ইচ্ছে করলে এই জায়গা ঘুরে আসতে পারেন । আর লালবাগ কেল্লার বিখ্যাত ‘খেতে পুরি’ আপনি এখানে পাবেন। ঘুরাঘুরি শেষে ইচ্ছে করলে খেয়ে দেখতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ