বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি

গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করেছে। পাঠক-পাঠিকা ও শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই টেলিফোনে এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য জানতে চেয়েছেন। কেউ কেউ আবার বিলম্বের জন্য কৈফিয়তও দাবি করেছেন। গত সপ্তাহটি অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে আমি পার করেছি। তুরস্কের একটি গবেষণা ও সমন্বয় সংস্থা কর্তৃক মুসলিম বিশ্বের সংকটের ওপর আয়োজিত একটি সম্মেলনে অতিথি হিসেবে আমাকে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়ে নিবন্ধন বাতিলের ওপর সময়মত লিখতে পারিনি বলে আমি দুঃখিত। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জামায়াতকে দেয়া সাময়িক নিবন্ধনকে আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত আখ্যায়িত করে তাকে আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর বলে ঘোষণা দেন। তিনজনের বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন তার রায়ে নির্বাচন কমিশনকে জামায়াতের নিবন্ধন ইস্যুটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের জন্য করা রীট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রায় ৫ বছর তিন মাস পর ১৫৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। রায় ঘোষণার এতদিন পর কেন গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলো তার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ইতোমধ্যে জামায়াত ও জামায়াত নেতাকর্মীদের সাথে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন নিষিদ্ধ সংগঠনের মত আচরণ করেছেন। বিনা ঘোষণায় দলটির সকল স্তরের দফতরসমূহ পুলিশ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান যদি বিবিসির সাথে তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তার দলের অবস্থান সম্পর্কে সাহসিক ও সুস্পষ্ট বক্তব্য না রাখতেন তাহলে নিবন্ধন বাতিলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি আরো বিলম্বিত হতো। এখন রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এক নিবন্ধে বলে ছিলা যে, রায়টি আমার কাছে আদালতের রায়ের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক হ্যান্ডআউট বলেই মনে হয়েছে। বেঞ্চের তিনজন বিচারপতির মধ্যে বিচারপতি কাজী রেজাউল হক বলেছেন, যে গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে তা নির্বাচন কমিশনের আওতা ও কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং নির্বাচন কমিশন সাময়িকভাবে কোনো দলকে নিবন্ধনও দিতে পারে না। সাময়িক নিবন্ধন দেয়ার পরে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে বলার এখতিয়ারও তার নেই। বিচারপতি কাজী রেজাউল হকের লিখিত রায়ের সঙ্গে বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ঐকমত্য পোষণ করে কিছু কিছু সংযোজনী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী তর্কিত নিবন্ধনটি হাসিলের জন্য নির্বাচন কমিশনে প্রবঞ্চনা বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। অতএব ঐ নিবন্ধনটি অশুদ্ধ ও অকার্যকর।
মাননীয় বিচারপতি তার এই অভিমতের পক্ষে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট কোনো দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেন নি। ফলে তাঁর রায়ের এই অংশটি ঢালাও রাজনৈতিক অভিযোগের মতো মনে হয়েছে, হাইকোর্টের মতো একটি বিচারিক প্রতিষ্ঠানের রায় হয়নি। তিনি আরো বলেছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অনুচ্ছেদ ৯০(উ)’তে বা উক্ত আইনের অন্য কোথাও কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন, পরিমার্জন বা সংযোজনের জন্য তাগিদপত্র প্রদানের মাধ্যমে অভিভাবক বা পরামর্শদাতার ভূমিকা পালনের কোনো ক্ষমতা বা এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনকে প্রদান করা হয়নি। তিনি গঠনতন্ত্র সংশোধনের কথিত সুযোগ প্রদানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অভিযুক্ত করেন এবং তাদের এই কাজকে সংবিধি বা আইনের সাথে প্রতারণা বলে অভিহিত করেন। এখন প্রশ্ন হলো, যদি এই কাজগুলো নির্বাচন কমিশনের আওতা বহির্ভূতই হয়ে থাকবে তাহলে কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচন কমিশনের সাথে আদৌ নিবন্ধনের প্রয়োজন আছে কি? নির্বাচন কমিশন সংবিধানের আলোকে গঠনতন্ত্র সংশোধন বা পরিমার্জনের চিঠি শুধু জামায়াতকেই দেয়নি, এই চিঠি ধর্মভিত্তিক প্রতিটি দল এমনকি আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জাতীয় পার্টিকেও দিয়েছে। জামায়াতকে নির্বাচন কমিশন যে পত্র দিয়েছে তা ছিল মূলত সার্বভৌমত্ব, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের প্রতিটি স্তরে ইসলামী অনুশাসন ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিষয়ে। জামায়াত তার গঠনতন্ত্রে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা করেছে। একটি মুসলিম দেশে ইসলামের অনুসারী একটি দল হিসাবে এটি তার ঈমান আকিদার অংশ। যারা আল্লাহকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মনে করেন না তারা ঈমানদার মুসলমান হতে পারেন না। আল্লাহ সকল মানুষের ‘রব’ বা প্রভু, সারাজাহানের মালিক ও স্রষ্টা। তার সাথে কাউকে শরিক করা যায় না, তিনি লাশরিক আল্লাহ। আল্লাহ যেমন আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রভু, স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক, সর্বাধিনায়ক এবং সকল ক্ষমতার মালিক তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেরও। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমরা ১৫৩ থেকে ১৭০ বার আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করি। এই অবস্থায় জামায়াত তার গঠনতন্ত্রে সকল শক্তির উৎস এবং সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এই কথা ঘোষণা করে সকল মুসলমানের ঈমান-আকীদার প্রতিধ্বনি ঘটিয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশের সংবিধানে ক্ষমতার উৎস এবং সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণকে বলা হয়েছে। জামায়াত বলেছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কাঠামোর মধ্যেই জনগণের সার্বভৌমত্ব। জামায়াতের এই বিশ্বাসকে ধর্মনিরপেক্ষ ও এ দেশের নাস্তিক শক্তি পছন্দ করে না। তারা জামায়াতকে সাম্প্রদায়িক দল বলে মনে করে। তাদের এই বিশ্বাস সঠিক নয়। দুর্ভাগ্যবশত আদালত এদের পক্ষেই রায় দিয়েছে। ১৫৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাদেরই দাবি প্রতিধ্বনিত হয়েছে শুধুমাত্র বিচারপতি মোয়াজ্জম হোসেনের রায়ের অংশটি ছাড়া। আমি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় পড়েছি। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পর ভারতে ব্যাপক হারে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল। ঐ সময় ভারত সরকার জামায়াতে ইসলামী, হিন্দকে বেআইনী ঘোষণা করেছিল। জামায়াত এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করে। দীর্ঘদিন শুনানির পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই মর্মে আদেশ দেন যে, জামায়াত ইসলামী, সাম্প্রদায়িক কোনো দল নয়। ভারতবর্ষে এই দলটি তার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যেতে পারে। ভারতীয় সংবিধানেও সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণ। কিন্তু তথাপিও সেখানে ইসলামপন্থী ও মুসলিম দলসমূহের গঠনতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকেই স্বীকার করা হয়েছে এবং জনগণের সার্বভৌমত্বকে তার অধীন বলা হয়েছে। একই অবস্থা নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলোতেও। সেখানে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক দেশে ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে। কোন কোন দেশে জামায়াত তা তার ন্যায় ইসলামী আন্দোলন ভিত্তিক দলও আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে যুক্তি ও সহনশীলতার স্থান কম, আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই এখানে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলতে গেলে এখানে গণতন্ত্রের নামে ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরতন্ত্রই রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। বিচারপতি এনায়েতুর রহিম তার রায়ে বলেছেন, ইসলাম ধর্ম ও তার রাসূলের (সা.) সুন্নতগুলো পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে দেওবন্দ আহলে হাদীস, তাবলিগ জামায়াত, হানাফি মাযহাবসহ বিভিন্ন মাযহাবে নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, রীতিনীতি ও চর্চা পদ্ধতি বিদ্যমান। কিন্তু তারা সবাই মওলানা মওদূদী ও তার জামায়াত সম্পর্কে এক ও অভিন্ন ভাষায় বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করেছেন। এখানে বিষয়টি পরিস্কার নয়। মাননীয় বিচারক এখানে তুলনামূলক কোনো পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ দেননি যা আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের জন্য অপরিহার্য ছিল। মাওলানা মওদূদী জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তিনি কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী এমন কোনো মতবাদ বা ব্যাখ্যা ইসলামে অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে আমরা জানিনা। দেওবন্দ আহলে হাদীস নামে কোনো রাজনৈতিক দল আছে বলে আমাদের জানা নেই। দেওবন্ধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে যে সব আলেম বের হয়ে এসেছেন তাদের মধ্যে যারা জামায়াতকে পছন্দ করেছেন তারা জামায়াতের সাথে কাজ করছেন, আর যারা জামায়াতকে পছন্দ করেননি তারা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে কাজ করছেন। আবার তবলিগ জামায়াতের সাথে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যার জন্য তিনি যে সব প্রতিষ্ঠানের নাম বলেছেন সেগুলো সম্পর্কে তার সঠিক ধারণা আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। তবে এটা সত্য যে ইসলামের সকল ব্যাখ্যা মানদ-ই হচ্ছে আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) পরিস্কার বলেছেন যে, তার কোনো মতামত বা ব্যাখ্যা যদি কুরআন সুন্নাহর পরিপন্থী হয় তাহলে তার অভিমত বাতিল বলে গণ্য হবে, কুরআন-সুন্নাহকে অনুসরণ করতে হবে। আবার হানাফি মাযহারের উসুলে ফিকহার সাথে জামায়াতের দ্বন্দ্ব কোথায় সেটাও মাননীয় বিচারপতি বলতে ব্যর্থ হয়েছেন। উসুলে ফিকাহর রূপ-পদ্ধতি কুরআন বা হাদীস নয়। কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোনো ইমামের সাথে কোনো আলেমের কোথাও যদি এখতেলাফ পরিদৃষ্ট হয় তাহলে তাতে কোনো অপরাধ হতে পারে না।
রীট মামলার নিষ্পত্তির জন্য গঠিত বেঞ্চের সিনিয়ার বিচারপতি জনাব এম মোয়াজ্জেম হোসেনের রায়টি আমার কাছে অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়েছে। তার দেয়া রায়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে জামায়ায়াতের নিবন্ধন ইস্যুটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তার রায়ে বলেছেন রীটকারীদের মধ্যে ১২জন ইসলামী রাজনীতির সাথে জড়িত। তারা জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যা দিয়ে তার বিরোধিতা করে। এদের মধ্যে ৪ জন সরাসরি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সাথে যুক্ত। তাদের মধ্যে একজন তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল, একজন জাকের পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল, একজন সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি এবং একজন তরিকত ফেডারেশনের প্রচার সম্পাদক। রীটকারীদের ১০ জন সাধারণ নাগরিক। তারা তাদের বিশেষ পরিচয় দেয়নি। এবং তারা কেন জামায়াতের নিববন্ধন বাতিল করতে চান তাও উল্লেখ করেন নি। অপর তিনজন “আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান” নামক একটি সংগঠনের সদস্য। তারা বাংলাদেশে যাতে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতি করতে না পারে সে জন্য আগ্রহী। বিচারপতি মোয়াজ্জেম হোসেন তার রায়ে বলেছেন নিবন্ধন বাতিলের এই আবেদন, আইনী নয় আবেগ প্রবণ। জামায়াতের মত যোগ্যতা নিয়ে খেলাফত আন্দোলনও নিবন্ধন লাভ করেছে। কিন্তু আবেদনকারীরা পুরো বিষয় নিয়ে আদালতে আসেননি, তাদের উদ্দেশ্য সৎ নয়, আবেদনকারীদের মামলা জামায়াতের ধর্মীয় চরমপন্থা, জঙ্গীবাদ ও জ্বিহাদের দিকে ইঙ্গিত করে, নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের জন্য এগুলো হুমকিস্বরূপ কিন্তু জামায়াতের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের অনুকূলে প্রামাণ্য কোনো দলিল বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, তিনি তার রায়ে বলেছেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের জন্য করা রীট গ্রহণযোগ্য নয়। এ প্রেক্ষিতে তিনি দলটির নিবন্ধনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন। বিচার আইন দিয়ে হয় আবেগ দিয়ে নয়।
এখানে একটা প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের প্রতিষ্ঠা ১৯৭৯ সালে। ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যতগুলো সংসদ বাংলাদেশে ছিল তার প্রত্যেকটিতে জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। যেমন ১৯৭৯ সালের সংসদের ৬ জন এমপি, ১৯৮৬ সালের সংসদে ১০ জন এমপি, ১৯৯১ সালের সংসদে ১৮ জন এমপি, ১৯৯৬ সালের সংসদে ৩ জন এমপি, ২০০১ সালের সংসদে ১৭ জন এমপি এবং ২০০৮ সালের সংসদে ২ জন এমপি। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেই এমপি হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের ভিত্তিতেই তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। এটা যদি সত্য হয় তাহলে জামায়াতকে নতুন করে নিবন্ধন দেয়ার প্রশ্নটি কি উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়। আবার আদালতই বা এই নোংরা কাজে জড়ালেন কেন?
এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। এই রীট আবেদনটি করা হয়েছিল ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর উৎসাহ, অর্থানুকূল্য ও প্ররোচনায়। যারা এই রীট করেছিলেন তাদের পরিচয় ছিল সুস্পষ্ট। এরা পীর পূজা এবং মাজার পূজায় বিশ্বাসী এবং যেহেতু ইসলামে এর কোনটিরই স্থান নেই সেহেতু জামায়াত মাজার ব্যবসার মতো এর কোনটিকেই অনুপ্রাণিত করে না। আসলে জামায়াতের দাওয়াতি কার্যক্রম বাংলাদেশে মাজার পূজার পথে যেমন অন্তরায় হয়ে পড়েছে তেমন আওয়ামী লীগের ন্যায় ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতার যারা প্রসার চান তাদের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। আবার বিএনপির সাথে জামায়াতের জোট তাদের ক্ষমতা লিপসা এবং লুটপাটেরও অন্তরায়। আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা ২০০৮ সালে সুপরিকল্পিতভাবেই ২০০৮ সালে এই রীট মামলাটি করিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত তারা তা জামায়াতের মাথার উপর খড়গ হিসেবে রেখে দিয়েছেন। জামায়াতকে বিএনপি জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে এবং আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকারের দুঃশাসন, অত্যাচার, অবিচার ও দুর্নীতির বিরোধিতা করা থেকে বিরত রাখতে না পেরে তারা দলটিকে নির্মূল করার পথ অবলম্বন করেছেন। এ জন্য তারা প্রথমে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ আনেন, নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি দেন এবং তাদেরই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে জামায়াতকে নিষিদ্ধকরণ ও তাঁর নিবন্ধন বাতিলের দাবি তোলেন। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী রীট মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার ঘোষণা দেন। এরপর যা কিছু ঘটেছে তার সবকিছুই তাদের বৃহত্তর নাটকের অংশ, সবকিছুই তারা করছেন আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে। রায়ের পর দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করার পেছনেও হয়ত কোনো উদ্দেশ্য ছিল। জামায়াত যদি আত্মসমর্পণ করে পায়ে পড়ে।
অনেকে আপীল আবেদনের বিষয়টি চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু তা নয়। কিন্তু জামায়াত নীতিতে রয়েছে অবিচল এবং আল্লাহ ও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতি আস্থায় দৃঢ়। এই রীটের রায় ও বিলম্বিত গেজেট বিজ্ঞপ্তি জামায়াতের ঈমানদীপ্ত অগ্রযাত্রাই প্রমাণ করে? হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত আপীল করছে। আপীল আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। বিচারাধীন মামলার ওপর একশান নেয়া যায় না। কিন্তু এই সরকার তা মানেনি। দেশের মানুষ আশা করে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে হয়ত একদিন নিশ্চয়ই এর বিচার হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ