শুক্রবার ০২ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

চুয়াডাঙ্গায় চলছে খেজুরগুড়ের প্রস্তুতি ॥ গাছিরা মাঠে মাঠে গাছ ঝোড়া ও চাঁছাছোলায় ব্যস্ত 

এফ.এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা : চুয়াডাঙ্গা জেলা জুড়ে সম্প্রতি বৃষ্টি ও ভ্যাপসা গরমের পর গত কয়েকদিন থেকে শুরু হয়েছে ভোরের দিকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা। সেইসাথে রাতের দিকে অনুভুত হচ্ছে হালকা শীতের আমেজ। দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় চুয়াডাঙ্গায়ও শুরু হয়েছে খেজুরগুড়ের মওসুম। বিভিন্ন এলাকায় চলছে মধুবৃক্ষ খেজুরগাছ থেকে রস আহরণের প্রস্তুতি।

এরই অংশ হিসেবে গাছিরা বর্তমানে খেজুর গাছের ডেগো পরিষ্কার, দা তৈরী, দড়ি কেনা ও ভাড় কেনা, রস জ্বালানোর তাওয়া কেনা, চুলা তৈরির স্থান নির্বাচন করাসহ রস সংগ্রহ ও খেজুরগুড় তৈরির নানা আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছে। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রামবাংলার গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষকে ঘিরে জেলার গ্রামীন জনপদে শুরু হবে এক উৎসব মুখর পরিবেশ। মধুবৃক্ষ থেকে গাছিরা মিষ্ট রস সংগ্রহ করে সেই রস জ্বালিয়ে তৈরী করবে গুড় ও পাটালি। হেমন্তের নতুন ধান ওঠার সাথে সাথে জেলার প্রতিটি গ্রামীন জনপদে শুরু হবে চালের আটা আর নলেন গুড় ও রসের তৈরি নানারকম পিঠা-পায়েসের উৎসব। আর গ্রামবাংলায় এ উৎসবের আমেজ চলবে পুরো হেমন্ত ও শীতকাল জুড়ে।

এক সময় চুয়াডাঙ্গা জেলা ছিল খেজুর রস, গুড় ও পাটালি উৎপাদনের অন্যতম প্রসিদ্ধ স্থান। এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলতো বটেই, দেশের বাইরেও চুয়াডাঙ্গার খেজুরগুড়ের বেশ কদর রয়েছে। তবে বর্তমানে নানা প্রতিকুলতায় খেজুর গুড়ের এ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। গ্রাম বাংলার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক এ খাতে সরকারি কোন পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় বর্তামানে আগের মত আর রস, গুড় উৎপাদন হয় না। জেলার নির্দিষ্ট কিছু গ্রাম ছাড়া সুঘ্রাণ নলেন গুড় পাওয়া যায় না। তা আবার চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে শীত মওসুমে যে রস, গুড় ও পাটালী তৈরী হয় তা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে রীতিমত কাড়াকাড়ি শুরু হয়। ইতোমধ্যেই শহরের লোকজন গ্রামের গাছিদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। আবার কেউ কেউ গাছিদের নিকট অগ্রিম টাকা তুলে দিচ্ছেন ভাল রস, গুড় ও পাটালী পাওয়ার আশায়। অগ্রিম টাকা পেয়ে অনেক গাছি কিনছে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির জন্য নানা উপকরণ। গত কয়েক বছর বাজারে গুড়ের চেয়ে চিনির দাম কম থাকায় বেশি লাভের আসায় অনেক অসাধু গাছি খেজুর রস থেকে গুড় তৈরির সময় তাতে চিনি মিশিয়ে ভেজাল করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে। ফলে অনেকেই এ ভেজাল গুড় কিনে আসল গুড়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর চিনির দাম বেশি থাকায় হয়তঃ ভেজালমুক্ত গুড় পাওয়া যাবে এমন অভিমত অনেকের। 

জেলার ঈশ্বরচন্দ্রপুর গ্রামের গাছি আব্দুল লতিফ বলেন, এলাকায় আগের মতো আর খেজুরগাছ তেমন নেই। তাই খেজুর গুড় তৈরি করে আগের মত আর লাভ হয় না। তবুও বাড়তি উপার্জনের আশায় অন্যান্য কাজের ফাঁকে একাজ করি। জয়রামপুর গ্রামের গাছি খোরশেদ আলি বলেন, আমি প্রায় ২০/২৫ বছর যাবৎ খেজুর গাছ কাটছি। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গ্রামের বিভিন্ন্ মাঠে প্রায় ২শ’ খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছি। চলছে খেজুর গাছ ঝোড়া ও চাছা-ছোলার কাজ। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে আশা করি আর দিন দশেক পর থেকেই এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু করা যাবে। তবে এ কাজে আগের মতো এখন আর ভাল লাভ হয় না। আগে এলাকার সব মাঠে ও গ্রামের আনাচে কানাচে খেজুর গাছ ছিল। বর্তমানে খেজুর গাছ দিয়ে ইট ভাটায় ইট পোড়ানোর ফলে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক খেজুর গাছ নিধন হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় খেজুরগাছ লাগানো হচ্ছে না। তাই খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় এখন বেশি রস পাওয়া যায় না। গাছের অভাবে অনেক গাছিই এ কাজ ছেড়ে দিয়েছে। 

 জেলার দামুড়হুদা উপজেলার সহকারি কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকইে আবাদি জমির আইলে খেজুর গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছি। ইতোমধ্যে আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই তাদের কৃষি জমির আইলে খেজুরগাছ রোপন করতে শুরু করেছেন। আশা করা যায় আগামী দশ বারো বছর পর থেকে এসব গাছ হতে প্রচুর রস, গুড় ও পাটালি পাওয়া যাবে। 

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানাগেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় খেজুর গাছ রয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী রয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদা উপজেলায়। জেলায় বর্তমানে খেজুর গাছ দিন দিন বাড়ছে। মাঝে অবশ্য কিছু দিন ইটের ভাটায় খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারনে কমে গিয়েছিল।

জেলার প্রবীণদের অনেকেই জানান, খেজুর গাছ আবাদি জমির তেমন কোনো ক্ষতি করে না। তাই আবাদি জমির চারি আইলে খেজুরগাছ রোপন করা যায়। বিভিন্ন স্থানের অধিকাংশ খেজুর গাছই অযতœ আর অবহেলায় বেড়ে ওঠে। আবাদি জমি ছাড়াও সড়কপথ, রেলপথ, পুকুরপাড়, বসতবাড়ির আঙ্গিনাসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশের ফাঁকা জায়গায় প্রচুর খেজুর গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা একটু উদ্যোগী হলেই বিপুল সংখ্যক খেজুরগাছ রোপনের মাধ্যমে দেশে গুড়ের চাহিদা পুরণ করে এ গুড় বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করা সম্ভব। 

খেজুরের রসে প্রচুর এনার্জি বা শক্তি রয়েছে। এতে জলীয় অংশও বেশি। এটাকে প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক বলা যেতে পারে। এতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকে। খেজুরের রস কাঁচা খাওয়া যায়, আবার রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করেও খাওয়া যায়। গুড়ে আয়রন বা লৌহ বেশি থাকে এবং হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে। যারা শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন, কাজকর্মে শক্তি পান না, খেজুরের রস তাঁদের জন্য দারুণ উপকারী। খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এতে ১৫-২০% দ্রবীভূত শর্করা থাকে। খেজুরের গুড় আখের গুড় থেকেও বেশি মিষ্টি, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। খেজুরের গুড়ে প্রোটিন, ফ্যাট ও মিনারেল সবই রয়েছে। তবে যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্য খেজুরের রস এড়িয়ে যাওয়ায় উত্তম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ