শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

গণতন্ত্রের এ কেমন নমুনা বাংলাদেশে

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : বাংলাদেশের আকাশে এক কালো মেঘের ঘনঘটা নি¤œচাপের ফণা ঘনীভূত হচ্ছে, যা সুনামির চেয়ে মারাত্মক। যে গণতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষ যুদ্ধ করেছে, সে গণতন্ত্র আজ শৃঙ্খলিত। শুধু মনের আয়নাতে কল্পনা করা যায়। বাস্তবে ধরাও যায় না, ছোঁয়াও যায় না। অথচ কম বেশি সবাই গণতন্ত্রের পূজারী। গণতন্ত্রের কথা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রাক্কালে শোনা গেলেও ক্ষমতার সিঁড়িতে বসে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুধাবন করা কঠিন হয়ে যায় । গণতন্ত্রের আবরণে যখন স্বৈরতান্ত্রিক জুলুম নির্যাতনের শাসন চেপে বসে নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর তখন সমাজ বা রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করে না। সিনেমার হিরো বা নায়িকার চশমা দিয়ে বড়জোড় অভিনয় করা যায়, সমাজের নির্যাতিত মজলুম মানুষের আহাজারি বা নির্যাতনের ছবি দেখা যায় না। জনগণের মুখের ভাষা বুঝার মতো হিতাহিত জ্ঞান তখন জনপ্রতিনিধিদের মগজে থাকে না। আমরা যদি পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কোথাও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সুফল বয়ে আনেনি। আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতাকে হরণ করে কোনো রাষ্ট্রই উন্নয়নের মহাসড়কে যেতে পারেনি। যেমনটি পারেনি জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসক রবার্ট মুগাবে। জিম্বাবুয়ের শাসক হিসেবে শতবর্ষী রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার মনোবাসনা ছিল তাঁর। কিন্তু ৯৩ বছর বয়সের মাথায় এসে ক্ষমতার রাজসিংহাসনের নিয়ন্ত্রণ হারাইতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম দিকে মুগাবেকে বলা হতো মুক্তির নায়ক বা মুক্তিদাতা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার খুব অল্প সময় পরই মুগাবে হয়ে ওঠে স্বৈরাচারী শাসক। রাজনৈতিক ভিন্ন মতালম্বীদের পিষে ফেলতেও মুগাবে কুন্ঠাবোধ করতো না। তবে ইতিহাসের পাতায় ওইসব রাষ্ট্র নায়কের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে,ওইসব  মুক্তির নায়কেরা ক্ষমতায় আসেন ফুলের মালা আর জনগণের অফুরন্ত ভালোবাসা নিয়ে। জনগণ তাদের নেতাকে স্বাগত জানাতে রাজপথে নামতেও কার্পণ্য করে না। তাঁরা চান নেতার ভালোবাসা। কিন্তু ক্ষমতার সিংহাসনে বসার পর মানবতাবাদী শাসকের চেহারা যখন পাল্টে যেতে শুরু করে তখনই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। যারা তাকে সম্মান, শ্রদ্ধা, ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছিল তারাই তখন ছিটকে পড়েন। আর তখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নায়ক বিদায় নেন জনগণের ধিক্কার,অবহেলা,অনাদর আর ঘৃণার মধ্য দিয়ে।  পৃথিবীর কোথাও অন্যায় চিরস্থায়ী হয় না। যদি হতো তাহলে রাত্রি আর দিনের পালাবদল এভাবে হতো না। মানুষ ক্ষমতার মোহে নীতি-নৈতিকতা এমনকি স্রষ্টাকেও ভুলে যায়। যে কারণে ক্ষমতাসীনদের বিবেক জাগ্রত হয় না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি যখন হেরে গিয়েছিল তখন জার্মান জেনারেল এরিক লুডেনডফ অভিযোগ করে বলেছিলেন যে,‘আমাদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের গভীর অপপ্রচারের কারণেই আমরা হেরে গেছি। এরিক লুডেনডফের এই উক্তিটিকে হিটলার খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। যে কারণে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শুধু প্রোপাগান্ডার জন্য বিশেষভাবে ড. জোসেফ গোয়েবলসের মতো লোককে নিযুক্ত করেছিলেন । কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি হিটলারের। ক্ষমতার কাছে অসহায় হয়ে যাওয়ার ইতিহাস অনেক পুরানো। বাংলাদেশেও এটি একেবারে নতুন নয়! তবে এমন ভয়ানকরূপে আগে কখনো দেখা মেলেনি। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যেখানে বলা হয়ে থাকে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস, সেখানে আজ জনগণের অসহায়ত্ব দিন দিন বেড়েই চলছে। গণতন্ত্রের এই স্বর্ণযুগে বিএনপির কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচিকেও পুলিশ লাঠিপেটা করে পন্ড করে দিয়েছে। অসহায়ত্ব কোথায় নেই। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলটির কালো পতাকা কর্মসূচিকে পুলিশ যে কায়দায় বাধা দিয়ে ভন্ডুল করে দিয়েছে তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক দেশের সরকারের আচরণ হতে পারে না। খালেদা জিয়ার কারাদন্ডকে কেন্দ্র করে বিএনপি হরতাল-অবরোধের মতো ধ¦ংসাত্মক কর্মসূচি দিতে পারতো। কিন্তু তারা সে ধরনের কোনো কর্মসূচি না দিয়ে কালো পতাকা প্রদর্শনের মতো নিরীহ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি দিয়েও পুলিশের লাঠিপেটা থেকে রেহাই পায়নি। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, সরকার কারও রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণœ করছে না। সরকার কোনো দলের গণতান্ত্রিক অধিকারে বাধা দেয় না। জ্বালাও-পোড়াও থেকে সরে এসে সুষ্ঠু রাজনৈতিক আন্দোলন করলে প্রয়োজনে বিএনপিকে সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু মন্ত্রীর এই আশ্বাসের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই পুলিশ বিএনপির কালো পতাকা কর্মসূচিকে ভন্ডুল করে দিয়েছে। ঘটনার পর বিএনপির পক্ষ থেকে দাবী করে বলা হয়েছে দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ১৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশের লাঠিপেটায় অন্তত ২৩০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। প্রচলিত আইনের কোথাও  কালো পতাকা কর্মসূচি পালনের বিষয়ে আগাম অনুমতির কথা বলা নেই। আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর দায়িত্ব জনগণের জানমালের শান্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা যখন নিজেরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে অশান্তির আগুন তৈরি করে তখন আর দুঃখের সীমা থাকে না। বিএনপির কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি যে অজুহাত দেখিয়ে পুলিশ পন্ড করে দিয়েছে তার ছিটে ফোটাও যদি সরকারীদলের বেলায় দেখাতে পারতো তাহলে ইতিহাসের পাতায় পুলিশ প্রশাসনের নাম সোনার হরফে লেখা থাকতো। বিজ্ঞ পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে বিচার নয় ফাঁসি চায় স্লোগান দিয়ে মাসের পর মাস শাহবাগের মতো ব্যস্তময় রাস্তায় গণজাগরণ মঞ্চের কিছু পরগাছা ব্যারিকেড দিয়েছিল। তখন কিন্তু জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে পুলিশ বাহিনীকে কোনোরুপ ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। পুলিশের এই বিপরীতধর্মী আচরণ একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ,সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বিরাজ করে তখন সেখানে অন্যায় অবিচার জুলুমের মাত্রা বাড়তে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল ও ভিন্নমতালম্বীদের কথা বলার অধিকার তো দিতে হবে। আদালতের রায় পক্ষে বা বিপক্ষে গেলে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানো তো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সূর্যের আলো ছাড়া দিন যেমন অচল তেমনি চাঁদের আলো ছাড়াও রাত অচল হয়ে যায়। দিন আছে বলেই রাতের তাঁরা এত সুন্দর দেখায়। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দল ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করে থাকে। বিরোধীদল বিহীন সরকার যে স্বৈরাচারী হয়ে উঠে তার প্রমাণ তো ভুরি ভুরি দেয়া যাবে। রাজনীতি এখন আর রাজনীতির জায়গাতে নেই যে কারণে প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হচ্ছে দেশ,সমাজ ও রাষ্ট্র। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য অবশ্য এখন নানা রঙে-রসে ভরপুর। বিরোধীদল গণতন্ত্রসম্মত কোনো কর্মসূচি দিলে তারা বলেন,ওদের আন্দোলন করার মুরোদ নেই। আবার আন্দোলনের কর্মসূচি দিলে বলে ওরা দেশে অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদে মত্ত হচ্ছে। সেতুমন্ত্রী বিএনপিকে বলেছেন-আপনারা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেন তাহলে ঘরে বসে করুন,অফিসে করুন,রাস্তায় কেন?  পুলিশের বেষ্টনীতে থেকে অন্যকে অনেক সবক দেয়া যায়। কিন্তু নিপীড়নের মাত্রা অনুধাবন করা যায় না। আওয়ামী সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে সেটি তারা যে মানে না তার নমুনা তো প্রায়ই দেখা যায়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখীর বাউফলে স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সমাবেশে স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

গণতন্ত্রে হঠাৎ করেই ক্ষমতার পরিবর্তন হয় এবং এটি হয় প্রচন্ড দ্রুততার সঙ্গে। কাউকে জানান না দিয়ে কিংবা কাউকে একটু প্রস্তুতিরও সময় না দিয়ে গণতন্ত্র মোড় নেয় এদিক থেকে ওদিকে। ফলে যারাই শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকেন গণতন্ত্রের আবরণে তাদের নৈতিক চরিত্রে, চিন্তায়,মননশীলতায় স্বৈরাচারের গন্ধ যখনই লেগে যায় তখনই বর্ষার বাদলে ডুবে যায় স্বৈরতন্ত্রের সাজানো সিংহাসন। গণতন্ত্রের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকার ফলেই আফগানিস্তান, ইরাক, লেবানন, মিশর,সিরিয়া,ফিলিস্তিন ভেঙ্গে পড়েছে। দেশের স্বার্থে পশ্চিমাগোষ্ঠী একসময়ের শত্রুকে ও মিত্র বানিয়েছে,তাহলে আমরা কেন পারবো না রাজনৈতিক ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে। এ বিষয়টি দেশপ্রেম দিয়ে চিন্তা করলে আশা করি শান্তির পথে স্বস্তির পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। দেশে এখন যে রাজনৈতিক সংকট ও হানাহানি চলছে তার একটি সমাধানের পথ বের করতে না পারলে গণতন্ত্রের জিন্দা দাফন হবে। নিষ্পেষিত হবে দল মত নির্বিশেষে সব শ্রেণী পেশার মানুষ। গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে আইয়ুব খান উন্নয়নের জোয়ার প্রচার করেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এদেশের জনগণ উন্নয়নের গালভরা বুলি শুনতে চায় না,গণতন্ত্রের বাংলাদেশও দেখতে চায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ