মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ছুটির দিন

রেজাউল রেজা : পাড়ার সব ছেলেদের একটাই নেশা কাঁঠাল পাতা সংগ্রহ করা। আমরা ছোটবেলায় কাঁঠাল পাতার টাকা দিয়ে লই খেলতাম। কাঁঠালের পাকা পাতা কিন্তু শুকনো নয় এরকম পাতাগুলোকে টাকা হিসেবে ব্যবহার করতাম। পাতায় কোন ধরনের ফুটো থাকাও চলবেনা। সেই টাকা দিয়ে কেনাকাটাও করতাম।

মেলা বসত, মেলায় নানা ধরনের জিনিস পাওয়া যেত। কাপড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট পুতুল, মাটির পুতুল, মাটির মার্বেল, বালুর ভাত, কচু গাছের তরকারি, মাটির বিস্কুটসহ নানা ধরণের খাবার ও খেলনা পাওয়া যেত মেলায়। যা কিনতে হত কাঁঠাল পাতার টাকায়।

সেদিন ছিল শুক্রবার। শুক্রবার মানেই সারাদিন খেলাধুলা। সকালের খাওয়া দাওয়া করেই সবাই আমাদের বাড়ির উঠানে হাজির। আমাদের উঠনটা ছিল একটা ছোটখাট মাঠের মত। খেলাধুলা করলে ওখানেই করতাম। হেলাল, সেলিম, সাফিন, আমিসহ আরো বেশ কয়েকজন উপস্থিত হলাম। সবাই বুদ্ধি করলাম আজ মেলা বসাব। তিন-চারজন মেলায় দোকান বসাবে, বাদ বাকি সবাই ক্রেতা ও দর্শনার্থী হবে। যেই কথা সেই কাজ। সিদ্ধান্ত হলো-রাকিব, শারমিন, সুজন আর হেলাল মেলায় দোকান বসাবে।

দোকানদাররা দোকানের জিনিস বানাতে শুরু করল। কেউ বালু সংগ্রহ করতে লাগল, কেউ কচুগাছ কাটতে গেল, কেউ কেউ মাটি দিয়ে বিস্কুট বানাতে শুরু করল। শারমিন মাটির ও কাপড়ের পুুতুল বানালো। তারা নিজ নিজ জায়গায় দোকান বসালো। পুরো উঠোনটা কলা গাছের বাকলের দড়ি দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো।

আমরা গেলাম টাকা সংগ্রহ করতে। টাকা ছাড়া মেলায় যাওয়া অসম্ভব! টাকা ছাড়া কিছু দিবেনা দোকানদাররা। আমি, সাফিন, সেলিমসহ কয়েকজন গেলাম টাকা সংগ্রহ করতে কাঁঠাল তলায়।

যে যার মত কাঁঠালের পাতা কুড়াচ্ছি। হঠাৎ গাছ থেকে কি যেন ধপাস করে পড়ল। সবাই ঘুরে দেখি সেলিম পড়ল। বেঁচারা ব্যাথায় কোঁকাচ্ছে আর আমরা তো হাসতে হাসতে শেষ। কিরে গাছ থেকে পরে কত টাকা পাইলি! আমি বললাম, আর সবাই হো করে হেসে উঠল। পরে সবাই মিলে সেলিমকে ধরে দাঁড় করালাম। মালিস করলাম। আর বুদ্ধি করলাম এই কথা কাউকে বলা যাবে না। বাড়িতে শুনলে খবর আছে! তেমন একটা ব্যাথাও পায়নি অবশ্য। যাই হোক, সবাই টাকা সংগ্রহ করে মেলায় আসলাম।

কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া শুরু করলাম। আমি রাকিবের ভাতের দোকানে ভাত খাওয়ার জন্য বসলাম।

বালুগুলোই ছিল ভাত। আমি রাকিবকে ক্ষেপানোর জন্য ভাতের মধ্যে একটা ঘাসের টুকরা দিলাম।

তারপর রাকিবকে ডেকে বললাম, এসব কি? কি বাজে ব্যবসা শুরু করেছ মিয়া! ভাতের মধ্যে জঙ্গল, এসব খাওয়া যাবে?

আমি জোরে জোরে চিল্লাচ্ছিলাম যাতে সবাই শুনে। আমার বুদ্ধি কাজে লাগল। সবাই ছুটে আসল রাকিবের দোকানে। আমি বললাম-দেখেন, ভাতের মধ্যে কি সব জঙ্গল! নোংরা দোকান। এখানে কেউ খাবেন না। রাকিব স্যরি বলল। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য মাফ চাইল। বলল, প্লিজ আপনারা এভাবে বলবেন না। আমি গরীব মানুষ, আপনারা আমার দোকানে না আসলে আমার অনেক লস হবে। আমার বউ বাচ্চাকে না খেয়ে থাকতে হবে। সবার অভিভাবকরা আমাদের মেলা দেখছিল। তারা হাসছিল আমাদের কা- দেখে। তারা বলেছিল, পাগলগুলোর কা- দেখ!

 মেলা শেষ করলাম দুপুরের মধ্যেই। শেষ করেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমাদের পুকুরে। পাক্কা এক ঘন্টা গোসল করলাম পুকুরে। চোখ লাল করে বাড়িতে ফিরলাম। মায়ের কি বকা! দুপুরের খাবার খেয়ে বিকালে আবার বের হলাম। সেলিম, হেলাল, সাফিনও আসল। আবার চলে গেলাম কাঁঠাল তলায়।

সবাই টাকা সংগ্রহ করলাম। এবার লই খেলব আমরা। লই খেলা শুরু করলাম। একবার আমার টাকা ফুরায় তো আরেকবার সাফিনের। আবার দৌড়ে যাই কাঁঠাল গাছের তলে, টাকা আনতে। এভাবে সেদিন সারাটা বিকাল লই খেলেছি। খেলা শেষে বাড়ি ফিরলাম। মা খুব আদর করে কাছে ডাকল।

আমিও কাছে গেলাম। কাছে যেতেই মায়ের কি মাইর! আমি লাল চোখ নিয়ে আবার খেলতে গিয়েছিলাম তাই সেদিন মা খুব মেরেছিল আমাকে। পরে শুনি সেলিমকেও অনেক বকেছে ওর বাবা।

খেলতে খেলতে কত ঝগড়া, মারামারিই না করতাম! দিন শেষে আবার সবাই এক। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ