মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নো-ম্যানস ল্যান্ডের  রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ

 

৪ আগস্ট, আল জাজিরা : কোমরে নীল-সাদা চেকের লুঙ্গি পরিহিত নূর আল-আমিন বাঁশের চাটাইয়ের ঘরের সারির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি কর্দমাক্ত খালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। প্রায় ৪০ বছর বয়সী এই রোহিঙ্গা বলেন, ‘এখানে কোনো কাজ নেই, কোনো কিছুই করার নেই। ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ি, কুরআন পড়ি, তারপর আবার ঘুমাই। তারপর সাহায্য সংস্থার আসার জন্য অপেক্ষা করি। এটাই আমার নিত্যদিন।’ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের আর্তনাদের কথা।

নূর আল-আমিন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত ৪ হাজার ৬০০ রোহিঙ্গার একজন। এখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা শরণার্থীর মর্যাদা পায়নি। আর যে এলাকায় তারা প্রায় এক বছর ধরে অবস্থান করছে তা এখন মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু স্থলপথে মাইন পুঁতে দেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত বেড়া নির্মাণ করার মাধ্যমে সেখানে থেকে রাখাইন রাজ্যে যাওয়া তাদের জন্য অসম্ভব। আর তাদের ঘরের কয়েক মিটার দূরে খালের ওপারেই বাংলাদেশের তা¤্রু কোনাপাড়া। মাসে দুইবার করে রেড ক্রসের লোকজন সেখানে গিয়ে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিয়ে আসে। 

বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)-র কঠোর নজরদারি মধ্য দিয়ে একটি কাঠের ব্রিজের মাধ্যমে খাল পার হয়ে তারা বাংলাদেশের তাম্রু চেক পয়েন্টে আসতে পারে। মূলত ত্রাণের পণ্য নেওয়া ছাড়া তা¤্রু গ্রাম থেকে কিছু বাজার করার জন্য তারা মাঝে মাঝে সীমান্ত পার হয়ে থাকে।

বিজিবি ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি পারষ্পরিক বোঝাপড়া আছে যে, রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও আবারও তাদের ক্যাম্পেই ফিরে যায়। এটা অনেকটা ‘জেন্টেলমেন্স এগ্রিমেন্টের’ মতো।

বিজিবির স্থানীয় কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, সোজা কথায় রোহিঙ্গাদের নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া একটি সুবিধার বিষয়। তারা যদি আমাদের এই পাশে না আসে তাহলে কিভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে তাদের ত্রাণ সংগ্রহ করবে?’ তিনি আরও বলেন, তারা মিয়ানমারের নাগরিক হলেও তারা আমাদের সীমানায় চলে আসে। তবে বেশি দূর যায় না।

এই ক্যাম্পের বাসিন্দা নূর আল-আমিনের মিয়ানমারের মংডুর শহরতলীর পানিপাড়া গ্রামে নিজের ধানের জমি রয়েছে। তিনি এই পর্যন্ত তিনবার জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।

প্রথমবার ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু করলে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে একবছর ছিলেন আল আমিন। সেই সময়ে তিনি শিশু ছিলেন। এরপর ১৯৯২ সালে তাদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হলে দ্বিতীয় বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তিনি। ওই সময় বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে ৮ বছর পার করেছিলেন এই কৃষক। আর সর্বশেষ গত বছর রাখাইন রাজ্যজুড়ে সেনা অভিযানের মুখে ২৭ আগস্ট পরিবার নিয়ে তৃতীয়বারের মতো পালিয়ে আসতে বাধ্য হন তিনি। জাতিসংঘ সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ বললেও মিয়ানমার তা অস্বীকার করে আসছে।   

আল আমিন বলেন, মাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়ে আমার দুই ছেলে আহত হয়েছে। একজন মাথায় ও আরেকজন বুকে আঘাত পেয়েছে। বাংলাদেশের হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে তারা এখন অনেক সুস্থ হয়ে উঠেছে। ওই সময় তিনি বলেন, তার ছেলেরা ভাগ্যবান যে পঙ্গু হয়ে যায়নি বা মারা যায়নি। আল আমিন জানান, তিনি সীমান্ত বেড়ার গর্তের মধ্যে পুতে রাখা মাইন বিস্ফোরণ হয়ে এক নারীর দুই পা বিছ্ন্নি হয়ে যেতে দেখেছেন। 

আল আমিনের বড় ছেলের বয়স ২১ বছর আর ছোট ছেলের বয়স ৭ বছর। এই ক্যাম্পের জীবনের হতাশা ও সন্তানদের ভবিষ্যতের বিষয়টি উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন, আর কত দিন আমাকে এখানে থাকতে হবে? বাকি জীবন কি তাদের শরণার্থী হিসেবেই কাটিয়ে দিতে হবে?

নো-ম্যানস ল্যান্ডের জীবন খুবই কষ্টকর। এখানে কোনও সুবিধা নেই, কোনও কাজ নেই, কোনও স্কুল নেই। গত বছর বর্ষাকালে বন্যা হওয়ায় এবার এখানকার ঘরগুলোর কাঠামো ইস্পাত দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা দিল মোহাম্মদ একটি ব্রিজ দেখান। একটি বাঁশ দিয়ে নির্মিত সাধারণ কাঠামোর ব্রিজটি সবুজ রং করা। তিনি বলেন, একমাস আগে জুলাইয়ের ১ তারিখে এটা তৈরি করা হয়েছে। এটা তৈরির উপকরণগুলো সরবরাহ করলেও বিজিবি এই ব্রিজটি দেখেও দেখে না। আগে আমরা ত্রাণের জন্য এই খালের পানির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যেতাম।

৫১ বছর বয়সী দিল মোহাম্মদ বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত বেড়া থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরেই তার বাড়ি। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বার বার ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছে যে, তিনি আরসা’র একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি বলেন, যখন মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টিয়ান স্ক্রানার বার্জনার কয়েক মাস আগে সীমান্ত বেড়ার কাছে আমার সঙ্গে কথা বলেন। আমি যা বলেছি মিয়ানমার সরকার তা বাতিল করে দিয়ে আমাকে আরসার একজন নেতা হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে।

বাসিন্দারা জানান, মিয়ানমার এর আগেও বলেছে যে, এই ক্যাম্পে বসবাসকারীরা সবাই আরসার সদস্য। আল আমিন বলেন, রাতের বেলা অনেক সময় মিয়ানমারের সেনারা ফাঁকা গুলী ও আমাদের দিকে বোতল ছুঁড়ে মারে। মূলত যুবক লোক ও ছেলেদের তাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারার জন্য উস্কানি দিতেই তারা এটা করে থাকে।

মোহাম্মদ জানান, তিনি এমন ভয়ঙ্কর পরিবেশে থাকতে চান না। তিনি বলেন, যখন আমরা প্রথম আসলাম, ভেবেছিলাম কয়েকদিন পরই আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবো। কিন্তু এক বছর পার হয়ে গেছে তাও কোনও সমাধান হলো না। জাতিসংঘ আমাদের ব্যর্থ করে দিয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে বাংলাদেশের তাম্রু সীমান্তটি বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। এই জেলায় প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস। তাম্রু এলাকার প্রধান সড়কের পাশে সারিবদ্ধ কয়েকটি চায়ের দোকান, মুদি ও সবজির দোকান। নো-ম্যানস ল্যান্ড ক্যাম্পের কয়েকজন রোহিঙ্গা সেখানে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আর কয়েকজন পরিচিতভাবেই বাজারে ঘোরাফেরা করছেন।

তবে তাদের উপস্থিতিতে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে কোনও বিরক্তি নেই। এই নতুন মানুষদের নিয়ে গ্রামাঞ্চলে কোনও সমস্যা নেই বলে স্থানীয় সীমান্ত হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মালিক নূর মুহাম্মদ। তিনি বলেন, তাদের উপস্থিতিতে আমরা বিরক্ত নই। আমরা একই দলের লোক। আমরাও সীমান্তে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও কোনও সমস্যায় পড়ি না।

মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের চেয়ে বেশি সাহসী বলে মনে করেন নূর মোহাম্মদ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অবস্থানের কারণে তাদের বার বার সহিংসতার শিকার হতে হয়।

মুহাম্মদ বলেন, স্বল্প সময়ের জন্য স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। কারণ বাংলাদেশি শ্রমিকরা যে কাজ ৫০০ টাকায় করবে রোহিঙ্গা শ্রমিকরা তা ২০০-৩০০ টাকা কমেই তা করে দেবে। মুহাম্মদ বলেন, দেশের জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদে আশ্রয় দেয়া হলে তা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, তারপরও আমরা তাদের মেনে নিয়েছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ