সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ইসলামফোবিয়াকে যেভাবে একীভূত করা হচ্ছে

পশ্চিমা দেশগুলোতে কৌশলে ছড়ানো হচ্ছে ইসলামভীতি

১১ মে, ফরেন পলিসি : এক দশক আগে একাডেমির বাইরে খুব অল্পসংখ্যক লোকই দাসত্বের বিষয় নিয়ে জনাথন ব্রাউনের বক্তৃতাটি লক্ষ্য করত। ওয়াশিংটনের এই বান্দিার বয়স এখন ৩৯ বছর। ব্রাউন এখন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজের একজন অধ্যাপক এবং সেখানকার ‘মুসলিম-খ্রিস্টান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ সংক্রান্ত প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল সেন্টারের একজন পরিচালক।

জনাথন ব্রাউন ইসলামে ধর্মান্তরিত একজন মুসলিম। তার বেশিরভাগ কাজের মাধ্যমে তিনি ইসলামিক চিন্তাধারাকে সাধারণ শ্রোতাদের কাছে আরো সহজতর করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার বিশ্বাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্রাউনের এই প্রচেষ্টা তাকে কিছু আমেরিকানদের কাছে ঘৃণার পাত্র বানিয়েছে। অসংখ্য নিবন্ধে তাকে দাসত্ব এবং ধর্ষণের একজন সমর্থনকারী হিসেবে দোষারোপ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার পরিবারকে মৃত্যু এবং ধর্ষণের হুমকিও দেয়া হয়েছে।

আসলে এটি সব ভাল অভিপ্রায়ের শুরু করে। ব্রাউন বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের একজন, যারা বিশ্বাস করে যে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ইসলামি চিন্তাধারার একটি বিকৃত ব্যাখ্যা ব্যবহার করার মাধ্যমে দাসত্ব, ধর্ষণ এবং অন্যান্য অপরাধকে আশীর্বাদ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে।

ব্রাউন এও জানেন যে এই গ্রুপের বিকৃত ধর্মতত্ত্বকে খুব শিগগিরই কিছু মুসলিম ত্যাগ করছেন না। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, আইএসের মতবাদে প্রলোভিত হয়ে শত শত বিদেশি যোদ্ধা সিরিয়া ও ইরাকে গ্রুপটির সঙ্গে যোগদান করেছে। ধর্মীয় সত্যতার আবরণে ইসলামিক স্টেটের অত্যাচারকে ন্যায্যতা প্রমাণে অন্যান্য কিছু লোকের প্রচেষ্টা বিশ্বাসের সঙ্কট সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু ব্রাউন অনুভব করেছিলেন যে, বিশ্বাসের এই সঙ্কট থেকে মুক্তি লাভের জন্য তার প্রচেষ্টা করা উচিৎ। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভার্জিনিয়ায় হেরনডনের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট’ -এ তিনি তার পাবলিক বক্তৃতাটি দেন। তিন ভাগে বিভক্ত বক্তৃতায় ব্রাউন প্রথমেই ইসলামের দাসত্ব নিয়ে কথা বলেন। তার এই বক্তব্যের পর তিনি আমেরিকার ডান্পন্থী ও মুসলিম-বিরোধী গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের শ্রুতিকটু বাক্যের মুখোমুখি হয়েছেন।

বক্তৃতা শেষে, ব্রাউন অ্যান কুল্টার, রবার্ট স্পেন্সর এবং মিলো ইয়াননপোলোসের মতো রক্ষণশীল ও অল্টানেটিভ-ডানপন্থী হেভিওয়েটদের কাছ থেকে অনলাইনে বিভিন্ন কটু কথা সহ্য করতে হয়েছে। তাদের দাবি, তিনি নিন্দা করার জন্য যে বিষয়গুলো সম্পর্কে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি সেসবের পক্ষ নিয়েছেন। তার বিশ্ববিদ্যালয় তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং তাকে বরখাস্তেরও হুমকি দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা রয়েছে, যা ধর্ম বিশ্বাসের ঐতিহ্যগুলিকে একটি মুক্ত এবং সুরক্ষিত পরিবেশে উপস্থাপনের অনুমতি দেয়। কিন্তু একটি লক্ষ্যবস্তু নেটওয়ার্ক এখন মুসলিমদেরকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছে। তারা স্বাধীনতা এবং ইসলামকে একটি ধর্মের পরিবর্তে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে প্রচার করছে।

কুরআন দাসত্বের নিন্দা করে না। রাসূল (সা.) ক্রীতদাসদের মুক্তি দেয়াকে একটি কল্যাণমূলক কাজ হিসেবে উত্সাহিত করেছেন। কিন্তু দাসদের প্রতি আচরণের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে অন্যান্য শিক্ষাও তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই শিক্ষা দাসত্বের সুযোগকে সীমিত করেছে কিন্তু একেবারে নিন্দা করা হয়নি।

বিশ শতকের বেশিরভাগ ইসলামি চিন্তাধারা দাসত্বের এই অনুশীলনকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলি এটিকে বিলুপ্ত করে দেয়। তিউনিস শাসক আহমদ বে ১৮৪৬ সালে দাস প্রথার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সৌদি আরব চূড়ান্তভাবে ১৯৬২ সালে এটি বিলুপ্ত করে দিয়েছিল।

কিন্তু আধুনিক বিশ্বাসীদের কাছে প্রাচীন গ্রন্থগুলি অযৌক্তিক এবং নিরবধি হতে পারে। যেমন সূরা ২৪:৩২- বলা হয়েছে, ‘এবং তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত এবং তোমাদের পুরুষ দাস ও তোমাদের নারী ক্রীতদাসদের মধ্যে যারা যোগ্য হন, তাদের সঙ্গে তোমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও।’

এই আয়াতটিতে, দাসত্বকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করতে দেখা যায় এবং এমনকি অসম্মতিসূচক যৌন সম্পর্ককে উত্সাহিত করণ হিসাবেও দেখা যেতে পারে। স্বাধীনতা ও সর্বজনীন মানবাধিকারের ব্যাপারে যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য এটি দুঃখজনক এবং সমস্যাযুক্ত, বিশেষ করে যখন একটি স্ব-ঘোষিত ইসলামিক খিলাফত বা আইএস ইয়াজিদি নারীদের দাসত্বকে সমর্থন করার জন্য এইরকম আয়াতকে ব্যবহার করেন।

এটি খ্রিস্টানদের কাছে এখনো একটি সমস্য। তারা দীর্ঘ দিন ধরে এটির মোকাবেলা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একবার তার নিজের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এ নিয়ে সংগ্রাম করেছে। এসব খ্রিস্টান জঙ্গিরা প্রাতিষ্ঠানিক দাসত্বকে সমর্থন করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছিল। আমেরিকার কনফেডারেট রাজ্যের প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিস বলেছেন, ‘দাসত্ব ঈশ্বরের আদেশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটা বাইবেলে অনুমোদিত হয়েছে। টেস্টামেন্টের উভয় ধর্ম গ্রন্থেও এটি সমর্থন করা হয়েছে। এটি সব যুগে বিদ্যমান রয়েছে।’ পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গ মিউজিয়াম আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে একটি ‘ধর্মীয় সঙ্কট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বাইবেলে দাসত্বের কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু যিশু কখনো তা নিন্দা করেন নি। কলসীয়দের নিউ টেস্টামেন্ট গ্রন্থে ক্রীতদাসদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সবকিছুতেই তোমাদের পার্থিব মনিবদের আনুগত্য কর’। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক আয়াতে মনিব কর্তৃক ক্রীতদাসদের নিয়ন্ত্রণ এবং মনিবদের জন্য তাদের ক্রীতদাস নারীদের বিয়ে করতে বা তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে অনুমতি দেয়া হয়েছে।

বাইবেলে ক্রীতদাস সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরগুলো গৃহীত হয়েছে এই রকমভাবে: বাইবেলের সময়ে প্রচলিত ক্রীতদাস ছিল আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের জাতি ভিত্তিক সর্বগ্রাসী প্রতিষ্ঠানের একটি ভিন্ন ধরনের চর্চা। তখন ক্রীতদাসদের অনেক অধিকার ছিল এবং সেই সময়ে সমাজটি এখনকার সমাজ থেকে আলাদা ছিল। সমাজিক মানুষগুলো ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত ছিল, সামান্য কিছু মানুষ স্বাধীনতা ও সামাজিক সক্রিয়তা উপভোগ করতেন এবং ক্রীতদাসদের একটি সুস্পষ্ট সামাজিক অবস্থান ছিল, যা সমাজে তাদের একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করেছিল।

চার্চে প্রতি রবিবার সকালের ধর্মোপদেশে এবং খ্রিস্টান তরুণ-তরুণীদের মিটিংয়ে ক্রীতদাস সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরগুলো এভাবেই বলা হয়ে থাকে।

জন পাইপার নামে একজন জনপ্রিয় খ্রিস্টান যাজক ও লেখক, নিউ টেস্টামেন্টের দাসত্বের জন্য তার ওয়েবসাইটটি উৎসর্গ করেছেন। চার্চের শুরুর দিকের নেতা পল মনিবদের মান্য করার জন্য ক্রীতদাসদের উত্সাহিত করেছিলেন। কিন্তু পাইপার তার ওয়েভ সাইটে লিখেছেন, ‘ক্রীতদাসরা যাতে তাদের স্বাধীনতা লাভ করতে পারে, তার জন্য পল তাদের উৎসাহিত করেছেন।’

‘পিয়ার্স মায় ইয়ার’ নামক একটি জনপ্রিয় খ্রিষ্টীয় উপাসনার গানও রয়েছে, যা ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি শ্লোককে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে একজন দাসকে তার বাকি জীবন মনিবের জন্য উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে।

উইসকনসিনের একটি খ্রিস্টান যুব ক্যাম্পের ওয়েবসাইটিতে এটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এইভাবে: ‘এই শ্লোকটি দাসত্বের প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি স্বীকার করে যে একজন ক্রীতদাস সাত বছর পরে তার মনিবের সঙ্গে থাকা না থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, বিশেষ করে যদি স্বাধীনতার কোন সম্ভাবনা না থাকে।’

তাদের এই গানটি একটি রূপক দৃষ্টিভঙ্গি, যা আজকের জগতের জন্য আক্ষরিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে একটি নৈতিক পাঠকে তুলে ধরে। খ্রিস্টানদের এই পুনরাবৃত্ত প্রক্রিয়া মুক্ত কথোপকথন এবং আলোচনার জন্য একটি সুরক্ষিত স্থান দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। অধিকাংশ খ্রিস্টানই দাসত্বকে ভুল হিসেবে বিশ্বাস করেন এবং তাদের এই বিশ্বাস তাদের ধর্ম বিশ্বাস অটুট থাকতে সক্ষম করেছে। এমনকি এটি মানবাধিকারের আধুনিক ব্যাখ্যার জন্যও একটি যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে আজকে ক্রমবর্ধমানভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসলাম নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার স্থানকে অস্বীকার করা হচ্ছে।

তিনি দাসত্বের আধুনিক চ্যালেঞ্জ বুঝার জন্য একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ১৯ শতকের ব্রিটেনের মুক্ত নারীদের তাদের নিজেদের সম্পত্তির মালিকানা ছিল না এবং তাদের আইনগত অধিকার তাদের স্বামীর সাথে সংযুক্ত ছিল।

যে বিষয়ে ব্রাউন উপসংহার টানেন, তা দাসত্বের লেবেল ছিল না। এটি এমন একটি শোষণ ও নিপীড়ন ছিল, যা প্রতিরোধ করা ইসলামি আইনের উদ্দেশ্য ছিল। বিষয়টি সম্পর্কে ব্রাউন তার পরবর্তী বক্তৃতাতে আরো আলোচনার কথা বলেছিলেন।

ব্র্উান চেয়েছিলেন তাদের পবিত্র গ্রন্থসমূহ এবং তাদের মানবাধিকারের সংবেদনশীলতার মধ্যে আমেরিকান মুসলমানদের জন্য একটি সেতু নির্মাণ করা। যেমনটি তার আগে অনেক খ্রিস্টান চিন্তাবিদরা করেছেন। তিনি তার এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইসলামফোবিক বাস্তুতন্ত্রের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ