রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

সরকারী নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হাজামদের বাণিজ্য

আবু সাইদ বিশ্বাসঃসাতক্ষীরা: জেলা ব্যাপি চলছে ছেলেশিশুদের সুন্নতে খতনা। পহেলা ফাল্গুন থেকে জোরে শোরে শুরু হয়েছে সুন্নতে খাতনার। হাজামরা প্রতিদিন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটে বেড়াচ্ছে। কয়েক জন হাজামের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রতি দিন জেলাতে প্রায় শতাধিক ছেলে শিশুকে  খতনা করানো হচ্ছে। ডাক্তারের কাছ থেকে খতনা করালে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে এমন অভিযোগ তুলে লক্ষ লক্ষ টাকা বাণিজ্য করছে তারা। সিন্ডিকেট করে তারা জেলা ব্যাপি সুন্নতে খতনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ৫শ টাকা থেকে শুরু করে ৫হাজার টাকা পর্যন্ত তাদেরকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর সাথে আছে চাল,ডাল সহ  আছে অনেক কিছু।  প্রাচীন পদ্ধতিতে বাঁশের ‘চোশ’ দিয়ে ছুরি বানিয়ে খতনা করছে হাজামেরা। খতনার পরে মন্ত্ররও পড়ে ফু দিচ্ছে। যা ডাক্তারের মাধ্যমে করালে ইসলামী সব রীতি মেনেচলা সম্ভব নয় বলে হাজামরা জানান।
 ইসলাম ধর্মীয় রীতিনুযায়ী বাংলাদেশে প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের ছেলে শিশুদের খতনা করানো হয়। ছেলে শিশুর বয়স চার বছর পার হলে মা-বাবা তার শিশুকে খতনা করানোর জন্যে ডাক্তার বা হাজামের দ¦ারস্ত হন।
তালার খলিশখালী ইউনিয়নের মঙ্গলানন্দ কাটী গ্রামের একটি পাড়ায় চারটি শিশুকে খতনা  করানো হয়।খতনা করানো শিশুরা হলেন,লিমন শেখের ছেলে তানভীর(৪),আব্দুস সামাদ বিশ্বাসের ছেলে আমির হোসেন(৬),শাহজান বিশ্বাসের ছেলে আকাশ (৬),এবং আনিচুর রহমানের ছেলে সাকিব আল হাসান(৫)। মঙ্গলানন্দ কাটীর দরিদ্র দিন মজুর আব্দুস সামাদকে দিতে হয়েছে ৫শ টাকা চাল ও ডাল,শাহজান বিশ্বাস,আনিচুর রহমান দিয়েছে একই টাকা। একটু বড় লোক লিমন শেখ তাই তাকে টাকা দিতে হয়েছে অনেক বেশি। সাতক্ষীরা শহরের ৫নং ওয়ার্ডের মিয়াসাহেবের ডাঙ্গা গ্রামের মেহেদীর ছেলে হুসাইন(৩)কে ও কাল খতনা করানো হয়েছে। তার একপা ভাঙ্গা ব্যান্ডেজ করা। তার কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে আটশ টাকা।
সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে তাদেরকে সুন্নতে খতনা করানো হয়। ইসলাম ধর্মীয় রীতিনুযায়ী হাজাম দ্বারা এখতনা করানো হয়। এর আগে গ্রামরীতিনুযায়ী গোসল করানো,গালে খীর দেয়া সহ অনেক রীতি পালন করানো হয়।
 খতনা করান হাজাম আকরাম হোসেন। পাটকেলঘাটায় রাড়ীপাড়ায় তাদের বসবাস। আকরাম হোসেন এর বাপ নিজাম আলী ও দাদা ইছার আলী ও পেশায় হাজাম ছিলেন। তিনি জানান,ডাক্তারের চাইতে তাদের কাছে খতনা করলে শিশুরা সুরক্ষিত থাকে। অভিভাবকরা তাদেরকে বেশি নিরাপদ মনে কনের। এজন্য তার এলাকাতে তা ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তিনি আরো জানান, ইদানিং ডাক্তারা তাদের নিমানুযায়ী খতনা করতে শুরু করেছে। এ মাসে প্রতিদিন তিনি (৫-১০)টি করে খতনা করার অর্ডার পান। প্রতিটি খতনা সর্বনিম্ন পাঁচশ টাকা করে নেয়া হয়। আর যাদের অবস্থা স্বচ্ছল তাদের কাছ থেকে একটু বেশি করে নিতে পারি।
সতাক্ষীরা শহর,তালা,ও সদরের কয়েকজন হাজামের সাথে কথা বলে জানা যায়,তাদের একটি সমিতি আছে। সমিতির মাধ্যমে ঠিক করা হয় কোন হাজাম কোন এলাকাতে খতনা করবে। যে কারণে কোন অভিভাবক ইচ্ছা করলে যে কোন হাজামকে নিয়ে তার শিশুকে খতনা করাতে পারে না। সিন্ডিকেট করে এভাবে হাজামেরা অধীক পরিমাণে টাকা তুলছে। দেখার যেন কেউ্ নেই।
খাতনা করানোর ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত কোন স্বাস্থ্য নীতি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ছয় বছরের নিচে বয়স এমন  কোন শিশুকে খতনা না করোনোর কথা থাকলেও তিন বছর বয়স হলেই হাজামেরা খাতনা করান। এতে শিশুর  মানবাধীকার লঙ্ঘিত হয় বলে অভিযোগ ।
পুরুষাঙ্গের সামনে বা মাথার দিকে যে অতিরিক্ত চামড়া পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল মাথাকে ঢেকে রাখে, অপারেশনের মাধ্যমে এ অতিরিক্ত চামড়া ফেলে দেওয়াই খতনা বা মুসলমানি। ধর্মীয় কারণে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা খতনা করিয়ে থাকে। এ ছাড়া কিছু কিছু রোগে, যেমন ফাইমোসিস, প্যারাফাইমোসিসে এটি করাতে হয়।
ডাক্তাররা বলছে,ফাইমোসিসের ফলে পুরুষাঙ্গের মাথার দিকের চামড়া এমনভাবে মূত্রনালিকে ঢেকে রাখে যে শিশু প্রস্রাব ঠিকমতো বের করতে পারে না। প্রস্রাবের সময় শিশু ব্যথায় কান্নাকাটি করে এবং প্র¯্রাব বের হতে না পেরে পুরুষাঙ্গের মাথা ফুলে ওঠে। এভাবে বেশিদিন চলতে থাকলে প্র¯্রাবে ইনফেকশন, এমনকি কিডনি ফেইলিওর পর্যন্ত হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খতনা করে পুরুষাঙ্গের ক্যানসার প্রতিরোধ করে
 ডাক্তাররা বলছে খতনা করানোর আগে রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন । অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শুধু খতনা করানোর কারণেই অনেক রোগী রক্তপাতের ফলে মারা গেছে। অনেক শিশুর জন্মগত রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা থাকতে পারে। রক্ত পরীক্ষা না করে এ শিশুদের খতনা করালে একবার রক্তপাত শুরু হলে আর থামতেই চায় না। তাই খতনার আগে বাচ্চার অবশ্যই রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা (জন্মগত) আছে কি না, তা দেখে নিতে হবে।
অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে খতনা করালে তেমন অসুবিধা হয় না বললেই চলে। তবে হাজামদের দ্বারা খতনা করালে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়া, অতিরিক্ত বা কম চামড়া কেটে ফেলা, পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল মাথা কেটে ফেলার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এ সমস্যাগুলো শুধু অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে খতনা করিয়ে দূর করা যায়।
দেশের সব হাসপাতালেই শিশুর খতনা করানো হয়। সাধারণত ছয় থেকে নয় বছরের শিশুদের খতনা করানো হয়। 
 এবিষয়ে জানতে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন তৈহিদুর রহমান পত্রদূতকে বলেন, হাজাম দিয়ে খতনা করানোর ব্যাপারে সরকারের তেমন কোন বিধি নিষেধ নেই। তবে ডাক্তারের মাধ্যমে খতনা করালে ঝুকিটা অনেক কম। অভিভাবকরা অনেকটা অসচেতন তাই তারা আধুনিক পদ্ধতির পরিবর্তে পুরাতন পদ্ধতিতে সুন্নাতে খতনা করান। জেলা সকল উপজেলা ও জেলা সদরের সরকারী স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র সমূহে সুন্নতে খতনা করানোর ব্যবস্থা আছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে বিনা মুল্যে খতনা করানো হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ