বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আবহমান গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার খেজুর রস ও পাটালি

আবহমান গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যপূর্ণ খেজুর পাটালি

খুলনা অফিস : হেমন্তের শেষে শীতের ঠান্ডা পরশের মাঝেই বাঙালির কাছে খেজুর গাছের রসে নিজেকে ডুবিয়ে নেয়ার সুন্দর এক মাধ্যম আবহমান বাংলার খেজুর চাষী। একঘেয়েমি যান্ত্রিকতার জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে থাকে শীত ঋতুচক্র। বৈচিত্রপূর্ণ গ্রামীণ সংস্কৃতির এই শৈল্পিক ঐতিহ্যের চরম প্রাণোচ্ছলতায় আসলেই ঋতুচক্র বছর ঘুরেই দেখা দেয় বারবার। এই শীতকাল গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জীবনে শীত আসে বিশেষ করে চাষীদের কাছে সে তো বিভিন্ন মাত্রার রূপ নিয়ে। স্বপ্ন আর প্রত্যাশায় তাদের অনেকখানি খেজুর গাছের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গি বসবাস হয়ে যায়। নানাভাবে জড়িত চাষীর জীবন সংগ্রামে বহু কষ্টের মাঝে অনেক প্রাপ্তিই যুক্ত হয় বাংলার এই জনপ্রিয় তরুবৃক্ষ খেজুর গাছের সঙ্গে। ভূমিহীন চাষী, প্রান্তিক চাষী বা দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের জন্য এই সময়টা অনেক আনন্দদায়ক। তাদের খেজুর গাছের যত্ন-আত্তি না করলে যে রস মিলবে না। আর রস না মিললে গুড় হবে কি করে। পাটালি না দেখলে যেন ঘুম আসে না চাষীর। পাটালি গুড়ের মিষ্টি-মধুর গন্ধে চাষীরা বিক্রয় কাজে না থাকলে বাঁচবে কি করে। শীতের আমেজে প্রকৃতির মাঝ হতে সংগৃহীত খেজুর রস চাষীরা যেন চষে বেড়ায় সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায় গ্রামের মেঠো পথ ধরে, তারই বহিঃপ্রকাশে যেন চমৎকার নান্দনিকতা এবং অপরূপ দৃশ্য অনুভব করে, তা যেন অবশ্যই এক শৈল্পীকতার নিদর্শন। এই শীতকালে রূপ সৌন্দর্যের আর একটি উপাদেয় সামগ্রি খাঁটি সরিষার তেল, যা শরীরে মালিশ করে অনেকাংশেই ত্বকের মসৃণতা এবং ঠান্ডা দূর করে খেজুর গাছে উঠতে। গ্রামে খুব ভোরে খেজুর গাছ হতে রসের হাঁড়ি নামিয়ে আনতে ব্যস্ত হন চাষী। রাতের এ হিমশীতল রস ভোরে হাড় কাঁপানি ঠান্ডায় গাছ থেকে নামিয়ে খাওয়ার যে স্বাদ তা একেবারেই যেন অন্যরকম। আসলে ভোর বেলায় রস খেলে শীত শরীরে আরো বেশী জেকে বসে। আবার শীতে শরীর কাপুনির স্পন্দন যেন চরম আনন্দদায়ক। শীত লাগে লাগুক না কেন, তবুও রস খাওয়ার কোন বিরাম নেই। এক বা দুই গ্লাস খাওয়ার পরপরই কাঁপতে কাঁপতে যেন আরও এক গ্লাস মুড়ি মিশিয়ে মুখে তুলে চুমক দেয়া আর রোদ পোহানো সে যে কি আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। এই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে গ্রামের ছেলে মেয়েরা ঘুম থেকে খুব ভোরে উঠে হাত মুখ ধুয়ে খড় কুটোয় আগুন জ্বেলে হাত পা গরম করে এবং অপেক্ষা করে কখন রোদের তেজ প্রখর হবে। তাদের রোদ পোহানোর আরামের সঙ্গে আরও অপেক্ষা, তা হলো তাদের প্রিয় খেজুর রস। কখন যে আসে আর তখনই খাবে। সে রস আসলে যথা সময়ে হাজির হলে তাদের কাছে যেন আনন্দ উল্লাসের কোনই কমতি হয়না। গ্রামবাংলার অভাবী মেয়েরা নানা রঙের যেসব খেজুর পাতায় খেজুর পাটি তৈরি করে তার উপরই যেন চলে রস খাওয়ার আসর। উপার্জনের জন্যই খেজুর পাতা শুকিয়ে তা দিয়ে খেজুর পাটি তৈরীর পর বিক্রয় করে সংসারের জন্য কিছুটা বাড়তি অর্থ আয় হয়। সুতরাং এই খেজুরের পাটিতেই গ্রামের অনেক পরিবার ঘুমানোর কাজে তা ব্যবহার করে। খেজুর পাতা দিয়ে এক ধরনের সাহেবী টুপিও তৈরি হয়। খেজুরের পাতা, ডাল এবং গাছ শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর মোরব্বা তৈরিতেও খেজুর কাটার প্রচলন আছে। এক কথায় বলা চলে খেজুর গাছের পাতা ও ডাল সেতো কবর পর্যন্তও লাগে। খেজুর গাছ ছয় সাত বছর বয়স থেকে রস দেয়া শুরু করে প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত রস দেয়। গাছ পুরনো হয়ে গেলে রস কমে যায়। আর পুরনো খেজুর গাছের রস খুব মিষ্টি হয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য অবার অনেক ক্ষতিকর। রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। তবে কার্তিক মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। এছাড়া রসের স্বাদও ততই মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভরা মওসুম। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত একটি খেজুর গাছে মাসে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কেজি রস পাওয়া যেতে পারে। খেজুর গাছ শুধু রস দিয়েই খ্যান্ত হয় না। শুকনো খেজুরে ভেষজ গুন অনেক রয়েছে। চাষীরা দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান এ গাছ থেকে সে গাছে। মাটিতে পা ফেলার সময়টুকুও পায় না অভাবী এই মানুষগুলো। শীত আসা মাত্রই খেজুর গাছ ‘তোলার জন্য’ অনেক আগে থেকেই সকাল-সন্ধ্যায় যেন লেগে থাকে খেজুরচাষীরা। খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। আর এই গাছগুলো কাটে যারা তাদেরকে ‘গাছি’ বলা হয়। তারা বিভিন্ন উপকরণ’র সমন্বয়ে গাছি নামধারি মানুষ পরিচ্ছন্ন ভাবে গাছ কাটার জন্য ব্যস্ত  হয়ে যান। তারা গাছ কাটতে ব্যবহার করেন দা, দড়ি, এক টুকরো চামড়া বা পুরনো বস্তা। আবার দা রাখার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি থলি বা ঝাঁপি। সে ঝাঁপি গাছিরা রশি দিয়ে খুব যতেœ দা রেখে এ গাছ থেকে সে গাছে উঠানামা করতে সুবিধা পায়। আবার কোমরে বেশ কিছু চামড়া বা বস্তা বেঁধে নেয় যেন গাছে ওঠা নামায় কোন প্রকার সমস্যা না হয়। গাছ কাটার জন্য গাছি শরীরের ভারসাম্য রার সময় কোমর বরাবর গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে নেয়। দড়িটা বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়। রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়। যেমন, পাটালি গুড়, ঝোলা গুড়। এ সব গুড় বিভিন্ন ভাবে খাওয়া হয়। শীতের খেজুর গাছের রস হতে যে গুড়ে তৈরি তা দিয়ে দুধের পিঠা, পুলিপিঠা, সেমাই পিঠা আরো কত কিযে পিঠা তৈরী হয় তা না খেলে একেবারে জীবনই বৃথা। পাটালি গুড় দিয়ে মুড়ির মোয়া খাওয়া ও ঝোলা গুড়ের সহিত মচমচে মুড়ি খাওয়ার জনপ্রিয়তা শুধুই গ্রামীণ মানুষের রয়েছে। শখ করে অনেক চাষিরা চা বানিয়ে খায় খেজুর গুড় দিয়ে। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমা অঞ্চলে খেজুর গুড় বাণিজ্যিকভাবেই উৎপাদিত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ