শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ব্যাংক হিসাব তদন্ত ও জব্দে তদন্ত কর্মকর্তার করণীয়

জিয়া হাবীব আহ্সান : সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের নালিশী হিসাব তদন্তে ও দলিলপত্র জব্দকরণে তদন্ত কর্মকর্তাদের পদ্ধতিগত ভুলের জন্য মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তাগণ বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা বিজ্ঞ মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের তদন্তের নির্দেশ পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের নালিশী একাউন্ট ও তৎসম্পর্কিত দলিলপত্র পরিদর্শন ও জব্দে সহযোগিতার জন্য বলেন। অথচ সেশন কোর্ট বা মহানগর দায়রা জজ বা বিজ্ঞ জেলা জজের অনুমতি ব্যতিরেকে তা পরিদর্শন বা জব্দ বা তদন্ত করা যায় না। ভোক্তা বা ব্যাংক গ্রাহকদের প্রাইভেসীর স্বার্থে আইনে এ বিধান রাখা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের অবগতি ও এতদ সংক্রান্ত ভুল বুঝাবুঝি নিরসনের জন্য আমার  এ প্রবন্ধের অবতারণা।
ধরে নিলাম সি. আর. বা জি. আর. মামলাটি ৪২০/৪০৬/ ৪৬৭/৪৬৮/৪৬৯/৪৭১/১০৯/৩৪ দঃবিঃ ধারায় আনীত অভিযোগ হয়। অভিযোগটি চট্টগ্রামের বিজ্ঞ মেট্রো আদালত বা সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালত বাদীর অভিযোগ তদন্ত পূর্বক সত্যতা যাচাই করে রিপোর্ট দাখিলের জন্য পি.বি.আই বা পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন, চট্টগ্রামকে নির্দেশ দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তা পি.বি.আই চট্টগ্রাম বা যে কোন সরকারী এজেন্সী পরিদর্শন বা তদন্ত কর্মকর্তা মেট্রো (মিঃ এক্স) পি.পি.এম, পুলিশ মহাপরিদর্শক গত ১৮/১০/১৭ ইং তারিখে স্মারক নং পি.বি.আই/ চট্টগ্রাম মেট্রো/ ২২০ মূলে ঋঝওইখ বা কোন লিজিং কোম্পানির হেফাজতে রক্ষিত কতিপয় নথিপত্রের অনুলিপি সরবরাহের জন্য শাখা প্রধান বরাবরে চিঠি প্রদান করেন। চিঠিতে উক্ত কোম্পানির লকারে সংরক্ষিত সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্টপত্র হিসাব যাচাই-বাছাই, পরিদর্শন ও জব্দের জন্য সংশ্লিষ্ট হিসাব বিবরণী বা ঋণ সংক্রান্ত সকল ডকুমেন্ট এর অনুলিপি সরবরাহের জন্য বলা হয়। প্রকৃত পক্ষে মোকদ্দমার তদন্তের স্বার্থে কোন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামীয় হিসাব সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহে ব্যাংক বা আর্থিক কোম্পানি সমূহ বাধ্য নয়। ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ সালের ৯৪ ধারায় এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য আছে-
দলিল কিংবা অন্যান্য জিনিস হাজির করিবার সমন:
১। যেইক্ষেত্রে কোন আদালত বা কোন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই কার্যবিধির অধীন কোন তদন্ত, অনুসন্ধান, বিচার বা অন্য কোন প্রসিডিং-এর জন্য কোন দলিল বা কোন জিনিস প্রয়োজনীয় বা বাঞ্ছনীয় বলিয়া বিবেচনা করেন সেইক্ষেত্রে উক্ত আদালত সমন বা অফিসারের লিখিত আদেশ কর্তৃক যে লোকের দখলে বা ক্ষমতায় উক্ত দলিল বা জিনিস রহিয়াছে বলিয়া অনুমতি হয়, তাহাকে বা আদেশে বর্ণিত সময়ে ও স্থানে হাজির হইতে এবং উহা হাজির করিতে কিংবা দাখিল করিতে নির্দেশ দিতে পারিবেন।
তবে শর্ত থাকে যে, এইরূপ কোন অফিসার Bankers’ Books Evidence Act. 1891 (XVIII of 1891) এর সংজ্ঞা অনুসারে কোন ব্যাংক বা ব্যাংকারের হেফাজতে রক্ষিত কোন দলিল বা অন্য কোন জিনিস যাহা লোকের ব্যাংকের হিসাব সম্পর্কিত কোন তথ্য প্রদান করিতে পারে তাহা নিম্নরূপ ক্ষেত্রে দাখিল করিবার কোন আদেশ দিবেন না। যথা :-
ক। দায়রা জজের লিখিত পূর্বানুমতি লইয়া দণ্ডবিধির ৪০৩/৪০৬/৪০৮ এবং ৪০৯ ধারা এবং ৪২১ ধারা হইতে ৪২৪ ধারা (উভয় অন্তর্ভুক্ত) এবং ৪৬৫ ধারা হইতে ৪৭৭-ক ধারা (উভয় অন্তর্ভুক্ত) অধীন কোন অপরাধের তদন্তের জন্য; এবং
খ। অন্যান্য ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের লিখিত পূর্বানুমতি লইয়া।
২। এই ধারার অধীন যাহাকে কেবলমাত্র কোন দলিল বা অন্য কোন জিনিস হাজির করিতে বলা হইয়াছে, তিনি উহা হাজির করিবার জন্য ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত না হইয়া উক্ত জিনিস বা দলিল দাখিল করিবার ব্যবস্থা করিলে তিনি নির্দেশ পালন করিয়াছেন বলিয়া অভিহিত হইবে।
৩। এই ধারার কোন বিধান ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১২৩ ও ১২৪ ধারাকে প্রভাবিত করিবে না কিংবা ডাক বা টেলিগ্রাফ কর্তৃপক্ষের হেফাজতে কোন পত্র পোস্টকার্ড টেলিগ্রাম ও অন্যান্য দলিল বা কোন পার্সেল বা বস্তুর প্রতি প্রযোজ্য হইবে না।    
শুধু মাত্র মানি লন্ডারিং প্রভৃতি অপরাধের ক্ষেত্রে দুদক আইনে তদন্তের বেলায় বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতের পূর্বানুমতি লাগবে না। যা বর্তমান ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী পুলিশ বা পি.বি.আই অফিসার ব্যাংকার বুক এভিডেন্স এ্যাক্ট ১৮৯১ ইংরেজী এর বিধান অনুযায়ী ব্যাংক বা কোন ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্টের সাথে যুক্ত কোন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে পারে ঐ সমস্ত বস্তু সম্পর্কে কোন অফিসার তল্লাশী করবেন না বা করাবেন না। কিন্তু দায়রা জজের লিখিত পূর্বানুমতি নিয়ে দন্ডবিধির ৪০৬, ৪২০ ইত্যাদি ধারার অধীনে অপরাধের তদন্ত করবার উদ্দেশ্যে তল্লাশী করা চলবে।
অর্থ্যাৎ কোন তদন্তকারী পি.বি.আইন বা পুলিশ কর্মকর্তা দায়রা জজের অনুমতি ব্যতিরেকে কোন মোকদ্দমা তদন্তের স্বার্থে কারো ব্যাংকার্স বুক কিংবা তৎসংলগ্ন কোন বিষয়ে পরিদর্শন বা কপি বা জব্দ করতে পারবেন না। এমতাবস্থায় মাননীয় বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি ব্যতিত ব্যাংক কোম্পানী বা ম্যানেজার বা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত লিজিং কোম্পানি সমূহ উক্ত তদন্তকারী পুলিশ বা পি.বি.আই কর্মকর্তাকে কোন তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য নহে। যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ও ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স এ্যাক্ট ২ ধারার বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন যেকোন লিজিং কোম্পানী ব্যাংকার্স ব্যবসায় নিয়োজিত একটি রেজিস্টার্ড কোম্পানি হয় এবং যাহা বাংলাদেশ ব্যাংক তার লাইসেন্স গ্রহণ ক্রমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে সেহেতু প্রতিষ্ঠানটি একটি অর্থ বিনিয়োগকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ফ্যাইন্যান্সিয়াল কোম্পানী হয় বিধায় এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ মহোদয়ের অনুমতি বা নির্দেশ ব্যতিরেকে পি.বি.আই কর্তৃক চাহিত ডকুমেন্ট সমূহ সরবরাহ করা যাবে না।
আশা রাখি প্রত্যেক তদন্ত কর্মকর্তা এ ব্যাপারে ফৌজদারি কার্যবিধি ৯৪ ধারা অধ্যয়ন পূর্বক এতদসংক্রান্ত আইনী পদ্ধতি যথাযথভাবে পরিপালন করবেন। নইলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন আমলে আসবে। বিজ্ঞ আইনজীবী বিচারক, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী সহ বিজ্ঞ বিচারক মহোদয়গণকে এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ভূমিকা রাখতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে উপযুক্ত প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন রয়েছে। আসুন আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আমরা সকলে যুগপৎভাবে কাজ করি। নচেৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায় বিদূরীত হবে না।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সু-শাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ