বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মঞ্চ নাটকে রোহিঙ্গা নারীদের ‘বিপন্ন মানবতার আর্তনাদ’

১৭ নভেম্বর, রয়টার্স : মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লোকজন। ২৫ আগস্টে রাখাইনে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর যখন বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে তখন মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরে একদল রোহিঙ্গা নারী বেছে নিয়েছেন নাটকের মঞ্চ। এই মঞ্চে তারা তুলে ধরছেন তাদের জীবনের কথা;  রাখাইনে তারা যে হয়রানি, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এই রোহিঙ্গা নারীদের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালা লামপুরে প্রায় দুই দশক ধরে লুকিয়ে বাস করছেন রোহিঙ্গা নারী সৈয়দা বাই। তার বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা বলার ও জানানোর মতো কোনও মাধ্যম ছিল না।  কাজ করার অধিকার ও স্কুলে যাওয়ার অনুমতি না থাকা ২১ বছরের ওই তরুণী শিশু অবস্থায় মানবপাচার চক্রের কবলে পড়েন। পরে মিয়ানমারের নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসেন মালয়েশিয়া। দীর্ঘদিন কেটেছে তার কোনও কিছু না করেই। তার ভাষায় দিন কেটেছে ‘খেয়ে ও ঘুমিয়ে’।  কিন্তু এখন তিনি নিজেদের জীবন সংগ্রামের কথা বলার মতো একটি পাটাতন পেয়েছেন।

সৈয়দা বাইসহ কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী একত্রিত হয়ে গঠন করেছেন ‘রোহিঙ্গা উইমেন থিয়েটার’। এখানে কাজের ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা রয়েছে, কাজ করতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছেন সাত্বনা।

বৃষ্টিস্নাত বিকেলে কমিউনিটি হলের সামনে প্রায় ১০০ জন দর্শকের সামনে শরণার্থী নারীরা পারফর্মেন্স করছিলেন। বিষয়বস্তু হিসেবে ছিল তাদের জীবনে  ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যা। যেমন- পুলিশের নির্যাতন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অভাব, বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং পারিবারিক সহিংসতা। কোনও এক দৃশ্যে  বাই একজন হতাশ স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। যেখানে তিনি তার স্বামীকে আটকের পর সামরিক কর্মকর্তারা মুক্তিপণ দাবি করছিলেন। এ দৃশ্যটি মূলত কয়েক বছর আগে তার স্বামীকে গ্রেফতার করার এক প্রেক্ষাপট থেকে নেওয়া হয়েছিল।

৩৫ বছর বয়সী বিধবা নুর জাহান অনুষ্ঠানের একজন দর্শক ছিলেন। তিনি চার বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে মালয়েশিয়া আসেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নাটকটির একটি দৃশ্যের সঙ্গে নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনার সাদৃশ্য পেয়েছেন। তিনি যে দৃশ্যের কথা বলছিলেন তা ছিল, একটি পারিবারিক সহিংসতা দেখানো হয়েছে।  জীবনে  শিকার হওয়া নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ক্লান্ত অবস্থায় কাজ থেকে ফিরে তার স্বামী তাকে অনেক শারীরিক নির্যাতন করতেন। এই দৃশ্য মঞ্চে উপস্থাপিত হতে দেখে আমি শিখেছি পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নীরব থাকা যাবে না।’

কুয়ালা লামপুরের উপকণ্ঠে প্রথমবার নাটক মঞ্চায়নের পর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন সৈয়দা। বলেন,   ‘আমি খুবই আনন্দিত। এই প্রথম কোথাও জীবনে ঘটে যাওয়া কাহিনীগুলো আমরা বলতে পারছি। এসব ঘটনা কেবল নাটকের দৃশ্য নয়,  এগুলো আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা। আমরা চাই তা সবাইকে জানাতে।’

মালেয়শিয়ায় এই প্রথমবারের মতো এমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। দেশটিতে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম আশ্রয় নিয়েছে। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত এসব মানুষ মিয়ানমারে নাগরিকত্ব হারানো রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হামলা শুরু হলে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য চলে আসে। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গারা পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাড়ি জমাতে পেরেছেন।

দীর্ঘদিন লুকিয়ে থাকার পর অবশেষে সৈয়দা বাইরা একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন বলে মনে করছেন। এখানে দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকালীন প্রক্রিয়ায় কয়েক দশক বসবাস করতে পারবেন বলে আশা করছেন সৈয়দা। রোহিঙ্গা উইমেন থিয়েটার এই সমস্যার সমাধান আনবে বলে তিনি মনে করেন।

  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে একজন ও রোহিঙ্গা উইমেন ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক সাপোর্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শরিফ শাকিরাহ বলেন, নাটকটির জন্য কোনও চিত্রনাট্য ছিল না।  দৃশ্যগুলো কেমন হবে তা উপস্থাপনের ঠিক আগ মুহূর্তেই নারীরা নিজেরাই  সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। আমাদের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে, নারীকে পুরুষের মতো সমান অধিকার দেওয়া হয় না। আমাদের মধ্যে একটা সংস্কৃতিগত বিশ্বাস আছে যে, নারীদের ঘরেই থাকা উচিত। কিন্তু এই থিয়েটারে তারা দেখছে নারীরাও কিছু করতে জানে।

শরণার্থীদের আতঙ্ক কাটিয়ে ও আত্মবিশ্বাস তৈরির কাজে সহযোগিতার জন্য শিল্প একটি সৃজনশীল উপায় বলে মনে করেন নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক অলাভজনক বন্ড স্ট্রিট থিয়েটারের পরিচালক জোয়ানা শারম্যান। তিনি রোহিঙ্গা নারীদের প্রশিক্ষণ এবং থিয়েটার গঠনে কাজ করেছেন। এই গ্রুপটি ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বোসিয়ান যুদ্ধের সহিংসতার শিকার এমন উদ্বাস্তুদের নিয়ে ৪০টি দেশে কাজ করেছে।

এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন শারম্যান, ‘থিয়েটাটি কেবল অভিনয় করার জন্য নয়। এখানে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিও জড়িত। এখন তারা (রোহিঙ্গা নারী) জানে সবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে এবং  প্রভাব ফেলতে। এটিই হচ্ছে শক্তি এবং তারা কখনও এই শক্তি হারাবে না। যখন আপনি মানুষকে ক্ষমতায়ন করেন, তখন আপনি তাদের জীবনের অন্যান্য দিকগুলিকেও ক্ষমতায়ন করেন।’

এছাড়া রোহিঙ্গা উইমেন থিয়েটার বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছে। প্রচারাভিযানের মাধ্যমে উদ্বাস্তুরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে সেগুলোর সমাধান ও আলোচনা,  গ্রেফতার হলে করণীয় নিয়েও কাজ করছে।

মালয়েশিয়ার চ্যারিটি অ্যাসাইলাম অ্যাক্সেস সংস্থার কর্মকর্তা নাজিম বশির জানান, পাওয়ার পয়েন্ট দিয়ে বিভিন্ন বক্তব্যগুলো হয় খটমটে, মানুষ তাতে তেমন মনোযোগ দেয় না। ফলে শিক্ষাহীন রোহিঙ্গাদের জন্য থিয়েটার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সহজ মাধ্যম হতে পারে।

শাকিরাহ জানান, এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা উইমেন থিয়েটার অল্প কয়েকজন শিল্পীদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিক ভিত্তিতে চলছে। আর পারফর্ম করেছে ছোটোখাটো। অসুস্থতা ও পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে অনেক নারীই নিয়মিত আসতে পারেন না। এরপরও তিনি স্বপ্ন দেখেন, এই থিয়েটারে অংশ নিতে আরও রোহিঙ্গা নারী এগিয়ে আসবেন এবং তা বড় আকারে ব্যাপ্তি লাভ করবে। তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি মনে করেন রোহিঙ্গাদের কোন কিছু করে দেখানোর মনোবল নেই। তারা সব সময় অর্থ ও খাদ্য চায়। কিন্তু আমরা সবাইকে জানাতে চাই যে, আমরাও কাজ করতে পারি। আমরা দেখাতে চাই যে, আমাদেরও মেধা রয়েছে। আমরাও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারি। .

‘আমরা যখন মঞ্চে পারফর্ম করি, তখন মনে হয় সমাজে অন্যদের মতো আমাদেরও সুখী হওয়ার অধিকার রয়েছে’- জানালেন এই নারী সংগঠক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ