বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

প্রধান বিচারপতির দেশ ছাড়া  ও অসুস্থতা নিয়ে নানা প্রশ্ন

 

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা দেশ ছেড়েছেন ঠিকই তবে অনেক প্রশ্ন রেখে গেছেন তার প্রস্থানে। তার ছুটি নেয়াকে কেন্দ্র করে আইনমন্ত্রী-এটর্নি জেনারেলের নানা বক্তব্য এবং সুস্থতার বিষয়ে খোদ প্রধান বিচারপতির বক্তব্য ‘আমি সুস্থ আছি’ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। দেশ ছাড়ার আগে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য তুমুল আলোচিত সারা দেশে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে নানা রকমের আলোচনা সমালোচনা। 

ঢাকা ছাড়ার সময় হেয়ার রোডের বাসভবনের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের শুক্রবার রাত ১০টার দিকে একটি লিখিত বক্তব্য দিয়ে যান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। তার ওই লিখিত বক্তব্যটি সংক্ষিপ্ত হলেও তাতে বর্তমান পরিস্থিতির অনেক কিছুই উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে অনেক প্রশ্নই সামনে এসেছে।

গত ২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতিকে দেয়া প্রধান বিচারপতির ছুটির চিঠিতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থতার বিষয় বলা হয়েছে। আইনমন্ত্রীও ঘটা করে সাংবাদিক সম্মেলনে অসুস্থার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সরকারের এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও বলেছেন অসুস্থার কথা। অথচ শুক্রবার দেশ ছাড়ার আগে বিচারপতি এস কে সিনহা বলে গেলেন, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি’। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আমি ফিরে আসবো। 

প্রশ্ন উঠেছে ১৫ দিনের জাপান-কানাডা সফর শেষে দায়িত্ব গ্রহণের পর কেন আবার ছুটি নিতে হলো? ঠিক সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষে আদালত খোলার আগেরদিন? আদালত খুললে আইনজীবীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এ জন্য সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতাদের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। এখন তিনি বলে গেলেন, তিনি স্বেচ্ছায় বিদেশ সফরে যাচ্ছেন, ছুটি শেষে দেশে ফিরবেন। তিনি অসুস্থ নন, অথচ স্বল্প দিনের ব্যবধানে কেনো ফের দীর্ঘ সফরে কেনো বিদেশ গেলেন? এমন প্রশ্ন এখন সর্বমহলে।

সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন ছুটি নেয়ার দিন ২ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির ছুটির বিষয়ে জানতে তার বাসভবনে ছুটে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আদালতের দ্বারস্থ হন এবং প্রধান বিচারপতির অসুস্থতা নিশ্চিত হতে দুইবার তার বাসভবনের দিকে যেতে রওনা হলেও পুলিশের বাধায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। অথচ আইনজীবী নেতাদের বাধা দেয়া হলেও এর মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার, বেঞ্চ রিডার, চিকিৎচক দেখা করেছেন। প্রশ্ন হলো সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতাদের দেখা করতে দেয়া হলো না কেন?

প্রধান বিচারপতি তার লিখিত বক্তব্যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বক্তব্যে নিজে বিব্রত বলে উল্লেখ করেছেন। কেন ও কি কারণে বিব্রত সেটা বলে যাননি।

দেশ ছাড়ার আগে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দেয়া লিখিত বক্তব্য এখন বিপুল আলোচনায়। সে চিঠিতে প্রধান বিচারপতি লিখেছেন-আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। কিন্তু ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী, বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারের একটি মহল রায়কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে পরিবেশন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন। যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সেই সাথে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শংকিতও বটে। কারণ গত (বৃহস্পতিবার) প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্ধৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধুমাত্র রুটিনমাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরো অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। 

প্রধান বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতারা আহ্বান জানিয়েছিলেন দেশ না ছাড়তে। তারা বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আছে। তারা বলেছেন, চাপের কাছে মাথা নত না করে দেশে অবস্থান করতে। এই আহ্বান সত্ত্বেও গত শুক্রবার রাত ৯টা ৫৭ মিনিটে বাসা থেকে বের হন প্রধান বিচারপতি। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সুষমা সিনহা। আধা ঘণ্টা পর রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তারা বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে রওনা হন। গতকাল শনিবার দেশটির স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে ব্রিসবেনে পৌঁছান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ