বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

চলে গেলেন সাইয়্যিদ ফখরুল

আবদুল হাই ইদ্রিছী : সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর জন্ম-মৃত্যুর মাঝেই মানুষের জীবন। পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কত রকমের স্বপ্ন দেখে থাকে। কারো স্বপ্ন পূরণ হয়, আবার কারো স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। তাকে চলে যেতে হয় আপন ঠিকানায়। রেখে যায় স্মৃতি। কিছু কথা। আপনজনেরা সেই স্মৃতি কথা নিয়ে বেঁচে থাকে। এছাড়া যে আর কোন উপায়ই নেই। এটাই তো জীবন। জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিনতির নাম মৃত্যু। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হলেও কিছু কিছু মৃত্যু মানুষের হৃদয়কে বার বার দোলা দিয়ে যায়। তাদেরই একজন হচ্ছেন বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী কবি ও গবেষক সাইয়িদ ফখরুল।
কবি সাইয়িদ ফখরুল  স্বপ্ন দেখতেন দেশ ও জাতিকে নিয়ে। স্বপ্ন সাজাতেন দুখি মানুষকে নিয়ে। তিনি লিখেছেন অভিষ্ট জনগোষ্ঠির তথা মানুষের জন্য। দেশের জন্য। আগ্রাসনের বিরুদ্ধাচরণের জন্য। সর্বোপরি ঐতিহ্য চেতনার জন্য পরিকল্পনামাফিক পরিমিত পরিমাপে সুন্দর সুন্দর কবিতার শীতল ছায়াঘেরা ফলজ বৃক্ষে ঘেরা ও ফুলপাখি ভরা মনের মত বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কিন্তু তাঁর কাজগুলো শুরু করেই চলে গেলেন ওপারে।
সাইয়িদ ফখরুল ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ১২ নভেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের (বর্তমান পৌরসভার) কুশালপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সৈয়দ আব্দুল হক ও মাতা সৈয়দা জিন্নাতুন নেছা। ছয় ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। গ্রামের পাঠশালা থেকেই তার পড়া-লেখা শুরু। এরপর ১৯৭৮ সালে কমলগঞ্জ বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন।
কবি সাইয়্যিদ ফখরুল ৮০ দশক থেকে লেখালেখি শুরু করেন। নিয়মিত লিখেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। কবিতার পাশাপাশি গবেষণামূলক প্রবন্ধও লিখতেন তিনি। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবেও রয়েছে তাঁর বেশ কৃতিত্ব। সাপ্তাহিক কমলগঞ্জ সংবাদ পত্রিকায় পত্রিকায় তিনি ”চলার পথে দেখা’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী ধারাবাহিক লেখার মাধ্যমে খুবই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
কবি ১৯৯১ সালে কমলগঞ্জের গোপালনগর গ্রামের খুরশেদ উদ্দিন চৌধুরীর কন্যা শাহনাজ ইসলাম চৌধুরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে তিনি পাঁচ কন্যা সন্তানের জনক।
কবি সাইয়্যিদ ফখরুল ছিলেন একজন সৃজনশীল হৃদয়ের কবি। তাঁর মননশীল চেতনায় ছিল সমকালীন সমাজ, প্রকৃতি, জীবনাচরণ ও মূল্যবোধ জাগ্রত। বিপন্ন মনুষ্যত্ব তাঁর মনোজগতে তীব্র আঘাত হানতো। অধিকার বঞ্চিত সমাজে নিপীড়িত, নিগৃহীত মানুষের করুণ অবস্থা দেখে তাঁর হৃদয়ে কম্পন জাগতো। তিনি লিখেন-
ঠিক যখন এ শূন্য পান্ডুর রাত তিনটা বেজে উঠে
তখনি নিদ্রা ভেঙে আমার দৃষ্টিপাত হয়, যেন-
এই হৃদয় মধ্যে হয়ে গ্যাছে এক উত্তাল সমুদ্র, আর-
সেখানে তরল জলের পরিবর্তে জ্বলছে কাল আগুন।
                                                    (জিজ্ঞাসা)

কবি হৃদয়ে যেমন অধিকার বঞ্চিত মানুষের করুণ অবস্থা দেখে তাঁর কম্পন উঠেছে তেমনি ষড়ঋতুর বাংলাদেশের রূপলাবণ্যে, সবুজের সমারোহে, নদীর কুলুতানে, ঝিরিঝিরি দক্ষিণা হাওয়ায়, বর্ণিল আকাশের নীলিমায়, সবুজ ঘাসের গালিচার বাহ্যিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছেন। কবি কমলগঞ্জের বুক দিয়ে প্রবাহিত ধলাই নদীর কল কল শব্দ শুনে লিখেছেন-
এভাবেই ধলাইয়ের স্বচ্ছ জল
যদি আমাকে তার নীরব কল্ কল্ শব্দ শুনিয়ে যায়
যদি শব্দ আসে- রঙিন স্বপ্ন মাঝে
ঘুমিয়ে থাকা কোটি প্রাণের শ্বাস-প্রশ্বাসের কালে। আর
আমি কেবলি চেয়ে থাকি-
প্রকৃতির অগাধ নীলিমার হু হু. . . . . .
                                                (আধাঁর রাতে)
সাইয়্যিদ ফখরুল কবি হলেও মননশীল গদ্যচর্চায় তার হাত ছিল বেশ শক্ত। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তার অনেক শক্তিশালী প্রবন্ধ-নিবন্ধ। প্রকাশিত হযেছে তার দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ ”তিন উদ্দিনের ত্রিভূজ” ও লাথি থাবা কিল”। এছাড়াও তিনি ”কমলগঞ্জ পরিচিতি” গ্রন্থেরও অন্যতম লেখক। তার ”লাথি থাবা কিল” গ্রন্থের মূল্যায়ন করতে গিয়ে একুশে পদকপ্রাপ্ত গণমানুষের কবি দিলওয়ার লিখেন-  ”ভাইটি আমার লিখেছেন জনারণ্যের তিনটি ক্ষুদ্র শব্দ দিয়ে। পাঠকরা সেই তিনটি ফুলের স্পর্শসুখ পাবেন এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলোর মধ্যে”।
কবি সাইয়্যিদ ফখরুল সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, স্মারক ও সাহিত্য সাময়িকী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: পদাদিক, কমলগঞ্জে লিওয়ার, শিখর, লাল কালির তূর্য নায়ক, বেদনার্ত অনুভ’তি ইত্যাদি। সংগঠক হিসাবেও তাঁর রয়েছে সুনাম। বেশ কয়েকটি সাহিত্য, সংস্কৃতিক ও সামাজসেবামূলক সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, নির্বাহী সদস্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসাবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাইয়্যিদ ফখরুল ছিলেন সমাজসচেতন একজন বিদগ্ধ কবি। তাঁর কবি সত্বার মহোত্তম বিকাশ চমৎকারভাবে পরিলক্ষিত হয় আধুনিকতার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সর্বোপরি মানবিক বিপর্যয়ে তার সরব কাব্যিক উপস্থিতিতে। কমলগঞ্জের এই শেকড়সন্ধানী কৃতিসন্তান গত ২৮ আগস্ট ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ সোমবার দিনগত রাত ১২.৩০টায় তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো রেখে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তিনি আর কখনো ফিরবেন না। তবে তিনি তাঁর কর্মে মানুষের প্রাণে প্রাণে থাকবেন- এ বিশ্বাস আমাদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ