মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নদী এবং নারী

তমসুর হোসেন : সংসারটাকে গুছিয়ে গোছাতে পারে না আকতারা বেগম। কোথায় যেন একটা ত্রুটি থেকে যায়। তা সে ধরেও ধরতে পারে না। একটানা কাজ করেও মনে হয় কাজ শেষ হলো না। একটা চোরা অসম্পূর্ণতা সবখানে লেগে থাকে। সারাদিন খেটে ঘরটা একভাবে সাজানো হলো। পরক্ষণেই মনে হয় অন্যভাবে সাজানো যেত। খাটের পাশে টেবিল অথবা সোফার পাশে আলনা কোনটা যে বেশী মানানসই এই জন্যেই তার অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। ঘর সাজানোর কাজে বাধ সাধে একটা ভারী আলমিরা এবং কাঠের ওয়ার্ডরোব। ও দুটোকে সরানো প্রায়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেজন্য ও দুটোকে যথাস্থানে রেখে বাকিগুলো নড়াচড়া করতে হয়। স্বামী অফিসে গেলে বুয়াকে নিয়ে এসব কাজে মেতে ওঠে সে। নিজের কাছেই অপছন্দ হয় তার দ্রব্যবিন্যাস। এসব ব্যাপারে সে কারো মাথা গলানো পছন্দ করে না। এটা তার বাতিক। একট সূক্ষ্ম গোলমাল যে তার মাথায় আছে এটা তার কাজেই ধরা পড়ে। অফিস থেকে ফিরে এসব দেখে স্বামী প্রায়ই ভালো মন্তব্য করে না। তখন মেজাজটা বিগড়ে যায় আকতারা বেগমের। এতগুলো কাজ বিনা অর্থব্যয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কোথায় তার ভূয়শী প্রশংসা করা হবে, তা না করে স্বামী বলে বসে, ‘বসে থেকে বুঝি ভাত হজম হয় না । একি ঘরদোরের অবস্থা’। তখন তার মনের অবস্থা যে কি হয় তা কাউকে বোঝানো যাবে না। সংসারের প্রতি একটা দারুণ অনাগ্রহ জন্ম নেয় তার মনে। স্নায়ুকোষগুলো খুবই অবসন্ন হয়ে পড়ে। খুব ঘুম পায় তখন তার মনে। হাত পা ছেড়ে লম্বা ঘুম দিলে সকল বিষণ্ণতার অবসান ঘটে। এ শান্তির ঘুমকেও এখন কেড়ে নিল বাচ্চারা। ওরা বড় হবার পর হলো আরেক সমস্যা। বাচ্চারা ছোট থাকলে মায়েদের এত উদ্বিগ্নতা থাকে না। তিনটে সন্তান নিয়ে তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
বড় মেয়ে লতা নবম শ্রেণীতে পড়ে। তার ছোট সজল। সে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। ছোট বাচ্চার নাম নাইমা। সে নার্সারীতে ভর্তি হলো এবার। এদেরকে নিয়ে দারুণ ব্যস্ততায় তার দিন চলে যায়। সকাল সাতটায় কেজি স্কুল থেকে ভ্যান আসে নাইমাকে নিতে। তাকে সাজিয়ে দিতে দিতে আটটায় লতার কোচিং- এ যাবার সময় হয়ে যায়। সেখান থেকে সোজা সে স্কুলে যায়। টিফিন পিরিয়ডে প্রায়ই একজন না একজন বান্ধবীকে সাথে নিয়ে আসে। সময়মত খাবার না পেলে না খেয়েই চলে যায় মেয়েটা। সকলের স্কুল ছুটি হয় দুপুরে। ওকে আবার নিয়ে আসার জন্য বুয়াকে পাঠাতে হয়। আর বুয়াতো একবার বাইরে যেতে পারলেই হলো। কোন না কোন অজুহাতে তিনটের আগে সে ফিরবে না।
মেয়েটা যে কার মতো হলো। এত কম বয়সে মেজাজী হয়েছে। কথাও বলে কম। অন্য মেয়েরা মায়ের সাথে কত কথা বলে। স্বাদ আহলাদ করে। দাবী করে। এ মেয়েটা তার থেকে আলাদা। একা ঘরে বসে নিরিবিলি পড়াশুনা করে। চুপ করে ঘুমায়। একা একা বসে খায়। মায়ের প্রয়োজন কমই অনুভব করে সে। আকতারা বেগম অসুস্থ হলে লতা পাশে এসে দাঁড়ায় না। মেয়ে যদি মায়ের দরদ না বোঝে তবে তাকে মানুষ করে লাভ কি। হতাশ হয়ে পড়ে আকতারা বেগম। মাঝে মাঝে সে মেয়ের সাথে রাগারাগি করে। মারধর করে। একা একা কাঁদে। কোন লাভ হয় না। হৃদয়বৃত্তির কোন লক্ষণ মেয়ের মধ্যে প্রকাশ হয় না। এজন্য সে দায়ী করে তার বাবাকে। বাবা যেমন মেয়ের সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না, তেমন মেয়েও হয়েছে বাবার মতো। মেয়েটা কোনদিন তার বাবার সামনে দাঁড়ায় না। নিজমুখে কোনকিছু চায় না। বাবা যদি মেয়েটাকে ছোটবেলা থেকে কাছাকাছি রাখতো তাহলে কি এমন হতো। বাবাকে নকল করে মেয়েটা এমন বেয়াড়া হয়ে গেল। এর দেখা দেখি ছোট দুটোও এমন হবে।
আকতারা বেগম সব দোষ তার স্বামীর ঘাড়ে চাপাতেই তৃপ্তি পায়। আবার কোন কোন দিন একান্তভাবে মেয়েকে কাছে টেনে নেয় সে। মাথায় বেশী করে তেল মেখে বিনি কেটে দেয়। খুচিয়ে খুচিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কথা জেনে নেয়। শারীরিক অসুবিধার খোঁজ নেয়। ওভাবে নিশ্চুপ ঘুমানোর কারণ যে দুর্বলতা সে বিষয়ে সে নিশ্চিত হয়। তারপর এক সময় সে একখানা লম্বা ফর্দ স্বামীর সামনে পেশ করে। চোখে মুখে নতুন কিছু একটা আবিষ্কারের আনন্দ। যা অন্য কারো পক্ষে উদঘাটন করা কোনকালে সম্ভব হবে না। স্বামী একটু অনীহা দেখালে মারাত্মক একখানা কান্ড হয়ে যায়। মেয়ের পক্ষ নিয়ে সে তখন আপোষহীন যুদ্ধে নেমে পড়ে। তার কন্ঠ হতে অপরিচিত ধরনের শব্দ উচ্চারিত হয়। যা শুনে স্বামী বিস্ময় প্রকাশ করে। ‘একি বলছ তুমি। এখন বললে এখনই ছুটতে হবে আমাকে বাজারে। সময় অসময় বলতে কিছু নেই।’ স্বামীর নিস্পৃহ ভাব দেখে পায়ের রক্ত মাথায় ওঠে আকতারা বেগমের। গলা কেঁপে ওঠে। কি বলবে ভাষা খুঁজে পায় না। গলা চড়িয়ে বলে, ‘তোমার সময় তো কোনদিনই হয় না। আমাদের বেলায় সময় সুযোগের প্রশ্ন। আসলে কথা হলো কি- আকতারা বেগমের কথার রেশ ধরে স্বামী বলে, আসলে কি কথা। মনে হয় আমি টাকা পয়সা অন্যের সংসারে ঢালছি। কোথায় বাড়িতে এসে একটু শান্তি পাবো। তার বদলে অশান্তির আগুনে পুড়তে হচ্ছে।’
স্বামীর কথায় সে দিকভ্রান্ত হয়। বাচ্চা কি তার একার। বাচ্চার প্রয়োজনের কথা বলতে এসে এমন গা জ্বালানো কথা শুনছে সে। তখন সে বেপরোয়া হয়ে বলে, ‘এখানে তো অশান্তির আগুন, সেখানে বুঝি শান্তির স্বর্গ। তবে আর এখানে কেন সেখানে গিয়ে থাকলেই তো পারো।’ রাগের মাথায় এমন খোঁচা প্রায়ই সে স্বামীকে দিয়ে থাকে।
বিবাহের আগে স্বামীর সাথে সামান্য মন দেয়া নেয়া ছিল আকতারা বেগমের। বিগত দিনের পাগলামী এখনো সে স্বামীর কাছ থেকে কামনা করে। এক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন বিলাস তার মনকে অগোছালো করে। নিছক জাগতিক প্রেমের জন্য মানুষ তো কম ইতিহাস জন্ম দেয়নি। তারও জীবনের তো ছোট্ট একখানা ইতিহাস আছে। একটি অলিখিত মোহময় প্রাণবন্ত ইতিহাস। দুটি প্রাণের আকুলতার প্রাণোচ্ছল কাহিনী মিশে আছে এ সংসারের সর্বত্র। আকতারা বেগম সে প্রেমের প্রতিদান দাবী করে। সংসারের প্রতিটি কাজে সে তার প্রেমবতী মনের প্রতিফলন ঘটাতে চায়। কিন্তু স্বামীর নিকট থেকে সে প্রায়ই ভালো আচরণ পায় না। এর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন একথা ভেবে আশ্বস্ত হয় যে তার স্বামী হয়তো এখন অন্য কাউকে মন প্রাণ ঢেলে ভালোবাসে। আকতারা বেগম তার সে কল্পিত শত্রুকে হিংসার চাকু দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে। স্বামীর ভাবভংগি আচরণের মধ্যেও তার অস্তিত্ব অনুধাবন করে আকতারা বেগম। স্বামীর ঠান্ডা এবং নিরুত্তাপ ব্যবহারে তার মন সন্দেহের পুকুরে হাবুডুবু খায়। তখন তার সংসার স্বামী সন্তান কোনটাই ভালো লাগে না। তখন মনে হয় কোন অরণ্য কিংবা জনহীন ধু ধু প্রান্তরে বাস করাই তার সমীচীন হবে। বিশাল এ বিশ্ব সংসারে সামান্য ধুলিকণার মতো ঘূর্ণিবাতাসে তার ভেসে বেড়াতে ইচ্ছে করে। সেই দিনগুলোর কথা কেন যে ভুলতে পারে না আকতারা বেগম। তাদেরই বাড়িতে লজিং থাকতে এসেছিল তার স্বামী। তখন সে দশম শ্রেণীর ছাত্রী। পড়াশুনা  এবং সংগীতচর্চায় সে এত ব্যস্ত থাকতো যে অন্যদিকে নজর দেয়ার ফুরসত থাকতো না। কিন্তু এই লোকটাকে প্রথম দেখাতেই তার মনে এক প্রবল ঝাঁকানি হয়েছিল। এই নিরীহ লোকটার মধ্যে ভালোলাগার কি একটা বিষয় খুঁজে পেয়েছিল সে। তার শান্ত চোখের নীরব ভাষা আকতারা বেগমের অন্তরকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। কেন তার ভাষায় এত মধুরতা। কেন তার চোখে এত আকর্ষণ যতই একথা সে ভেবেছে ততই তার মন বাঁধনহারা হয়েছে। শিকড় ছেঁড়া গাছের মতো সে তার দিকে ঢলে পড়ার অপেক্ষায় ছিল। লজিং মাস্টারের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। অভাবের মধ্যেও সে ছিল নিশঙ্ক ভাবনাহীন।
সে মাস্টারই একদিন তাকে ডেকে নিয়ে বলে, ‘তোমার কাছে টাকা হবে। বেশী না মাত্র একশত টাকা হলেই হবে।’ মানুষ এমনও হয়। বিনয়ের সহজ সুষমায় এমন করে বাঁধতে পারে। একশত টাকা কেন। তার সত্তার মধ্যে জাগ্রত যে কুসুমিত প্রেম নিজের অজান্তে সে তা দান করে বসে। গৃহশিক্ষকের প্রেমের স্রোতে সে হারিয়ে যায়।
বাবা মা যখন এসব ঘটনা জানতে পারে তখন আর করার কিছুই ছিল না। এই অর্বাচীন মেয়েটির প্রাণের সহজ দাবী প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারলো না। ভুল যে তাদেরই হয়েছিল। একজন যুবককে কেন তারা বাড়িতে স্থান দিতে গিয়েছিল। মাস্টারকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে সে তা সহজে গ্রহণ করেছিল।
বিবাহিত জীবনের শুরুতে খুবই অনটন ছিল তাদের। কিন্তু হৃদ্যতার কোন ঘাটতি ছিল না। দারিদ্রের সমস্ত উত্তাপকে অম্লান করে দিয়ে শীতল ছায়ার মতো নিবিড় হয়েছিল তাদের প্রেম। কিন্তু এখন অবস্থা হয়েছে ভিন্ন। সচ্ছলতা এসেছে সংসারে। কিন্তু সব আয়োজনের মধ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আরাধ্য সে ভালোবাসা। আকতারা বেগম মাঝে মাঝে নির্জনে বসে কাঁদে। মনের আকাশে জমাট বাঁধা অন্ধকার মগ্ন দুঃখের ক্ষেত্র রচনা করে। হায় পরম দুঃখের শান্তি। সর্বত্রগামী মন গভীর বেদনার মধ্য থেকেও সান্তনা খুঁজে পায়।
কৃষিবিদ স্বামী গাছপালা নিয়ে গবেষণায় মগ্ন থাকে। গাছের বংশবিস্তার, মাটি জল আবহাওয়ার সাথে তার সুনিবিড় সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারে তার মনোনিবেশ উল্লেখ করার মতো। গাছের বালাই রোধে কীটনাশকের ব্যবহার, পরিবেশের উপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে তিনি অনেক তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বৃক্ষপ্রেম তাকে প্রকৃতিপ্রেমী করে তুলেছে। কবিতা এবং গল্প তিনি ভালো লেখেন। উপন্যাস রচনায়ও তিনি নিয়মিত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। আকতারা বেগম স্বামীর এসব রচনা আড়ালে খুঁটে খুঁটে পড়ে। নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখে। না কোথাও এতটুকু মিল নেই। তাদের ভালোবাসার কাহিনীকে নিয়ে গল্প উপন্যাস না লিখে অন্য কারো ঘটনাকে তুলে ধরা হয়। আকতারা বেগম ব্যথিত হয়। স্বামীর লেখনীতে কেন তাদের জীবনের প্রতিফলন নেই। কেন তার রূপের বাস্তব বর্ণনা নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজকে খুঁটে খুঁটে দেখে সে। দেখতে কেমন সে। শ্যামলা, স্বাস্থ্যবতী  না কালোর সাথে হালকা ফর্সার বর্ণিল কুয়াশার মোহজালে বন্দী বিনিদ্র জোসনার বালিয়াড়ি। তাকে কেউ নিরেট ফর্সা বলবে কিনা। তার ছোটবোন তন্বী বলেছিল, আপা এখন ফর্সা হয়েছে। ফর্সা যে সে নয় একথা ঠিক। কিন্তু বয়স বাড়াতে দৈহিক গড়ন ভালো হয়েছে তার। স্বামী তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকতে চায় না কেন। সেকি তার কাব্য মানসী হতে পারে না। এটাই বড় ব্যর্থতা আকতারা বেগমের। স্বামীর চেতনার দিগন্তে শুভ্র কান্তি জোছনার আভা ছড়ানোর গৌরব তার হয়নি। তার কবিতার সূক্ষ্ম অনুভূতির রাজ্যে সুহাসিনী নন্দিতার স্থান লাভ করতে সে ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্য মাঝে মাঝে সে স্বামীর কোন লেখা পড়ে না। নিজের ব্যর্থতার পাঁচালি পড়ে টেনশন বৃদ্ধি করা কোন মানে হয় না।

আবার কখনো একা একা গল্পগুলো পড়েও আকতারা বেগম। কী যেন একটা যাদুকরী আকর্ষণ আছে লেখাগুলোতে। নতুন লেখা একটা উপন্যাসের উপর নজর পড়লো তার। সীমা নামের এক যুবতীকে নিয়ে লেখা উপন্যাসটি। সবুজ ছায়াঢাকা গ্রাম। শহর দিকে সোজা পশ্চিমে ইট বসানো রাস্তা। এই রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলে একটা বাজার। বাজার থেকে একটু উত্তরে হেলে রাস্তা চলে গেছে কৃষ্ণানন্দ নামে একটি গ্রামে। সেই গ্রামের সুন্দরী মেয়ে সীমা। বনজ আসমানী রঙ শাড়ি পরে সে যায় বানীদহ নদীতে নাইতে। এক যুবক এই সীমার মায়াজালে আটকা পড়ে। কৃষ্ণানন্দ গ্রামটি কেন জানি চেনা চেনা লাগে আকতারা বেগমের কাছে। বানীদহ নদীর তীরে দু’টি ব্যাকুল প্রাণের মধুর কাহিনী আকতারা বেগমের মনকে চঞ্চল করে। বাস্তবতার গন্ধ পায় সে এ কাহিনীতে। কল্পনায় এত সুন্দর করে কেউ হৃদয়ের কথা বলতে পারে না।
একদিন রিকশা নিয়ে আকতারা বেগম কৃষ্ণানন্দ গ্রামে যায়। গল্পের বর্ণনার সাথে মিলে যায় সবকিছু। সীমা নামের মেয়েটিকেও খুঁজে পায় সে। সীমা এক উদ্ভিন্ন যুবতী। দেহে তার কাব্যিক সুষমা। কন্ঠে যার বীণার আলাপ। আকতারা বেগম তার রূপ দু’চোখ ভরে উপভোগ করে। তার চলা, বলা এবং নিরবতার মধ্যেও এক বিরল সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে।
সীমাকে নিয়ে বানীদহ নদীর ধারে বেড়াতে যায় আকতারা বেগম। ধীরগতি নদী। কালচে নীল জলে তার উপচানো বুক। বিকেলের হালকা রোদ তার ঢেউয়ে খেলা করছে। আকতারা বেগম এক অকল্প ভাবলোকে পৌঁছে যায়। মেঘমুক্ত বৈকালিক দিগন্তের মৌনতা দেখতে পায় সে সীমার নির্মল অবয়বের মধ্যে। মিহি রোদের সাথে তার যেন নিরব সখ্য। এই শান্ত পরিবেশে অনেক আলাপ হয় দু’জনে। খুব ভালো মেয়ে সীমা। তার চেহারায় কোথাও মালিন্য নেই। রূপের একটা অহংকার থাকে। কিন্তু সীমা যেন নিরব শান্ত বহমান নদী। সীমাকে আচমকা প্রশ্ন করে আকতারা বেগম।
    তুমি জামান সাহেবকে চেন?
    কোন জামান সাহেব।
    লেখক
    হ্যাঁ, চিনি।
    তিনি কি প্রায়ই এখানে আসেন।
    মাঝে মাঝে।
    এই নদীটা তার খুব পছন্দ তাই না?
    কি করে জানলেন?
 তার লেখায় এই নদীটির কথা আছে।

মেয়েটি খুবই সরল। তার সর্বাংগের সহজ কান্তি তাকে এক অপূর্ব মাত্রা দান করেছে। আকতারা বেগম সীমার কাছে পরিচয় গোপন রাখে। সীমা এই অপরিচিতা রমণীর সাহচর্যে অস্বস্তি বোধ করে। জামান সাহেবের প্রসংগ এসে যাওয়ায় সে সন্দেহ করে ইনি তার ঘনিষ্ঠ কেউ হবেন। সে জামান সাহেবকে ভালোবাসে কিনা তা জোর দিয়ে বলতে পারবে না। তাকে নিয়ে লেখা জামান সাহেবের গল্প সে পড়েছে। পল্লীর এক যুবতীকে তিনি স্থাপন করেছেন অনন্য এক মর্যাদার আসনে। বানীদহ নদীর তীরে নৈশ তমসার দেয়াল ভেংগে রাতের শয়নে সে তার বাঁশী শুনেছে। লেখনীর প্রবাহে স্থানচ্যুত হয়ে সীমা ভেসে গেছে দূর মোহনায়। যেখানে বানীদহ নদী মিশেছে ঢেউ উচ্ছল সাগরে। সেখানে সীমা হারিয়ে গেছে বিশাল এক হৃদয়ের বালুচরে।
কিন্তু মহিলাটি কে? হঠাৎ বিকেলে রিকশা নিয়ে শহর থেকে সরাসরি তার কাছে আসারই বা কারণ কি। আখতারুজ্জামান সাহেব একজন ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাসের নায়িকা সীমা। বানীদহ নদীর নামটিও আছে সেখানে। আছে কৃষ্ণানন্দ গ্রাম। এর চেয়ে বেশী তো কিছু নয়। এ মহিলা সে ভালোবাসার গন্ধ শোঁকে কেন। আর এসবের খোঁজও বা সে জানলো কি করে। মহিলার সুন্দর স্বাস্থ্য, নিরাবেগ গম্ভীর আচরণ মনে রাখার মতো। কোন গড়মিল ধরা পড়েনি সীমার চোখে। একটি সত্য ঘটনা জানার পর সে কোন উচ্ছলতা প্রদর্শন করেনি। বরং সীমাকে জয় করে নিয়েছে আচরণের মুগ্ধতা দিয়ে। সীমার ইচ্ছে হয় তার হৃদয়ের গভীর অনুভূতির কথা খুলে বলতে। কিন্তু বলতে পারে না। কোথায় যেন বাধা আছে। একটি অবাস্তব কল্পনানির্ভর হৃদয়াবেগকে ব্যক্ত করতে গিয়ে সে ধাক্কা খায়।
সীমার নিকট থেকে ফিরে আসে আকতারা বেগম। ততক্ষণে সন্ধ্যা উতরে রাত্রি নেমেছে। আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠেছে। প্রান্তরে গলে পড়েছে হালকা জোসনা। ফিরতে তার মন মোটেই চায় না। সীমা যেন আকাশের নির্মল চাঁদ। যার চেহারায় কোন মলিনতা নেই। তাকে যদি আপন করা যেত। এই স্বার্থপর সংসারে মানুষ কত অক্ষম সে কথা স্মরণ করে ব্যথিত হয় সে। বাসায় ফিরে সে দেখে স্বামী উদ্বিগ্ন মনে অপেক্ষা করছে তার জন্য। আকতারা বেগম কাউকে কিছু না বলে ছাদে গিয়ে মেঘমুক্ত আকাশে জ্বলে থাকা রূপসী চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ