সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ড. মাহফুুজুর রহমান আখন্দ : সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ : মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা
বাংলাদেশের মিয়ানমার সীমান্ত এলাকাজুড়ে এখন মানবতার হাহাকার। গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতি বহন করে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ জীবন বাঁচানোর জন্য দীর্ঘকষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার নানা স্থানে। অবুঝ শিশু, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ এবং অসংখ্য আহত মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে সেখানকার আকাশ বাতাস। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা তো দূরের কথা ন্যূনতম মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও মিলছে না। মানবিক বিপর্যয়ে পতিত এ সব অসহায় নারী শিশু বৃদ্ধসহ নির্মমভাবে আহত মানুষের কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। সেইসাথে মুসলিমবিশ্বের নেতৃবৃন্দসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলকে নাড়া দিয়েছে এ অমানবিকতা। তবে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশি ভারত ও চীনের ভূমিকা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। আরাকানে হাজার বছরের সোনালি ইতিহাসের নির্মাতা এ সব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এ নির্মম পরিণতি বিশ্বের সকল বিবেকবান মানুষকে আহত করেছে। মানবতাবোধের কবর দিয়ে এ ধরনের গণহত্যা চালিয়ে মিয়ানমার যে অপরাধ করে চলেছে তা আধুনিকবিশ্বকে হতবাক ও বিস্মিত করেছে। এ নিষ্ঠুরতার নিন্দা জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।
দুঃস্বপ্নময় ভয়াবহ অঞ্চল এখন আরাকান। মিয়ানমারের ‘রাখাইন স্টেট’ নামের এ রাজ্যে মুসলমানদের জীবন আজ মগ-বৌদ্ধ, সেনাবাহিনী এবং অং সান সুচির হাতের মুঠোয়! মানুষের মাংসে বারবিকিউ বানানো কিংবা নোংরা যৌন-লালসা চরিতার্থ করার সব উপকরণ যেন এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ আরাকানী জোয়ানদের মরণস্থল। রোহিঙ্গা মুসলমানদের পিতৃভূমি এ অঞ্চলটি আজ ইতিহাসের এক জঘন্যতম মৃত্যুপুরী। নানা অজুহাত এবং পুর্বপরিকল্পিত ইস্যু তৈরি করে সেখানকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর দমন-পীড়ন শুধু নয়, সরাসরি গণহত্যায় মেতে উঠেছে দেশটির সেনাবাহিনসহ স্থানীয় মগরা। তারা পুরো মুসলিম অধ্যুষিত আরাকানে আগুন জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করছে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ অসংখ্য রোহিঙ্গা মুসলমানকে। বাড়ি থেকে রোহিঙ্গা মহিলাদেরকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিকভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা সেখানকার নিত্যদিনের খবর। নিজেদের সৃষ্ট ইস্যুতে গণহত্যা চালিয়ে রোহিঙ্গা সমাজে অনেকাংশে পুরুষ শুণ্য করা হয়েছে। কেউ কেউ জীবন বাঁচানোর জন্যে দেশের অভ্যন্তরে বনে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও রেহাই নেই। পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দেখামাত্রই অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে দেশটির সেনাবাহিনী। কোন ধরনের মিডিয়াকর্মীকে সে সব এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। সরকার, মগ-বৌদ্ধ এবং সেনাবাহিনীর বানানো খবরই প্রচারিত হয় সারা বিশ্বমিডিয়ায়। ইতিহাস নির্মাণ হচ্ছে তাদেরই ইচ্ছে মতো।
জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আরাকান সফরে এসে ২৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার ইয়াঙ্গুনে সংবাদ সম্মেলন করলেন। সংবাদ সম্মেলনকে যেন রোহিঙ্গা নির্যাতন অভিযানের উদ্বোধনী পর্বের অনুষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেছে মিয়ানমার। কফি আনানের হেদায়েতি বক্তব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘সার্জিক্যাল অপারেশনের’ নামে বৃহস্পতিবার রাতেই বর্ডার গার্ড পুলিশ এবং সেনাবাহিনী মংডুর নাইকাদং ও কোয়াংছিদং গ্রামে রোহিঙ্গাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এটা ছিল তাদের উদ্বোধনী অভিযান। তারপর আর থেমে নেই। রাত দিন সমান করে চালিয়ে যাচ্ছে এ অভিযান। ইতোমধ্যে কে বা কারা কাদের মদদে মিয়ানমারের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ‘রাখাইন রাজ্যে ৩০টি পুলিশ পোস্টে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলা’ নামক গল্পের সূচনা করলো বিষয়টি বোধগম্য নয়। ঠিক একই ধরনের গল্প রচনা করে গত বছরের অক্টোবরে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে মিয়ানমার। এবারো সেই প্রস্তুতি চলে আসছে বেশ কিছুদিন থেকে ‘সার্জিক্যাল অপারেশনের’ নামে। আর তারই রঙ্গমঞ্চ উদ্বোধন করা হলো কফি আনানের সংবাদ সম্মেলনের মধ্যদিয়ে। আসলে সেখানে কি ঘটছে এবং কারাই বা এর কলকাঠি নাড়ছে? বিষয়টি যাই হোক, রাখাইন রাজ্য নামের এ আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা নির্মূল করাই তাদের উদ্দেশ্য। 
ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ‘ওআইসি’র মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমাদ আল-ওথাইমিন বাংলাদেশ সফরে এসে গত ৪ আগষ্ট রোহিঙ্গা আশ্রয়ক্যাম্প দেখতে গিয়েছিলেন সরেজমিনে। সেখানেও তিনি সাংবাদিকদের কাছে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারসহ মানবাধিকার হরণের নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং মিয়ানমার সফরে যাবারও আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন। কিন্তু তাঁর সফরে যাওয়ার কোন সুযোগ কি মিয়ানমার সরকার দেবে? কক্ষণই না। কারণ কোন মুসলিম নেতা তো দূইে থাক, খোদ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের অমুসলিম প্রতিনিধিরাই সেখানে অসহায়। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি এসেছিলেন মিয়ানমার সফরে। তিনিও মিয়ানমারে নির্বিঘেœ সফর করে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছেন। ১২ দিনের সফর শেষে জেনেভায় পৌঁছে গত ২৪ জুলাই এক বিবৃতি প্রদান করেছেন। সে বিবৃতিতে উঠে এসেছে যে, ইতোপূর্বের সামরিক শাসনের যে ইতিহাস তারই পুনরাবৃত্তি ঘটনো হচ্ছে সদ্য গণতন্ত্রে উত্তরণের পথের এ দেশটিতে। সেখানকার হত্যা, নির্যাতন, বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদকরণ, পুলিশি হেফাজতে হত্যা, গুমসহ নানাবিধ মানবিক সংকট এখনো অব্যাহত। তিনি বলেন, ‘সফরকালে আমার নিজের চলাচলও কঠোরভারে নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সংকটপূর্ণ এলাকাসমূহে যেতে পারছে না। আমার সাথে দেখা করতে আসা লোকজন নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে। আমার সফরের উপর মিয়ানমার সরকার পূর্বশর্ত আরোপ করেছে, যা নজীরবিহিন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগের সরকারের ব্যবহৃত কৌশল এখনো প্রয়োগ করা হচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক।’
গত সাতদশক ধরে আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাস ভীষণ নির্মম থেকে নির্মমতর হতে চলেছে। ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মগ-শাসকদের এ নিষ্ঠুর নির্যাতন ক্রমশ ভারি হতে হতে সেখানকার মুসলিম জাতিসত্ত্বার নির্মূল এখন শুধু ঘোষণা বাকী মাত্র। গণতন্ত্রের নতুন লেবাসে যাত্রা শুরু করলেও সামরিক জান্তার স্বত্ত্বার কোন পরিবর্তন ঘটেনি সেখানে। এখনো সেখানে বাকস্বাধীনতা কিংবা সংবাদ গ্রহণ ও প্রচারের কোন সুযোগ নেই। সাংবাদিক ও গবেষক এখনো কঠোরভারে নিষিদ্ধ বিষয়। এমনকি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকা-ও তাদের দয়া এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণে। স্যাটেলাইটে প্রাপ্ত ছবি এবং তথ্যই সংবাদের মূল সোর্স। সেইসাথে গণহত্যার নির্মমতার স্বাক্ষী হয়ে যে সকল মানুষ কোনরকমে প্রাণে বেঁচে বাংলাদেশে ঠাঁই নিয়েছেন তাদের বিবরণ ছাড়া আরাকানে পরিচালিত জুলুম-নির্যাতনের কোন খবর পাওয়া কঠিন। গত ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে ঘটে যাওয়া রোহিঙ্গা দমন-পীড়নেও কোন তথ্য বাইরে প্রকাশ করতে দেয়নি। গত উনিশে নভেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দেয়া তথ্যের আলোকে ওয়াশিংটন পোষ্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদনে স্যাটেলাইটে তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, সে দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শনাক্ত করে যে, মাত্র তিন সপ্তাহে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের তিনটি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে দিয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনী। এতে অসংখ্য বাড়িঘর একেবারে ভস্মীভূত করে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে যে, গত তিন সপ্তাহে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও ৬৯জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে বলে সেনাবাহিনী দাবী করেছে, কিন্তু রোহিঙ্গা নেতা নূরুল ইসলামের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে যে, সেখানে চার শতাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। সেনাসদস্যরা বিভিন্ন পাড়ায় ঢুকে বাড়িতে বাড়িতে তল্লাসী চালানোর নামে হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ ও ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকা- পরিচালনা করছে। এমন নির্মমতায় প্রাণ হারাচ্ছে অসহায় নারী শিশু ও বৃদ্ধসহ সেখানকার খেটে খাওয়া অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিতসহ সমগ্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠি। সর্বস্ব হারিয়ে নিজেদের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে তারা পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে। ২০১২ সালে বৌদ্ধদের রোহিঙ্গা বিরোধী দাঙ্গায় অসংখ্য মুসলমান যেমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তেমনি প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিজের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে অস্থায়ী উদ্বাস্তু হিসেবে ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ইতোপূর্বে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের মত মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু ঘুর্ণিঝড়ের পরও রোহিঙ্গাদের জানমালের খোঁজ খবর, পুনর্বাসন কিংবা ত্রাণ কার্যক্রমসহ কোন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করেনি মিয়ানমার সরকার। বরং স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মগদের পুর্নবাসনে রোহিঙ্গাদের উপর চাদা পর্যন্তও ধার্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
(চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ