মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর শিশুপ্রেম

মাওলানা এএইচএম আবুল কালাম আযাদ : বিশ্বনবী মুহম্মদ (সা:) শিশুদের মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন।  যেকোনো শিশুকে তিনি নিজের সন্তানের ন্যায় আদর-সোহাগও করতেন। নিষ্পাপ শিশু-কিশোরদের মন খুবই সরল, কোমল ও পবিত্র। তিনি বলতেন ‘শিশুরা বেহেশতের   প্রজাপতি।’ অর্থাৎ প্রজাপতিরা যেমন তাদের সুন্দর শরীর আর মন নিয়ে ফুলবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, শিশুরাও তেমনি তাদের সুন্দর মন নিয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। প্রজাপতির স্বভাব যেমন নিষ্কলুষ, শিশুরাও তেমনি নিষ্কলুষ ।
সন্তানের  প্রতি রাসূলুল্লাহর সা: ভালবাসা: রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুদের খুবই ভালোবাসতেন ও স্নেহ করতেন। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস (রা:) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে আর কাউকেও সন্তানের প্রতি এত অধিক স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখিনি।’ তিনি   প্রাণপ্রিয় কন্যা ‘খাতুনে জান্নাত’ হযরত ফাতেমা (রা:) কে খুবই স্নেহ করে প্রায়ই বলতেন, ‘ফাতেমা আমার কলিজার টুকরা’। শিশু ফাতেমা (রা.) যখন তাঁর কাছে যেতেন, তিনি উঠে দাঁড়াতেন এবং ফাতেমার হাত ধরে চুমু দিয়ে তাকে মজলিসে বসাতেন।’ (আবু দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সা:) বলতেন, ‘সন্তান-সন্ততিকে সম্মান করো এবং তাদের উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (ইবনে মাজা)
অন্য ধর্মের শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা: ভালবাসা: মহানবী (সা:) মুসলিম শিশুদের যেমনীভাবে ভালোবাসতেন, ঠিক তেমনী অন্য ধর্মের শিশুদেরও গভীরভাবে ভালবাসতেন। যেকোনো শিশু পেলে তাকে জড়িয়ে ধরতেন ও আদর-স্নেহ করতেন, কোলে তুলে নিতেন, চুমু খেতেন, সুন্দর নামে ডাকতেন। সফর থেকে ফেরার পর ছোট ছেলেমেয়েদের উটের সামনে-পেছনে বসাতেন এবং তাদের সঙ্গে কৌতুক করে আনন্দ করতেন। শিশুদের প্রতি দয়ামায়া প্রদর্শন সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে শিশুদের প্রতি দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি)
নবীজীর (সা.) কাছে শিশু তো শিশুই। তার কোনো জাত-পাত, ধর্মাধর্ম ছিল না। বিধর্মী ও কাফেরদের শিশু সন্তানদের প্রতিও তাঁর সমান স্নেহবোধ ছিল। তাদেরকেও তিনি সমান আদর করতেন। তাঁর কাছে একদা একটি শিশুকে আনা হলে তিনি তাকে চুম্বন করেন এবং বলেন ‘এরা মানুষকে ভীরু ও কৃপণ করে দেয়, আর এরা হলো আল্লাহ্র ফুল।’ নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘প্রত্যেক জন্ম নেওয়া শিশু ফিতরাত তথা সহজাত সত্য গ্রহণ করার ক্ষমতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে, কিন্তু তার পিতামাতা হয় তাকে ইহুদি বা খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (বুখারী ও মুসলিম)
ইয়াতিম শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা: ভালবাসা: নবী করিম সা: অবহেলিত শিশুদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও বিনোদনের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও ভালবাসা দিয়ে ধর্মে-কর্মে যথার্থ মানুষ হিসেবে গঠন করেছিলেন।
সব শিশুদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা:) ভালবাসা থাকলেও এতিম শিশুদের প্রতি তাঁর দরদটা ছিল আরও বেশি। এক ঈদের দিনে সকালবেলা নবীজী (সা:) দেখলেন, রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে একটা শিশু কাঁদছে। পরনে তার ছিন্ন বস্ত্র। সারা শরীর কাদায় ঢাকা। শিশুটির কাছে যেয়ে জিজ্ঞাসা করে তিনি জানতে পারলেন, ছেলেটি এতিম। অর্থাৎ তার মা বাবা কেউ নেই। এ কথা শুনে তাঁর খুব খারাপ লাগলো। শিশুটির প্রতি তাঁর মায়া হলো। তাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে এলেন। স্ত্রী আয়েশাকে (রা:) বললেন, শিশুটিকে ভালোভাবে গোছল করিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিয়ে দিতে। হযরত আয়েশা (রা:) তাকে তেমনিভাবে করিয়ে দেওয়ার পর তিনি নিজ হাতে তাকে নতুন পোশাক পরিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে নিয়ে গেলেন। আদর করে শিশুটিকে বললেন ‘আজ থেকে আমি তোমার বাবা আর আয়েশা তোমার মা।’
কোনো দুঃখী মানুষের কষ্ট দেখলে নবীজীর (সা:) কষ্ট তো হতোই, বিশেষ করে কোনো শিশুর কষ্ট দেখলে, তাঁর দুই চোখ অশ্রুতে ভরে যেতো। চলারপথে কোনো শিশুকে কাঁদতে দেখলে, তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতেন।
শুধুমাত্র নিজের বাচ্চাদের ভালোবাসলেই হবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে সব শিশুর প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা দেখাতে হবে আমাদের। বিশেষ করে যেসব শিশুর বাবা বেঁচে নেই কিংবা বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই, সেসব অনাথ শিশুদের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ প্রকাশ করতে হবে। তাদের খোঁজখবর নিতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মহানবী সা. বলেন, ‘আমি এবং এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। একথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলির মধ্যে সামান্য ফাঁক রাখলেন। (বোখারী: ৪৯৯৮)।
শিশুদের সাথে রাসূলুল্লাহর সা: খেলাধুলা করা: তিনি বলেন ‘শিশুদেরকে যে ভালোবাসে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ শিশুদেরকে দেখলে তিনি আদর করতেন। দু’হাত মেলে দিতেন তাদের দিকে। তারপর বলতেন ‘দেখিতো, কে আগে আমার কাছে পৌঁছাতে পারো।’ সব শিশুরা একসাথে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তো। কেউ তাঁর কোলে, কেউ তাঁর কাঁধে, কেউ তাঁর বুকে। কেউ ঝুলে পড়তো তাঁর গলায়। এসব শিশুদের অনেককেই তিনি হয়তো চিনতেন না। কিন্তু তাদের সবাইকে নিয়ে তিনি আদর করতেন। সবার সাথে আনন্দ করে খেলাধুলা করতেন।
শিশু হাসান (রা:) ও হোসেন (রা:) ছিলেন নবীজীর (সা:) নাতি। নবীজী (সা:) তাঁদেরকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাঁদের দুইজনকে নিয়ে প্রায় সময় তিনি মজার মজার খেলা করতেন। নানা নিজে হামাগুড়ি দিয়ে ঘোড়া সাজতেন। দুই নাতি পিঠে সওয়ার হতেন।
অনেক সময় নবীজী (সা:) যখন নামাজে সেজদায় যেতেন, শিশু দুই নাতি তাঁর পিঠে চড়ে বসতেন। তাঁরা তাঁর পিঠ থেকে না নামা পর্যন্ত তিনি সেজদারত অবস্থায় থাকতেন। কিন্তু কখনোই তিনি বিরক্তিবোধ করতেন না। নিষেধও করতেন না।
শিশুদের চুমু খাওয়া: তিনি সবার সাথে আনন্দ করে খেলাধুলা করতেন শুধু তাই নয়, তাঁদেরকে কোলে নিয়ে তিনি চুমুও খেতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, কিছু বেদুঈন লোক রাসুূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আপনারা কি আপনাদের শিশু-সন্তানদের চুমু দিয়ে থাকেন?’ নবী (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তারা বলল, ‘কিন্তু আল্লাহর কসম! আমরা চুমু দেই না।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ্ যদি তোমাদের অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নেন, তবে আমি কি তার মালিক করে দিতে পারি?’ (বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহ্পাকের দয়া ও করুণা পেতে হলে আমাদেরকে ছোটদের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। ইমাম বোখারী রহ: সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রা:-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, একদা রাসূল সা: নিজ নাতি হাসান রা. কে চুমু খেলেন। সে সময় তার কাছে আকরা বিন হারেস উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, আমি দশ সন্তানের জনক। কিন্তু আমি কখনও তাদের আদর করে চুমু খাইনি। তখন মহানবী সা. তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না’। (বোখারী: ৫৬৫১)।
শিশুর মোহাব্বতে রাসূলুল্লাহর সা: খুতবা বন্ধ করা: নবী করিম (সা.)-এর জীবনে শিশু-কিশোরদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসার অনেক ঘটনা বিদ্যমান। একদিন নবীজী (সা.) মসজিদে খুতবা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন তাঁর শিশু নাতি হাসান (রা.) ও হোসেন (রা.) তাঁর দিকে দৌড়ে আসতে যেয়ে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। সাথে সাথে খুতবা দেওয়া বন্ধ করে মিম্বর থেকে ছুটে এসে তিনি তাঁদেরকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর তাঁদেরকে সামনে বসিয়ে রেখে আবার খুতবা দিতে শুরু করলেন।
মসজিদে কোনো শিশু এলে তাকে তিনি সামনে ডেকে নিতেন। তিনি তাঁর সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে বলতেন ‘শিশুদের প্রতি এমন আচরণ করো, যাতে তাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ সৃষ্টি হয়।’
শিশুর কষ্টে রাসুলুল্লাহর সা. নামাজ দ্রুত শেষ করা: মদীনার মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের জামাতে ইমামতি করতেন। এ জামাতে মহিলা নামাজীরাও শরিক হতো। তারা তাদের শিশু সন্তানদেরকেও নিয়ে আসতো এবং তাদেরকে একটু দূরে রেখে জামাতে নামাজ আদায় করতো। তিনি যখন ইমামতি করতেন, এসময় কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে গেলে তিনি দ্রুত নামাজ শেষ করতেন, যাতে ওই শিশুর কোনো কষ্ট না হয়।
শিশুদের দুষ্টামীতে রাসূলুল্লাহর সা. কষ্ট না পাওয়া: শিশুদের কোনো ধরনের অচরণেই কখনও তিনি বিরক্ত হতেন না। একবার তিনি একটা শিশুকে কোলে নিয়ে মিষ্টি খাওয়াচ্ছিলেন। এমন সময় শিশুটি হঠাৎ তাঁর কোলে প্রস্রাব করে দিল। কিন্তু তিনি তাতে বিন্দুমাত্র বিরক্তও হলেন না; বরং নিজেই পানি দিয়ে উক্ত স্থানটি ধুয়ে নিলেন।
এমনিভাবে শিশুদেরকে তিনি অন্তর দিয়ে অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসতেন। হযরত আনাস (রা.) দীর্ঘদিন নবীজীর (সা.) ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে ছিলেন। তিনি বলেন ‘আমি রাসুলুল্লাহর (সা.) মত শিশুদেরকে এত অধিক ভালোবাসতে আর কাউকে দেখিনি।’
কাজের ছেলের সাথে রাসুলুল্লাহর সা. আচরণ: শিশু নির্যাতন রোধে রাসূলুল্লাহ (সা.) আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও শাস্তি কার্যকর করার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে ঘরে কাজ করা শিশু নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি বেশি আলোচনায় আসছে। অথচ প্রিয় নবী (সা.)-এর আদর্শ দেখুন। তিনি একটি শিশু কৃতদাসকে সন্তানের স্থানে উন্নীত করে গেছেন।
হযরত আনাস (রা.)-কে মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর মা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবায় অর্পণ করেন। (বুখারি : হা. ১৯৮২) দীর্ঘদিন খেদমত করতে গিয়ে নবীজী (সা.) কে কেমন পেয়েছেন সে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি ৯ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। আমার কোনো কাজে আপত্তি করে তিনি কখনো বলেননি, ‘এমন কেন করলে? বা এমন করোনি কেন’?’’ (মুসলিম : হা. ২৩০৯) শুধু মুসলিম সেবক নয়, ভিন্ন ধর্মের শিশু সেবকও ছিল নবীজী (সা:)-এর স্নেহের পাত্র। একটি ইহুদি শিশু রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর খেদমত করত। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা:) তাকে দেখতে গেলেন। তার শিয়রে বসলেন। তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে আহ্বান করলেন। সে তখন নিজের বাবার দিকে তাকাল। বাবা বলল, তুমি আবুল কাসেমের কথা মেনে নাও। এবার ছেলেটি ইসলাম গ্রহণ করল। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বললেন, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনি ছেলেটিকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন। ’ (বুখারি : হা. ১২৯০)
নবীজীর প্রতি শিশুদের মোহাব্বত: নবীজী সা. শুধু শিশুদেরকে ভালবাসতেন না শিশুরাও নবীজী সা. কে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। নবীজী (সা:) কোন পথ দিয়ে আসবেন জানতে পেরে সে এলাকার শিশুরা পথের দু’পাশে এসে হাজির হতো। নবীজীর (সা.) আগমন ঘটলে তারা নেচে-গেয়ে আনন্দ-উল্লাস শুরু করে দিত। নবীজীও (সা.) এতে খুব আনন্দ করতেন। শিশুরাও নবীজীর (সা.) আদর পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে উঠতো।
শিশু হত্যা রোধে নবীজীর কর্মসূচী: সুস্থভাবে খেয়েপরে নিরাপদে বেঁচে থাকা প্রত্যেক শিশুর মৌলিক অধিকার। শিশুদের জীবন রক্ষা করার জন্য মহানবী (সা.) সর্বাগ্রে দয়ামায়াহীন আরব পৌত্তলিকদের জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। শিশুদের যথার্থ মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তিনি শিশুহত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের গোপন পন্থায় ধ্বংস করবে না।’ (আবু দাউদ) যে জাতি আপন সন্তানকে জীবিতাবস্থায় মাটিচাপা দিয়ে আনন্দ-উল্লাস করত, ইসলামের নবীর সংস্পর্শে ও হুঁশিয়ার বাণীতে তা পরিত্যাগ করে তারাও সভ্য সমাজ হয়ে ওঠে। এভাবে তিনি কোমলমতি শিশুদের পৃথিবীতে নিরাপদে বেঁচে থাকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ইসলামী আইন ব্যবস্থায় মানব ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি ধারালো অস্ত্র দ্বারা শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদ-। কিন্তু শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বেলায় ইসলামে আরো কঠোরতার নমুনা পাওয়া যায়। একবার এক “রাহাজান” একটি শিশুর অলংকার ছিনতাই করে তাকে পাথরে পিষে হত্যা করে। ওই শিশুহত্যার মৃত্যুদ- কোনো ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয় না। বরং তাকেও নিহত শিশুটির মতো প্রস্থরাঘাতে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। (মুসলিম : হা. ৪৪৫৪)
ইসলাম গ্রহণ করলে আগের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (মুসলিম: হা. ১৯২), তা সত্ত্বেও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ (সা.) অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। হযরত কায়েস ইবনে আসেম (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর কাছে এসে বললেন, ‘আমি (জাহেলি যুগে) কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দিয়েছি। ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘প্রতিটি কন্যার বদলে একজন করে দাস মুক্ত করে দাও। ’ তিনি বললেন, আমি তো কেবল উটের মালিক। রাসুলুল্লাহ (সা:) বললেন, ‘তাহলে  প্রতিটি কন্যার বদলে একটি করে উট কোরবানি করো। ’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৮/৩৩৫)
প্রতিটি মুসলিম পরিবার যদি শিশুর শারীরিক সুস্থতা ও বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক বিকাশের দিকে গুরুত্ব না দেয় তাহলে শিশুরা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ জনসম্পদে পরিণত হবে না। একটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য জাতিসংঘ ‘শিশু অধিকার সনদ’-এর ২৭ নম্বর ধারায় প্রতিটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত মানসম্মত জীবনযাপনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে সবার বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার দ্বারাই শিশুরা প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য রাসুলে করিম (সা.) তাদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার নিজে করেছেন এবং অন্যদেরও সদাচার করার নির্দেশ  প্রদান করেছেন। তিনি চাইতেন শিশুরা যেন কোনো সময় কষ্ট না পায় বা নির্যাতনের শিকার না হয়। শিশুদের যেকোনো মৌলিক চাহিদা মেটাতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত যতœশীল। কোনো শিশু দুষ্টুমি করলে তিনি তাকে কড়া শাসন না করে হাসিমুখে শোধরানোর কৌশল গ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘যে ছোটকে স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়কে শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (বুখারি, তিরমিজি)
শিশুদেরকে ভাল শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ : শিশুদের কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন না করে তাদের সঙ্গে সব সময় ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দানের কথা উল্লেখ করে নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা শিশুসন্তানদের স্নেহ করো, তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো এবং সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (তিরমিজি) অন্যকে জ্ঞান দান করা উত্তম কাজ। কিন্তু শিশুদেরকে জ্ঞান দান করা আরও উত্তম। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবসন্তানকে সুশিক্ষা প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘সন্তানকে সদাচার শিক্ষা দেওয়া দান-খয়রাতের চেয়েও উত্তম।’ শিশুদের উত্তম ও যুগোপযোগী শিক্ষাদানের জন্য তিনি নির্দেশ প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞানদান করো। কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট।’(মুসলিম)
শিশুদের কোমল ও পবিত্র মনে যদি একবার কোনো খারাপ ধারণা বা ভয়ভীতি প্রবেশ করে, তবে তা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে থেকে যায়। তাই নবী করিম (সা.) শিশু-কিশোরদের সঙ্গে খেলাচ্ছলেও মিথ্যা বা প্রতারণা করতে নিষেধ করেছেন।
উপসংহার: শিশুরা আগামী দিনের দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাই তাদের যদি সুন্দর করে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায়; তাহলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে আরও সুন্দর। রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই নিজ কর্ম, উপদেশসহ আরো নানা উপায়ে সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধি করে বিশ্বকে একটি শিশুবান্ধব সমাজ উপহার দিয়ে গেছেন। তাই ইসলামের শিক্ষা সব শিশুই যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠে। অথচ আজকের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও আমাদের দেশে শিশুরা কতই না অবহেলিত, নির্যাতিত ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার! সুতরাং ইসলামের সুমহান শিক্ষাকে সামনে রেখে যদি নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের আদর্শ শিক্ষা-দীক্ষায় শিশুদের যথাযথ স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে পিতামাতা, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র তাদের সেবা লাভে উপকৃত হবে। শিশুদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা প্রদর্শন করা হলে এমন পরিবারে আল্লাহর করুণা ও দয়া সর্বদাই বর্ষিত হতে থাকবে।
লেখক: সভাপতি: বাংলাদেশ জাতীয় মুফাস্সির পরিষদ, টাঙ্গাইল জেলা।
email- azad91bd@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ