রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বানভাসীর ডায়েরী

জুবাইদা বিনতু আমিন : আমি নুরভান বেগম। বাড়ি কুড়িগ্রামে। ষাটোর্ধ্ব শরীরটা নুয়ে পড়তে চায় বারবার। আমি মুখ্য সুখ্য মানুষ। পড়ালোখা জানি না। কোনদিন ‘বাংলাদেশের বন্যা’ বা ‘Flood of Bangladesh’ রচনাও পড়িনি। তবে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছি খরা আর বন্যার সাথে। প্রতি বছরই শীতকালে পানির জন্য হাহাকার চলে ঘরে ঘরে। শুষ্কতায় চৌচির হয় ফসলি জমি, পুড়ে যায় জমির ফসল, নদীগুলো হয়ে যায় মরা গাঙের মত নিষ্প্রাণ। আর বর্ষায় যখন বৃষ্টি শুরু হয়, আস্তে আস্তে জমিগুলো প্রাণ ফিরে পায়। গৃহস্থরা নেমে পড়ে চাষাবাদে। তখনই হঠাৎ করে ছেড়ে দেয়া হয় তিস্তাবাঁধের সবগুলো দরজা। কারণ তখন আর তাদের পানির দরকার হয় না। এ বছরও হয়েছে এমনটি। প্রথমে ঘরে পানি ঢুকল, খাঁটের উপরে থাকলাম। তারপর আরো বাড়ল। তখন ঘরের মধ্যে টঙ তৈরি করে থাকা শুরু করলাম। তারপর পানি আরো বাড়ল। গরু দুটোকে পানির মধ্যে বেঁধে রাখা ছাড়া উপায় ছিল না। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি গরুদুটি ভেসে গেছে বানের তোড়ে। পানি মাচা ছুঁয়েছে। আর কিছু করার পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পানির তোড়ে ঘর হেলে পড়েছে। চালে ওঠারও জো নেই। দু’দিন ধরে খাইনি কিছুই, যতটুকু চিড়া-মুড়ি ছিল তাতো কবেই শেষ।
কয়দিন আগে আমার ছেলে অনেক দূরে সাঁতরে গিয়ে কয়টা চিড়া-মুড়ি এনেছিল। কারা যে দিয়েছে তা জানিনা পানির কল তো সেই কবেই ডুবে গেছে। ময়লা পানি খাওয়া ছাড়া জান বাঁচানোর উপায় নেই। না খেতে খেতে বৃদ্ধ শরীরটা আরো দুর্বল হয়ে গেছে। ছেলেমেয়ে নাতি নাতনীগুলোরও দুরবস্থা। এখন আর ঘরে থাকার উপায় নেই। যেখানেই হোক যেতে হবে। অনেক কষ্টে সবকিছু রেখে শুধু জানগুলো নিয়ে বের হলাম অজানার পথে। বাচ্চাগুলোকে ভেলায় চড়িয়ে আমরা প্রায় সাঁতরে চললাম বাঁধের দিকে। রাস্তা আর খালবিল কিছুই বোঝার উপায় নেই। হঠাৎ করে ধাক্কা খেলাম। পড়ে যাচ্ছিলাম গর্তে। নাকানি-চুবানি খেয়ে উঠে দাঁড়াতে পারলেও হাত থেকে ফসকে গেল নাতিটা সাত বছরের ছেলে, তবে অপুষ্টি আর দুর্বলতায় চার বছরের ছেলের সমান তাকে আর খুঁজে পেলাম না। তারপর এসে উঠলাম বাঁধে কোনরকম প্রাণ নিয়ে। এরপর আর বলার কিছু নেই। খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছি। দরকারি খাবার নেই। পানি নেই, ওষুধ নেই, জামা কাপড় নেই। আজ পর্যন্ত কোন নেতা আসল না আমাদের দেখতে। শুনেছি ১৯৮৮ সালের মত বন্যা হতে পারে এবছর। অবশ্য তাতে আমাদের সরকার খুব বেশি চিন্তিত নয়। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোপূর্বে কয়েকবারই ঘোষণা দিয়েছেন যে কোন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত আছি। তাইতো তিনি নীরব। অপেক্ষায় আছেন দুর্যোগের।
পানি আর কতটা বিপদসীমা অতিক্রম করলে আপনার সংজ্ঞায় সেটা দুর্যোগ হবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? আর দুর্যোগ কতটা ঘনীভূত হলে আপনি তা মোকাবেলা করবেন? জানি আমার এ ডায়েরীর লেখা ডায়েরীতেই থেকে যাবে। আর এ ডায়েরী একদিন ভেসে যাবে বানের পানিতে। এ লেখা আপনার নজরে না পড়লেও, আমাদের আহাজারিগুলো আপনার কান পর্যন্ত না পৌঁছলেও এ লেখার কালি গুলো বানের পানিতে মিশে পৌছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। কিন্তু ভেবেছেন কি, যেদিন তারা বানের তোড়ের মতই ভয়ঙ্কররূপে ছুটে আসবে আপনার দিকে সেদিন পারবেন কি পালিয়ে যেতে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ