শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

বন্যা পুনর্বাসনে তাৎক্ষণিক ও বাস্তব ব্যবস্থা চাই

স্কুল জীবনে গণিত শাস্ত্রে আমার বেশ ব্যুৎপত্তি ছিল বলে শিক্ষক মহোদয়রা আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন। আমারও মনে হতো অঙ্ক ও বীজগণিতে আমি খুবই ভালো ছিলাম। কিন্তু জ্যামিতির এক্সট্রার কথা শুনলে আমি খুবই ভয় পেতাম। অধুনা আমি অঙ্কেও ভয় পাই। কেননা, আমার অঙ্ক মিলে না। ফেসবুকে এক বন্ধু একটা অঙ্ক দিয়েছেন, অঙ্কটি হচ্ছে, একজনকে এক মগ ডাল দিতে যদি নয়জন লোক লাগে তাহলে বন্যা উপদ্রুত ৫০ লাখ লোককে এক মগ করে ডাল দিতে কত লোক লাগবে? এই অঙ্কটির উপরে একটি ছবি আছে। তাতে দেখা যায়, কোনও একজন ভিআইপি বন্যা উপদ্রুত এলাকায় একটি হতদরিদ্র কিশোরকে একটি মগে করে ডাল দিচ্ছেন, ছেলেটি হাতে একটি বাটি আগায়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখা যাচ্ছে যে, সেখানে জটলারত নয়জন লোক বাটি, মগ ও সংশ্লিষ্ট ভিআইপি’র হাত ধরে আবার কেউ কেউ কোনকিছু ধরতে না পেরে জামার হাতা ধরে ক্যামেরার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটির উপরে একটি গান আছেÑ
‘তোরা দেখ, দেখরে চাহিয়া...
ত্রাণের নামে ফটো সেশন টোকাই ধরিয়া
মগটা বুঝি গেলোই ভেঙে টানাটানিতে
লজ্জা শরম ধুইয়া গেছে বানের পানিতে’
আমার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ছবিটা সামনে রেখে অঙ্কটা কষবো কিভাবে? বাটির যে সাইজ তার মধ্যে এক মগ ডাল আঁটতে পারে না। আবার মগটাও ডাল ভর্তি নয়, তার চারভাগের এক ভাগ ডালে ভর্তি কিনা তাও বলা যায় না। কাজেই এই অঙ্ক আমাকে দিয়ে কষা সম্ভবপর নয়। আগস্ট মাসের প্রলয়ঙ্করী বন্যার ফলে সারা বাংলাদেশের ৪০টিরও বেশি জেলা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের হাওর এবং নিচু জলাভূমি এলাকা তলিয়ে যায়। অতি বৃষ্টি, ভারতের দিক থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, ভারত কর্তৃক তিস্তা এবং ফারাক্কা ব্যারেজের স্লুইস গেট খুলে দেয়ার ফলে এই বন্যার সৃষ্টি হয়। হাওর এলাকায় এটা হচ্ছে দ্বিতীয় বন্যা। প্রথম বন্যায় এপ্রিল মাসে তাদের ফসল, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি এবং হাওরের লাখ লাখ টন মাছ ধ্বংস হয়। সাধারণত বন্যায় মাছ মরার কথা নয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পারমাণবিক পরীক্ষাগারের বিষাক্ত ও তেজস্ক্রীয় বর্জ্য উজানে ছেড়ে দেয়ার ফলে তা বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুনামগঞ্জ হাওরের মাছ এবং হাঁসের মৃত্যু ঘটায়। এই অভিযোগটি ঐ রাজ্যের পরিবেশবিদরাই উত্থাপন করেছেন। দ্বিতীয় বন্যায় জেলাবাসী তাদের বাড়িঘর ও আশ্রায়স্থল হারিয়েছেন। হাওরসমূহের ধান-চাল দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতির একটা বিরাট অংশ পূরণ করা হতো। বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে এই ফসল ধ্বংস হওয়ার ফলে হাওরবাসী চোখে অন্ধকার দেখছেন। বছরে একটা মাত্র ফসলই তারা পান। বিকল্প ব্যবস্থা না হলে তাদেরকে উপোষ থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বন্যা ১৯৮৮’র ভয়াবহ বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, ২০০ বছরের ইতিহাসে এত ভয়াবহ বন্যা আর হয়নি। একটি জাতীয় দৈনিকের খবর অনুযায়ী দেশের ৪০ জেলায় বন্যায় সাড়ে ছয় হেক্টর রোপা আমনের জমি তলিয়ে গেছে। বিশেষভাবে ৪০টি জেলার কথা বলা হলেও দেশের সবগুলো জেলা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক বন্যার অবস্থা পর্যবেক্ষণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য কোনও কন্ট্রোল রুম প্রতিষ্ঠা না করায় ক্ষয়ক্ষতির বেলায় সর্বত্র একটি তথ্য বিভ্রাট রয়েছে। আবার সরকারিভাবে বন্যার ভয়াবহতা স্বীকার করার বেলায়ও যথেষ্ট ইতস্ততা পরিলক্ষিত হয়। সরকারপন্থী অনেক সাংবাদিক বন্যায় বাংলাদেশে মৃতের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত তথ্য পরিবেশন করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যায় মৃতের তথ্য ও ক্ষয়ক্ষতি এমনভাবে নিয়ে আসেন যেন বাংলাদেশে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার।
সম্ভবত: তারা মনে করেন যে, অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আসলে কি তা হয়। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘস্থায়ী বন্যা আর কখনো হয়নি। গত ৮/৯ বছরে রাজধানী শহর ও তার বাইরে প্রেস্টিজ কেন্দ্রিক বেশকিছু মেগা প্রকল্পের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বেশির ভাগ চাঁদাবাজ. ঠিকাদার, দলীয় কর্মকর্তারা ভাগ-বাটোয়ারা করে খেয়েছেন, বলে আভিযোগ রয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো. রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রভৃতি মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়নি বললেই চলে। এ সব খাতে এডিপিতে যে বরাদ্দ ছিল তার শতকরা নব্বই ভাগই ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপি ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের স্রোতের তোড়ে ক্ষয়িষ্ণু রাস্তাঘাট, নদীর পাড় ও বাঁধ ভেঙে গিয়ে জনপদ পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক নদী ও খাল প্রভাবশালীরা মাটি ভরাট করে জমিতে রূপান্তর করেছে, খননের অভাবে বিদ্যমান খালগুলো পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেটসহ যে সব অবকাঠামো তৈরি করেছে সেগুলোর কোনও সংস্কার নেই। স্লুইস গেটের ভাটিতে চর পড়ে উঁচু হয়ে যাবার ফলে উজানের পানি আর সরে না। ফলে অনেক জেলায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী আকার ধারণ করেছে এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বন্যার পানি এখন নামতে শুরু করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এই বন্যার ফলে প্রায় ৫ লাখ লোক তাদের সর্বস্ব হারিয়েছে, প্রায় ৭২ লাখ লোক আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে লক্ষাধিক বাড়ি-ঘর সম্পূর্ণভাবে এবং ছয় লাখ বাড়ী-ঘর আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। টিউবওয়েল ধ্বংস হয়েছে ৬০,০০০। এ সব নলকূপ থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা খাবার পানি সংগ্রহ করতেন। ৪০ জেলার রোপা আমন নাই বললেই চলে; সদ্য লাগানো ধানের চারা বন্যার বদ্ধ পানিতে পচে গেছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট এই বিপর্যয়কে অন্যতম মানবিক বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছে। এতে উপদ্রুত এলাকার মানুষ বর্তমানে যেমন খাদ্য সংকটে পড়েছে ভবিষ্যতেও অন্তত: এক বছর পর আরেকটি নিশ্চিত ফসল না আসা পর্যন্ত খাদ্য সংকটে থাকবে। মানুষকে এ থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
বন্যার ক্ষয়-ক্ষতি স্পষ্ট। উপদ্রুত এলাকার মানুষ সজন হারিয়েছে, তাদের ঘরে ভাত নেই, জমির শস্য নেই। হাঁস মুরগী গবাদি পশু নেই। পুকুরের মাছ নেই। ঘর নেই। তারা সর্বহারা হয়ে পড়েছে। রাস্তা-ঘাটও নেই। তাদের পুনর্বাসনের জন্য অবিলম্বে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই পদক্ষেপ হতে হবে স্বল্প মেয়াদি, মধ্য মেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী। বন্যার পানি নামার সাথে সাথে রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়া শুরু করেছে। তাদের জন্য খাবার, ওষুধ, গৃহ নির্মাণ তৈজস পত্র ক্রয় অন্তত প্রতিটি পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী ডাল-চালের ব্যবস্থা করা দরকার।
উপদ্রুত এলাকায় কৃষি ঋণ মওকুফ করতে হবে বিনা সুদে গৃহনির্মাণ, গবাদি পশু ক্রয় তথা কৃষি পুনর্বাসন ও আয়বর্ধক কর্মকা-ের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলায় সম্প্রতি ত্রাণ বণ্টন করেছেন এবং বলেছেন যে, সরকার কৃষি পুনর্বাসনের জন্য ১১৭ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তিনি আরো বলেছেন যে, প্রয়োজন বোধে সরকার ১৫ লাখ টন চাল আমদানী করবেন তবুও মানুষকে না খেয়ে মরতে দিবেন না, কথাগুলো পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের শস্য উৎপাদনের দু’টি উর্বর ক্ষেত্র হাওর অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের ষোলটি জেলার ফসল বন্যায় ধ্বংস হয়ে গেল এরপরও কি আমদানির প্রয়োজন হয়নি? চালের দামের উর্ধ্বগতি রোধ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের পরিবর্তে ঝযড়ৎঃফঁৎধঃরড়হ এর ধান লাগিয়ে ক্ষতি পোষানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমদানি তো থাকবেই। এ ব্যবস্থা না নিলে আশু খাদ্য সংকট রোধ করা যাবে না। পুনর্বাসন প্রকল্পের আকার নিয়ে ও প্রশ্ন আছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলা-উপজেলা সমূহে এই প্রকল্পের ১১৭ কোটি টাকা ভাগ করলে প্রতিটি এলাকা কি পাবে তা সহজে অনুমেয়। আমার বিশ্বাস বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তার ভিত্তিতে পুনর্বাসন প্রকল্প প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে, ১১৭ কোটি টাকার প্রকল্প সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ