মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

এখনো টিকিটের অপেক্ষায় শত শত হজ্বযাত্রী

নির্ধারিত সময়ে হজ্বে যেতে না পেরে টাঙ্গাইলের একটি গ্রুপের হাজীদের অসহায় অবস্থান ও কান্না। গতকাল রোববার হাজীক্যাম্পের দৃশ্য -সংগ্রাম

মিয়া হোসেন : চলতি বছরের হজ্ব ফ্লাইট শেষ হচ্ছে আজ সোমবার। এখনো প্রতারিত শত শত হজ্বযাত্রী অনিশ্চয়তার প্রহর গুণছে। তাদের অনেকের ভিসা হয়েছে কিন্তু টিকিট না দিয়ে পালিয়েছে এজেন্সি মালিকরা। আবার বেশকিছু হজ্বযাত্রী টিকিট ভিসা কিছুই পায়নি। তবে ভিসা প্রাপ্ত হজ্বযাত্রীদেরকে আজকের মধ্যে হজ্জে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কীত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন।

সূত্রমতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের শেষ ফ্লাইট রোববার দিবাগত রাত ৩টা ৩০ মিনিটে এবং সাউদিয়া এয়ারলাইনসের শেষ ফ্লাইট সোমবার ৫টা ১৫ মিনিটে হজ্বযাত্রী নিয়ে জেদ্দার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়বে। এদিকে, চলতি বছর হজের টাকা জমা দিয়ে হজ্ব এজেন্সি মালিক ও গ্রুপ লিডার দ্বারা প্রতারনার শিকার হয়েছেন শতশত হজ্বযাত্রী। প্রতারিত হওয়া এসব হজ্বযাত্রী রাজধানীর আশকোনা হজ্বক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রতারিত হজ্বযাত্রীরা ভিসা পেলেও এখনও জেদ্দা যাওয়ার টিকিট পাননি।

প্রতারিত সব হজ্বযাত্রী সৌদি আরব যেতে পারবেন এমন আশ্বাস দিয়েছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কীত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন। তিনি বলেছেন, ভিসাপ্রাপ্ত সবাই হজ্ব পালনের জন্য সৌদি আবর যেতে পারবেন। সব হজ্বযাত্রী পাঠানো নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল; তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে সমাধান হয়েছে। তিনি বিমানকে নতুন আটটি সøটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি।

তিনি আরও বলেন, যে সব হজ্বযাত্রী ভিসা পেয়েছেন, এয়ারলাইনসের টিকিট পাননি; তাদের টিকিটের ব্যবস্থা করতে শনিবার আমরা হজ্ব এজেন্সি মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। ভিসাপ্রাপ্ত সব হজ্বযাত্রীকে টিকিট দিতে ব্যাংক কর্মকর্তা ও এজেন্সি মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সমাধান হয়েছে। যারা টিকিট পাচ্ছিলেন না তাদের টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। হজ্বক্যাম্পে থাকা যেসব হজ্বযাত্রী ভিসা পেয়েছেন, কিন্তু এয়ারলাইনসের টিকিট পায়নি তারা হজ্ব অফিসে যোগাযোগ করবেন। তাদের টিকিটের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এই বছর দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে অনেক হজ্বযাত্রী প্রতারিত হয়েছেন। যেসব এজেন্সি মালিক ও দালাল প্রতারণা করেছে তারে বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে; যা পরবর্তীতে নিয়মিত মামলায় স্থানান্তর করা হবে। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হজ্ব অফিসের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশের ১৭০টি ফ্লাইটে ৬২ হাজার ৮২১ জন এবং সৌদিয়া এয়ারলাইনসে ১৬৭টি ফ্লাইটে ৫৮ হাজার ১৪ জনসহ মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৮৩৫ জন হজ্বযাত্রী সৌদি আরব গেছেন। এছাড়া সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত বিমানের ৫টি ফ্লাইটে ১৯৯৫ জন এবং দুপুর দেড়টা থেকে রাত ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত সৌদি এয়ারলাইনসের ৯টি ফ্লাইটে ৩ হাজার ৬২৩ জন হজ্বযাত্রী সৌদি আরব যাবেন। বিমানের শেষ হজ্ব ফ্লাইট ঢাকা ছাড়বে আজ রোববার দিবাগত (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ৩টায়। আর সৌদি এয়ারলাইনসের শেষ হজ্ব ফ্লাইট ঢাকা ছাড়বে আগামীকাল সোমবার বিকাল সোয়া ৫টায়।

এদিকে, হজ্ব ফ্লাইট শেষ পর্যায়ে আসলেও ভিসাপ্রাপ্ত কয়েকশ হজ্বযাত্রী এয়ালাইনসের টিকিট পায়নি। তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এসব প্রতারিত হজ্বযাত্রীরা এখন রাজধানীর আশকোনা হজ্বক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা হজ্ব এজেন্সি মালিক বা গ্রুপ লিডারকে খুজে না পেয়ে হজ্বক্যাম্পে এসে চোখের পানি ফেলছেন।

গতকাল হজ্বক্যাম্পে দেখা গেছে, হজ্বক্যাম্পের প্রবেশদ্বারের পাশে বসে আছেন কিছুসংখ্যক হজ্বযাত্রী। তারা ভিসা পেলেও জেদ্দা যাওয়ার টিকিট পাননি। এসব অপেক্ষমাণ হজ্বযাত্রীদের মধ্যে কাঁদছিলেন আব্দুস সালাম নামের একজন হজ্বযাত্রী। জানতে চাইলে আব্দুস সালাম বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর থানায়। মো. সাইফুল ইসলাম নামের এক গ্রুপ লিডারের মাধ্যমে মদিনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল হজ্ব এভিয়েশনে হজের টাকা জমা দিয়েছি। ওই এজেন্সির মোট ১৬৫ জন হজ্বযাত্রী আছেন। আমাদের সব হজ্বযাত্রীর ভিসা হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট আমাদের হজ্বক্যাম্পে নিয়ে আসে গ্রুপ লিডার সাইফুল। এখানে আসার পর ভিসাপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে ৬৫ জনকে গত শুক্রবার সৌদি আরব পাঠানো হয়। এরপর নিজেরা কিছু টাকা খরচ করে শনিবার আরও ১০ জন চলে গেছেন সৌদি আবর। এখন বাকি ৯০ জন টিকিটের অপেক্ষায় আছি হজ্বক্যাম্পে। আমরা গ্রুড লিডার বা এজেন্সি মালিককে খোঁজে পাচ্ছি না। আমরা হজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। হজ্ব না করে বাড়ি ফিরে যেতে চাই না। আমাদের সৌদি আরব যাওয়ার টিকিট কে দেবেন? আমরা কখন যাবো? এসব নিয়ে খুবই উৎকণ্ঠায় আছি।

জামালপুরের বাসিন্দা শাহজাহান বলেন, আমরা মুফতি কামরুজ্জামানের কাছে হজ্ব পালনের জন্য ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দিয়েছি। আমাদের সবার ভিসা হয়েছে। আমাদের নাকি ফ্লাইট ২৮ আগস্ট ভোর ৬টায়। আমরা ভিসাপ্রাপ্ত ৩০ জন হজ্বক্যাম্পে আছি। এখনো আমাদের টিকিট দেওয়া হয়নি।

রাজশাহীর আমিনুল ইসলাম বলেন, হজ্ব পালনের জন্য আমরা রাজশাহীর আকবর ট্রাভেলসে ১০৬জন টাকা জমা দিয়েছি। আমাদের ভিসা হলেও জেদ্দা যাওয়ার টিকিট দেওয়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হজের টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়ে হজ্বক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে ইকো এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম ১৭৫ জন, মদিনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল হজ্ব এভিয়েশনের ১৬৫ জন, আকরব ট্রাভেলসের ১০৬ জন ও সাউথ এশিয়ানের ১৬ জনসহ আরও বেশ কয়েকটি এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হওয়া হজ্বযাত্রীরা।

এদিকে, ২০১৭ সালের হজ্ব ব্যবস্থাপনা ও হজ্বযাত্রী পরিবহন বিষয়ে জরুরি সাংবাদিক সম্মেলন করে হাব। সাংবাদিক সম্মেলনে হাব মহাসচিব এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, হজ্ব ব্যবস্থাপনার জন্য অনেকে হাবকে দায়ী করেছিলেন। হজ্ব ফ্লাইট বিপর্যয়ের মূল কারণ হচ্ছে- ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে বিলম্বে মোয়াল্লেম ফি পাঠানো, সৌদি সরকার কর্তৃক হঠাৎ করে ২০০০ রিয়াল ধার্য, শুরুতে ই-ভিসা প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা, ৯১টি এজেন্সির সময়মতো মোয়াল্লেম না পাওয়া এবং মদিনায় ৮ দিন থাকার বিধান মানার কারণে ফ্লাইটের তারিখ পছন্দমত নেওয়া। তবে হজ্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে সমস্যা হয়েছিল তার সমাধান হয়েছে। বেশ কিছু হজ্বযাত্রী ভিসা পেলেও জেদ্দা যাওয়ার টিকিট পাননি। এখন তাদের বিষয়গুলো সমাধান করা হচ্ছে। সব হজ্বযাত্রী যেন যেতে পারেন আমরা সেই চেষ্টা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ