শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

ঈদযাত্রা এবং বিপদজনক সড়ক-মহাসড়ক

পবিত্র ঈদুল আযহার প্রাক্কালে দেশের সব গণমাধ্যমই মানুষের বাড়ি ফেরা নিয়ে ভীতি ও আশংকা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। কোনো কোনো দৈনিকে ‘ঈদযাত্রা ভয় জাগাচ্ছে’ ধরনের শিরোনামও দেখা যাচ্ছে। একটি দৈনিক ‘ক্ষতবিক্ষত সড়ক-মহাসড়ক’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানিয়েছে, বৃষ্টি ও বন্যায় দেশের ৩৯টি জেলায় এক হাজার ১৭৭ কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন অবস্থার কারণ জানাতে গিয়ে দৈনিকটি লিখেছে, ক্ষমতাসীনদের নেকনজরে থাকা ঠিকাদাররা কাজের নামে চুরি করা ও ফাঁকি দেয়া ছাড়া কিছুই করেনি বলে এমনিতেই সকল সড়ক-মহাসড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে–ছিল। তার ওপর এসে গেছে বর্ষা। এবারের আষাঢ় ও শ্রাবণে দেশের সব অঞ্চলেই প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ভাদ্র মাসেও থেমে থেমে কম বৃষ্টি হয়নি। এখনো বৃষ্টি একেবারে বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের চোখে তাই ঘুম নেই। গত বুধবারও তিনি বলেছেন, বৃষ্টি-বাদল যদি অব্যাহত থাকে তাহলে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করা খুব চ্যালেঞ্জিং হবে। ওদিকে তার মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বলেছেন, আর যাতে বৃষ্টি না হয় সেজন্য তারা দোয়া বা মোনাজাত নয়, আল্লাহর কাছে ‘প্রার্থনা’ করছেন! বাস মালিকরাও পিছিয়ে থাকছেন না। এরই মধ্যে তারা সিদ্ধান্তের আকারে জানিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু রাস্তার অবস্থা খারাপ এবং যেহেতু ১০ ঘণ্টার দূরত্ব অতিক্রম করতে এখনই ২০/২৫ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে সেহেতু ঈদের সময় তারা বাসের সংখ্যা না কমিয়ে পারবেন না। আর বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ, ঈদে ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যাবে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই পরিস্থিতি অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেতুমন্ত্রী যখন ‘খুব চ্যালেঞ্জিং হবে’র আড়ালে নিজেদের অক্ষমতা সম্পর্কে জানান দেন এবং বাস মালিকরা যখন আগেভাগেই বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন আর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা আসলেও শোচনীয় শুধু নয়, বিপদজনকও হয়ে উঠেছে। বাস্তবেও বিগত দুই-আড়াই মাসের বৃষ্টি এবং তার পরপর শুরু হওয়া বন্যায় প্রায় সকল এলাকার সড়ক-মহাসড়কগুলো বহুস্থানে ভেঙে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে শত শত ছোট-বড় গর্ত ও খানা-খন্দকের। বহু এলাকায় ১২ থেকে ১৫/২০ ফুট পর্যন্ত জায়গা জুড়ে এখন গর্ত ও খানা-খন্দক। ইট-বালু-সিমেন্ট সরে যাওয়ায় এবড়ো-থেবড়ো হয়ে পড়েছে প্রতিটি সড়ক-মহাসড়ক। যাত্রী পরিবহন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রীতিমতো কুস্তি চলছে বিভিন্ন গন্তব্যের অভিমুখীন সড়ক-মহাসড়কে। দেড়-দু’ঘন্টার পথ হলেও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আজকাল সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত। 

যমুনা সেতু অভিমুখীন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। টাঙ্গাইলের দিকে সেতুর পূর্ব পাড়ে প্রায় তিন মাইল এলাকায় শুরু হয়েছে যমুনার ভাঙন। এর সঙ্গে রয়েছে আশুলিয়া এলাকায় গার্মেন্ট শ্রমিকদের ভাঙচুর ও অবরোধের সম্ভাবনা। বেতন-ভাতার দাবিতে ঈদের আগে যে কোনো মুহূর্তে আবারও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক বন্ধ করা হতে পারে। ওদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্পর্কিত খবরও ভীতিকর। এবড়ো-থেবড়ো ও বহুস্থানে ভেঙে যাওয়া এ মহাসড়কটিতে যানজট ইদানীং প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মাত্র পাঁচঘণ্টার পথ হলেও ১২/১৫ ঘণ্টার আগে এই পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।  সায়েদাবাদ থেকে সিলেট ও কুমিল্লাগামী বাসগুলোকেও বেশ কয়েক ঘণ্টার ফাঁদে আটকে থাকতে হচ্ছে। তারও আগে হানিফ ফ্লাইওভারে টোল আদায়ের নামে শত শত বাসকে যেতে হচ্ছে না। সেখানে প্রতিদিন অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের মধ্যে এমন বহু কিলোমিটার সড়ক রয়েছে যেগুলোর অবস্থা এত বেশি শোচনীয় যে, মোটামুটি চলাচলযোগ্য করে তুলতেও মেরামত করতে হবে অন্তত মাসখানেক সময় নিয়ে। এদিকে রাজধানীর ‘রাজপথ’গুলো সম্পর্কে কথা বলে নিশ্চয়ই সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না। বস্তুত এমন কোনো রাজপথের কথা বলা যাবে না, যা কোনোরকমেও স্বাভাবিক চলাচলের মতো অবস্থায় রয়েছে। যানজটে প্রতিদিন নাকাল হচ্ছে রাজধানীবাসী। এমনকি ছুটির দিনেও আজকাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সব ধরনের যানবাহনকে। 

এভাবে নাম ধরে ধরে উল্লেখে যাওয়ার পরিবর্তে এক কথায় বলা যায়, দেশের কোথাও কোনো সড়ক-মহাসড়কই যানবাহন চলাচলের উপযোগী নেই। কোনো কোনোটি শুধু খানা-খন্দকেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, যে কোনো সময় বন্ধ হওয়ার আশংকাও রয়েছে। এমন এক অবস্থার মুখে এসেই সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো তৎপর হয়েছে মাত্র দিন কয়েক আগে- প্রকৃতপক্ষে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসার পর। এটুকু নড়াচড়াও কর্তাব্যক্তিরা করতেন না, যদি গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তুমুল হইচই না করা হতো। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকেও ইদানীং দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যাচ্ছে। তাই বলে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী কোনো ব্যবস্থা কিন্তু নেয়া হচ্ছে না। কেবলই দায়সারা ‘মেরামত’ করা হচ্ছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতেই আবারও ‘মেরামত’ করার সুযোগ পাওয়া যায়! শুনতে খারাপ লাগলেও কথাটাকে হাল্কাভাবে নেয়ার অবকাশ নেই। কারণ, সকল ধরনের গবেষণা ও পর্যালোচনায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, সওজসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঠিকাদারদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকেন মন্ত্রী-এমপি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এখানে তাই ‘এক শ্রেণির’ ঠিকাদার বা ‘এক শ্রেণির’ কর্মকর্তা বলে কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। ঘুষ ও অবৈধ অর্থের লোভে সবাই আসলে পচে গেছে। এজন্যই কোনো কাজই ১০০ ভাগ দূরে থাকুক, ৫০/৬০ ভাগও নির্মাণকাজের নীতিমালা অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয় না। ইট-বালু-সিমেন্ট ও রডের মতো নির্মাণ সামগ্রীরও যথাযথ ব্যবহার হয় না। কিন্তু দোষ ও অপরাধগুলো ধরার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কেউ নেই। কারণ, এসব যাদের দায়িত্ব তারা নিজেরাই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন! কোটি টাকার অংকে ঘুষ লোনদেন হচ্ছে। এখানেও ‘এক শ্রেণির’ বলার সুযোগ নেই। দুর্নীতি আসলে সবাইকে গিলে খেয়েছে।

আমরা মনে করি, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর ব্যাপারে সরকারের উচিত জরুরিভিত্তিতে তৎপর হয়ে ওঠা। পবিত্র ঈদুল আযহার ধাক্কা সামাল দেয়ার জন্য এই মুহূর্তে মেরামত ছাড়া যেহেতু উপায় নেই সেহেতু মেরামত করা যেতে পারে কিন্তু সে মেরামত করতে হবে দ্রুত গতিতে। সময় স্বল্পতার ও ব্যস্ততার আড়াল নিয়ে এমনভাবে ফাঁকি দেয়া চলবে না যার ফলে দু’-চারদিনের বৃষ্টিতেই পুরো মহাসড়ক আবারও অচল হয়ে পড়বে। সরকারকে একই সঙ্গে যানবাহন চলাচলের ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি কম ঘটে। আমরা আশা করতে চাই, এবারের ঈদুল আযহা উপলক্ষে মানুষের যাতায়াতকে নিরাপদ করার ব্যাপারে সবদিক থেকেই সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ