শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রধান কোচ যদি নির্বাচক হন তাহলে...

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : দীর্ঘ ১১ বছর পর আবারো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে মাঠে নামতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রয়েল বেঙ্গল টাইগাররাও প্রায় একবছর পর মাঠে নামছে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে। স্টিভেন স্মিথের দলের বিপক্ষে মাঠ নামার আগে প্রথম টেস্টের দল নির্বাচন নিয়ে এক পশলা বিতর্ক হয়ে গেল। সেই বিতর্কটা মমিনুল হক সৌরভকে নিয়ে। শুরুতে দলে না থাকলেও প্রথম টেস্ট দলের ১৪ জনে ফিরেছেন মমিনুল। আর তিনি ফেরায় দল থেকে বাদ পড়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, চোখের যে পীড়ায় মোসাদ্দেক ভুগছিলেন তা থেকে প্রথম টেস্টের আগে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন কি না-তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাই সিরিজের প্রথম টেস্টে মোসাদ্দেক থাকছেন না। তার জায়গায় চলে এসেছেন মমিনুল। ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াল? গত ১৯ আগস্ট নির্বাচকরা জানালেন মমিনুল টেস্ট দল থেকে বাদ। পরদিন সন্ধ্যায় বিসিবি সভাপতি জানালেন মমিনুল টেস্টে ফিরেছেন। বাদ পড়েছেন মোসাদ্দেক! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে মমিনুলকে যে নির্বাচকরা দল থেকে বাদ দিতে চলেছেন সেটা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তারপরও একটা আশা ছিল, মমিনুলের যে টেস্ট রেকর্ড এবং টেস্ট ম্যাচের টেম্পারমেন্ট সেটা বিবেচনা করে নির্বাচকরা তাকে অন্তত ১৪ জনের দলে রাখবেন। কিন্তু হেড কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহেকে পাশে বসিয়ে প্রধান নির্বাচক দল ঘোষণার দিন জানিয়ে দিলেন-মমিনুল প্রথম টেস্টে নেই। কোচের সিদ্বান্তেই এমনটা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আর কেন মমিনুল বাদ? এই প্রশ্ন ছাড়া সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে মূলত আর অন্য কোনো প্রশ্ন পাত্তাই পেল না! মমিনুলকে বাদ দেওয়ার এ সিদ্ধান্তের পরপরই পুরো ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় এমন-একদিকে ক্রিকেটের নির্বাচক ও হেড কোচ এবং অন্যদিকে পুরো বাংলাদেশ! ক্রিকেট বোঝেন এমন একজনও কেউ টেস্ট দল থেকে মমিনুলের বাদ পড়াটা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই জোর দাবি ওঠে এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। খোদ বিসিবির মধ্যেই নির্বাচকদের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা ওঠে। দল ঘোষণার দিন সন্ধ্যায় বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও সংকট আঁচ করতে পারেন। মূলত মমিনুলকে দলে ফেরাতে তৎপরতা শুরু হয় তখনই। বিসিবি সভাপতি এ বিষয় নিয়ে চন্দিকা হাথুরুসিংহে এবং প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর সঙ্গেও কথা বলেন। সে বৈঠকেই মমিনুলকে ফিরিয়ে আনার নিজের সিদ্ধান্তের কথা তিনি জানিয়ে দেন। যেহেতু ঘরের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ, তাই দলের সদস্য ১৫ জন করেও তাকে রাখা যেত-এমন যুক্তিও তিনি সেই বৈঠকে নির্বাচকদের সামনে তুলে ধরেন। নির্বাচকরা ভুলটা মেনে নেন। পরে নতুন একটা উপায় বের করা হয়। মোসাদ্দেকের জায়গায় মমিনুল। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, চোখের যে পীড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন মোসাদ্দেক সেটা তার এখনও পুরোপুরি সারেনি। এ সমস্যার কারণেই তিনি চট্টগ্রামে অনুশীলন ম্যাচ মিস করেছিলেন। সেই সমস্যা দেখিয়ে মোসাদ্দেককে প্রথম টেস্টে নির্বাচকরা ‘বিশ্রামে’ পাঠিয়ে দেন।
এখন সন্দেহ নেই মমিনুলকে এভাবে দল থেকে বাদ দেওয়াটা ছিল নির্বাচকদের চরম একটা ভুল। তবে সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তারা পরে যে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা যে আরও বড় ভুল-সেই দাবিটা অন্তত আর কেউ না হোক, মোসাদ্দেক করতেই পারেন! প্রশ্ন হল-মোসাদ্দেক যে চোখের সমস্যায় ভুগছেন তা থেকে প্রথম টেস্টের আগে তার মুক্তির সম্ভাবনা নেই-এ বিষয়টা কি বিসিবির চিকিৎসকরা নির্বাচকদের জানিয়েছিলেন? উত্তর হল-অবশ্যই জানাননি। কারণ এমন কোনো আশঙ্কাই তারা যে করেননি। যদি করেই থাকতেন তাহলে অবশ্যই দল ঘোষণার আগে সেটা তারা নির্বাচকদের জানাতেন। আর যদি তারা জেনেও এ তথ্য না জানান-তাহলে তাদের দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। যতদূর জানা গেছে, কোনো জায়গা থেকে এমন কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। আসলে মমিনুলকে বাদ দেওয়াটা যে বড় একটা অন্যায় হয়ে গেছে, সেই অন্যায় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটা পথ খোঁজা হচ্ছিল। বেচারা মোসাদ্দেকের অনেক আগের সামান্য চোখের অসুখ নির্বাচকদের সেই পথ দেখিয়ে দিল! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন পথটা পিচ্ছিল! যে কায়দায় নির্বাচক প্যানেল (দুই নির্বাচক এবং হেড কোচ) মমিনুলকে দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন সেটা যে মোটেও ক্রিকেটীয় যুক্তিতে টিকে না-তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন স্বয়ং বিসিবি সভাপতি। তিনি বলছেন, ‘প্রথম টেস্টের দলে মমিনুলের না থাকাটা দুঃখজনক। ও বাদ পড়ার কোনো খেলোয়াড় হতেই পারে না। ওকে নিয়ে কারও চিন্তার কোনো কারণ নেই। ও দেশের সম্পদ। ওকে যথাযথ মূল্যায়ন যেন করা হয়, যথাযথ সুযোগ যেন দেওয়া হয় তা আমরা নিশ্চিত করব। ওকে আমরা টেস্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখেছি। ও যদি টেস্ট দলে না থাকে তাহলে তো খারাপ লাগবেই।’ প্রধান নির্বাচক এবং হেড কোচও ক্রিকেট কিছু কম জানেন না। তারপরও দেশের সর্বোচ্চ টেস্ট গড় যার সেই ব্যাটসম্যানকে মাত্র দুই টেস্টের পারফরম্যান্স বিবেচনা করে দল থেকে ছাঁটাই করে দেওয়া কেন? প্রশ্ন উঠতেই পারে তাহলে কি মমিনুল ব্যক্তিগতভাবে কারও রোষের শিকার? এই প্রশ্নেও অভিভাবক হয়ে বিসিবি সভাপতি মমিনুলের পাশে দাঁড়ালেন, ‘ওর বাদ পড়ার কোনো কারণ নেই। ও কেন বাদ পড়ল সেই ব্যাপারেও কথা বলেছি। ও আসলে এই সিরিজ বা এই ম্যাচের জন্য পরিস্থিতির শিকার হয়ে গেছে। মমিনুলের সঙ্গে কোচও কথা বলবে। আমি নিজেও কথা বলব। ওর মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই।’ দলে ফিরে মমিনুলের হয়তো এখন মন ভালো।
কিন্তু দলে থাকার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আবার এভাবে বাদ যাওয়ার ঘটনায় নিশ্চয়ই মোসাদ্দেকের মন ভালো থাকার নয়! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, নির্বাচকরা যে দল ঘোষণা করেছিলেন, সেই দল ঘোষণার কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে অনুমোদন করেছিলেন স্বয়ং বোর্ড সভাপতি। সেই তিনি অবাক গলায় জানালেন, মমিনুলের নাকি টেস্ট দলে না থাকার কোনো কারণ নেই। সিরিজ শুরুর আগে ভালোই নাটক দেখা যাচ্ছে, বিনা টিকেটে! এর আগে দল ঘোষনা নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। মমিনুলের সামগ্রিক যে ফর্ম জানুয়ারি থেকে সর্বশেষ শ্রীলঙ্কা সিরিজ পর্যন্ত, সেখানে ছয় ইনিংসে তার মাত্র একটা ফিফটি। এই পারফরম্যান্সের জন্যই মমিনুল দলে নেই।’ ব্যাখ্যাটা আরেকটু বিস্তারিত করলেন প্রধান নির্বাচক, ‘ও যে জায়গায় ব্যাট করছে সেই জায়গায় সৌম্য সরকার ও ইমরুল কায়েস ভালো করছে। সৌম্যর পেছনের আট টেস্টের চারটিতে ফিফটি আছে। গড় ৪৫.৭৫। এই কারণে মমিনুল বিবেচনায় নিচে চলে গেছে। এছাড়া ঘরের মাঠে ইমরুলের পারফরম্যান্স ভালো। সে তিনে খেলবে।’ আবারও প্রশ্ন, এবারও বিষয় মমিনুল! মমিনুলের কিন্তু দেশের মাটিতে রান গড় বেশ ভালো। দেশের মাটিতে সর্বশেষ টেস্টে একটা ম্যাচজয়ী পার্টনারশিপ ছিল তার। এবার খানিকটা বিরক্তই দেখাল প্রধান নির্বাচককে। দল নির্বাচনের সব দায়-দায়িত্ব যেন নিজের কাঁধে নিতে চাইছেন না তিনি। কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহে সেই শুরু থেকেই মমিনুলের ব্যাটিং নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে আসছিলেন। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে তাকে ব্যাট করতে পাঠানো হয় নয় নম্বরে! এ বাঁহাতিকে ওয়ানডে এবং টোয়েন্টি-২০’র ব্যাটসম্যানের তালিকা থেকে অনেক আগেই খারিজ করে দিয়েছেন কোচ। আর তাই চন্দিকার শাসনামলে মমিনুলের খেলার জায়গা ছিল শুধু একটাই-টেস্ট ক্রিকেট। কোচের সিদ্ধান্তে এখন সেটাও বন্ধ হওয়ার পথ ধরেছে! মমিনুল সম্পর্কিত আরেকটি তথ্য। তার টেস্ট গড় এখনও ৪৬.৮৮। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলে যারা খেলছেন অথবা বাংলাদেশের হয়ে অন্তত ২০টি টেস্ট ইনিংস যারা খেলেছেন সেই তালিকায় মমিনুলের টেস্ট গড় সবচেয়ে বেশি! তবুও তাকেই বাদ পড়তে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ