সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

চালকদের বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতায় মহাসড়কে বাড়ছে প্রাণহানি

ইবরাহীম খলিল : চালকদের বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতায় সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। কোন বাস কোনটাকে পেছনে ফেলে আগে যাবে এ নিয়ে রাত দুপুরেও চলে প্রতিযোগিতা। শুধু গাড়িতে থাকা যাত্রীরাই নন, বাসগুলোর এই প্রতিযোগিতার কাছে অসহায় সড়কপথে চলাচলকারী ছোট যানবাহন ও পথচারীরাও।
গবেষণা বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ। এই তথ্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই)। দুর্ঘটনার কারণ-সংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এআরআই এই চিত্র পেয়েছে।
১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ রয়েছে এআরআইয়ের। প্রতিষ্ঠানটি নিজেও বড় দুর্ঘটনাগুলো তদন্ত করে থাকে। তাদের গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটছে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে।
 বেসরকারি  সংস্থা ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেইঞ্জের গবেষণায় বলা হয়, ১০-১২টি কোম্পানির বাস সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বেশি। এই কোম্পানিগুলো হলো, বিআরটিসি বাস, শ্যামলী, হানিফ, এনা, সাকুরা ও ঈগল পরিবহন, আজমেরী, এশিয়া, বিহঙ্গ, পদ্মা লাইন, পারিজাতক ও তুরাগ পরিবহন।
গত ৪ মার্চ ২০১৭ এ ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ওপর ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কমিশন, ইউএনইসিই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে যান্ত্রিক যানের সংখ্যা মাত্র দু’টি। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। 
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রোডে চলা দূর পাল্লার বাসের চালকরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একে অন্যের সঙ্গে গতির প্রতিযোগিতা করছেন। এই গতির কারণে  বেড়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনার গতি। আর লাশ বৃদ্ধির গতি। 
 রাজধানীর মহাখালী, গাবতলী আন্তঃনগর বাসস্ট্যান্ডে এ বিষয়ে কথা হয় একাধিক চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারদের সঙ্গে। তারা দ্রুত গতিতে বাস চালানোর পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে যাত্রীদের চাপ সৃষ্টি গন্তব্যে যাওয়ার তাগাদা, চালকদের কারও কারও মাদক সেবন, মহাসড়কে ছোট যানগুলোর নিয়ম না মানা, সুদূর গন্তব্যে চালকদের আপ-ডাউন ড্রাইভিংয়ে বাধ্য করা, সিনিয়র ও অভিজ্ঞদের ডাইভারদের পেশাত্যাগের বিষয়টি বিশেষভাবে উলে¬খযোগ্য।
কারণ জানতে চাইলে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে চলাচলকারী পিংকী বাসের একজন চালক ও সুপারভাইজার বলেন, বাস দ্রুত চালানোর কয়েকটি কারণ। একটি হচ্ছে কোনও সড়কে ফেরি থাকলে, ফেরি ধরার তাড়া। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া। তবে রাত বিরাতে বেশি গতি দেওয়ার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে চালকদের মাদক সেবন।  আর নেশাগ্রস্ত থাকে বলেই রাতে-দিন এক সমান। সামনে-পেছনে না দেখেই খালি ওভারটেক করতে চায়। এ জন্য দুর্ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, সড়কে প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর হাজারো অভিযোগ আমরা পেয়েছি। মালিকরা তার গাড়িটি দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চালকদের ওপর চাপ দেন। আমরা এমন অভিযোগ প্রায় পেয়ে থাকি। মহাসড়কে একটি গাড়ির গতি ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার
তবে চালকরা বলছেন ভিন্ন কথা। দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানোর বিষয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে বসে কথা হয় এনা পরিবহনের চালক মো. বকুল, শাহ আলম, হানিফ খন্দকার ও একজন প্রবীণ চালকের সঙ্গে। প্রায় ১৫ বছর ধরে বাস ড্রাইভিং করি। এনা পরিবহনের আগে জলসিঁড়ি, সৌখিন পরিবহনের বাস চালিয়েছি। সড়কে দুর্ঘটনার পেছনে তার পর্যবেক্ষণ, গতির প্রতিযোগিতার জন্য না, সর্বপ্রথম যাত্রীদের গালাগালির কারণে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে হয়। এরপর প্রাইভেট কার। রাস্তার কোনও দিকে যেকোনও সময় কোনাকুনি করে গাড়ি রাখবে, লোকাল বাস সিগনাল ছাড়া, এন্ডিকাটার ছাড়া হঠাৎ করে বাস থামিয়ে দিলে আমাদের তখন কী করার থাকে? পাশ থেকে মন্তব্য করেন প্রবীণ একজন চালক বললেন, এখন আর অভিজ্ঞ আর সিনিয়র চালক নেই। এই যে, আমি মাসে তিনটা চারটা টিপ মারি।
তবে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতার বিষয়টি অস্বীকার করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, আসলে হাইওয়েতে প্রতিযোগিতা হয় না। হাইওয়ের পথ দীর্ঘ। বিষয়টা এমন নয় যে, সে একবার ট্রিপ দিয়ে আবার একটি ট্রিপের জন্য প্রস্তুত হবে। এছাড়া হাইওয়েতে চলাচলকারী যানবাহনগুলো অনেক দামি। কোনও মালিক তার চালককে বলবেন না প্রতিযোগিতা করতে। কারণ, তিনি চাইবেন না তার গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হোক। মালিকের যেমন তার গাড়িটির জন্য মায়া আছে, ঠিক চালকেরও তার জীবনের জন্য মায়া আছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট রোডে দুর্ঘটনার জন্য এনা পরিবহনকেই দায়ী করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শশই নামক স্থানে এনা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে অন্য একটি যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসচাপায় ৮ জন নিহত ও ১ জন আহত হন। হতাহতরা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলেন। নিহতরা সবাই বিয়ের যাত্রী ছিলেন। একই বছর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকায় এনা পরিবহনের বাসচাপায় মারা যান ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের ছোট ছেলে ডা. মুশফিকুর রহমান শুভ। বেপরোয়া গতির বাসটির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। চলতি বছরে একই পরিবহনের একটি বাসের নিচে পড়ে রাজধানীর খিলক্ষেতে প্রাণ হারান তিনজন।
জানতে চাইলে সড়কে দুর্ঘটনার কারণ উলে¬খ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ  বলেন, রাস্তার ত্রুটি, ড্রাইভারের ত্রুটি, হালকা-ধীরগতির গাড়ি, রোড ক্রসিং, ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ি, হাইওয়ের পাশে দোকানপাট-বাজার, বাড়িঘর, ওভার লোডিং, নসিমন-করিমন, অতিরিক্ত প্রাইভেট গাড়ি চলাচলের কারণেই দুর্ঘটনা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ