বুধবার ২৫ মে ২০২২
Online Edition

কালবৈশাখীতে রাজশাহীর জনপদে আমসহ ফসলের ব্যাপ ক্ষতি

রাজশাহী : কালবৈশাখী ঝড়ে পড়ে যাওয়া কাঁচা আম বাজারে বিক্রির অপেক্ষায়। বাঘার দৃশ্য -সংগ্রাম

রাজশাহী অফিস, চারঘাট, বাঘা ও তানোর সংবাদদাতা : গত রোববার রাতে সংঘটিত কালবৈশাখী ঝড়ে রাজশাহীর জনপদে আম ও উঠতি ধানসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৩০৮টি পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন সূত্র জানায়, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে রাজশাহীর ২ হাজার ৩০৮টি পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পরিবার প্রতি ৩০ কেজি করে চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। গত রোববার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা রাজশাহীর ওপর দিয়ে কালবৈশাখী বয়ে যায়। ঝড়ের সময় পাঁচ মিনিট বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার। রাজশাহীর বাঘায় কালবৈশাখী ঝড়ে প্রধান অর্থকরী ফসল আম, বোরো ধান বিনষ্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ঝড়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাঁচা আম গাছ থেকে পড়েছে। মিলিক বাঘা এলাকার ইদ্রিস আলী জানান, কালবৈশাখীর ঝড়ে ২৫ শতাংশ কাঁচা আম গাছ থেকে পড়ে গেছে। এর আগেও তিনদিনের ঝড়ে উপজেলায় প্রায় কোটি টাকার উপরে ক্ষতি হয়েছে। আম ব্যবসায়ী সুলতান আহম্মেদ দেড় টাকা কেজি হিসাবে ঝড়ে পড়া ৪ ট্রাক আম কিনে  প্রতি ট্রাকে ৩০০ মণ করে আম নেয়া গেছে। সেই আম ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করা হবে। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এবছর উপজেলায় ৭৩ হাজার ৫শত মেট্রিক টন আমের উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশী। রোববারের ঝড়ে আমের যে ক্ষতি হয়েছে তার মূল্য ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তানোরে ডুবছে ধান
গত শনিবার সন্ধ্যার আগে ও পরে চলে তীব্র বৈশাখী ঝড়। পরদিন রোববার হয় শনিবারের মতো ভয়াবহ ঝড়। আবার সোমবারেও ঝড়ে ল-ভ- হয়ে পড়ে সবকিছু। উপজেলার চাঁন্দুড়িয়া থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ, আমশো, গোল্লাপাড়া, কুঠিপাড়া, সিন্দুকাই, গুবিরপাড়া, ধানতৈড়, গোকুল, চাপড়া, তালন্দ এসব এলাকার জমির ধান ব্যাপক হারে ডুবেছে। এছাড়াও বিলের জমির ধান অন্যতম ভরসা কামারগাঁ ইউপি এলাকার কৃষকদের। তাদের বেশির ভাগ জমি বিলকুমারী বিলে। অকাল বন্যাতে এক সিকির মতো জমির ধান ডুবেছে বলে জানান ওই এলাকার আব্দুর রহিম। পৌর সদরের কৃষক মফিজ উদ্দীন জানান, ধানের আবাদ ঝেড়ে পোল্ট্রির ব্যবসা শুরু করেছি। কিন্তু বিলে রয়েছে ৩-৪ বিঘার মতো জমি। প্রতিটি জমির ধান ডুবেছে। ভাগ্যে জুটবে না কাক্সিক্ষত ফলন। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ মওসুমে উপজেলায় বোরো চাষ হয়েছিল ১৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবেছে। অবশ্য অনেক জমিতে পানি উঠেছে কৃষকরা কষ্ট করে সেই ধান কাটছেন। অন্যদিকে একাধিক কৃষক জানান, চান্দুড়িয়া থেকে কামারগাঁ পর্যন্ত নিম্নে হলেও ৮-৯ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবেছে।
মোহনপুরে তলিয়ে গেছে ধান
রাজশাহীর মোহনপুরে কালবৈশাখীতে বোরো ধান, চলতি মওসুমের ফসল, ঘরবাড়ি, পানবরজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গাছপালার ও আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার বিলকুমারি, বিলমাইল ও বিল হিন্না বিলের মওসুমের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান কালবৈশাখীর ঝড়ে মাটিতে পড়ে যায়। নিম্নাঞ্চলের ধান ভারি বর্ষণে ও উজান থেকে আসা পানিতে তলিয়ে যায়। মঙ্গলবার কৃষকদেরকে তলিয়ে যাওয়া আধা পাকা বোরো ধান কেটে নিয়ে আসতে দেখা যায়। গৌরাঙ্গপুরে সুলতান আলী নামে একজন কৃষক জানান, প্রতিবছর যে জমিতে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন হতো ১৮/২০ মণ। কিন্তু হঠাৎ করে কালবৈশাখী ঝড়, ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে বোরো ধান জলমগ্ন হওয়া বিঘাপ্রতি ধানের ফলন হচ্ছে ১০/১২ মণ। ফলন কম হওয়ায় ও ভেজা ধান রং বিকৃতির কারণে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ঝড়ে অসংখ্য বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লণ্ডভণ্ড, পানবরজ, গাছপালা ও আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মোহনপুর উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, ৮০ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, কালবৈশাখী ঝড়ে যেসব ধানে ফুল ঝরে গেছে, সেসব ধান চিটা হয়ে যাবে। এটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
চারঘাটে জনজীবন বিপর্যস্ত
পর পর দুই দিন ধরে কালবৈশাখীর তা-বে জনজীবন বির্পযস্ত হয়ে পড়ে রাজশাহীর চারঘাট এলাকায়। গাছপালা ভেঙে বিধস্ত হয়েছে বাড়ি-ঘর। ক্ষতির মুখে পড়েছে চারঘাট-বাঘার মওসুমি ফল আম ব্যবসায়ীরা। বিশেষত আমের ক্ষতি দেখে চাষি ও ব্যবসায়ীরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই। এতে অনেকেই আবারো ঋণের জালে বন্দী হওয়ার আশংকা করছেন। চারঘাট-বাঘার আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নাফ বলেন, রোববার-সোমবারের কালবৈশাখীর আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে চারঘাট-বাঘার অঞ্চল। গত দুইদিনে যে পরিমাণ আম ঝড়ে পড়েছে তা এক টাকা কেজিতেও কেউ কিনছেন না। ফলে ঝড়ে পড়া আম নিয়েও রয়েছে ব্যবসায়ীরা বিপাকে। ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে যারা ঋণ নিয়ে আমের মুকুল কিনেছিলেন তাদের ভিটেমাটি বিক্রি ছাড়া ওই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না বলে জানালেন তিনি। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চারঘাট উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় ইরি বোরো ধান ছিল সেগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিল ও মুগ কালাইয়ের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে বেশী ক্ষতি হয়েছে এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আমের। যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে ওঠা আম ব্যবসায়ী ও চাষিদের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ