শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

একদিনের পান্তা-ইলিশের বাঙালী নয় প্রয়োজন দেশপ্রেমিক সাচ্চা নাগরিক

মোঃ আমান উল্লাহ্ : বাংলা নববর্ষ তথা ১৪২৪ বঙ্গাব্দে আমরা পা রাখলাম। যথেষ্ট উৎসব মুখর পরিবেশে আমরা বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে থাকি। তবে এ কথা সত্যি যে, বাংলা নববর্ষের তাৎপর্য ও গুরুত্ব কিংবা ইতিহাস-ঐতিহ্যের ব্যাপারে আমাদের উপলব্ধি যে মাত্রায় তার চেয়েও অধিক মাত্রার আবেগ-উচ্ছ্বাস ও আনন্দ-উৎসবে আমরা তা পালন করে থাকি। আমরা যদি আমাদের জাতি-ধর্মের আলোকে নিজেদেরকে বিচার করি তাহলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে যে, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়া আমাদের জন্যে কোন ক্রমেই উচিত হবে না। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা নববর্ষের প্রেক্ষিতে আমাদের কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় তথা কার্যক্রম নিয়ে সামান্য আলোকপাত করতে চাই। প্রথমেই আমাদের জন্য করণীয় বিষয়গুলো এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরছি:
জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা: বাংলা নববর্ষই হোক কিংবা অন্য যে কোন বিশেষ দিবস পালন হোক না কেন আমাদের সকলেরই উচিৎ জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া। আমরা যদি জাতীয় ঐক্যের দিকে ধাবিত না হয়ে বিভক্তি সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসি তাহলে সেরূপ আচরণ কখনো দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করবে না। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, জোর-জবরদস্তি করে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলেই তা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না বরং এর প্রতিক্রিয়ায় গণবিস্ফোরন সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাই বেশী থাকে। আবার সাময়িক কোন প্রয়াস আমাদেরকে আবেগ তাড়িত করতে পারে কিন্তু তা ঐক্যের কোনরূপ সুদূরপ্রসারী ভিত্তি রচনা করতে পারে না। মোদ্দাকথা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শই কেবল ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া উচিত।
সুস্থ ও জীবন ঘনিষ্ঠ সংস্কৃতির লালন: নববর্ষ উদযাপনের নাম করে সংস্কৃতির নামে অনেকাংশেই অপসংস্কৃতি জাতির ঘাড়ে জেঁকে বসে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বিশেষ করে আমাদের তরুণ-যুব সমাজের মধ্যে যে উন্মাদনা তৈরী করে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। সংস্কৃতি চর্চার নামে অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনা আমাদের জীবন যাত্রাকে কতটুকো সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নেবে তা আমাদেরকেই ভাবতে হবে। ধার করা সংস্কৃতি নিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়- এই কথাটি সাধারণ গণমানুষ বুঝতে পারলেও আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে গিয়ে যেন বারবার হোঁচট খান। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলতে পারি যে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ডিশ লাইনে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো প্রদর্শন না করলেও আমাদের দেশের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান সৃষ্টিতে একদম ব্যর্থ হয়েছেন বলা যায়।
জাতীয় ঐতিহ্য ধারণ করা: ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি উন্নাসিকতা আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে- বাংলা নববর্ষে এই সত্যটি যেন আরো বেশী করে প্রতিভাত হয়ে উঠে। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, জাতীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কোন জাতি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বরং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীরাই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। মনে রাখতে হবে, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা করে মঙ্গল বয়ে আনা যায় না। বরং দেশ ও জাতির সত্যিকার মঙ্গলের জন্য আমাদেরকে আবারো অতীতের সোনালী ঐতিহ্যের দ্বারস্থ হতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নিঃস্বার্থ বাস্তবায়ন: নববর্ষ বছর ঘুরে আমাদের নিকট ফিরে আসে আবার চলে যায়। কিন্তু এমন একটি দিনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঞ্চার করে এরূপ কোন কার্যক্রম আমরা দেখতে পাই না। আর যা কিছু দেখতে পাই তা-ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম করে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির কার্যক্রম। অতএব, গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার, দেশাত্মবোধ- মুক্তিযুদ্ধের এসব চেতনার প্রতিষ্ঠা ব্যতিত আমাদের জাতীয় মুক্তির অন্য কোন উপায় নেই।
সুন্দর জীবন যাত্রার উন্মেষ ঘটানো: একটি সুন্দর ও শ্লীল জীবন যাত্রার উন্মেষ ঘটানোর জন্যে আমরা নববর্ষ উৎসবকে কাজে লাগাতে পারি। এজন্যে আমাদেরকে অশ্লীল আচার-অনুষ্ঠানগুলো বর্জন ও বন্ধ করতে হবে। এমনকি এক দিনের জন্যে বাঙালী হয়ে যাবার মহড়াও ত্যাগ করতে হবে। পক্ষান্তরে কৃষ্টি কালচারের দিক দিয়ে আমাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান আমাদেরকেই তৈরী করতে হবে এবং তা ধরে রাখতে হবে যে কোন মূল্যে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো একান্ত করণীয় মনে করে সেগুলো দায়িত্বের সাথে সম্পাদন করা আজ সময়ের দাবী। পক্ষান্তরে কিছু বর্জনীয় কাজ রয়েছে এ পর্যায়ে সেগুলো সংক্ষিপ্তরূপে তুলে ধরছি:
অনৈক্যের অপপ্রয়াস: বাংলা নববর্ষসহ বিশেষ দিবসগুলোকে ঐক্যের উৎস হিসেবে কাজে লাগানো তো হচ্ছেই না বরং জাতিকে সামগ্রিকভাবে দ্বিধা বিভক্ত রাখতে বিভিন্নমুখী অপপ্রয়াস পরিচালিত হচ্ছে। এ লক্ষ্যে চলছে অপপ্রচারের তোড়জোড় ও মিথ্যার বেসাতী। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অনৈক্যের পথকে পাকাপোক্ত করতে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে হেন জুলুম-নির্যাতন নেই যা প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তবে জাতির সচেতন মানুষেরা যদি তাদের আদর্শে অটুট ও অটল থাকে তাহলে নিকট ভবিষ্যতে কোনও একদিন ঐক্যের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠবেই।
ভিনদেশী অপসংস্কৃতির চর্চা: কোন কিছু ভিনদেশী হলেই তা নিন্দনীয় নয়। কিন্তু ভিনদেশী অপসংস্কৃতি যদি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিতে চায় তাহলে তাকে নিন্দা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে ভিনদেশী সংস্কৃতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজাতীয় সংস্কৃতি বিধায় একে আমরা কোনক্রমেই লালন করতে পারি না বরং তা একেবারেই পরিত্যাজ্য। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আমাদের দেশে অনেক বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে যা অতীতে ছিল না। হিংস্র প্রাণীর মুখোশ পরা, উল্কি আঁকা, ঢাক পেটানো- এগুলো আমাদের সামগ্রীক সংস্কৃতির সাথে মোটেই সংশ্লিষ্ট নয়। এ সবের মূলোৎপাটনে জোরদার ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা একান্ত প্রয়োজন।
ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলী দেয়া: ইতিহাস-ঐতিহ্য আমাদের জীবন পথের দিশারী। কিন্তু আধিপত্যবাদী শক্তির সেবাদাসেরা পথের দিশা ভুলে গিয়ে যেন গোলামীর জীবনকেই নিজেদের জন্য বেছে নিতে চায়। বাংলা নববর্ষে আমাদের ব্যবহারিক জীবনে যত কাহিনীই রচিত হোক না কেন এ নববর্ষ আমাদেরকে এ কথাও মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলী দেয়ার পরিণাম ফল কখনো শুভ হয় না, হতে পারে না। বিষয়টি আমরা যত গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবো, সমাজের জন্য ততই কল্যাণকর বিবেচিত হবে।
দেশাত্মবোধ বিসর্জন: দেশাত্মবোধের আজ বড়ই অভাব। মনে হচ্ছে এ জাতির লোকেরা দেশাত্মবোধ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে। অথচ আমার জানামতে দেশাত্মবোধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা। বাংলা নববর্ষ আমাদের হারিয়ে যাওয়া দেশাত্মবোধ জাগাতে সাহায্য করবে যদি আমরা দেশাত্মবোধ তথা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে নতুন একটি সমাজ গড়ার পথে নিজেদেরকে সচেষ্ট রাখি। এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, এ দেশে অনেক জাতি-ধর্মের ব্যক্তিগণ বর্তমান রয়েছেন এবং কেবলমাত্র দেশাত্মবোধই তাদেরকে একসূত্রে গ্রথিত করতে পারে।
অশ্লীলতা-বেহায়াপনা: এ কথাটি আমরা বারবার উল্লেখ করছি। কেননা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা নানারূপে এসে কোন জাতিকে বিশেষ করে তরুণ সমাজকে পঙ্গু করে দেয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেটা হতে পারে কোন মোবাইল ফোনের রাত-জাগা অফার কিংবা ডিশ লাইনের যথেচ্ছা ব্যবহার কিংবা ইন্টারনেটে ফেসবুকের অপব্যবহার ইত্যাদি মাধ্যমে। অতীব দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি এসবের অপব্যবহারের দরুণ যুব-চরিত্র ধ্বংসের এমনই আকার ধারণ করেছে যে, আজ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে স্তরে স্তরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত কোন কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন ব্যতিত এহেন অবস্থা থেকে মুক্তির আর কোন উপায় নেই।
পরিশেষে কেবল একদিনের জন্য পান্তা-ইলিশের বাঙালী কিংবা রমনা বটমূলের বাঙালী হওয়া নয় বরং দেশপ্রেমিক সাচ্চা নাগরিক হিসেবে আমরা যাতে আমাদের করণীয় কাজ সম্পাদন করে এবং বর্জনীয় কাজসমূহ পরিত্যাগ করে জাতির ভবিষ্যত বিনির্মাণে যথাযথ ভুমিকা রাখতে পারি- সেই কামনাই করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ