বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ঐতিহ্য ভুলে বাংলা নববর্ষ এখন অপসংস্কৃতির উৎসবে পরিণত হয়েছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ১৪ই এপ্রিল। ইংরেজী এই তারিখটার সাথেই মিশে আছে একটি নতুন বছরের পদার্পণ। বাংলা নববর্ষ। বছর ঘুরে আবার দিনটি এসেছিল পেলে আসা জীবন পাতার হিসেব মিলানোর জন্য। অতীতের সকল গ্লানি ও অন্যায়কে ভুলে গিয়ে নতুন করে সত্যের পক্ষে চলার জন্য। কিন্তু আমরা সেটা না করে হারিয়ে যাই নানান অপসংস্কৃতিতে। আমরা ভুলে যাই, বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষপঞ্জির সাথে জড়িয়ে থাকা মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। আমরা বাংলা নববর্ষে নতুন বছরকে বরণ করার নামে বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে যে দৃশ্য দেখি তাতে মুসলিম নয়, প্রতিফলিত হয় পৌত্তলিক সংস্কৃতির নানান আচার অনুষ্ঠান। অথচ এ কথা কারো অজানা নয়,  হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে, বাংলা  বর্ষপঞ্জি ১৫৮৪ ঈসায়ী বা খ্রিষ্টাব্দে দিলীর সম্রাট আকবর এর প্রবর্তন  করেছেন। এই দিন সম্রাট  আকবর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।  তার সিংহাসনে আরোহণের ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এ দিন থেকে গণনা শুরু করা হয়। তখন এ নতুন সালের  নাম ছিল তারিখ-ই-এলাহী। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন আকবরের এ বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখা এবং রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে এ নতুন সনের প্রবর্তন করা হয়। এছাড়া নববর্ষ একজন সচেতন মানুষ এই চিন্তা করাতে পারেন যে, গত এক বছরে সমাজ ও ব্যক্তি-জীবনে যে পরিবর্তন বা উন্নতি হওয়ার কথা ছিল তা সাধিত হয়েছে কি-না। যদি উন্নতি কিছু ঘটে থাকে তাহলে আরো উন্নতি কিভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবতে শেখায়। আর যদি উন্নতি না হয়ে থাকে তাহলে কেন অবনতি ঘটলো এবং কি কি সংস্কার আনা উচিত তা নিয়ে ভাবতে উব্ধুদ্ধ করে। নববর্ষের সেই অতীত ঐতিহ্য ভুলে এখন এটি একটি চাঁদাবাজির উৎসবেও পরিণত হয়েছে। এবারোও দেশব্যাপী বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়েছে বর্ষবরণকে সামনে রেখে। এর সাথে মূলত ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরাই বেশী জড়িত ছিলো বলে অবিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, পহেলা  বৈশাখকে কেন্দ্র করে এবার বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়েছে। চাঁদাবাজি শুধু রাজধানী ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দেশজুড়েই বিস্তার লাভ করেছে এই সামাজিক ব্যাধি। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ বড় বড় শহরেও চলেছে পহেলা বৈশাখের ব্যাপক চাঁদাবাজি। রাজধানী ঢাকাসহ এসব মহানগরীর বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও এর অঙ্গ সংগঠনসহ সন্ত্রাসী-মাস্তানরাও নেমে পড়েছে এই নীরব চাঁদাবাজিতে।
বৈশাখী মেলা, উৎসব, শোভাযাত্রা, অনুষ্ঠান ও আপ্যায়নের নাম করে তারা শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিবিদদের কাছে হানা দিচ্ছে। চাঁদাবাজদের নীল থাবা থেকে বাদ পড়েনি শপিং মল, সুপার মার্কেট, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, গার্মেন্ট ও পরিবহন মালিক, ঠিকাদার ও কাঁচাবাজারও। ফুটপাতের হকাররাও বাদ যায়নি। কুৎসিত এই চাঁদাবাজির থাবা থেকে। ২০০ টাকা থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি হয়েছে। হুমকি-ধমকি ও জোরজুলুমও হয়েছে বহু ক্ষেত্রে। কিন্তু কেউ মুখ খুলে বৈশাখী চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করে না, ভয় পায়। জানা গেছে, এখন অমুক তমুক সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকসহ কর্মকর্তাদের নামেই চাঁদাবাজি হয়। কোনো কোনো সংগঠনের কর্মকর্তারা নিজেরাই চাঁদা তুলে নিজেদের আখের গুছিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে, বাংলা সনের উৎপত্তির ইতিহাসটাও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলা সনের উৎপত্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ধর্ম, সংস্কৃতি, উৎপাদন ও কৃষক সমাজের প্রসঙ্গ চলে আসে। নতুন বছরে মানুষের মনে জাগে নতুন আশাবাদ। গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন আয়োজনে থাকে সমৃদ্ধ। কিন্তু এখন বৈশাখ উপলক্ষে খুব ঘটা করে বের করা হয় মঙ্গল-শোভাযাত্রা। বিশাল আয়োজনের এ শোভাযাত্রায় ময়ূর, পেঁচা, কুমিরসহ নানা পশু-পাখির প্রতিকৃতি ও মুখোশের সমাবেশ ঘটানো হয়। এই মঙ্গল মিছিলের যে রূপ ও আবহ তা গ্রামবাংলার ব্যাপক জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মিলে না। কৃত্রিম এ শোভাযাত্রায় বিশেষ ঘরানার রাজনৈতিক চেতনাও লক্ষ্য করা যায়, যা সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে যায় না। আর যে বিষয়টি প্রকট হয়ে ধরা পড়ে তা হলো, এদেশের ৯০ ভাগ মুসলমানের মনে আলাহর একত্ববাদ বা তাওহিদের যে চেতনা, তার বিপরীত ধারায় পরিচালিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। মঙ্গল শোভাযাত্রায় পশু-পাখির যে প্রতিকৃতি বা মুখোশ তার সাথে টোটেম-বিশ্বাসের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পশু-পাখির প্রতিকৃতি বা মুখোশের মাঝে কোনো মঙ্গল বা কল্যাণ খুঁজে পায় না। সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসেও বলা হয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কহীন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ একসময়ে বিভিন্ন পশু-পাখিকে পূজা করতো এবং তাদের কাছে মঙ্গল বা কল্যাণ ভিক্ষা করতো। তাহলে তাদের আবার মঙ্গল-শোভাযাত্রার মাধ্যমে পেছনের দিকে ডাকা হচ্ছে কেন? পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, এদেশের ইসলামবিদ্বেষী কিছু মানুষ সরাসরি ইসলামের তাওহিদ বা ‘একত্ববাদ’ চেতনার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস না পেলেও নববর্ষ উপলক্ষে বাঙালিয়ানার নাম করে পশু-পাখির প্রতিকৃতি নিয়ে মঙ্গল-শোভাযাত্রার আড়ালে ভিন্ন সংস্কৃতির একটি মিশ্রণ ঘটাবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কৌশলে।
কোন কিছু ভিনদেশী হলেই তা নিন্দনীয় নয়। কিন্তু ভিনদেশী অপসংস্কৃতি যদি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিতে চায় তাহলে তাকে নিন্দা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে ভিনদেশী সংস্কৃতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজাতীয় সংস্কৃতি বিধায় একে আমরা কোনক্রমেই লালন করতে পারি না বরং তা একেবারেই পরিত্যাজ্য। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আমাদের দেশে অনেক বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে যা অতীতে ছিল না। হিংস্রপ্রাণীর মুখোশ পরা, উল্কি আঁকা, ঢাক পেটানো- এগুলো আমাদের সংস্কৃতির সাথে মোটেই সংশিষ্ট নয়। এ সবের মূলোৎপাটনে জোরদার ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা একান্ত প্রয়োজন। বাংলা নববর্ষে আমাদের ব্যবহারিক জীবনে যত করুণ কাহিনীই রচিত হোক না কেন এ নববর্ষ আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলী দেয়ার পরিণাম ফল কখনো শুভ হয় না, হতে পারে না। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মঙ্গল ও কল্যাণের যে কথা প্রচার করা হয়, তার প্রভাব এই শোভাযাত্রার সমর্থকদের অনেকের মধ্যেই তেমন লক্ষ্য করা যায় না। যদি মঙ্গলশোভা যাত্রার মাধ্যমে আমাদের অজাচার, অনাচার দূর হতো তাহলে বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসবকে কেন্দ্র করে হামলা, শীলতাহানি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটতো না।  
এরই মধ্যে দেশব্যাপী পালিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। পান্তা-ইলিশ খাওয়া থেকে বৈশাখী মেলায় ঘুরে বেড়ানো পর্যন্ত সবকিছুই হয়েছে। তবে এবার ইলিশের দাম বেশী হওয়ায় অনেকে ভিন্ন আমেজে দিনটি পালন করেছে। অনেকে নতুন কাপড়-চোপড়ও কিনেছে। সব মিলিয়ে বিশেষ করে শহুরে অবস্থাপন্নদের জন্য এবারের পহেলা বৈশাখ আনন্দের একটি দিনে পরিণত হয়েছে। তবে দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈশাখের আনন্দে তেমন দেখা যায়নি।
রাজধানীতে নববর্ষের উৎসব হয়েছে রমনার বটমূলে। সেখানে পান্তা-ইলিশ ভোজনের মধ্য দিয়ে বাঙালিয়ানা দেখানোর বিলাসিতা করেন এক শ্রেণীর মানুষ। তারা পহেলা বৈশাখকে বেছে নিয়েছেন টাকা দেখানোর এবং বিলাসিতা করার উপলক্ষ হিসেবে। অথচ পান্তা-ইলিশ খাওয়া কখনো গ্রাম বাংলার তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ছিল না। গ্রাম বাংলার কোনো অঞ্চলেই বছরের এ সময়ে ইলিশ পাওয়া যায় না। এটা ইলিশের মওসুমও নয়। বরং ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। তারা পান্তা খায় নুন- পেঁয়াজ আর শুকনো মরিচ দিয়ে। সেটাও খায় বাধ্য হয়েÑ ভালো কিছু খাওয়ার উপায় নেই বলে। একটু অবস্থাপন্নরা হয়তো সঙ্গে সবজি ও ছোট মাছ খায়। কিন্তু কেউই ইলিশ খায় না, পায় না বলে খেতেও পারে না।
সারা পৃথিবীতেই নানা রকমের আয়োজনে নববর্ষ পালিত হয়। ইংরেজী আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ায় ইংরেজী নববর্ষটার আয়োজন থাকে মহা ধুমধামের। সেদিন উৎসাহীগণ সারা পৃথিবীকেই কাঁপিয়ে দিতে চায়। সেদিন পৃথিবীতে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় করা হয়। সেদিন অভিজাত শ্রেণীর অনেক যুবক-যুবতী নানান ধরনের আপত্তিকর অপকর্মে লিপ্ত হয়। আমাদের দেশে জাতীয়ভাবেই বাংলা নববর্ষ পালিত হয়। এটার রেওয়াজ বহু পুরনো। বর্তমান সময়ে নববর্ষ পালনের নামে যা হচ্ছে- তা অতি বাড়াবাড়ি। এটা এখন সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারায় নেই। এখন এটা হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক। সারা বছর যারা শাহী খাবার খেতে অভ্যস্ত তারা সেদিন রাস্তা-ঘাটে, হোটেল-রেস্তোরায় পান্তা খেয়ে গরিবদের সাথে উপহাসই করছে। সেদিন পান্তা বিক্রির ধুম পড়ে যায়। এবার নতুন বছরটি যখন শুরু হলো তখন দেশে চলছে গণতন্ত্রের নামে একদলীয় শাসন। যেখানে আজ গণতন্ত্র মৃতপ্রায়। কেউই এখন নিরাপদ নয়। কথায় কথায় বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের জীবন ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে।
মুছে যাক সব গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে দেহে প্রাণে শুচি হোক ধরা।/ রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,/ আনো, আনো, আনো তব প্রলয়ের শাঁখ/ মায়ার কুজঝটি-জাল যাক দূরে যাক।’ বৈশাখকে এভাবেই ধরাতলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চৈত্রের রুদ্র দিনের পরিসমাপ্তি শেষে বাঙালির জীবনে শুরু হয় সবচেয়ে আনন্দের এবং মহিমান্বিত ক্ষণ। বাংলা ১৪২৩-এ সেই আনন্দ যে একেবারেই বিলীন হয়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। জনমনে নেই বাঁধভাঙা উল্লাস। ১৪২২-এর আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে নতুন পথচলার জন্য আরো কতকাল যে অপেক্ষা করতে হবে তা কে-ই বা জানে।
ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ