শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

পাবনায় পিয়াজের বাম্পার ফলন শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি

বেড়া (পাবনা) শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত পিয়াজের স্তূপ। ছবিটি করমজা চতুরহাট থেকে তোলা -সংগ্রাম

আবুল কালাম আজাদ, বেড়া (পাবনা): পাবনা জেলায় এবার পিয়াজের আশাতীত ফলন হয়েছে। জমি থেকে পিয়াজ ও পিয়াজবীজ সংগ্রহ চলছে পুরোদমে। কৃষাণ-কৃষাণীদের দম ফেলার সময় নেই। তারা পিয়াজের ডাঁটাকাটা ও বাছাইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। হাট-বাজারে প্রচুর নতুন পিয়াজ আমদানি হচ্ছে। প্রতিমণ পিয়াজ মানভেদে ৭০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করে চাষিরা খুশি। আবার পিয়াজ হাটে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র, চাষিরা শিলাবৃষ্টিতে আধাপচা পিয়াজ প্রতিমণ বিক্রি করছেন ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা দরে। এই পিয়াজের ক্রেতা সাধারনত স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীরা। অনেক চাষি পিয়াজ বিক্রি করতে না পিরে আধাপচা পিয়াজ হাটেই ফেলে দিয়ে যাচ্ছেন।
এমন দৃশ্য দেখা গেছে, পাবনার বেড়া, কাশিনাথপুর, বোয়ালমারি, বনগ্রাম, আতাইকুলাসহ অন্যান্য হাটে। এদিকে পঁচা পিয়াজের ঝাঁঝাঁলো গন্ধে হাটবাজারে আশপাশের এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, পাবনা জেলায় গত বছরের চেয়ে পিয়াজ এ বছর প্রায় ১১ হাজার ২০৪ হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ হয়েছিল। পাবনার সুজানগর উপজেলায় ১৮ হাজার হেক্টরে দুই লাখ ৪৩ হাজার টন, সাঁথিয়ায় ১৬ হাজার হেক্টরে দুই লাখ ১৬ হাজার টন, পাবনা সদরে পাঁচ হাজার হেক্টরে ৬৭ হাজার ৫০০ টন, ঈশ্বরদীতে দুই হাজার ২১০ হেক্টরে ২৯ হাজার ৮৩৫ টন, বেড়ায় দুই হাজার হেক্টরে ২৭ হাজার টন, ফরিদপুরে এক হাজার ১০০ হেক্টরে সাড়ে ১৪ হাজার ৮৫০ টন, চাটমোহরে এক হাজার ১০০ হেক্টরে সাড়ে ১৪ হাজার ৮৫০ টন, ভাঙ্গুড়ায় এক হ্াজার হেক্টরে ১৩ হাজার ৫০০ টন ও আটঘরিয়ায় এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সাড়ে ২০ হাজার ২৫০ টন পিয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছিল। প্রায় ৪৭ হাজার ৯২২ হেক্টর জমিতে পিয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রতি হেক্টরে গড়ে সাড়ে ১৩ টন হিসেবে প্রায় ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৯৪৭ টন। তবে আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবছর পিয়াজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৪ টন হিসেবে পিয়াজ উপাদন হয়েছে ৬ লাখ ৭১ হাজার টন। তবে প্রাকৃতিক দূর্যোগে বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার টন পিয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে।
জানা যায়, সম্প্রতি সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় হালকা বৃষ্টির সাথে ভারি শিলাপাতে  জমির পিয়াজ, পিয়াজবীজ, রসুন, আলু, কাউন, শসা, বাদাম, সাজনা, গম, জব, মরিচ, পটল, বেগুন, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, বাঙ্গি, তরমুজ, করলা, লাউসহ বিভিন্ন উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ২০ মিনিট স্থায়ী ভারি শিলাপাতে দু’টি উপজেলায় ৪ হাজার ১০২ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল প্রায় সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে। এরমধ্যে সাঁথিয়া উপজেলায় ২ হাজার হেক্টর জমির পিয়াজ, ১০৬ হেক্টরের পিয়াজবীজ, ৯৬ হেক্টরের রসুন, ২৭০ হেক্টরের গমসহ অন্যান্য ফসল ১৫৫ হেক্টর, বেড়া উপজেলায় ৫০০ হেক্টর জমির পিয়াজ, ২৬ হেক্টরের পিয়াজবীজ, ৫০ হেক্টরের রসুন, ৪০০ হেক্টরের গম এবং ৫০০ হেক্টরের অন্যান্য ফসল বিনষ্ট হয়েছে। ভারতীয় পিয়াজের কারণে এ অঞ্চলের কৃষকদের মুলকাটা পিয়াজে ব্যাপক লোকসান দিতে হয়েছে। শিলাবৃষ্টিতে পিয়াজ, পিয়াজবীজ, রসুনসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি তাদের মেরুদ- ভেঙে দিয়েছে।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বিলমহিষারচর, কোনাবাড়ী, শরিষা, ভিটাপাড়া,, হাড়িয়া, ডহরজানি, বিলসলঙ্গি, হাড়িয়াকাহন, চরপাকুরিয়া, গৌরিগ্রাম, সাতানিরচর, পুরানচর, গোপিনাথপুর, পুন্ডুরিয়া, সৈয়দপুর, কালাইচড়া, বাউসগাড়ী, পাথাইলহাট, নাগডেমরা, সেলন্দা, মনমথপুর, ছেঁচানিয়া, সোনাতলা, ধুলাউড়ি, বায়া, করমজা, কড়িয়াল বেড়া উপজেলার হাতিগাড়া, বরশিলা, চাকলা, দমদমা, পায়না, হাটুরিয়া, পিচাকোলা, চরপেঁচাকোলা, চরনাগদা, কৈটোলা, রাকশা, বাটিয়াখড়া, বকচর, সোনাপদ্মা, মাসুমদিয়া গ্রাম সরেজমিন ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বেড়া ও সাঁথিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল পিয়াজ। সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টিতে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির প্রায় ৩৪ হাজার টন পিয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। এই পিয়াজ প্রতিমণ ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অনেকে ক্রেতা অভাবে পিয়াজ বিক্রি করতে না পিরে হাটেই ফেলে দিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় ১৩২ হেক্টর জমির পিয়াজবীজ মাটির সাথে মিশে গেছে। রসুনের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ হাজার টন। আধাপঁচা পিয়াজ ও রসুনের ক্রেতা সাধারনত স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী। তারা ভাল পিয়াজ ও রসুনের সাথে আধাপচা পিয়াজ রসুন মিশিয়ে বিক্রি করছেন। পাবনার প্রধান প্রধান হাট-বাজারে পচা পিয়াজের ঝাঁঝাঁলো গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
বেড়া উপজেলার খাকছাড়া গ্রামের কৃষক আজাহার প্রামানিক জানান, সে এবার ৩ বিঘা জমিতে পিয়াজ আবাদ করেছিলেন। বাম্পার ফলেনের আশায় দিন গুনছিলেন। কিন্তু তার শ্রমে-ঘামে ফলানো কষ্টের ফসল পিয়াজ ঘরে তুলতে পারেননি। গত ১৭ মার্চ বিকেলে মাত্র ২০ মিনিটের শিলাবৃষ্টিতে তার ক্ষেতের ফসল লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সেই সাথে ভেঙে যায় তার সব আশা স্বপ্ন। এখন ক্ষেতের পিয়াজ পঁচে গেছে। এখন কিভাবে মাহাজনের ঋণশোধ করবেন এ চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এমন ক্ষতির শিকার হয়েছেন সাঁথিয়া বেড়া অঞ্চলের শত শত পিয়াজ চাষি। বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুরহাটে পিয়াজ বিক্রি করতে আসা সাঁথিয়া উপজেলার কৃষক পুলক বলেন, তিনি এবার ১০ বিঘা জমিতে পিয়াজ আবাদ করেছিলেন। আশা করেছিলেন ৫০০ মণের বেশি পিয়াজ পাবেন। জমিতে পিয়াজ তুলতে গিয়ে দেখেন প্রায় সব পিয়াজ পঁচে গেছে। মাত্র ৪০ মণ আধাপঁচা পিয়াজ পিয়েছেন। চতুরহাটে ৫০ টাকা দরে ৪ মণ পিয়াজ বিক্রি করেছেন। অবশিষ্ট পিয়াজ বিক্রি করতে না পিরে হাটের পাশে খালে ফেলে দিয়েছেন।
শালঘর ভবানীপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক জানান, সে এবার আড়াই বিঘা জমিতে পিয়াজবীজ আবাদ করেছিল। আবাদে তার খরচ হয়েছে প্রায় পিৗণে ৩ লাখ টাকা। নজিরবিহীন শিলাপাতে তার ক্ষেতের পিয়াজবীজ (কদম) মাটির সাথে মিশে গেছে। এ ফসল থেকে একটি টাকাও পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবাদের পুরো টাকাই লোকসান হয়েছে।
এমন দূরাবস্থা শুধু মাহাতাব ও রাজ্জাকের নয়, সাঁথিয়া উপজেলার প্রায় প্রতিটি কৃষকই কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ উপজেলায় চলতি মওসুমে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে পিয়াজ আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার টন। কৃষি বিভাগ ও কৃষকেরা বাম্পার ফলনের আশা করেছিলেন। সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টিতে বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার টন পিয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ (খামারবাড়ী) অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার এ প্রতিবেদককে জানান, এবার পিয়াজ বীজের মান ভাল ছিল। চলতি বছর পাবনা জেলায় ২৫ হাজার কৃষক ফরিদপুরি, তাহেরপুরী ও মিটকা জাতের পিয়াজ আবাদ করেছেন। তবে তাহেরপুরী জাতের আবাদ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৪৭ হাজার ৯২২ হেক্টর জমিতে পিয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রতি হেক্টরে গড়ে সাড়ে ১৩ টন হিসেবে প্রায় ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৯৪৭ টন।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পিয়াজ উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ১৪ টন। তবে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টিতে অন্যান্য ফসলের সাথে পিয়াজ ও পিয়াজবীজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ