বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর বেসরকারি পাটকলগুলো বন্ধ করে দিচ্ছেন মালিকরা

খুলনা অফিস : খুলনার শিল্পাঞ্চল নামে খ্যাত মীরেরডাঙ্গা ও শিরোমনি শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানা জুট মিল একে একে বন্ধ হয়ে শিল্পাঞ্চলটি এখন মৃত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। নতুন মজুরী কাঠামো ঘোষণার পর থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলগুলোর মালিক কৌশলে শ্রম আইন লঙ্ঘন করে একে একে মিলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। আইনের কোন তোয়াক্কা না করে এ অঞ্চলের হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষকে চাকরিহারা করা হয়েছে। শ্রমিকদের পাওনা শত শত কোটি টাকা পরিশোধ না করে দিনের পর দিন বন্ধ করে রাখা হয়েছে মিলগুলো। পাওনা টাকা না পেয়ে এবং মিলগুলো দিনের পর দিন বন্ধ থাকায় শ্রমিক পরিবারগুলো অনাহারে, অর্ধাহারে, বিনা চিকিৎসায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে কোন আন্দোলন সংগ্রাম সফল হয়নি আর এর জন্য এক শ্রেণির সুবিধাবাদী শ্রমিক নেতাকে দায়ী করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
বর্তমান সরকার, সরকারি ও বেসরকারি মিলের শ্রমিকদের বেতন কাঠামো ৫৬০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে দুই হাজার ৭০০ টাকা করায় ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলগুলোর মালিকগণ শ্রমিকদের মজুরী কাঠামো বৃদ্ধির ফলে কৌশলে একে একে মিলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর পরই দেখা গেলো মালিক পক্ষ সরকারি সিদ্ধান্তকে কৌশলে দীর্ঘদিন এড়িয়ে সম্পূর্ণ শ্রম আইন লঙ্ঘন করে মিলগুলো বন্ধ করে রেখেছেন। জুট মিলসগুলোতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৩ সালের ২১ মে পর্যন্ত মাত্র ৫৬০ টাকা বেসিকে কাজ করতো শ্রমিক-কর্মচারীরা। বর্তমান বাজারের দ্রব্যমূল্যের সাথে কিছুটা সঙ্গতি রেখে সরকার শ্রমিকদের নতুন মজুরী কাঠামো দেয়ায় তাদের বেতন দাঁড়ায় ২৭শ’ টাকা। কিন্তু শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরী বেতন কাঠামোর টাকা তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
খুলনা পাট অধিদফতরের সূত্র জানায়, জেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে পাটকল রয়েছে ২৭টি। এর মধ্যে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত আর বাকী ২১টি বেসরকারি পাটকল। বেসরকারি ২০টি পাটকলের মধ্যে ৭টি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া দু’টি পাটকল আংশিক বন্ধ রয়েছে। বন্ধ থাকা পাটকলগুলোর মধ্যে রয়েছে, ফুলবাড়িগেট মিরেরডাঙ্গা এলাকার এ্যাজাক্স জুট মিল, শিরোমনি এলাকার মহসেন জুট মিল, শিরোমনি বিসিক এলাকার জুট স্পিনার্স, ট্রান্সওসেন ফাইবার্স প্রসে. (বিডি), দিঘলিয়ার চন্দনী মহল এলাকার ইয়াসিন জুট মিল, দেয়াড়া এলাকার শাহনেওয়াজ জুট মিল ও স্পেশালাইজড। আর আংশিক বন্ধের তালিকায় রয়েছে সোনালী ও আফিল জুট মিল।
মহসেন : শিরোমনি শিল্পাঞ্চলের মহসেন জুট মিল ষাটের দশকে প্রায় ২০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। মিলটি দীর্ঘ ১৩ মাস লে-অফ থাকার পর গত ১৭ জুলাই মহসেন জুট মিলটি বন্ধ ও মিলের ৬৬৭ জন শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করে মিল কর্তৃপক্ষ। মিলটিতে প্রায় ৭শ’ স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছে। বর্তমানে মিলটি বন্ধ রয়েছে।
এ্যাজাক্স : ফুলবাড়ীগেট মিরেরডাঙ্গা শিল্পাঞ্চলের এ্যাজাক্স জুট মিল ষাটের দশকে ৮০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ্যাজাক্স জুট মিল দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। এ মিলটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক ছিলো। বর্তমানে মিলের নয়া মালিক মিলটি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের পূর্বের বকেয়া পরিশোধ করা শুরু করেছে। বন্ধের কাতারে রয়েছে শিরোমনি বিসিক এলাকার জুট স্পিনার্স, ট্রান্সওসেন ফাইবার্স প্রসে. (বিডি), দিঘলিয়ার চন্দনী মহল এলাকার ইয়াসিন জুট মিল, দেয়াড়া এলাকার শাহনেওয়াজ জুট মিল ও স্পেশালাইজড। 
আফিল : আটরা-গিলাতলা শিল্পাঞ্চলের আফিল জুট মিল ষাটের দশকে ৫০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আফিল জুট মিলটি কেন রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। মিলে হেসিয়ান বিভাগ বন্ধ করা হয়েছে।
সোনালী : ফুলবাড়ীগেট মিরেরডাঙ্গা শিল্পাঞ্চলের সোনালী জুট মিল ষাটের দশকে ৪৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিরোমনি শিল্পাঞ্চলের সোনালী জুট মিলটি কয়েক দফা বন্ধের পর বর্তমানে আংশিক চালু রাখা হয়েছে। মিলটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলো। বর্তমানে তার অর্ধেকও নেই।
সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি খাতের বড় পাটকল সোনালী জুট। এ মিলটি বড় ধরনের ঋণ খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুদক সোনালী জুট মিলের চেয়ারম্যানসহ চার সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৮৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করে খানজাহান আলী থানায় মামলা দায়ের করেছে। বর্তমানে মিলটির আংশিক চালু রয়েছে।
শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ না করে পাটকলগুলো বন্ধ রাখায় অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন। বেকার হয়ে পড়েছে এসব মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন অনেক তারা।
এ ব্যাপারে সাবেক সিবিএ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল খান বলেন, লে-অফ ঘোষণা শেষে মিলটি চালুর কথা থাকলেও মিল চালু না করে মিলটি অবৈধভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাইয়ের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বকেয়া পাওনা পরিশোধ করার কথা থাকলেও মালিক দীর্ঘ দুই বছরের অধিক সময় কতিপয় দালাল চক্রের সহযোগিতায় বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করে মিলটির প্রায় ৩৫শ’ শ্রমিককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় মালিক পক্ষ অবৈধভাবে শ্রমিকদের ছাটাই করে তাদের পাওনা প্রায় ১৮ কোটি টাকা পরিশোধ না করে মিলটি বন্ধ করে রেখেছেন। আফিল জুট মিলের ১ও ২ নং মিল বন্ধ থাকায় তাদের প্রায় ৯ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে, সাগর জুট মিলের শ্রমিকদের গ্রাচ্যুইটির ১১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে, জুট স্পিনার্সের কয়েক কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে। খুলনার আটরা শিল্পাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ব আলীম জুট মিলস মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতায় র্দীর্ঘ ১৪ মাস টানা আন্দোলন সংগ্রামের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আন্তরিকতায় অবশেষে বন্ধকৃত জুট মিলটি গত ৬ আগস্ট আবারও বিজেএমসির তত্বাবধানে উৎপাদন শুরু করায় ওই এলাকায় কিছুটা প্রাণ ফিরে এসেছে। এলাকার বন্ধকৃত জুট মিলগুলো সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় পুণরায় চালুর হলে শিল্পাঞ্চলটি আবার তার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে। আর এ সকল মিলগুলো চালু করা হলে ব্যবসা বাণিজ্যে হবে চাঙ্গা।
বেসরকারি পাট, সুতা, বস্ত্রকল সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সবুজ জানান, খুলনায় ২১টি বেসরকারি জুট মিলের মধ্যে বর্তমানে ৭টি বন্ধ ও ২টি আংশিক চালু রয়েছে। পাটকলগুলো লাভজনক থাকা সত্ত্বেও মালিকরা বন্ধের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব মিলে ঋণের ব্যাপার জড়িত, সেখানেই শুধু সমস্যা হচ্ছে। ঋণের কারণেই মহসেন ও এ্যাজাক্স পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। এছাড়া সোনালী ও আফিল জুট মিলের আংশিক বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। মালিকপক্ষের খামখেয়ালির কারণে এসব মিলের হাজার হাজার শ্রমিক এখন বেকার। শ্রমিকদের বেকারত্বতা দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এ শ্রমিকরা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হতে পারে। এ কারণে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, অবিলম্বে বেসরকারি পাটকলগুলো চালু ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করা হলে দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হবে।  
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিলের এমডি বলেন, মিল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের চেষ্টার কোন ঘাটতি নেই। তবে মিলগুলো ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুরাতন মেশিনারীজ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ বিলের উর্ধ্বগতি এবং শ্রমিকদের মজুরী কমিশন বাস্তবায়ন ও বিশ্ববাজারে পাটপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় মিলকর্তপক্ষ লোকসানের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ফলে কিছু মিল বন্ধ হয়েছে। মিলগুলোর মেশিন বিএমআরই করা একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
খুলনা পাট অধিদফতরের সহকারি পরিচালক মো. আব্দুর করিম বিশ্বাস জানান, পাটকলগুলো এক সময়ে লাভজনক ছিলো। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ, মালিকের অবহেলাসহ নানা কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের মুখে। তবে পাটকলগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা হলে এগুলো পুনরায় লাভবান প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ