বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কৃষি জ্বালানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি প্রায় শত কোটি টাকা

 

খুলনা অফিস : খুলনায় পরিবহন ধর্মঘটের কারণে কৃষি, জ্বালানি খাত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়েছে প্রায় শত কোটি টাকার। চারদিন পর ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। ধর্মঘটের সময় মংলা বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস এক প্রকার বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া স্বল্পসংখ্যক পণ্য খালাস হলেও পরিবহন বন্ধ থাকায় দেশের কোথাও তা সরবরাহ করা যায়নি। এতে করে স্থবিরতায় বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। এছাড়া কৃষি, চিংড়ি, হিমায়িত খাদ্য ও পাট রফতানিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

কাঁচামাল ব্যবসায়ী আবু হোসেন পেশায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী। গ্রাম ঘুরে শীতকালীন সবজি কিনে তা শহরে এনে বিক্রি করেন। সেই সাথে নিজের ক্ষেতের সবজিও বিক্রির জন্য আনেন বাজারে। খুলনায় চারদিনের ধর্মঘটে বাজারে আনা তার অধিকাংশ সবজি পচে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু বিক্রি হয়েছে পানির দরে। বললেন, ‘ধর্মঘটে আমি তো শ্যাষ। টাহা-পয়সা যা ছেলো, সব খুয়াইলাম। ধর্মঘটে আর কার কি হইছে জানি না। আমি শ্যাষ হইয়া গেছি।’

আবু হোসেনের মতো প্রান্তিক চাষির সংখ্যা অনেক। যারা কোন কিছুর মধ্যে না থেকেও এই ধর্মঘটে সব পুঁজি হারিয়ে বসেছেন। এছাড়া মাঝারি ও বড় শিল্পের মালিকরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ধর্মঘটের চার দিনে খুলনা থেকে চিংড়ি, হিমায়িত খাদ্য ও পাট রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। পাইকারী বাজারগুলোতে পণ্য বেচাকেনা বন্ধ ছিলো। ইরি-বোরোর ভরা মওসুমে কৃষকের মাঝে জ্বালানি তেল ও সার সরবরাহ করা যায়নি। মংলা বন্দরে জাহাজ থেকে মালামাল খালাস হলেও দেশের কোথাও তা সরবরাহ হয়নি। 

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি এডভোকেট সাইফুল ইসলাম জানান, চারদিন পর ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। তিনি বলেন, ধর্মঘটের কারণে মংলা বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস এক প্রকার বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া স্বল্পসংখ্যক পণ্য খালাস হলেও পরিবহন বন্ধ থাকায় দেশের কোথাও তা সরবরাহ করা যায়নি। তিনি বলেন, ধর্মঘটের কারণে স্থবিরতায় বন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। এছাড়া কৃষি, চিংড়ি, হিমায়িত খাদ্য ও পাট রপ্তানিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় ট্যাংক লরি ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরহাদ হোসেন জানান, ইরি- বোরোর ভরা মওসুমে প্রতিদিন সেচ কাজের জন্য প্রায় ৪০ লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও ধর্মঘটের কারণে তা বন্ধ ছিলো। পেট্রল পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এ খাতে ক্ষতি ১০ কোটি টাকার মতো।

ভোমরা স্থল বন্দরে চার দিনে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পাঁচশত কোটি টাকা : শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে ভোমরা স্থল বন্দর চতুর্থ দিনের মত অচল হয়ে পড়ে। গত চার দিনে ভোমরা বন্দরে রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় পাঁচশত কোটি টাকা। সাতক্ষীরা ভোমরা স্থল বন্দরের আমদানিকৃত দেড়শতাধিক কাঁচা মাল ভর্তি ট্রাকসহ পাঁচ শতাধিক বিভিন্ন পন্যবাহী ট্রাক এখনো আটকা পড়ে। এতে বন্দরের আমদানিকৃত কোটি কোটি টাকার আমদানি পন্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। 

সাতক্ষীরা ভোমরাস্থল বন্দরের যুগ্ম কমিশনার কাজি ফরিদ উদ্দিন জানান, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে গত চার দিনে ভোমরা বন্দরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। অনুরুপ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ভোমরা সিএন্ডএফের এসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী নওশাদ দেলোয়ার রাজু জানান, পরিবহন ধর্মঘট ও পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ভোমরা স্থল বন্দর। গত চারদিনে পাঁচশত কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছের আমদানি-রফতানিকারকরা।

নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির : টানা ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে খুলনার নিত্যপণ্যের বাজারে। ২-১টি ছাড়া প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে পাঁচ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় শহরে পণ্য আসতে পারেনি। আবার কিছু পণ্যবাহী ট্রাক আসলেও তাদের দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া গুণতে হয়েছে। ফলে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, ধর্মঘটের কারণে পাইকারি কাঁচাবাজারগুলোতে চারদিনে গড়ে ২০ কোটি টাকার লেনদেন হয়নি। বেচাকেনা বন্ধ থাকায় পেঁয়াজ, টমেটো, কুমড়া, কুল ও শীতকালীন সবজিতে পচন ধরে। ফলে কৃষকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা। 

টানা ধর্মঘটের কারণে বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপিসহ সবজির দাম বেড়েছে। এর মধ্যে ফুলকপি আগে প্রতিটি ১০ টাকা থাকলেও গতকাল বিক্রি হয়েছে ২০ টাকায়। পটল, করল্লা, ঢেঁড়সের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে লাগামহীন বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। অবরোধের আগে যার দাম ছিল প্রতি কেজি ৪০ টাকা। বর্তমান দাম ১শ’ টাকা কেজি। বাজার ভেদে আলু, টমেটো, মূলা, ধনিয়া পাতা, সীম, পেঁপেতে কেজি প্রতি বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা করে। মাছ-মাংসের দামও বেড়েছে। গরুর মাংস বেড়েছে কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। খাসির মাংস ৫০ থেকে ১০০ টাকা। লেয়ার, ব্রয়লার মুরগি বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা। থেমে নেই মশলাজাতীয় পণ্যের দাম। প্যাকেটজাত পণ্য ছাড়া প্রায় সকল মশলার দাম বেড়েছে।

টুটপাড়া জোড়াকল বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আলমগীর বলেন, বাজারের প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজি প্রতি ৫-১৫ টাকা বেড়েছে। তবে কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে আকাশ ছোঁয়া। কয়েকদিন আগে বিক্রি করেছি ৪০ টাকা কেজি দরে, আজ বিক্রি করছি একশ’ টাকা দরে। এখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা যেমন কিনি তেমন বিক্রি করি।

 সোনাডাঙ্গা পাইকারী কাঁচা বাজারের সাধারণ সম্পাদক এএমএম মঈনুল ইসলাম নাসির জানান, খুচরা বাজারে পণ্যের সরবরাহ না থাকায় এরই মধ্যে সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেসিসি পাইকারী কাঁচা বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি শেখ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আড়তে মাল ছিল না বললেই চলে। অল্প যা ছিল তার দাম অনেক বেশি। বাজার আবার স্বাভাবিক দামে ফিরে আসতে দুই একদিন সময় লাগবে। 

খুলনা মহানগর পাইকারী ও খুচরা মৎস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. রমজান আলী হাওলাদার বলেন, খুলনা মহনগরের অধিকাংশ মাছ রূপসা পাইকারী মাছ বাজার থেকে আসে। চারদিন গাড়ি না আসার কারণে মাছের সরবরাহ কম ছিল। যার কারণে খুচরা বাজারে মাছের দাম কিছুটা বাড়তি থাকতে পারে।

কেসিসি বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি রাবেয়া ফাহিদ হাসনা হেনা বলেন, বাজারের অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। যার ফলে ভোগান্তিতে পড়েছে শহরবাসী। শহর এলাকায় মালবাহী যানবাহন ঢুকতে না পারায় দাম বেড়েছে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ