সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভারত সফরে টাইগারদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। ক্রিকেটে বাংলাদেশের আজকের এই অবস্থানের পেছনে দেশটির ভূমিকা অনেক বেশি। সেই ভারত সফরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবশেষে অবসান হলো। ১৭ বছর প্রতীক্ষার পর ভারতের মাটিতে টেস্ট খেলে এলো বাংলাদেশ। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে সময়টা ১৬ বছর ২ মাস ২৯ দিন। যে ভারতের বিপক্ষে ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেক, তাদের বিপক্ষেই তাদেরই মাটিতে টেস্ট খেলতে এত্ত লম্বা সময় নিয়ে অপেক্ষা নিয়ে আক্ষেপের শেষ ছিলো না এতদিন। গত ১৬ বছরে ভারতের বিপক্ষে ৫টি সিরিজে ৮টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। এর সবকটিই বাংলাদেশের মাটিতে! আইসিসি’র প্রথম ফিউচার ট্যুর প্রজেক্টে (এফটিপি) (২০০১-০৬) ভারতের মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলার কথা ছিল বাংলাদেশ দলের। ২০০৬ সালে পূর্ব নির্ধারিত সেই সিরিজটি দিওয়ালী উৎসবের অজুহাতে বাতিল করে বিসিসিআই। ভারত ক্রিকেট দলকে আতিথ্য দিলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে সর্বশেষ ২টি তে ভারতের মাটিতে খেলার আগ্রহের পরিবর্তে বিসিসিআই’র প্রস্তাবে বাংলাদেশ বরং দিয়েছে ভারতকে আতিথ্য। বাংলাদেশ দলকে আতিথ্য দিয়ে আর্থিকভাবে লাভের সম্ভাবনা তেমন নেই বলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে আতিথ্য দিতে এতোদিন কম বাহানা করেনি বিসিসিআই। চলমান ৯ বছর মেয়াদি এফটিপিতে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ২ টেস্ট, ৬ ওয়ানডে।
২০১৪ সালে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের পর ২০১৫ সালে ৩ ওয়ানডে, ১ টেস্ট ম্যাচের সিরিজ। ওই সিরিজে যে একটি টেস্ট অবশিষ্ট ছিল, সেই টেস্টটি গড়াচ্ছে অবশেষে, ৩ বছর পর। গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভারত সফর নির্ধারিত থেকেও বিসিসিআই দেয়নি বিসিবিকে গ্রীন সিগন্যাল। সফরটি ৬ মাস পিছিয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারী ফিরতে তা আয়োজনের ঘোষণা বিসিসিআই’র সর্বশেষ সভাপতি অনুরাগ ঠাকুর দিয়েও অনিশ্চয়তার আবর্তে পড়েছিল একমাত্র টেস্টটি! সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বিসিসিআই’র ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অনুমতি ছাড়া অর্থ উত্তোলন করা যাবে না বলে হায়দারাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন টেস্ট আয়োজনে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান চেয়ে বিসিসিআই’কে চিঠি দিয়ে পড়ে বিপত্তিতে। পরবর্তীতে এই টেস্ট আয়োজনে হায়দারাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন আগ্রহ প্রকাশ করলে ৮ ফেব্রুয়ারীর পরিবর্তে ৯ ফেব্রুয়ারী টেস্ট আয়োজন চূড়ান্ত হয়। অবশেষে ভারতের মাটিতে শেষ হলো ‘ঐতিহাসিক’ সেই টেস্ট। স্পন্সর পাওয়া যাবে না বা মাঠে দর্শকদের সায়া মিলবে না- এই সব যুক্তিতে তা এখন মূলতবি হয়ে গেছে। কিন্তু হায়দারাবাদ টেস্ট কি সেই সব আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করতে পারল? বাণিজ্যিক ও ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণে কতটা সফল হল এই টেস্ট? গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেমন উন্নতি করেছে তাতে ভারতীয় দর্শকরাও মুগ্ধ- এবং তাদের বলতে কোনও দ্বিধা নেই বাংলাদেশকে আরও অনেক আগেই ভারতে খেলতে আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। লাঞ্চের ঠিক আগে মাহমুদুল্লাহ ও সাব্বির রহমান যেভাবে খেলছিলেন মুক্তকণ্ঠে তারও প্রশংসা করছিলেন তারা। বাংলাদেশের ভক্ত-সমর্থকরা আফসোস করতেই পারেন! দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিক-সাকিব-সাব্বির-মাহমুদুল্লাহরা যদি নিজেদের ইনিংসটা আরেকটু লম্বা করতে পারতেন! তারপরও হায়দারাবাদ টেস্টে টাইগারদের প্রাপ্তি কম নয়। রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে দুই ইনিংসেই একশ’ ওভারের বেশি ব্যাটিং করেছে বাংলাদেশ।
২০০০ সালের পর ভারতে এসে চতুর্থ ইনিংসে সফরকারী দলের সর্বোচ্চ স্কোরের পরিসংখ্যানে নিউজিল্যান্ডের পরেই বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত আহমেদাবাদ টেস্ট ড্র হওয়ার আগে কিউইদের সংগ্রহ ছিল ১০৭ ওভারে ছয় উইকেটে ২৭২। প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের ৬৮৭ রানের বিশাল স্কোরই মূলত পার্থক্য গড়ে দেয়।
ম্যাচ বাঁচাতে অধিনায়ক মুশফিকের ১২৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংসটি ছিল চোখে পড়ার মতোই। শেষ রক্ষাটা আর হলো না! ইশান্ত-অশ্বিন-জাদেজার দুর্দান্ত বোলিংয়ে ২০৮ রানের জয় পেয়েছে টেস্টের নাম্বার ওয়ান টিম ইন্ডিয়া। ৪৫৯ রানের লক্ষ্যে পঞ্চম ও শেষ দিনের দ্বিতীয় সেশনের শেষদিকে ২৫০ রানে অলআউট হয় সফরকারীরা। ২৫ ওভারের মতো খেলা বাকি ছিল। সর্বোচ্চ ৬৪ রান করেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। পুথম ইনিংসের পুনরাবৃত্তি টানতে ব্যর্থ মুশফিক (২৩)। আরেকটি কথা না বললেই নয়, ৯ নম্বরে নেমে পেসার কামরুল ইসলাম রাব্বি আবারো ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ের প্রমাণ রাখেন। ৭০ বল খেলে মাত্র ৩ রান করে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। দুই ইনিংসেই নটআউট টেলএন্ডার রাব্বি। নিউজিল্যান্ড সফরের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ৬৩ বলে ২। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব মেলানোর সাথে সাথে এরই মধ্যে আরেকটি ভারত সফরের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন অনেকেই। আবার এমনটিও বলছেন কেউ কেউ, আরো আগে কেন হলো না ভারত সফর? এদিকে ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ দলের সফল টিম ম্যানেজার হিসেবে টানা ২ বছর দায়িত্ব পালনের সুখ্যাতি আছে সাবেক অধিনায়ক এবং বর্তমানে বিসিবি’র গেম ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার খালেদ মেহমুদ সুজনের। তার দায়িত্ব পালন কালে ৬টি ওয়ানডে সিরিজের ট্রফি ছাড়াও ৩ টেস্ট জয়ের রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সর্বশেষ ২টি সফরে নিজ থেকেই দলের ম্যানেজারশিপের দায়িত্ব পালনে থেকে দাঁড়িয়েছিলেন সরে।
ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগের নবাগত দল শাইনপুকুরকে প্রিমিয়ার ডিভিশনে উন্নীত করে পুনরায় ফিরছেন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতে। আগামী মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শ্রীলঙ্কা সফরেই ম্যানেজার হিসেকে দেখা যাবে খালেদ মেহমুদ সুজনকে। নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন ‘ যতটুকু জানি, আমিই যাচ্ছি।’ টিম ম্যানেজার হিসেবে বিসিবি’র এই পরিচালক দীর্ঘমেয়াদে দলের দায়িত্ব নেয়ার পক্ষে ‘ যদি আমার থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তখন থাকব। যদি দায়িত্বটা দীর্ঘ মেয়াদে হয়, তাহলে পরিকল্পনা করতে সহজ হয়।’ দায়িত্ব ফিরে পেয়েই সাকিব, মুশফিকুরকে নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন সুজন। সর্বশেষ হায়দারাবাদ টেস্টে ঋদ্ধিমান সাহাকে সহজ স্ট্যাম্পিংয়ের সুযোগ হাতছাড়া করায় বাংলাদেশ অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের উইকেট কিপিং নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। মুশফিকুরের হাত থেকে কিপিং গ্লাভস খুলে অন্য কাউকে টেস্টে স্পেশালিস্ট উইকেট কিপার হিসেবে দেখতে চান বলে হায়দরাবাদ টেস্ট চলাকালে মিডিয়াকে জানিয়েছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। তবে সিদ্ধান্তের ভারটি মুশফিকুরের হাতেই ছেড়ে দেয়ার পক্ষে ম্যানেজারের দায়িত্ব ফিরে পাওয়া সুজন। টেস্টে ডিসমিসালের সেঞ্চুরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা (৯৫টি) মুশফিকুরের প্রতি এই পরামর্শই তারÑ‘কিপিং একটা থ্যাংকসলেস জব। একটা স্ট্যাম্পিং মিস করলে অনেক দিন দর্শক তা মনে রাখে। তারপরও মুশফিক যদি খেলে যেতে চায়, তাহলে তা করতে পারে। যদি ও নিজেকে ক্লান্ত মনে করে, তাহলে ব্যাপারটি আলাদা। এক্ষেত্রে ওর কথাটাই শোনা উচিত। যেহেতু দলকে অনেক সার্ভিস দিয়ে আসছে, তাই ও এই সম্মানটা পেতেই পারে।’ হায়দারাবাদ টেস্টে লড়াকু সেঞ্চুরি মøান হয়েছে ওই স্ট্যাম্পিং মিসে, তাতে রীতিমতো বিসিবি’র আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে মুশফিকুরকে।
দেড় বছর আগে পর পর ২টি টেস্ট সিরিজে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিপিং গ্লাভস খুলে মুশফিকুরকে তা তুলে দিতে হয়েছিল লিটন দাসকে। হয় ক্যাপ্টেনসি করতে হবে, নয় কিপিং বোর্ডের এই শর্ত মেনে কিপিংটা ছাড়তে হয়েছিল মুশফিকুরকে। মুশফিক ইস্যুতে আবারো কঠোর বিসিবি। যদিও হায়দরাবাদ টেস্টে মুশফিকুরের কিপিংয়ের পক্ষ নিয়েছেন সাকিব, মুশফিক নিজেও একসঙ্গে তিন দায়িত্ব উপভোগ করছেন বলে জানিয়েছেন। তবে স্ট্যাম্পিং মিসে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ থেকে নিবৃত্ত হয়েছে বিসিবি। মুশফিকুরের নেতৃত্বে টেস্টে লড়াকু বাংলাদেশের আবির্ভাবকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে ভদ্রোচিতভাবে একটা সমাধান খুঁজছে বিসিবি। এমনটাই জানিয়েছেন সুজন-‘ভালো কিছু করলে সেটা আলোচিত হয় না, কিন্তু একটা ভুল করলে সেটা বাতাসে ভাসতে থাকে।
আড়াই বছরে ওর দারুণ সাফল্যের কথা কেউ বলে না। মুশফিকুর সব সংস্করণের ক্রিকেটে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ও বলে সব সে উপভোগ করে। তার মানে ওর কাজের চাপ নেই। ও যদি মনে করে চাপ হচ্ছে, তাহলে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। আমার মনে হয় ও কিপিং ভালোবাসে। যতদিন পর্যন্ত সে উপভোগ করবে, ততোদিন সে কিপিং করে যেতে পারে।’
এদিকে হায়দরাবাদ টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৮২ রানের মাথায় অশ্বিনকে ডাউন দ্য উইকেটে খেলে আত্মাহুতি দিয়ে নিজের অবধারিত সেঞ্চুরি করেছেন হাতছাড়া, বাংলাদেশ দলকে ফেলেছেন বিপদের মুখে সাকিব। তার ওই শটটি নিয়ে মিডিয়ায় কম সমালোচনা হয়নি, সমালোচনা করেছে বিসিবিও। এমনকি টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষে নিজের আউট নিয়ে অনুতপ্ত না হলে উল্টো ওটাই তার খেলার স্টাইল বলে করেছেন প্রকাশ! এখন শ্রীলংকা সফরে সাফল্যের সেই ধারা অব্যহত থাকাই কামনা ক্রিকেটপ্রেমীদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ