মঙ্গলবার ১৭ মে ২০২২
Online Edition

ড. সিরাজুল ইসলাম আধুনিক ইতিহাস গবেষণার পথিকৃৎ- -মুহাম্মদ নূরে আলম বরষণ

অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম আধুনিক ইতিহাস গবেষণার পথিকৃৎ। তিনি দিনের প্রত্যেকটি মুহূর্ত ইতিহাস চর্চা তথা আমাদের জাতিসত্তার নিগূঢ় তথ্য উদ্ভাবনে মগ্ন থাকেন। দেশে এই খ্যাতিমান ঐতিহাসিক ১৯৩৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার থানাকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সম্প্রতি ভারতের বিখ্যাত স্যার যদুনাথ সরকার স্বর্ণপদক পেয়েছেন। ইতিহাস শাস্ত্রে মৌলিক গবেষণায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৬১ সালে বিএ অনার্স ও ১৯৬২ সালে একই বিভাগ থেকে এমএ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন এবং ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। তার আগে তিনি মোমেনশাহী আনন্দমোহন কলেজ ও ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৬৮ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের দি স্কুল অব অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৭২ সালের প্রথমদিকে ‘‘বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’’ শীর্ষক গবেষণা কর্মের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘ ৪০ বছর অধ্যাপনা করে স্বেচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে অবসরে যান। কারণ নিজেকে পুরোপুরি গবেষণা কর্মে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে এবং জীবনের বাকিটা সময় দেশের কল্যাণে গবেষণা করার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁর পছন্দের গবেষণার স্থান হিসেবে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিকে বেছে নেন। দেশি-বিদেশি বহু জার্নালে তাঁর ৪৫টি মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা এবং সম্পাদনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও গবেষণা কর্ম হচ্ছে ক. বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯০-১৮১৯), খ. বাংলার ভূমিস্বত্ব : মধ্যবর্তী শ্রেণীর উদ্ভব, গ. বাংলাদেশের নদী অববাহিকার গ্রামসমূহ, ঘ. বাংলাদেশের গ্রামীণ ইতিহাস, ঙ. ফজলুল হক পরিষদ স্মারক বক্তৃতা, চ. ভূমি ব্যবস্থা ও সামাজিক সমস্যা, ছ. ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো, জ. ভূমি ও ভূমি সংস্কার, ঝ. বাংলাদেশের ইতিহাস (৩ খন্ড যৌথ)। গবেষণা কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. সিরাজুল ইসলাম সিনিয়র ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার ইলিয়ন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার ব্রিটিশ আমলে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের গেজেটগুলোর উপর গবেষণা করে ১২ খন্ডে গেজেটগুলোকে প্রকাশ করেন। ১. চট্টগ্রাম জেলা গেজেট ১৭৬০-১৭৯০, ২. কুমিল্লা জেলা গেজেট ১৭৭২-১৭৯০ (৩ খন্ডে), ৩. ঢাকা জেলা গেজেট ১৭৭২-১৭৮২ (২ খন্ডে)। অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলামের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ও সম্পাদনায় বাংলাদেশের বিখ্যাত জাতীয় জ্ঞানকোষ ‘‘বাংলাপিডিয়া’’ ১০ খন্ডে বাংলা ও ইংরেজি ভাষাসহ ডিভিডি প্রকাশিত হয়। যা ইতোমধ্যে দেশের কোটি মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। দেশি-বিদেশি অসংখ্য গবেষক এই গ্রন্থ পেয়ে উপকৃত হয়েছেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষা ১২ খন্ডে বাংলা ও ইংরেজি ভাষাসহ ডিভিডি তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭০৪-১৭৯২) ৩ খন্ডে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত সাময়িকিটিরও সম্পাদনা করেন। সামুদ্রিক ইতিহাস গবেষণায় অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলামের প্রচুর ঝোঁক রয়েছে। তিনি ১৯৯০ সাল থেকে তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক ইতিহাসকে বেছে নেন। তিনি ভারত মহাসাগরে আমেরিকানদের আগমনের ইতিহাস ও তৎসংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণায় গভীর আগ্রহী। তাঁর এই সংক্রান্ত গবেষণার বিষয় দৃঢ়ভাবে সমর্থিত হয়েছে ফুল ব্রাইট কমিশন, এসোসিয়েশন অব কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি, বৃটিশ একাডেমী এবং কিংস রয়েল কলেজ লন্ডন প্রভৃতি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান দ্বারা। সমুদ্রসীমার ইতিহাস এবং সমুদ্র বিজ্ঞানের উপর তার অনেক মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ দেশী-বিদেশী বহু জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ড. সিরাজুল ইসলাম পেশাগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, সিটি জাদুঘরের সভাপতি এবং বর্তমানে তৃতীয়বারের মত বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি হিসাবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি পত্রিকা ও বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা তার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়। ইন্ডিয়ান হিস্টরিক্যাল কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান জার্নাল অব হিস্টরিক্যাল স্টাডিজের উপদেষ্টা কমিটিরও তিনি সদস্য। অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম তার গবেষণা কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একাধিক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলোসিপ। রয়েল হিস্টরিক্যাল ফেলোসিপ, বৃটিশ একাডেমী ফেলোসিপ, বাংলা একাডেমী ফেলোসিপ, কমনওয়েলথ ফেলোসিপ, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি ফেলোসিপ, লন্ডন কিংস কলেজ ফেলোসিপ, সিনিয়র ফুলব্রাইট ফেলো হিসেবে আমেরিকার ইলিয়ন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার মতো তিনি পেয়েছেন দূর্লভ সম্মাননামূলক ফেলোসিপ। এসব গবেষণা কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ফেলোসিপ পাওয়ার পাশাপাশি পেয়েছেন অনেক সম্মাননা ও স্বর্ণপদক। তা হলো ভারতের বিখ্যাত যদুনাথ স্বর্ণ পদক, মাহাবুব উল্লাহ জেবুন্নেসা স্বর্ণপদক ও সম্মাননা, হাকীম হাবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, শ্রুতিঃ নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক একাডেমী অ্যাওয়ার্ড, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্বর্ণ পদক ও সম্মাননা ডা. সিরাজুল ইসলাম মানব সমাজের উন্নয়নে অনেক অবদান রেখেছেন। ড. ইসলামের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ও এশিয়াটিক সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় অনেক গবেষণা প্রকল্পে বহু নবীন-প্রবীণ গবেষক উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের রচিত গবেষণা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলা পিডিয়া রচনা প্রকল্পে ড. সিরাজুল ইসলামের অধীনে দেশি-বিদেশী ১২শত গবেষক গবেষণা করেছেন। যা শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের প্রকৃত জ্ঞান কোষ হিসেবে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। সম্প্রতি তার সম্পাদনায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষা (১২ খন্ডে বাংলা ও ইংরেজী ভাষায়) প্রকাশিত হয়েছে। এতে কয়েকশত গবেষক কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ড. সিরাজুল ইসলাম তিন সন্তানের জনক। বড় ছেলে বিমানের প্রকৌশলী হিসেবে আমেরিকায় কর্মরত, বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং ছোট মেয়ে কানাডা সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছে। ড. সিরাজুল ইসলামের স্বপ্ন বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা আগামী প্রজন্মের জন্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ