বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে মশার উপদ্রব

রাজধানীতে আবারও মশার উপদ্রব বেড়ে চলেছে। রাতে তো বটেই দিনের বেলায়ও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হচ্ছে রাজধানীবাসী। পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু এবং টাইফয়েড ও ম্যালেরিয়াসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ-বালাই। অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দফতর-অধিদফতরগুলো দায়সারাভাবে কীটনাশক ছিটিয়েই কর্তব্য শেষ হয়ে গেছে বলে বোঝাতে চাচ্ছে। দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আগে শীতের সময় সাধারণত মশার উপদ্রব কমে যেতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটছে উল্টো ঘটনা। শীত যেমন বাড়ছে তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশার উপদ্রব। অবস্থা এমন হয়ে পড়েছে যে, নানা বাহারি নামের দেশী-বিদেশী মশার কয়েল ও ওষুধেও কোনো কাজ হচ্ছে না। রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় এমনকি দিনের বেলায়ও মশারী খাটাতে হচ্ছে। এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু এলাকায় নামকাওয়াস্তে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে সত্য কিন্তু মশার উপদ্রব থেকে রেহাই মিলছে না। বলা হচ্ছে, ছিটানো ওষুধগুলোর আসলে কার্যকারিতা নেই। এর কারণ, কেনার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি করা হয়ে থাকে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে কাউন্সিলরসহ সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হলেও কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এমন সব কীটনাশকই কেনা হচ্ছে যেগুলো মশা নিধনে মোটেও সক্ষম নয়। একই কথা সত্য বাজারের বিভিন্ন ওষুধ ও কয়েল সম্পর্কেও। তাছাড়া ইতিপূর্বে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে যেসব মশার কয়েল বিক্রি হয় সেগুলোর বেশির ভাগের মধ্যেই মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। ফলে মশা তাড়ানোর জন্য এসব কয়েল ব্যবহার করেও মানুষ কেবল ক্ষতিরই শিকার হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে উঠেছে বলেই সচেতন জনগণের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, মশা নিধনের চেষ্টার সঙ্গে মশার উৎপত্তিস্থলগুলোর ব্যাপারেই এখন বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। প্রসঙ্গক্রমে তারা পুকুর এবং খাল ও নালা-ডোবার মতো বিভিন্ন স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন, যেসব স্থানে মশার জন্ম অনেক বেশি হয়ে থাকে। এরও পেছনে রয়েছে পরিচ্ছন্নতার অভাব। এসব পুকুর খাল ও নালা-ডোবা থেকে বৃষ্টি ও বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় এমনিতেই এগুলো অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। তার ওপর আবার এসব স্থানে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতলের মতো বিভিন্ন আবর্জনা ফেলা হয়। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনাও এলাকার পুকুর এবং নালা ও ডোবাতেই ফেলে মানুষ। ফলে এই স্থানগুলো মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এমন অবস্থা কোনো বিশেষ এলাকার নয়। গুলশান-বনানী থেকে রূপনগর ও মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল পর্যন্ত সর্বত্রই একই চিত্র দেখা যাবে। পুরনো ঢাকার খাল এবং নালা ও ডোবাগুলোর কথা যতো কম বলা যায় ততই ভালো। মূলত এ কারণেই রাজধানীতে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে বলে মনে করেন তথ্যাভিজ্ঞরা। সেজন্য তারা মশার উৎপত্তিস্থলগুলোর পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, মশার উপদ্রবে রাজধানীবাসীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে নি¤œ আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীরা, যাদের পক্ষে বেশি টাকা দিয়ে প্রতিদিন দামী মশার কয়েল বা স্প্রে কেনা ও ব্যবহার করা সম্ভব নয়। অনেকের এমনকি মশারী কেনার মতো সামর্থ্যও নেই। এর ফলে মশার কামড়েই তারা কেবল অতিষ্ঠ হচ্ছে না, একই সঙ্গে রোগ-বালাইয়ের শিকারও তারাই বেশি হচ্ছে। রিপোর্টে ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েডের মতো পরিচিত রোগের পাশাপাশি ডেঙ্গুর কথাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। কারণ, রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে সম্প্রতি হঠাৎ করে ডেঙ্গু রোগীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এরও কারণ মশার উপদ্রব। আর এ কথা তো সাধারণ মানুষেরও জানা রয়েছে যে, আবর্জনা এবং দূষিত পানিতেই ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার জন্ম ও বিস্তার হয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে রাজধানীতেও সেটাই হচ্ছে।
একই কারণে মশার বিরুদ্ধে অভিযান দ্রুত জোরদার করা দরকার। এজন্য বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং একথা প্রমাণিত সত্যও যে, পুকুর এবং খাল ও নালা-ডোবার মতো উৎপত্তিস্থলগুলোকে পরিষ্কার রাখা গেলে মশার জন্ম ও বিস্তার যেমন কমে আসবে তেমনি কমে যাবে মশার উপদ্রবও। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে এখনই পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। একযোগে দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুর ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করতে হবে, যাতে বৃষ্টি ও বন্যার পানি সহজে গিয়ে আশপাশের নদ-নদীতে পড়তে পারে। যাতে পানি জমে থেকে দূষিত না হয়।
এখানে প্রাসঙ্গিক একটি তথ্য উল্লেখ করা দরকার। সে তথ্যটি হলো, শত শত পুকুর ও খাল ভরাট করে বহুতল ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ, ভবনের আশপাশে মাটির নিচে প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা না রাখা, পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনা জমে গিয়ে ড্রেনগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার অভাবে সব মিলিয়ে রাজধানীর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যখন অতি বর্ষণে তো বটেই, হাল্কা ও মাঝারি বৃষ্টি হলেও রাজধানী ঢাকা আজকাল পানিতে ডুবে যায়। বস্তুত এমন কোনো এলাকার কথা বলা যাবে না, যেখানে দুই থেকে তিন-চার ফুট পর্যন্ত পানি না জমে। এই পানি আবার সরেও যেতে পারে না। এভাবে রাজধানীর সম্পূর্ণ পরিবেশই অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে। একই কারণে বেড়ে চলেছে মশার উপদ্রবও।
আমরা মনে করি, সরকার এবং দুই সিটি করপোরেশনের উচিত প্রথমে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া এবং পাশাপাশি মশা নিধনের লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া। এজন্য কেবল ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়, তারও আগে ওষুধ তথা কীটনাশক কেনার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এমন কীটনাশকই কেনা এবং ছিটানো দরকার, যেগুলো মশার জন্ম ও বিস্তার রোধ করতে পারে। সরকারকে একই সঙ্গে মশার কয়েল ও স্প্রেসহ সকল ওষুধের বিক্রির ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানে  তৈরি কোনো ওষুধ বা কয়েল খোলা বাজারে বিক্রি না হতে পারে। সব মিলিয়ে আমরা এমন পরিবেশ সৃষ্টির দাবি জানাই, রাজধানী মহানগরী থেকে যাতে মশার উপদ্রব কমে যায় এবং অতিষ্ঠ ও রোগাক্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে মানুষ যাতে নিরাপদে বসবাস করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ