শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

আসলে পরাজয়টা হবে মানব সভ্যতার

বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, বর্তমান সভ্যতায় জুলুম-নিপীড়নের শিকার হওয়াটাই যেন মুসলমানদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কৈশোরে কাশ্মীরের মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশার কথা পড়েছি পত্রিকায়, এরপর দেখেছি ফিলিস্তিনে মুসলমানদের উচ্ছেদ ও নিপীড়নের ঘটনা। আর এখন তা হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়ায় মারণাস্ত্রের আঘাতে মুসলিম জনপদ বিধ্বস্ত হয়েছে। হত্যাকা- চলছে অব্যাহতভাবে। আর এখন তো মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চলছে হত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত নির্মূল অভিযান। সভ্যতাগর্বী পরাশক্তি আমেরিকায়ও মুসলমানদের বসবাস বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
২৭ নবেম্বর পাস টুডে পরিবেশিত খবরে বলা হয়, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে যুক্তরাষ্ট্রকে মুসলিমমুক্ত করার হুমকি দিয়ে মসজিদে মসজিদে উড়ো চিঠি পাঠানো হচ্ছে। ২৬ নবেম্বর মুসলিম কমিউনিটির এক নেতা জানান, এ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ৩টি মসজিদে এমন উড়ো চিঠি এসেছে। চিঠির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মুসলমানদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে এফবিআইএর দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন কেয়ারের পরিচারক হুসাইন আয়ালুস। এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের চিঠিকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালানোর পূর্বাভাস বলে মনে করছে। উল্লেখ্য যে, গত ৮ নবেম্বর ট্রাম্পের জয়ের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে ট্রাম্প সমর্থকদের হাতে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিমরা নির্যাতিত হচ্ছেন।
মার্কিন মুসলমানদের সংস্থা দ্য কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামী রিলেশন্স (কেয়ার) দেশটির মসজিদগুলোর জন্য বাড়তি নিরাপত্তার দাবি করেছে। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের তিন মসজিদে মুসলমানদের হুমকি দেয়ার পর এ দাবি করা হয়। কেয়ার বলেছে, চিঠি তিনটি একই হাতের লেখা। ফটো কপি করে চিঠিগুলো ইসলামিক সেন্টার ফর লংবিচ, দ্য ইসলামিক সেন্টার অব ক্লেরেমানন্টো এবং দ্য এভারগ্রীন ইসলামিক সেন্টার ইন সানজোস, লস অ্যাঞ্জেলেসে পাঠানো হয়েছে। এতে মুসলমানদের নোংরা ভাষায় হুমকি দেয়া হয়েছে এবং চিঠিটি ‘আমেরিকান ফর বেটার ওয়ের’ নামে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নগরে নতুন শেরিক বা আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা এসেছেন এবং তিনি হলেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকাকে ট্রাম্প আবার ঝকঝকে তকতকে করে তুলবেন বলে চিঠিতে দাবি করা হয়। এতে আরও বলা হয়েছে, মুসলমানদের হটিয়ে এ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করবেন ট্রাম্প। হিটলার ইহুদিদের যেবাবে নিধন করেছে, একইভাবে ট্রাম্পও মুসলমানদের হটিয়ে দেবেন। কেয়ারের লস অ্যাঞ্জেলস শাখার নির্বাহী পরিচালক হুসাইন আয়ালুস বলেছেন, চিঠির ঘৃণাপূর্ণ বক্তব্য মুসলমানদের হতাশ করেছে। তিনি আরো বলেছেন, ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম বিরোধী এমন মনোভাব তৈরি হয়েছে। পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার করেনি। অবশ্য এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সানজোস পুলিশ বিভাগ। এখন দেখার বিষয় হলো, তদন্ত সঠিক পথে এগোয় কিনা। আর এখানে বলার মতো বিষয় হলো, বর্তমান সভ্যতার সেরা দেশ আমেরিকায় যদি সংখ্যালঘু মুসলমানদের জীবনযাপন এমন অবস্থায় এসে দাঁড়ায়, তাহলে এমন সভ্যতাকে আমরা কোন নামে অভিহিত করবো?
বুধো বেচারা যদি আধুনিক এই বিশ্বসভ্যতায় শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার সুযোগ পেত, তাহলে বোধহয় তার দুঃখের মাত্রা অনেকটাই হ্রাস পেত। উদোর সদাচরণের কারণে এমন তারতম্য ঘটতো না। উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চাপানো তো হয়েই গেছে। বুধোর দুঃখবোধটা হ্রাস পেত আসলে তুলনামূলক বিবেচনার একটা সুযোগ পাওয়ার কারণে। বুধো এই ভেবে কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারতো যে, অন্যের অপরাধ তার ঘাড়ে চাপানোর ওজন ও মাত্রা আধুনিক সভ্য যুগের তুলনায় অনেক কম। মুসলমানদের দুর্দশা দেখে বুধো হয়তো নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবানই মনে করতো। কারা সাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী; আর দোষটা পড়ে কাদের ঘাড়ে!
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ২৫ নবেম্বর শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ করেছে হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন। এসব কর্মসূচি থেকে সংগঠনের নেতারা রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা বন্ধে জাতিসংঘ এবং ওআইসিকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারকে আরো মানবিক হয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভকালে মিয়ানমারের বর্তমান ক্ষমতাসীন নেত্রী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির কুশপুত্তলিকা জুতাপেটা করে বিক্ষুব্ধ জনতা। ইসলামী দলগুলোর বিক্ষোভ উপলক্ষে বায়তুল মোকাররম মসজিদ, পল্টন, দৈনিক বাংলার মোড়সহ আশেপাশের এলাকায় বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান, রায়ট কার প্রস্তুত রাখে। এছাড়া পল্টন ও দৈনিক বাংলা মোড় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে অকথ্য নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে তাতে যে কোনো বিবেকবান মানুষেরই বিক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। প্রতিবেশী বাংলাদেশের মুসলিম জনতা মিয়ানমারের নৃশংস ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। এদিকে সীমান্ত পার হয়ে আসা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ সরকারও। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাথে নিয়েই মানবিক এই সঙ্কট সমাধান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলছে নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা। সরকারের একাধিক মন্ত্রী এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। বিবিসিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম স্পষ্ট করে বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আরো কয়েক হাজার বাংলাদেশÑমিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি পাহাড়-জঙ্গল-নদী ও সাগর এলাকায় অপেক্ষা  করছে। প্রায় ১ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে মিয়ানমারে পুশ-ব্যাক করা হয়েছে। সঙ্কটের মানবিক দিক বিবেচনা করে সীমান্ত পুরোপুরি খুলে না দিলেও অনেককে আশ্রয় দিতে একরকম বাধ্যই হচ্ছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ করা ছাড়া রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে না। আর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেই আসতে হবে।
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মিয়ানমারের স্বৈরাচারী সামরিক জান্তার সুরে সুর মিলিয়ে গণতন্ত্রী বলে পরিচিত অং সান সু চিও বলছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের নাগরিক নয় বরং তারা বিদেশী ও বাঙালি। অর্থাৎ তারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশের বাসিন্দা বলে অভিহিত করতে চাইছে। ভিত্তিহীন এমন বানোয়াট বক্তব্য নোবেল বিজয়ী সু চি কী করে দেন তা ভাবতে গেলে অবাক হতে হয়। ইতিহাসের পাঠকমাত্রই একথা জানেন যে, আরাকান বহু শতাব্দী ধরেই রোহিঙ্গা মুসলমান, রোসাঙ্গ হিন্দু আর মহাযানী বৌদ্ধদের মাতৃভূমি। মধ্যযুগে এই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা চন্দ্র-রোসাং আর মুসলমানরা রোহাং নামেই পরিচিত ছিল। হিন্দু চন্দ্র রাজারা এবং মুসলিম সুলতানরাই ছিলেন ১৮ শতকের আগে পর্যন্ত আরাকানের শাসক। রাখাইন উপকূল থেকে বর্মী-অধ্যুষিত মিয়ানমারকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল আরাকানের পাহাড়। বর্মী রাজারা প্রায়ই এ অঞ্চলে হামলা চালাতেন। প্রাচীন সমৃদ্ধ আরাকানের বিপর্যয় শুরু মূলত ১০৪৪-১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে, বার্মিজ রাজা আনা ওরথাইর আগ্রাসনের সময়কালে। তিনি স্থানীয় রোসাং, রোহাং এবং রেকং বা রাখাইনদের হত্যা করেন। দেশত্যাগী হয় লাখ লাখ আরাকানী। চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা, রাখাইন, মারমাসহ অনেক জনগোষ্ঠী সে সময়ই দেশত্যাগী হয়ে বাংলাদেশে বসবাস করতে থাকে। রাজা আনা ওরথাই স্থানীয় বৌদ্ধ মতবাদ হটিয়ে থেরাভাদা বৌদ্ধ মতবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। উল্লেখ্য যে, গৌড়ের সুলতানদের সহযোগিতায় আরাকানের সম্রাট নারামেখলা ২৪ বছর বাংলায় নির্বাসিত থাকার পরে ১৪৩০ সালে আরাকানের সিংহাসন ফেরত পান। পরে তিনি ইসলাম ধর্মও গ্রহণ করেন। পরবর্তী আরাকানী রাজারাও বাঙালি ও মুসলমানদের আরাকানের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। সুতরাং একথা স্পষ্ট করেই বলা যায় যে, আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানরা কোনোভাবেই বহিরাগত নয়। বরং ১৭৮৫ সালে আরাকান দখলকারী বর্মীরাই হলো বহিরাগত। আরাকান দখলের পর বর্মী শাসকরা হিন্দু ও মুসলিম নাগরিকদের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে। এই বৈরিতা কমেছিল বৃটিশদের হাত থেকে মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রপন্থীদের সময়। বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট উ-নু রোহিঙ্গাদের আরাকানের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে বার্মার প্রথম সংবিধান সভার নির্বাচনে রোহিঙ্গারা ভোট দিয়েছিল। ১৯৫১ সালে আরাকানের অধিবাসী হিসেবে তারা পরিচয়পত্র পায়।
১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী উ বা রোহিঙ্গাদের আরাকানের জাতিগোষ্ঠী বলে অভিহিত করেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শাও সোয়ে থাইক বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা যদি স্থানীয় আদিবাসী না হয়, তাহলে আমিও তা নই।’ কিন্তু ১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্যের ট্রাজেডি-কাব্য। কেড়ে নেয়া হয় তাদের নাগরিকত্ব, বন্ধ হয়ে যায় রোহিঙ্গা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার। শুরু হয় অপারেশন ড্রাগন কিং নামে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান। মিয়ানমারের মুসলিমবিদ্বেষ এখন কাজে লাগছে  জ্বালানি স¤্রাটদেরও। এক্ষেত্রে হয়তো সমর্থন পাওয়া যাবে পরাশক্তিরও। চীন-মিয়ানমার পাইপলাইন তৈরি হচ্ছে রোহিঙ্গা বসতির মধ্য দিয়ে। মিয়ানমার ঘোষণা করেছে, ওই এলাকার সব অবৈধ (?) স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে আড়াই হাজার ঘরবাড়ি, ৬০০ দোকান, এক ডজন মসজিদ ও ৩০টি বিদ্যালয়? গত সেপ্টেম্বর মাসে রাখাইন সরকারি কর্মকর্তা কর্নেল হতেইন লিন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে সরকারের এ পরিকল্পনার কথা জানান। ফলে এখন এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মিয়ানমারে মুসলিমবিদ্বেষের সাথে যুক্ত হয়ে গেছেন তেল-গ্যাসলোভী  জ্বালানি সম্রাটরাও। অতএব, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বেঁচে থাকার বিষয়টি এখন এক কঠিন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বিষয়টি যেন গোটা মানবজাতি তথা বর্তমান সভ্যতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্থানীয় আদিবাসী রোহিঙ্গা মুসলমানরা যদি নাগরিক হিসেবে মিয়ানমারে বসবাসের সংগ্রামে পরাজিত হয়, তাহলে সেটা হবে আসলে গোটা মানব সভ্যতার পরাজয়। বিষয়টি উপলব্ধি করলে এখনই সঙ্গত ও কার্যকর ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা প্রয়োজন জাতিসংঘ ও পরাশক্তিগুলোর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ