শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ক্যাস্ট্রোর মৃত্যু : কমিউনিস্ট স্বর্গরাজ্যের পতন

কমিউনিস্ট বিশ্বের সর্বশেষ বাতিঘর কিউবার স্বৈরশাসক এবং দুনিয়ার হতাশ সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের অনুপ্রেরণার উৎস ফিডেল ক্যাস্ট্রো তিন দিন আগে মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। ২০০৮ সালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি তার ছোট ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সরকারি ক্ষমতা ত্যাগ করলেও তার ছোট ভাইয়ের পরিচালনাধীন সরকার কখনো তার রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে কাজ করতে পারেননি। তার মৃত্যুর সাথে সাথে পশ্চিম গোলার্ধের সর্বশেষ কমিউনিস্ট সরকারেরও পতন হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
ফিডেল ক্যাস্ট্রোর উত্থান হয়েছিল কিউবার তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধ দশকের গেরিলা যুদ্ধের জয়লাভের মধ্য দিয়ে। স্বৈরশাসককে হটিয়ে তিনি ও তার সহযোগীরা কিউবার ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেই আরো বড় স্বৈরশাসকে পরিণত হন এবং দেশে কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। কমিউনিস্ট জগতে ক্যাস্ট্রো ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন নেতা, আধিপত্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধী একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ধর্মে বিশ্বাস করতেন না এবং এ কারণে খৃস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও মৃত্যুর পর কবর না দিয়ে তার লাশ পুড়িয়ে ফেলার ইচ্ছা ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, নারী বিলাসী ব্যভিচারী এবং তার ব্যভিচারের কারণে অন্তঃসত্ত¦া এক মহিলাকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করায় উক্ত মহিলা একবার তাকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে তাকে ছয় শতাধিকবার হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র শক্তিকে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ফিডেল ক্যাস্ট্রো প্রায় ৫১ বছর তার দেশ শাসন করেছেন। তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ জন প্রেসিডেন্ট দেশ শাসন করেছেন; তাদের কারোর সাথেই ফিডেল ক্যাস্ট্রোর সুসম্পর্ক ছিল না। বলাবাহুল্য প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই সম্পর্কের উন্নতি হয়নি এবং দেশটির উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল রয়েছে। তার একগুঁয়েমী বিশ্বব্যবস্থাকে পারমাণবিক যুদ্ধের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা তাকে আপোষহীন নেতৃত্বের আসনে বসাতে সাহায্য করেছে। তবে ভিন্নমত দলন তার জন্য যথেষ্ট দুর্নাম কুড়িয়ে এনেছে। পুঁজিবাদী আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃণা করলেও সমাজতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের প্রতি তার নির্ভরতা ও সহনশীলতা তার ব্যক্তিত্বকে খাটো করেছিল এবং তার দেশের জন্য অমঙ্গল ডেকে এনেছিল। ক্ষমতা গ্রহণ করে সর্বপ্রথম তিনি তার দেশের পরিচালনাধীন সকল দেশী-বিদেশী শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য জাতীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসেন এবং এর ফলে উৎপাদনব্যবস্থার প্রচলিত প্রণোদনা ধ্বংস হয়ে যায়। উৎপাদন হ্রাস পায়। তার দলীয় লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ায় তারা দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসে এবং গোটা অর্থনৈতিক ও সমাজব্যবস্থা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। তার আমলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে সন্দেহ নেই, তবে তা কমিউনিস্ট ব্যবস্থার ফল কিনা তা বলা মুস্কিল। অপরদিকে কিউবার সিভিল লিবার্টি বলতে যা বুঝায় তার কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন দেশগুলো কিউবার কারিগরি ও মূলধন সামগ্রী রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা ও অসহযোগিতা করায় সে দেশে শিল্প ভিত গড়ে উঠাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন গবেষক কুয়ানিশা মিলার “Poverty in Paradise; Implications of Poverty in Cuba” শীর্ষক একটি সমীক্ষাপত্র প্রকাশ করেন। এই সমীক্ষায় তিনি বিপ্লবের আগে ও পরে কিউবার দারিদ্র্যের মাত্রা বর্ণনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের আগে কিউবাবাসীদের ৫০ শতাংশের স্বাস্থ্যসম্মত কোনো পায়খানা ছিল না। ৮৫ শতাংশ ও ৯১ শতাংশ মানুষের বাড়ি ঘরে যথাক্রমে পানি সরবরাহ বিদ্যুৎ ও সংযোগ ছিল না। ৪৫% লোক নিরক্ষর ছিল এবং পল্লী এলাকায় প্রতি ২০০০ লোকের জন্য একজন চিকিৎসক ছিলেন।
অন্যদিকে বেকারত্বের হার ছিল ২৫ শতাংশ। শহুরে ছেলে-মেয়েদের শতকরা ২৭ ভাগ স্কুলে যেত না এবং গ্রামের বাড়িঘরের শতকরা ৭৫টি ছিল তার পাড়ার কুঁড়েঘর।
সমীক্ষা অনুযায়ী বিপ্লবের পরে কিউবার আর্থসামাজিক অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়ে। বয়স্কদের স্বাভাবিক ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ৪০ শতাংশ হ্রাস পায় এবং স্বল্প ওজনের বাচ্চা প্রসব, রোগ ব্যাধি, মহামারি প্রভৃতি বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক কারণে খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং রোগ জ্বরা ব্যধির এটাই ছিল মূল কারণ। চিকিৎসা সামগ্রী ও চিকিৎসকের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে তোলা হয়েছিল কিন্তু সেখানে যোগ্য কোন চিকিৎসক ছিলেন না। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন যে, এই অবস্থা হয়তো কয়েক বছর চলবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। এরপর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে কিছুটা উন্নতি হলেও আর সব খাতই অবহেলিত থেকে যায়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিউবায় হাজার হাজার লোক আছেন যারা জীবনে কখনো টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজতে পারেননি এবং পারেন না। কিউবা একটি হ্যারিকেন উপদ্রূত এলাকা। হ্যারিকেনে বিধ্বস্ত বাড়িঘর মেরামত করার অবস্থা তাদের নেই। জাবালা আরগুয়েসের এক গবেষণা অনুযায়ী মাত্র ২২ শতাংশ বিধ্বস্ত বাড়িঘর তারা মেরামত করতে সক্ষম। সেখানকার একটি Boys and Girls Club এর একজন কম্যুনিটি ডিরেক্টর বলেছেন যে, ১৪০ জন লোক মিলে তারা একটি বাথরুম ব্যবহার করেন। উল্লেখ্য, কম্যুনিটি ডিরেক্টর স্বয়ং একজন অধ্যাপিকা। সে দেশে আবাসন সমস্যা অত্যন্ত তীব্র। স্বামী-স্ত্রীর তালাক হয়ে গেলেও আবাসন সংকটের কারণে তাদের একই ছাদের নিচে বসবাস করতে হয় এবং অনেক অনৈতিক কাজ প্রত্যক্ষ করতে হয়।
কিউবান পরিবারসমূহের শতকরা ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ আয় খাদ্য ক্রয়ে ব্যয় করতে হয়। সে দেশে খাদ্যসামগ্রীর কিছু অংশ বিশেষ করে চাল, ডাল, ডিম ও মুরগির জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু আছে। রেশন থেকে তারা বরাদ্দের সামান্য বেশি সিমের বিচি, কফি, ম্যাচ বাক্স, সাবান প্রভৃতি কিনতে পারে। তবে এটা অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। কিউবানদের জন্য মাসিক প্রোটিন বরাদ্দের অবস্থা নিম্নরূপ:
মুরগি- ১৪ বছরের বেশি বয়স্কদের জন্য ১ পাউন্ড
শুকরের গোশত- আধা পাউন্ড
গরুর গোশত- ১ পাউন্ড
কুচি করে কাটা গোশত- আধা পাউন্ড
ডিম- ৫টা
উপরোক্ত বরাদ্দও অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল।
কিউবায় যানবাহনের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। রাস্তায় কিছু বাস চলে কিন্তু তাতে উঠার উপায় নেই। যানবাহনের অভাবে মুমূর্ষু রোগীকেও হাসপাতালে নেয়া যায় না। ফলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়। অনেক ছেলে-মেয়ে যানবাহনের অভাবে অথবা ভাড়া দেয়ার পয়সা না থাকায় স্কুল পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর কিউবার অবস্থা আরো বিপন্ন হয়ে পড়ে। কিউবার প্রধান কৃষি পণ্য আখ, তামাক, কমলালেবু, কফি, ধান, গোল আলু, ডাল ও গবাদি পশু। ২০১৫ সালে তার খাদ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৭০-৮০ শতাংশ এবং দেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত খাদ্যের ৮০-৮৪ শতাংশ তারা রেশনের মাধ্যমে বিতরণ করে। আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সবচেয়ে বড় মিত্র এবং আদর্শিক গুরুকে হারিয়েছে। এই দেশটির উপর তার নির্ভরতা ছিল সবচেয়ে বেশি এবং তার পতনের ফলে কিউবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অধঃপতন দেখা দেয়, মাথাপিছু জিডিপি হ্রাস পায় এবং দারিদ্র্যের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ক্যাস্ট্রোর দুর্ভাগ্য তিনি যে কম্যুনিস্ট স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তা পারেননি। তার কাছ থেকে বিশ্বের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্টদের শিক্ষণীয় কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ