রবিবার ১৮ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই চলছে পুরানো জাহাজ ভাঙার কাজ

এইচ এম আকতার : পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই বাড়ছে পুরানো জাহাজ ভাঙার পরিমাণ। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে পুরানো জাহাজ ভাঙা। এতে করে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও বাড়ছে। কর্মরত অবস্থায় ইয়ার্ডে এ শিল্পে শ্রমিক মৃত্যুর হারও কম নয়। তাই জাহাজ ভাঙা নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন দেশে আন্দোলন করে আসছে। বাংলাদেশে এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মামলা হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের ইয়ার্ডে জাহাজ বিক্রি বন্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নানা ধরনের চাপ রয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিই বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙায় প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং এ দেশে জাহাজ ভাঙার পরিমাণ বাড়ছে।

২০১৫ সালে জাহাজ ভাঙায় বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। এ সময় বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জাহাজ ভাঙা হয় এ দেশে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) ‘রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে আঙ্কটাড।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বিশ্বে জাহাজ ভাঙার পরিমাণ দুই কোটি ৩০ লাখ ৩৭ হাজার টন। এর মধ্যে বাংলাদেশেই ভাঙা হয় ৭৪ লাখ ১৯ হাজার টন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। দেশটিতে গত বছর জাহাজ ভাঙার পরিমাণ ছিল ৪৯ লাখ ৪০ হাজার টন। আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অপর দেশ পাকিস্তান। দেশটিতে ওই সময় জাহাজ ভাঙা হয় ৪১ লাখ ৪৩ হাজার টন। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে চীনে ৩৯ লাখ ৭০ হাজার টন ও তুরস্কে আট লাখ ৫২ হাজার টন জাহাজ ভাঙা হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবু তাহের বলেন, দেশের স্টিল মিলগুলোর কাঁচামালের বেশিরভাগই শিপ রিসাইকেল থেকে আসে। এ খাতে চাহিদা বাড়ায় জাহাজ ভাঙার পরিমাণ বাড়ছে। এছাড়া আগামী কয়েক বছরে বড় কয়েকটি প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। ফলে জাহাজ ভাঙার পরিমাণ অব্যাহত থাকবে।

তবে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর নেতারা। তাদের মতে, তিন-চার বছর আগেও জাহাজ ভাঙায় বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে ছিল চীন। পরে এ জায়গা দখল করে ভারত। তবে জাহাজ ভাঙায় পরিবেশ ইস্যুতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও আইনি কাঠামো প্রণয়নের কারণে দেশ দুটিতে এর পরিমাণ কমছে। আর দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগে বাংলাদেশে এর পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল ল’ইয়ার্স এসোসিয়েশনের (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। প্রায়ই নানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতির জন্যও এ খাত দায়ী। তবে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তারা নানা কথা বললেও কখনোই তার বাস্তবায়ন করেনি। কারণ সেগুলো বাস্তবায়ন হলে তাদের পুরনো জাহাজ বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে।

২০১৫ সালে বিশ্বে ভাঙা জাহাজের ৯৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীনে। আর দাম বেশি পাওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলোও দক্ষিণ এশিয়ার ইয়ার্ডগুলোয় জাহাজ বিক্রিতে বেশি আগ্রহী। যদিও নরওয়েভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ল’ এন্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের (আইএলপিআই) সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা এ শিল্পের শ্রমিকদের আয়ুষ্কাল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গড় আয়ুষ্কালের চেয়ে ৩০ বছর কম।

আঙ্কটাডের তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বে বেশি ভাঙা হয় বাল্ক ক্যারিয়ার (পণ্যবাহী জাহাজ)। এর বড় অংশই ভাঙা হয় বাংলাদেশে। তেলবাহী ট্যাংকার, সাধারণ কার্গো ও কনটেইনারবাহী জাহাজও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভাঙা হয় এ দেশে। এছাড়া অফশোর (সমুদ্রে টহলরত) জাহাজ ভাঙায়ও শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। তবে তরল গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ সামান্য পরিমাণ ভাঙা হয় এ দেশে।

গত বছর এক কোটি ৬৮ লাখ ১৬ হাজার টন পণ্যবাহী জাহাজ ভাঙা হয়। এর মধ্যে ৫৭ লাখ ৫৮ হাজার টন বা ৩৪ শতাংশ ভাঙে বাংলাদেশ। পাকিস্তানে এ ধরনের জাহাজ ভাঙার পরিমাণ ছিল ৩৫ লাখ ৫৯ হাজার টন, ভারতে ৩১ লাখ ৩৬ হাজার ও চীন ২৮ লাখ ৯৫ হাজার টন। আর ২০১৫ সালে বিশ্বে তেলবাহী ট্যাংকার ভাঙা হয় ১১ লাখ ৬৯ হাজার টন। এর প্রায় অর্ধেক ভাঙা হয় পাকিস্তানে, যার পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টন। আর বাংলাদেশে ভাঙা হয় তিন লাখ ১১ হাজার টন।

এদিকে ২২ লাখ ৮৫ হাজার টন কনটেইনারবাহী জাহাজ ভাঙা হয় বিশ্বব্যাপী, যার মধ্যে ছয় লাখ ৪০ হাজার টনই ছিল এ দেশে। আর আট লাখ ১৮ হাজার টন সাধারণ কার্গো শিপের মধ্যে দুই লাখ দুই হাজার টন বাংলাদেশে ভাঙা হয়। এছাড়া গত বছর দেশে সমুদ্র টহলরত জাহাজ ভাঙা হয় তিন লাখ ৮৬ হাজার টন। পুরো বিশ্বে এ ধরনের জাহাজ ভাঙার পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪৩ হাজার টন।

আঙ্কটাড বলছে, ২০১৫ সালে বিশ্বে ভাঙা জাহাজের ৯৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীনে। আর দাম বেশি পাওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলোও দক্ষিণ এশিয়ার ইয়ার্ডগুলোয় জাহাজ বিক্রিতে বেশি অগ্রহী। যদিও নরওয়েভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ল’ এন্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের (আইএলপিআই) সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা এ শিল্পের শ্রমিকদের আয়ুষ্কাল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গড় আয়ুষ্কালের চেয়ে ৩০ বছর কম।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৭০ বছরের বেশি। অথচ জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৪০ বছর। মানবাধিকার ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় না নিয়ে জাহাজ ভাঙার কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় এ শিল্পের শ্রমিকরা দ্রত মারা যাচ্ছেন।

এদিকে নিম্নমানের ইয়ার্ডের কাছে পুরনো জাহাজ বিক্রি বন্ধে গত বছর একটি নীতিমালা তৈরি করে ইইউ। তাদের নিবন্ধিত শিপিং কোম্পানিগুলো যাতে এসব ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি না করে, সেটি উল্লেখ করা হয় নীতিমালায়। পাশাপাশি কোন ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি করা হয়েছে, সে-সংক্রান্ত প্রতিবেদন শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রতিবছর ইইউর সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিতে বলা হয়।

এ ধরনের ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট শিপিংলাইনসের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে ৩২টি বহুজাতিক কোম্পানির জোট ক্লিন শিপিং নেটওয়ার্ক (সিএসএন)। এসব ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রয়কারী শিপিংলাইনসের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন না করার ঘোষণা দিয়েছিল তারা। তবে এর কোনো প্রভাব পড়েনি বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে। জাহাজ ভাঙা শিল্পকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছর বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ আইন, ২০১৫ প্রণয়নে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। আইনের খসড়া অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকার জাহাজ নির্মাণের জন্য অঞ্চল নির্ধারণ করে দেবে। এর বাইরে কেউ জাহাজ ও ইয়ার্ড নির্মাণ করলে শাস্তির আওতায় পড়বে। এর আগে হাইকোর্টের অনুশাসন অনুযায়ী ‘শিপ ব্রেকিং এন্ড রিসাইক্লিং রুলস ২০১১’ জারি করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হেফাজুতুর রহমান বলেন, জাহাজ ভাঙায় পরিবেশগত ঝুঁকি আগের চেয়ে এখন অনেক কমে গেছে। আগে যেখানে শ্রমিকের ব্যবহার হতো, সেখানে এখন অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। জাহাজ ভাঙার প্রক্রিয়ায় আগে বিপুল পরিমাণ ধুলো, আবর্জনা, তেল ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও এখন তা আর নেই। তাই এ খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়ছে।

উল্লেখ্য, মূলত চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড, কুমিরা, জোড়ামতল, মাদামবিবিরহাট, কদম রসুল, ভাটিয়ারী, ফৌজদারহাট, শীতলপুর ও বারো আউলিয়ায় সাগরপাড়ে গড়ে উঠেছে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সিংহভাগ। তবে পুঞ্জীভূত ও ভবিষ্যৎ লোকসানের আশঙ্কায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেকেই এ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ