সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

যারা নামায আদায় করে তারা শ্রেষ্ঠ মানুষ

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : মহান আল্লাহপাকের চরাচরে মানুষ ও জীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল মাত্র তার এবাদত করার জন্য। আল্লাহপাক তার কালামে ঘোষণা করেন-ওয়ামা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লিইয়া’বুদুন। অর্থাৎ আমি জীন ও মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমার এবাদত করার জন্য। (জারিয়াত-৫৬) যদিও এবাদত মানে গোলামী। কেবলমাত্র আল্লাহর গোলামীর জন্য জীন ও মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানে এবাদত বা গোলামী শুধু মাত্র আল্লাহ্র করবে। তাহলে এবাদত বলতে শুধু নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত বুঝায় না, আল্লাহর হুকুম মত সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালনা করার নাম এবাদত। এতোসব কাজ কর্ম আল্লাহ্র নির্দেশমত সম্পন্ন করার জন্য প্রতিদিন আল্লাহ্র ঘর মসজিদে গিয়ে আল্লাহ্র আনুগত্য ও আল্লাহ্কে সিজদায় হাজিরা দিতে হয়। সেখানে আল্লাহ্র অহি পাঠ করা হয় বা অহি শুনা হয়। আল্লাহ্কে হাজির নাজির জেনে তার কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। মূলতঃ এটা নামায। মুসলমানের উপর নামায ফরয করা হয়েছে। নামায হল আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ।  নামায হল সর্বোত্তম যিকির। নামায হল স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধন।  নামায হল আল্লাহ্র গোলামীর বাস্তব সাক্ষ্য। নামায হল নির্ভেজাল তৌহিদের প্রতীক। নামায হল  সমস্ত র্শিক বিদআতমুক্ত পূত-পবিত্র মানুষের চাক্ষুষ চিত্র। নামায হল আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেয়ার হাজিরা।
আল্লাহর দিকে যখন ডাকা হয়
নামায আদায়ের জন্য প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদের মিনার থেকে সুমধুর কন্ঠে উচ্চস্বরে ডাকা হয়। মহামহিম আল্লাহ্তায়ালার স্মরণ ও সিজদার জন্য এমন সুন্দর ডাকের আয়োজন। সারা দুনিয়ায় অগণিত মসজিদের মিনার থেকে দুনিয়ার সেরা  এ আওয়াজ আকাশে বাতাসে অনুরণিত হতে থাকে। আশরাফুল মাখলুক্বাত এ মানুষজাতি ছাড়াও আঠারো হাজার মাখলুক্বাতের সবার কানে এ মহান তৌহিদের আওয়াজ পৌঁছে যায়। মুয়াজ্জিনের কন্ঠে উচ্চারিত আওয়াজগুলো বড় হৃদয়গ্রাহী। আল্লাহু আকবার-আল্লাহ মহান। আশহাদু আল্ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ্ ছাড়া কোন প্রভু নেই। আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ (স:) আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল। হাইয়্যা আলাস সালাহ- নামাযের জন্য আসো। হাইয়্যা আলাল ফালাহ- কল্যাণের জন্য আসো। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ্ ছাড়া কোন প্রভু নেহ।
আল্লাহর ডাকে তারা সাড়া দেয়
প্রতিদিন পাঁচবার করে আল্লাহর পক্ষ থেকে এভাবে তৌহিদ, রিসালাত ও সালাতের জন্য ডাকা হয়। ফলে মোমেন মুসলমানের হৃদয় ক্বলবে সাড়া জেগে উঠে। যারা সেরা মানুষ,যারা পরকালে বিশ্বাসী, যারা আল্লাহ্কে মানে তারা এ মধুর আযানের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারে না।নামাযের জন্য যারা দৌড়ায় তারা ওদের মত নয় যারা আযান শুনেও নড়ে না। অথচ আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এরূপ অবশ্য করণীয় ডাক কারো কানে পৌঁছলে তার হাতের সব কাজ হারাম মনে করা স্বাভাবিক। আল্লাহ্র মহব্বতে দুনিয়ার সব ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র মসজিদের দিকে যারা দৌড়ায়  তারা আল্লাহ্র প্রেমিক। তারা জামাতবদ্ধভাবে আল্লাহ্র সিজদায় লুটিয়ে পড়ে শান্তি পায়। মনের সব কালিমা ময়লা অপবিত্রতা  দূর করে ফেলে। পবিত্র পানি দিয়ে হাত, মুখ, কান, পা এসব ধৌত করে রাসূলের দেখানো পথ ধরে অজু করে। অজুর  পরে নামাযীর মন যেরূপ বিশুদ্ধ হয় তার পূর্বে এরূপ ছিল না। শরীর মনের পবিত্রতার সাথে আতরের সুগন্ধি নামাযীর মন আরো বেশী আল্লাহ্মুখী বানিয়ে দেয়। আল্লাহ্র মূল বা কেন্দ্রীয় ঘর হল ক্বা’বা ঘর। বিশ্ব মুসলিমের কেবলা হল ক্বা’বা ঘর। চারিদিক থেকে সব নামাযী এক কেবলামুখী হয়ে দুনিয়ার সব কিছুকে হারাম করে আল্লাহ্র সামনে এসে দাঁড়ায়। এক ক্বাবাঘরের দিকে মুখ করে উহার পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ চারিদিক থেকে মসজিদ আর মাঠে ঘাটে সর্বত্র মানুষ ও জীনেরা আল্লাহ্র সিজদারত আছে।
সকল নামাযী মুখ দিয়ে আল্লাহু আকবার (আল্লাহ্ মহান) ঘোষণা করে কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠিয়ে  নামায শুরু করে। নামাযের শুরুতে মানুষের প্রকাশ্য দুশমন শয়তান থেকে আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। কেননা  নামাযের মধ্যে সে কুমন্ত্রণা দিয়ে নামাযীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে থাকে। আল্লাহ্র বান্দা আল্লাহ্র নাম নিয়ে আল্লাহ্র সামনে যখন দাঁড়িয়ে যায় তখন তার দিল আল্লাহ্র ভয়ে কাঁপতে থাকে। তার হৃদয় ক্বলব, চোখ, কান, হাত, পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবই এক আল্লাহ্র ধ্যান খেয়ালে একনিষ্ঠ। কোন নড়াচড়া নেই।  সে যখন সূরা ফাতেহা পড়ে তখন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে চমৎকার জবাব দেয়া হয়। নামাযীরা প্রতিদিন নামাযে এবং নামাযের আগে পরে আল্লাহর বিধান আর রাসূলের হাদিস অধ্যয়ন করে নিজেদের যোগ্য দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলে।  নামাযী সূরা ফাতেহায় শপথ নিয়ে বলে-ইয়অ্যাকানা’বুদু ওয়াইয়অ্যাকা নাস’তায়ীন। অর্থাৎ আমরা কেবল তোমারী দাসত্ব করি এবং তোমারী কাছে সাহায্য চাই। নামাযী তার নামাযে কিয়াম, রুকু, সিজদা আর তাশাহ্হুদে আল্লাহ্র কাছে থেকে কাছে আরো কাছে পৌঁছতে থাকে। সে যখন সিজদায় যায় তখন একেবারে আল্লাহ্র নিকটতম অবস্থানে পৌঁছে যায়। নামাযী যখন তাশাহ্হুদে বসে তখন আল্লাহ্র সাথে মেরাজের ঘটনা ঘটে। নামাযী নামাযের আগে পরে সদা সর্বদা আল্লাহ্র বিধিবিধান এবং আল্লাহ্র আইন-কানুন ছাড়া আর কিছুরই দাসত্ব করবে না। নামাযীরা বিশ্বাস করে যে আল-কুরআন হলো মহাপবিত্র সংবিধান। তারা আল্লাহ্র বিধান শুনে, বুঝে আর উহার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্র বিধান ব্যক্তি, ঘর, সংসার, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রে বিজয়ী করা প্রত্যেক নামাযীর জন্য অবশ্য কর্তব্য।
নামায আদায়কারীরা শ্রেষ্ঠ মানুষ যেভাবে
যারা নামায আদায় করে তাদের মূল লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তোষ অর্জন।তাই নামাযীরা আনুগত্যে সর্বদা নত শির। তারা শুধু আল্লাহ্র পদতলে  আত্মোৎসর্গ করে দিয়ে সেরা মানুষের আসনে আসীন হয়। কুরআন পাকের সূরা বাক্বারায় আল্লাহ্ মুত্তাকীর প্রথম শর্ত ঘোষণা করেন, অদৃশ্যে বিশ্বাস করা। এরপর প্রধান আমল ফরয করেন, ওয়া ইউক্বিমুনাস্সালাতা, তারা নামায প্রতিষ্ঠা করবে। সূরা কাওছারে আল্লাহ্ বলেন, ফাসাল্লি লি রাব্বিকা ওয়ানহার- নামায কায়েম কর এবং কুরবানী দাও। সূরা বাক্বারার অন্যত্র আল্লাহ্ বলেন- হে ঈমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। এমনিভাবে কুরআন পাকে বারবার নামাযের অবশ্য করণীয় নির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ্র সব নবীদের সর্বাধিক আমল ছিল এই নামায। হাশরের দিন সর্বপ্রথম হিসাব হবে নামাযের। দুনিয়ার সেরা মানব হযরত মুহাম্মাদ (স:) মূলত: এই নামায, যাকাত ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা আর অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশ্বনবী (স:)-এর শেষ নি:শ্বাসের পূর্বে সর্ব শেষ ঘোষণা ছিল-সালাত, সালাত, সালাত। যারা নামাযী তারা সেই মহান গুণের অধিকারী ছিলেন যাতে মহানবী (স:) এবং অন্যান্য সব নবীরা বিদ্যমান ছিলেন। এই নামায হল বেহেশতের চাবী। নামায সম্পর্কে মহানবী (স:) থেকে অনেক হাদিস উল্লেখিত। তিনি বলেন, মুসলমান এবং কাফিরের পার্থক্য হল নামায। তিনি আরো বলেন যে, এক ওয়াক্ত নামায ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিলে তাকে দুই কোটি অষ্টাশি লক্ষ বছর দোজখের আগুনে জ্বলতে হবে।
কাজেই নামায আদায়কারীরা অতি উঁচু মর্যাদার অধিকারী। নামায আদায়কারী কোন মানুষ শ্রেষ্ঠ চরিত্রের  অধিকারী না হয়ে পারে না। আল্লাহ্ বলেন, নিশ্চয়ই নামায যাবতীয় অশ্লীল  ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। তাই চরিত্র গুণেও নামাযীরা সেরা মানুষ। নামায আদায়কারী মানুষ সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে আর  অন্যায়ের বিপক্ষের দলে অবস্থান নেয়। নামাযীরা সর্বদা সত্য, সুন্দর ও উন্নত মানসিকতার উজ্জল নক্ষত্র। তাই নামাযীরা সেরা সম্মানী। আল্লাহ্ বলেন-ইজ্জত সম্মান আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মোমেনদের জন্য। এই মোমেন মুসলমানেরাই আল্লাহ্র নির্ভরযোগ্য ও সম্মানিত শক্তি। যুগে যুগে এসব বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী নামাযীদের দ্বারাই ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয় সূচিত হয়ে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ