শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

ট্রাম্পের সস্তা রাজনৈতিক বক্তব্য গিলে ফেললো বিশ্বের শক্তিশালী দেশ

১০ নবেম্বর, ওয়াশিংটন পোস্ট : আমেরিকার এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায ব্যতিক্রমী, সন্দেহ নেই। এটা ছিলো রাজনৈতিক আভিজাত্যের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবের মতো। 

ধর্মান্ধ ও বর্ণবাদের জয়, নাকি উগ্র জাতীয়তাবাদের জয়? অধিকাংশ ভোট বিশ্লেষক মনে করেন, এই নির্বাচন ছিল সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে উগ্র জাতীয়তাবাদের। ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের পিছনে মূল ভূমিকা রেখেছে তার মেক্সিকানবিরোধী, ইসলামবিরোধী এবং অভিবাসীবিরোধী সস্তা রাজনৈতিক বক্তব্য।

প্রচারজুড়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র বসবাস করা মেক্সিকান অভিবাসীদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘ধর্ষক’ বলে আক্রমণ করেছেন। মেক্সিকোর সীমান্তে তাদেরই অর্থে দেয়াল তৈরি করার কথাও ঘোষণা করেছেন। 

আইএস তকমা লাগানো বিপথগামী জঙ্গিদের সঙ্গে ধর্মপ্রাণ, শান্তিপ্রিয় মুসলিমদের এক করে, ইসলাম ধর্মের প্রতি ভীতি ও বিদ্বেষ সৃষ্টিতে ট্রাম্প নেতৃত্ব দিয়েছেন। সব মুসলিমকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র প্রবেশ নিষিদ্ধ করার কথাও ঘোষণা করেছেন। আমেরিকার একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনি জাগিয়ে তুলেছেন বর্ণবাদ, অসহনশীলতা ও ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পোস্টের মতো, বিশ্বের বড় বড় সংবাদপত্র আঁচ করতেই পারেনি ট্রাম্পের ‘সস্তা রাজনৈতিক বক্তব্য’ কখন গিলে ফেলেছে বিশ্বের শক্তিশালী দেশ। ঢেলে ভোট দিয়েছে মার্কিন শ্বেতাঙ্গরা।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন মানুষকে কিভাবে আমেরিকান জনগণ পছন্দ করতে পারে ট্রাম্পের সমর্থকরা কি অভিবাসনবিরোধী, বর্ণবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী? তাই তারা বিদেশিবিরোধী, মুসলিমবিরোধী, সংখ্যালঘুবিরোধী, রেসিস্ট, মেসোজিনিস্ট ট্রাম্পকে সমর্থন করছে? 

ভিত্তিহীন মন্তব্য, প্রতিপক্ষের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে প্রতিনিয়ত অবজ্ঞা করে বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া ট্রাম্পের ‘নির্বাচনী ব্র্যান্ডে’ পরিণত হয়েছিল। তবুও আমেরিকা তাকে ভোট দিয়েছে। তার জয়ে রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া, পেশাদার রাজনীতিবিদরাও হতভম্ব হয়ে গিয়েছেন। ‘বিরাট ধাক্কা। আমার ধারণা, ট্রাম্প জানেন এ ভোট তার নয়, এ ভোট ওয়াশিংটন ও প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে রায়।’ রীতিমতো টেলিভিশনে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী উরসুলা ভন দের লেয়ান। বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের জয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কার মধ্যে ডলারের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজার উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেছে। 

ইউরোপীয় শেয়ারগুলি ৪ শতাংশ দর হারিয়েছে। ট্রাম্পের জয় যত এগিয়েছে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ছুটছে। সেই কারণে বেড়েছে সভরেন বন্ড ও সোনার দাম। সঙ্গে বেড়েছে জাপানি ইয়েনের দরও। ডলারের দর ৩১ শতাংশ কমে ১০১৮৯০ পয়েন্টে ঠেকেছে। সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে ডলারের দর ১৮ শতাংশ পড়েছে ০৯৬০৬ পয়েন্টে নেমেছে। উচ্ছসিত ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টির নেতা ম্যারি লো পেন ট্যুইট করে বলেছেন, মুক্ত আমেরিকার জনগণ ও আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন।

পর্ন তারকাসহ বিনোদন জগতের তিন তারকাকে বিয়ে করা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শুরুতে অনেকেই ভাঁড় হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। দলের মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে বাঘা বাঘা প্রার্থীদের ঠিক দুর্বল জায়গায় সময়মতো ছুরি চালিয়ে বিদায় করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি দলনির্বিশেষে সব রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এমনভাবে কথা বলেছেন যে, তিনি নিজে ছাড়া আর সবাই ভুল। সমর্থকদের মধ্যে তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করেছেন সফলভাবে।

শুরুতে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে তাকে নিয়ে চরম বিভেদ দেখা দিলেও আস্তে আস্তে অনেকেই তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখেছে। ৪৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ স্লোগান দিয়ে একদিকে বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্য কমে যাওয়ায় হতাশ আমেরিকানদের অনুপ্রাণিত করেছেন।

ট্রাম্পের জনসমর্থনের ভিত্তি ‘ব্লু কালার ওয়ার্কাররা’। আমেরিকার এই বিশাল জনগোষ্ঠী ক্ষুব্ধ, হতাশ ছিল। ‘ব্লু কালার ওয়ার্কাররা’ দলে দলে চাকরি হারিয়েছেন গত কয়েক দশকে। এই ব্লু কালার ওয়ার্কার আসলে কারা?

এরা হচ্ছেন মূলত শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। যাদের তেমন কোনো ডিগ্রি নেই। এরা আমেরিকার কলকারখানায় চাকরি করে মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করে। এরাই শুরু থেকে ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ একজন বিলিওনিয়ার ব্যবসায়ীর ট্রাম্পকে সমর্থন করে এসেছে। কারণ, ট্রাম্প কথা দিয়েছেন, কোনওভাবেই দেশ থেকে আর চাকরি চুরি হয়ে যেতে দেবে না।

প্রচারে বারেবারে বলেছেন, বিল ক্লিনটনের আমলে কানাডা ও মেক্সিকোর স্বাক্ষরিত ‘নাফটা’ এবং চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে দেশীয় উৎপাদন কমে গিয়ে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি। ফলে বেশি মজুরির আমেরিকায় কারখানা না বানিয়ে কম মজুরির মেক্সিকো ও চীনে কারখানা বানিয়েছে আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা। এতে সংকুচিত হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। কমেছে শ্রমিকের মজুরি।

আমেরিকার দ্য ট্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ট্যাক্স পলিসি সেন্টারের মতে, ট্রাম্পের কর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আগামী দশ বছরে জাতীয় আয় বাড়বে ১১৫ শতাংশ, সৃষ্টি হবে ৫৩ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান। এতে কর্মজীবী মানুষের জীবন কিছুটা উন্নত হবে, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়বে। সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন উচ্চআয়ের লোকেরা।

দেশের কম শিক্ষিত, কর্মজীবী শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ বা শ্রেষ্ঠত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে ট্রাম্প সফল। ভোট জুড়ে হিলারিকে এক ‘ক্ষমতালোভী’ হিসাবেই সমালোচনা করে গিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী। আসলে মার্কেটিং বা বাজারজাতকরণে ট্রাম্পের দক্ষতা দুর্দান্ত। মাত্র হাতেগোনা অন্য কয়েকজনের মতোই তার নাম নিয়ে তিনি একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু বাণিজ্য চুক্তিই নয়, নিরাপত্তা চুক্তিতেও পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন ন্যাটো সদস্যদের সমান হারে অর্থ দেয়ার কথা। 

জানিয়ে দিয়েছেন সৌদি আরব ও জাপানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের খরচ তাদেরই দিতে হবে। এতে আমেরিকার শত্রু-মিত্র সব দেশই ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নির্ধারণে এখনই মাথা ঘামাতে শুরু করেছে। সিরিয়ায় সেনা মোতায়েনের ঘোরতর বিরোধী ট্রাম্প। নিজেকে ইরাক যুদ্ধবিরোধী বলে প্রচার করছেন ট্রাম্প। সাপে-নেউলে সম্পর্ক রাশিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করতেও ডরাননি। রাশিয়ার বড় বড় সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পকে সমর্থনের আবেদন জানিয়েছিল।

ট্রাম্প জমানায় আমেরিকা আরো বেশি যুদ্ধংদেহী হবে নাকি যুদ্ধ বর্জন করে অভ্যন্তরীন বিষয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করবে তা এখনই কেউ বলতে পারেনি। তবে উগ্র জাতীয়তাবাদী ট্রাম্পের আমেরিকা বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ব বাড়াতে চেষ্টা করবে, তা কারোর অজানা নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ