বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ভারতে গ্যাস রফতানি প্রক্রিয়া শুরু

এবি সিদ্দিক : শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাসের উপর নির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে গ্যাস সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-ভারতের মধ্যে ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপন, গ্যাস ক্ষেত্রে বিদেশীদের কর্তৃত্ব প্রদান, জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী না করা এসবই রহস্যজনক। বাংলাদেশ থেকে ভারতে গ্যাস রফতানির চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা যায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে (ত্রিপুরা, আসাম রাজ্যে) ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্র ডুয়েড (গ্যাস/কয়লা) পদ্ধতিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। বৃহত্তর সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েকটি বড় গ্যাস ফিল্ড বিশেষ করে কতুবদিয়া, সেমুতাং, শাহবাজপুর, ছাতক ও কামতা গ্যাস ফিল্ডগুলো বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা চলছে। এসব ফিল্ড বিদেশীদের হাতে গেলে তারা সেগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন করে ভারতের কাছে বিক্রি করবে। উল্লেখ্য, কুতুবদিয়া ৪৫.৫০, সেমুতাং১৫০.৩০ ও শাহবাজপুর ফিল্ডে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ৪৬৫.৬০ বিলিয়ন ঘনফুট। এগুলো উৎপাদনে যায়নি। ছাতক ও কামতা গ্যাস ফিল্ডের মজুদ যথাক্রমে ৪৭৩.৯০ ও ৫০.৩০ বিলিয়ন ঘনফুট। প্রাপ্ত সূত্রে আরো জানা যায়, তৈরি যে ফিল্ডগুলোতে সর্বাধিক পরিমাণ গ্যাস মজুদ আছে সেগুলোই বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। গ্যাস নিয়ে সরকারের ভূমিকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশব্যাপী গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর বলেছেন, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২২০০ মিলিয়ন ঘনফুট, আর উৎপাদন হচ্ছে ১৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আরো বলেন, সারাদেশ এখন গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে একমাত্র জ্বালানি গ্যাস। শিল্প-বাণিজ্য ও অন্যান্য যেসব খাত আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে চিন্তা করা উচিত যে, শুধু গ্যাসের উপর নির্ভর না করে অন্য জ্বালানি, অর্থাৎ ফার্নেস অয়েল ডিজেল নির্ভর হলে ভালো হতো। হঠাৎ করে গ্যাস বাড়ানো যায় না, এটা সবার মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে ৪০ বছরে মাত্র ২০০০ মিলিয়ন গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আগামী ২/৩ বছরে গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে দেবো। গ্যাসের মজুদ কম নয় বলেও তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, হঠাৎ করে লাফিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো যায় না, এটার জন্য টাইম লাগে। এদিকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেছেন- গ্যাসের যথেষ্ট মজুদ আছে তবে কত মজুদ আছে, তা তিনি বলেননি। তিনি নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার ও সার্ভে করার কথাও বলেছেন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, দেশে ২৩টি ফিল্ডে বর্তমানে উত্তোলনযোগ্য মজুদ ১৫.৪১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) এর মধ্যে উত্তোলন হয়েছে প্রায় ৮.০৫০ টিসিএফ। মজুদ আছে ৭ টিসিএফ-এর বেশি। গ্যাসের মজুদ নিয়ে অবশ্য নানা বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমানে উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ৫ টিসিএফ-এর কিছু বেশি। চলমান গ্যাস সংকট সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে যদিও বলা হচ্ছে যে, উৎপাদন কম কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ সরবাহ সমস্যা। সাবেক বিদ্যুৎ সচিব প্রকৌশলী আ.ন.হ আখতার হোসেন বলেছেন, গ্যাসের উৎপাদন স্বাভাবিক। সরবরাহ হচ্ছে সমস্যা। সরকারের উচিত কম্প্রেসার বসিয়ে সরবরাহ বাড়ানো। এদিকে ভারতে গ্যাস রফতানির উদ্দেশ্যেই ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। মিয়ানমার থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯শ কিলোমিটার গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনের বিষয়ে বাংলাদেশ অনুমোদন দিতে যাচ্ছে। এ সম্পর্কিত একটি সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। ত্রিদেশীয় পাইপ লাইন স্থাপনে ভারত দীর্ঘদিন যাবত চেষ্টা চালিয়ে আসছে। গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনের চেষ্টা চালায় ভারত। কিন্তু জোট সরকার অনুমোদন দেয়নি। কারণ এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের গ্যাস পাচার হওয়ার বিষয়টি জড়িত। এ সম্পর্কে পেট্রোবাংলার একজন সাবেক চেয়ারম্যান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এ ধরনের পাইপ লাইনে ঝুঁকি আছে। তবে গ্যাস-আমদানি-রফতানির জন্যে এটা সহজ। বাংলাদেশ প্রয়োজনে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করতে পারবে, আবার ভারতে রফতানিও করতে পারবে। বাংলাদেশ যদি ভারতে গ্যাস রফতানি করে বা ভারত বাংলাদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করে তাহলে এই পাইপ লাইন কাজে লাগবে। আর পাইপ লাইনটা চট্টগ্রামের উপর দিয়ে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বা সিলেট অঞ্চলের ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন করে ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে সরবরাহ যেমন সহজ হবে, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তো পাইপ লাইন যাচ্ছেই। কাজেই ভারতে গ্যাস রফতানিতে ত্রিদেশীয় পাইপ লাইন হবে সহজ উপায়। তিনি আরো বলেন, ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপ লাইন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে হুমকির কারণ হতে পারে। সেহেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্বাধীনতাকামীরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, আবার তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। যদি তারা এই পাইপ লাইনে আঘাত করে তবে সেটা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ