শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ও নিন্দার ঝড়

কূটনৈতিক রিপোর্টার : ঢাকার কলাবাগানে গত সোমবার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রটোকল কর্মকর্তা জুলহাস মান্নানসহ ২ জনের হত্যা এবং সম্প্রতি সংঘটিত ব্লগার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী হত্যাকাণ্ডে দেশে যেমন নিন্দার ঝড় উঠেছে তেমনি বিদেশীদের মধ্যেও। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানীসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা এর তীব্র নিন্দা জানান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের খুঁজে বের করা ও বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শেষ দেখতে পাচ্ছে না জাতিসংঘ। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কারণে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। রাজধানীর কলাবাগানে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাস মান্নানসহ জোড়া খুনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গতকাল মঙ্গলবার দেয়া এক বিবৃতিতে এই মন্তব্য করেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে আরো একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা শোকাহত। সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাওয়া আক্রমণের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক ঘটনায় সহিংসতা ও চরমপন্থার শিকার হয়েছেন জুলহাস মান্নান ও মাহবুব তনয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতা সংশ্লিষ্ট সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতের সাথে মিল নেই- এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। (জুলহাস হত্যাকাণ্ডের) মাত্র দুইদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম খুনের ঘটনা এরই দৃষ্টান্ত।

এতে বলা হয়, সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যহীনভাবে সব মানুষের বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা জাতিসংঘের নীতি। গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে যে সহিংসতা ও নৃশংসতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি- তার বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় নেতাদের প্রতিবাদ জানানো উচিত। দোষীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ও দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। দোষীদের দায়মুক্তি অসহিষ্ণুতাকে আরো বাড়িয়ে দেবে, যা এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে উৎসাহিত করবে।

মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল অফিসার ও ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান খুনের নিন্দা জানিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ‘পূর্ণ সহযোগিতার’ প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, জুলহাস ছিলেন ‘একজন আস্থাভাজন সহকর্মী, একজন প্রিয়তম বন্ধু এবং বাংলাদেশে ব্যক্তির মর্যাদা ও মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার’। কেরির মতে, জুলহাসের হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশের চেতনা এবং সহনশীলতা, শান্তি ও বৈচিত্র্যের সুরক্ষায় বাঙালির যে ঐতিহ্য তার প্রতিনিধি ছিলেন তিনি।

বিবৃতিতে জন কেরি বলেন, “যে বিষয়গুলো জুলহাসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেগুলোর প্রতি আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বে সহনশীলতা ও মানবাধিকারের জন্য যারা কাজ করছেন তাদের সবাইকে সহযোগিতার অঙ্গীকার রয়েছে আমাদের।”

হত্যায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার প্রস্তাব তুলে ধরে পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, “যে কাপুরুষরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষকে আমাদের সহযোগিতার অঙ্গীকার করছি।” কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তদন্তকারীদের কাজটি ঠিকমতো করতে দেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রদূতের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাস মান্নানসহ জোড়া খুনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র স্তম্ভিত। বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডে জুলহাসের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। ন্যক্কারজনক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

রাজধানীতে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল অফিসার জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু তনয় হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। তিনি গত সোমবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে এই প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘জুলহাসের মৃত্যুতে আমি মর্মাহত। জুলহাস আমাদের একজন ভালো বন্ধু ছিল।’

বিবৃতিতে যারা এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছেন তাদের ধরার জন্য সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। এ সময় বার্নিকাট নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাস মান্নান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকীসহ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। সেইসঙ্গে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতেও বলা হয়েছে। এক টুইট বার্তায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুগো সোয়াইর বলেন, ‘অধ্যাপক করিম, তনয় ফাহিম এবং জুলহাস মান্নানের অনাকাক্সিক্ষত হত্যার ঘটনায় গভীর বেদনা বোধ করছি। খুনিদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

রাজধানীর কলাবাগানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রটোকল অফিসার জুলহাস মান্নান হত্যার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। জুলহাসকে তার বন্ধু আখ্যায়িত করে গত সোমবার সন্ধ্যায় এক টুইটার বার্তায় গিবসন বলেন, ‘ভয়ংকর। আমি আমার বন্ধু ও মানবাধিকার কর্মী জুলহাসের হত্যার নিন্দা জানাই। হত্যাকারীদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’

সমকামীদের অধিকারবিষয়ক পত্রিকা রূপবানের সম্পাদক ও মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএইডের কর্মী জুলহাস মান্নানের হত্যাকাণ্ডকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের শেকড় চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে থাকা ডেমোক্রেট দলের একজন শীর্ষস্থানীয় সিনেটর বেন কার্ডিন। এক বিবৃতিতে মি. কার্ডিন বলেন, “ব্যক্তিসত্তার জন্য, কর্মের জন্য, কাউকে ভালবাসার জন্য কিংবা পছন্দের সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করার জন্য যদি কারো বিরুদ্ধে অন্যায় করা হয় তার স্থান আধুনিক সমাজে নেই, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে সুস্পষ্টভাবে এই বার্তা দিতে হবে”। যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে এই ঘটনার সমালোচনা ও নিন্দা জানানো হচ্ছে।

মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইডের কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান হত্যার নিন্দা এবং হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় নেয়ার দাবি জানিয়েছে নিউইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক সংগঠন দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)। ইউএনবি এ তথ্য জানিয়েছে। সিপিজের এশিয়া প্রকল্পের সমন্বয়কারী বব দিজ বলেন, কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জুলহাস মান্নান হত্যার তদন্তপূর্বক অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বব দিজ আরো বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা হামলার শিকার হচ্ছেন এবং সরকার এই অপরাধ বন্ধ করতে অথবা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৎসামান্যই কাজ করছে।

সাবেক মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু তনয়কে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানীর রাষ্ট্রদূত ড. টমাস প্রিনজ। একইসঙ্গে গভীর শোকও প্রকাশ করেছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার জার্মান দূতাবাসের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেয়া বিবৃতিতে এ ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি। এ সময় নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। বিবৃতিতে রাষ্ট্রদূত প্রিনজ বলেন, দু’জন স্পষ্টভাষী ও উদারকর্মীর ওপর ভয়াবহ আক্রমণের নিন্দা জানাই। এটি শুধু দুই ব্যক্তির ওপর নয়, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ। এ ঘটনার দ্রুত এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জার্মান রাষ্ট্রদূত।

নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাতলামি দমনে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত সোমবার নিজস্ব ওয়েব সাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক চাম্পা প্যাটেল এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, আজ এলজিবিআই প্রকাশনার সম্পাদক তার বন্ধুসহ নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে হত্যার একদিন পরই তাদের কুপিয়ে হত্যা করা হলো। শান্তি প্রতিষ্ঠায় কর্মরত কর্মীদের জন্য এখন ভয়াবহ নিরাপত্তার অভাব দেখা দিয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শুধু এ মাসেই চারটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে এসব ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী করা হচ্ছে। আর হুমকির মুখে থাকা সুশীল সমাজের সদস্যদের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ