রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশে শিক্ষাসেবায় আমাদের অবদান

ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা সিএসসি : হলিক্রস পরিবারের সদস্যগণ কর্মযোগী সন্ন্যাসব্রতী। সন্ন্যাসকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার সাথে সাথে তারা বিভিন্ন প্রৈরিতিক কাজে নিজেদের উৎসর্গ করেন। হলিক্রস সন্ন্যাস-সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর ত্রিশ-এর দশকে ফরাসী বিপ্লবোত্তর ফ্রান্স দেশে। বিপ্লব-বিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠনের জন্য অন্যতম প্রধান প্রয়োজন ছিল শিক্ষা। সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ফাদার বাসিল মরো নিজেই একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি শিক্ষাদানকে তার সংঘের অন্যতম প্রধান প্রৈরিতিক কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সংঘের সূচনালগ্ন থেকেই শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতীদের শিক্ষাদান ছিল সংঘের গুরুত্বপূর্ণ কর্মদায়িত্ব। তবে সেই শিক্ষা যাতে তৎকালীন ইউরোপের সমসাময়িক প্রবহমান গতানুগতিক শিক্ষা না হয়ে বরং যুগোপযোগী হয় তার জন্য প্রতিষ্ঠাতা যে মূলনীতিটি স্থির করেছিলেন তা ছিল : ”We will not educate the mind at the expense of the heart." অর্থাৎ, শিক্ষার লক্ষ্য হতে হবে মানব-ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ বিকাশ - দেহ, মন ও হৃদয়-আত্মার সমন্বিত বিকাশ; কেবলমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞানদান নয়। প্রতিষ্ঠাতার প্রদর্শিত আদর্শ অনুসরণ করে হলিক্রস পরিবারের সদস্যগণ শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত করে নেন। ছাত্রছাত্রীরা যাতে উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, অর্থাৎ তারা যেন মন-মনন, বুদ্ধিবৃত্তি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও হৃদয়বৃত্তির উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে তার জন্য তাদের চেষ্টার ত্রুটি থাকে না। অন্তরের দীনতাকে জীবনের অন্যতম মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন বলে তাঁরা তাঁদের কাজের বিনিময়ে ব্যক্তিগতভাবে কোন পারিশ্রমিক নেন না, বরং সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ হয়ে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন।
হলিক্রস পরিবারের সদস্যগণ বর্তমান বাংলাদেশে প্রথম এসেছিলেন ১৬১ বছর আগে। তখন বৃটিশরাজের হাতে ছিল পাক-ভারতের শাসনভার। ঔপনিবেশিক সেই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছিল। সুতরাং দেশের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পূর্ব বাংলা ছিল প্রায়শ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত; উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় প্রতিবছর দেখা যেতো ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, সারা দেশে হতো বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি। ফলে কৃষিপ্রধান এই দেশটিতে নানা কারণে দেখা যেতো খাদ্যাভাব এবং দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি নানা রোগ-ব্যাধি। কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া ছিল প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অসংখ্য নদী-নালা খালবিল থাকাতে রাস্তাঘাট নির্মাণ সম্ভব হতো না; ফলে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া, নিরক্ষরতা, অশিক্ষা, কু-শিক্ষা, কুসংস্কার ও আচার-সর্বস্ব ধর্মের নামে বিচিত্র ধরনের ঝাড়ফুঁক, তুকতাক, তন্ত্রমন্ত্র, ভোজবাজি, গোঁড়ামি, ইত্যাদি ছিল এই অঞ্চলের বাস্তবতা। তাই এদেশে প্রৈরিতিক কাজ করতে এসে হলিক্রস সন্ন্যাসব্রতীগণ শুরু থেকেই শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছিলেন। এ কারণে এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোটখাট গির্জাঘর নির্মাণের পাশাপাশি তাঁরা বাঁশের খুঁটি ও ছন বা ঘাসের বেড়া দিয়ে স্কুলঘর নির্মাণ করতেন। প্রাথমিক পর্যায়ে একমাত্র প্রাথমিক শিক্ষার উপরই জোর দেওয়া হতো, কেননা জনসাধারণের মধ্যে তখন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বলতে মোটেই ছিল না। তথাপি মিশনারীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুদূরপ্রসারী বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে, যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে দেশে সার্বিক সাক্ষরতার তুলনায় কাথলিক খ্রিষ্টানদের মধ্যে সাক্ষরতার হার অনেক বেশি। অধিকাংশ সময় ছন ও বাঁশের তৈরি ঘরটি রোববারে ব্যবহৃত হতো প্রার্থনাঘর বা উপাসনালয় হিসেবে এবং সাপ্তাহিক দিনে স্কুল হিসেবে। শুরু থেকেই নতুন ধর্মান্তরিত ভক্তবিশ্বাসীদের শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হতো কেননা মিশনারীগণ মনে করতেন যে, ধর্মীয় বিশ্বাসকে আত্মস্থ ও গভীর করে তোলার জন্য শিক্ষার মাধ্যমে মন, মেধা, চিন্তা-চেতনা ও হৃদয়মনের বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন।
এদেশে শিক্ষা বিস্তারের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৮৯৪ খ্রিষ্টবর্ষে ঢাকার নব নিযুক্ত বিশপ পিটার হার্থ পুরনো ঢাকার লক্ষীবাজারে সেন্ট গ্রেগরী স্কুল নির্মাণ করেন। অতঃপর ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয় বান্দুরা হলিক্রস হাইস্কুল। তখন থেকেই হলিক্রস পরিবারের বহু সদস্য বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজ নির্মাণ করে সেগুলোর পরিচালনা  ও শিক্ষাদান কাজের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে দেশে কাথলিক চার্চ পরিচালিত কলেজ যেমন, হলিক্রস কলেজ (তেজগাঁও), সেন্ট যোসেফ স্কুল এ- কলেজ (মোহাম্মদপুর, ঢাকা) এবং সেন্ট ফিলিপস্ স্কুল এ- কলেজ (দিনাজপুর), হলিক্রস স্কুল এ- কলেজ (বান্দুরা), নটর ডেম কলেজ (ময়মনসিংহ), নটর ডেম ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রী কলেজ (মতিঝিল) ও নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (মতিঝিল) হলিক্রস পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশ কাথলিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত আর্চবিশপ টি এ গাঙ্গুলী টিচার্স্ ট্রেনিং কলেজের  পরিচালনা পর্ষদে আছেন হলিক্রস ব্রাদার এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন একজন হলিক্রস সিস্টার। তাছাড়াও রয়েছে সিস্টারদের দ্বারা পরিচালিত হলিক্রস হাইস্কুল (তেজগাঁও), কর্পূস খ্রীষ্টি হাইস্কুল (জলছত্র), ব্রাদার আন্দ্রে হাইস্কুল (নোয়াখালী), সেন্ট গ্রেগরীজ হাইস্কুল (লক্ষীবাজার), সেন্ট নিকোলাস হাইস্কুল (নাগরী), তুমিলিয়া বয়েজ হাইস্কুল (তুমিলিয়া) সেন্ট প্লাসিড হাইস্কুল (চট্টগ্রাম), মিরিয়াম আশ্রম হাইস্কুল (দিয়াং), উদয়ন হাইস্কুল (বরিশাল), বিড়ইডাকুনি হাইস্কুল (ময়মনসিংহ), সেন্ট যোসেফ কারিগরি বিদ্যালয় (নারিন্দা), বটমলী হোম কারিগরি বিদ্যালয় (তেজগাঁও) ইত্যাদি। এ ছাড়াও ব্রাদার এবং সিস্টারগণ কয়েকটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন যেমন, কুলাউড়া জুনিয়র হাইস্কুল। এসব প্রতিষ্ঠানে হলিক্রস পরিবারের সদস্যদের সাথে সহকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন নিবেদিতপ্রাণ বেশ কিছুসংখ্যক খ্রিষ্টভক্ত। তবে আমার ধারণা, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩ হতে ৭ জন করে হলিক্রস পরিবারের সদস্য প্রশাসনিক দায়িত্ব ও শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত আছেন।
হলিক্রস ফাদার, ব্রাদার বা সিস্টারদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেকোন ছাত্র বা ছাত্রী নিজেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রী বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। পরিচয়-পর্বের শুরুতেই তাঁরা তাঁদের স্কুল/কলেজের অধ্যক্ষ/অধ্যক্ষা  বা প্রিয় শিক্ষক/শিক্ষিকার নাম বলতে শুরু করেন। সুদীর্ঘ পঞ্চাশ/ষাট বছর পরেও তাঁরা সেই নামগুলো ভুলে যান না, বরং সুযোগ পেলেই তারা সেগুলো অনর্গল মুখস্ত বলে যেতে শুরু করেন। বিগত ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে হলিক্রস কলেজের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী, বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে একে একে সিস্টারদের নাম বলে যেতে থাকেন। তখন অবাক বিস্ময়ে তাঁর সেই স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য শুনে কলেজের প্রাক্তন ছাত্রীরা উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, মনে হচ্ছিল যেন মাত্র সেদিনের ঘটনা। অশেষ শ্রদ্ধাভরে নামগুলো উচ্চারণ করার সময় তাঁর মুখমন্ডল যেন উজ্জ্বল জ্যোতির আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল।
হলিক্রস পরিবারের সন্ন্যাসব্রতীদের দ্বারা পরিচালিত উপরোক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন যাবত প্রশাসনিক ও শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত থেকে যেসব জ্ঞানী-গুণী সন্ন্যাসব্রতী মূল্যবান অবদান রাখার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, ফাদার (পরবর্তীতে প্রথম বাঙ্গালী বিশপ ও আর্চবিশপ) থিওটোনিয়াস গাঙ্গুলী , সিএসসি যাঁকে মন্ডলী ধন্যশ্রেণীভুক্ত করার প্রাথমিক ধাপে “ঈশ্বরের সেবক” উপাধিতে ভূষিত করেছে।
হলিক্রস পরিবারের শিক্ষাব্রতী বহিরাগত মিশনারীদের কেউ কেউ প্রায় সারা জীবনই এদেশে শিক্ষকতার কাজ করেছেন; আবার কেউ কেউ কয়েক বছর কাজ করার পর স্বাস্থ্যগত কারণে স্বদেশে ফিরে গেছেন। তিনটি শাখারই বর্তমান প্রজন্মের বেশ কিছু সম্ভাবনাময় যুবা বয়সী সন্ন্যাসব্রতী বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্বে বা শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষাসেবায় এঁরা বেশ নিবেদিতপ্রাণ ও উদ্যমী। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে তাঁরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।
বাংলাদেশ মন্ডলীর পালকীয় কর্মী গঠনে হলিক্রস পরিবারের অবদান সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে বিশপ ল্যাগ্রান্ডের নির্দেশে ফাদার জন হেনেসি, সিএসসি বান্দুরা হলিক্রস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্কুলের পাশেই ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ফাদার জন ডেলোনী ক্ষুদ্র পুষ্প মাইনর সেমিনারী প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ স্থানীয় ম-লীতে নেতৃত্ব ও পালকীয় কাজে নিবেদিত কর্মীবৃন্দের একটি বড় অংশই উক্ত স্কুলে ও সেমিনারীতে অধ্যয়ন করে প্রৈরিতিক কাজের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এমনকি বর্তমান বাংলাদেশ ম-লীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দের অনেকেই এই স্কুল ও সেমিনারীতে অধ্যয়ন করেছেন। এ ছাড়াও স্থানীয় ম-লীর প্রায় সব পালকীয় কর্মী - যাজক, পুরুষ সন্ন্যাসব্রতী ও ক্যাটেখিষ্টগণ হলিক্রস ব্রাদারদের দ্বারা পরিচালিত হাইস্কুল ও ফাদারদের দ্বারা পরিচালিত নটর ডেম কলেজে অধ্যয়ন করেছেন। এমন কি বনানী মেজর সেমিনারীতেও অনেক হলিক্রস ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টারগণ অধ্যাপনা করেছেন এবং বর্তমানেও করছেন। অনেক যুবগঠন কার্যক্রমেও তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এবং আছেন। এভাবে তারা স্থানীয় মন্ডলীকে গড়ে তুলেছেন এবং আজো করে যাচ্ছেন। 
অতীতের ন্যায় বর্তমানে বাংলাদেশে বিদেশী মিশনারী আর আসছেন না। তবে নিবেদিতপ্রাণ বহিরাগত মিশনারীদের সঙ্গে কাজ করার ফলে স্থানীয় কর্মীরা যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তার ভিত্তিতে বর্তমানে স্থানীয়রাই স্কুল-কলেজে প্রশাসনিক ও শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সমাপনী পরীক্ষা (যেমন এসএসসি ও এইচএসসি, ডিগ্রি ও বিএড পরীক্ষার) ফলাফল বিবেচনায় হলিক্রস ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টারদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়ভাবে ও স্থানীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। কেবলমাত্র পরীক্ষায় পাসের হার বা উচ্চ জিপিএ (নম্বর)এর বিবেচনায় নয়, বরং ছাত্রছাত্রীদের ন¤্রভদ্র, হৃদয়বান, মননশীল ও সংস্কৃতিবান হয়ে গড়ে ওঠার প্রশিক্ষণে, নৈতিক বা মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষায় ও আদব-কায়দা রপ্ত করায় এবং সমৃদ্ধ, রুচিশীল, সামাজিক দায়বোধসম্পন্ন, মানবতা ও মানবিকতা, সম্প্রীতি, দায়িত্বশীলতা, ইত্যাদি মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিবেচনায়ও। রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ বজায় থাকার সুবাদে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকমন্ডলী, অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সম্প্রীতির কালচার গড়ে উঠছে; কোনপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, দলাদলি, দলীয় কোন্দল এখানে স্থান পায় না। এসব প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাতে পারলে যেকোন ধর্মাবলম্বী অভিভাবকগণ স্বস্তিবোধ করেন। দেশে বিদ্যমান অশুভ বাস্ততার ইঙ্গিত করে মাঝে মাঝে তারা এমন মন্তব্যও করে থাকেন : “আপনাদের প্রতিষ্ঠানে পড়তে পারলে আমার ছেলে/মেয়েটি অন্তত অমানুষ হবে না।”
হলিক্রস শিক্ষাকার্যক্রম ও শিক্ষাসেবার বৈশিষ্ট্য
১। হলিক্রসের শিক্ষা-দর্শন ও কর্মপ্রচেষ্টা : হলিক্রস সন্ন্যাসব্রতীদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জগত ও জীবন সম্বন্ধে ইতিবাচক ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে ওঠার পথ ও পন্থা সম্বন্ধে শেখানো হয়। সঙ্কট-সমস্যাকে তারা দেখেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে। শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কীভাবে অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করা যায় তা তারা শিক্ষা দেন। পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ/স্থান/শ্রেণী অর্জন করার চাইতে তাঁরা বরং সৎ ও খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার উপরই গুরুত্ব দেন বেশি।
২। মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কালচার : শিক্ষাকর্মে নিবেদিত হলিক্রস সন্ন্যাসব্রতীগণ ছাত্রছাত্রীদেরকে দেশপ্রেমিক দায়িত্বশীল নাগরিক হতে অনুপ্রাণিত করেন এবং সমাজের অনগ্রসর ও পিছিয়ে-পড়া জনসাধারণকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে শেখান। তারা পাশ্চাত্যের জড়বাদী ও ভোগবাদী সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে নিজেরা সচেতন থাকেন বলে তাদের প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদেরকেও তারা সচেতন করে তুলতে চেষ্টা করেন। দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে তাঁরা যেভাবে সাড়া দেন তা থেকেই এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। বর্তমানে ঢাকা শহরে ও অন্যত্র অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানেই বিনাবেতনে বস্তিবাসী দরিদ্র শত শত ছেলেমেয়েকে শিক্ষাদান করা হয়। এরূপ সহায়তা পাওয়ার দরুন বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
৩। দেশাত্মবোধ : “নিজেকে জানা” হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। হলিক্রস সন্ন্যাসব্রতীগণ এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। তাই বিচিত্র উপায়ে তাঁরা তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের দেশাত্মবাধে উদ্বুদ্ধ করেন, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা শেখান। সুদীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে থাকার ফলে আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তাচেতনা ও অকৃত্রিম দেশাত্মবোধ অনেকটা লোপ পেয়েছে। উপরন্তু অপসংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের স্বকীয়তাও অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এ কারণেই নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আমাদের আকর্ষণ ও দরদবোধ ততটা জোরালো নয়। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশীদের অনুকরণপ্রিয়তা, বিদেশীদের আনুকূল্য পেয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করা, নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিদেশী পোশাক-পরিচ্ছদ ও শিল্পচর্চা নিয়ে গর্ববোধ করা ইত্যাদি। এগুলোর পরিণাম হয় ধ্বংসাত্মক। এই উপলব্ধি থেকেই ফাদার ইউজিন হোমরিক বিগত প্রায় ৬০ বছর ধরে আদিবাসী গারো সমাজের মধ্যে তাদের নিজেদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করতে শিখিয়েছেন। তাছাড়া হলিক্রস শিক্ষাকর্মীগণ কোনপ্রকার তোষণ-নীতি বা লেজুড়বৃত্তিকে পছন্দ করেন না বা ওগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন না।
৪। প্রশাসনিক দক্ষতা : যেকোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হচ্ছে দক্ষ প্রশাসন। পরিচালনা-পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী নিষ্ঠার সাথে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করলেই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা ও  বজায় রাখা সম্ভব হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান কর্মযজ্ঞটির সাথে যারা জড়িত তাদের সকলকে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করে সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় সহযোগিতা অর্জন করে সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই দক্ষ প্রশাসকের দায়িত্ব। এ যাবৎ যেসব হলিক্রস ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন তারা সবাই যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
৫। শ্রেণিকক্ষে বাস্তবধর্মী শিক্ষাদান : হলিক্রস সংঘের কর্মীগণ শ্রেণিকক্ষে ফলপ্রসূ ও কার্যকরী শিক্ষাদান করে থাকেন। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সাক্ষ্যদান হতে এ কথার সত্যতা প্রমাণিত। শিক্ষাদান করার অর্থ শুধু তত্ত্ব বা তথ্য জানানো নয়, বরং বিষয়বস্তু আয়ত্ত করে জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করার মতো দক্ষতা অর্জন করা। শিক্ষার গুণগত মানের উপরই নির্ভর করে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষের অবদান বা অর্জিত জ্ঞানের কার্যকরী ও ফলপ্রসূ প্রয়োগ। এ প্রসঙ্গে আমি দেশ ও সমাজের “বাতিঘর” বলে পরিচিত কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তির মন্তব্য ও বক্তব্য এবং বিভিন্ন সময়ে হলিক্রস পরিবার ও তাদের শিক্ষাসেবা সম্পর্কে কতিপয় প্রাক্তন ছাত্র, শুভাকাক্সক্ষী বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির উক্তি তুলে ধরতে চাই যা বিভিন্ন স্মরণিকায় প্রকাশ হয়েছে। বিশেষ উপলক্ষ্যে কোন একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তা বলা হলেও আমি মনে করি সার্বিকভাবে হলিক্রস পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত যেকোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তা কমবেশি প্রযোজ্য : (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ