বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২০
Online Edition

মিশনারী কলেজ নটর ডেম-এর ব্যাপারে সরকারকে উদারনীতি গ্রহণ করতে হবে

ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা : আগামী ১৭ মে’ শিক্ষাবোর্ডসমূহ এসএসসি’র ফলাফল ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এরপরই ভাল কলেজে ভর্তির জন্য ছাত্রদের শুরু হবে দৌড়ঝাঁপ। বাংলাদেশের এক নম্বর কলেজ নটর ডেম-এ ভর্তির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে সারাদেশ। কিন্তু সেই  কলেজ এবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অস্বচ্ছ অন্লাইনে ছাত্র ভর্তির কবলে পড়বে। গত ৪ বছর ধরে এই অস্বচ্ছ অনলাইনে ছাত্রভর্তি নিয়মের কবলে পড়ছে। ছাত্র-অভিভাবক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে নটর ডেম কলেজের নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্র ভর্তির অধিকারটুকু রক্ষার আর্জি জানিয়ে মামলা করে আসছে। হাইকোর্টও স্থায়ী নির্দেশ না দিয়ে প্রতি বছর সাময়িক নির্দেশে কলেজে ছাত্রভর্তির অধিকার রক্ষা করে আসছেন। এর ফলে নটর ডেম কলেজে ছাত্রভর্তির বিষয়টি নিয়ে হয়রানি হচ্ছে। এতে শিক্ষাদান বিঘিœত হচ্ছে বলে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ করছে অতীতের তুলনায়।

নটর ডেম কলেজের অ্যালামনাই এসোসিয়েশন ও নটর ডেম শিক্ষা ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সঙ্গে রয়েছেন ১১৫ জন ব্যারিস্টার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ অধ্যাপক। তাঁরা সবাই প্রাক্তন নটরডেমিয়ান। তাঁদের প্রিয় কলেজটির শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আইনী লড়াই থেকে শুরু করে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানা গেছে। তাঁদের দাবি, ৬৫ বছর ধরে নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্র ভর্তি করে শিক্ষাদানে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছে, যার দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ তারা। তাঁদের প্রশ্ন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল-কলেজের উন্নয়নমূলক কর্মকা- পরিচালনা করবে। ঠিকমতো পাঠদান ও পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে কি’না, এসব তদারকি করবে। অথচ শিক্ষাদানের মানোন্নয়নের জন্য কাজ না করে অস্বচ্ছ অন্লাইন ছাত্র ভর্তির দায়িত্ব নেয়াটার মূল কারণ কি ভর্তিবাণিজ্য?

এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন ক্রয় করে যারা ভাল ফলাফল করবে, অন্লাইন ভর্তির সুযোগে তারা ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে। আর প্রকৃত মেধাবী ছাত্র ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। নটর ডেম কলেজের ছাত্র ভর্তির পদ্ধতিটা মেধাবী ছাত্র বাছাইয়ের উত্তম পন্থা। এর বিকল্প নেই। কিন্তু কেন সেই উত্তম পদ্ধতির বাধ সেধেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়? অনেক অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সন্তান নটর ডেম কলেজে পড়তে আগ্রহী। কিন্তু নটর ডেম কলেজের স্বচ্ছ ছাত্রভর্তি পদ্ধতির জন্য তারা ভর্তি হতে পারে না। পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানেরা মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হতে পারছে। একবার অন্লাইনে ভর্তির নিয়ম চালু করতে পারলে নটর ডেম কলেজে ভর্তিবাণিজ্যের রমরমা তদবির শুরু হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বখাটে সন্তান ভর্তি হয়ে কলেজের শান্ত অরাজনৈতিক মনোরম সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করে দেবে। ছাত্ররাজনীতি শুরু হয়ে যাবে। এই ছাত্ররাজনীতির কারণেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে আজ লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। কলেজটির ফলাফলের সুনামটিও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নটর ডেম কলেজটি ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই কি অন্লাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে? দেশের শিক্ষাবিদ্, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-অভিভাবকসহ সচেতন নাগরিকরা নটর ডেম কলেজের নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্রভর্তির পক্ষে মতামত দিয়ে বলেছেন, অবশ্যই মিশনারী কলেজ নটর ডেম-এর ব্যাপারে সরকারকে উদারনীতি গ্রহণ করতে হবে।

প্রায় প্রতিবছর নটর ডেম কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য আসন সংখ্যার তুলনায় অন্তত সাত/আট গুণ বেশি ছাত্র আবেদন করে। তাই কলেজকে বাধ্য হয়েই একটি বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় Ñ যাতে এমন ছাত্রদের এ কলেজে ভর্তি করা যায়, যারা পড়াশুনায় সত্যিই মনোযোগী এবং কলেজের নিয়মশৃংখলা মেনে চলতে আগ্রহী। যুগ যুগ ধরে একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে নটর ডেম কলেজে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষার মান বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিগত ৪ বছর ধরে নটর ডেম কলেজের সনাতন ভর্তি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। উক্ত সময়ের সরকারি নির্দেশনামতে কলেজে ভর্তির একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে শুধুমাত্র জিপিএ (এৎধফব চড়রহঃ আবৎধমব)। এক্ষেত্রে কলেজের নিজস্ব কোনো মতামত প্রকাশ করা বা মান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই। তবে আসন-সংখ্যার তুলনায় সমবয়সী অতিরিক্ত ছাত্র সমাগমের ক্ষেত্রে কলেজ মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থাটুকু শুধু করতে পারছে। ফলে, ১৯৪৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত এবং এতদিন থেকে লালিত এ কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া যা শুধু মাত্র ছাত্রদের মেধাই কেবল যাচাই করে না বরং তাদের মনোভাব যাচাইয়ের মাধ্যমে ভর্তি করে দেশের একজন সামর্থবান ভবিষ্যৎ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে Ñ তা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।

বিগত সরকারের আমলে লিখিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ার একটি মাত্র কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। আর তা হচ্ছে, সরকার কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করতে চান। নটর ডেম কলেজ কোচিং বা কোচিং সেন্টারের ঘোর বিরোধী কেননা সেখানে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ২০০৩ সালে শিক্ষা অধিদফতর থেকে প্রজ্ঞাপনটি কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছিল যখন অধিকাংশ কোচিং সেন্টারই তাদের ভর্তি-করা ছাত্রদের পড়ানো প্রায় শেষ করে ফেলেছে এবং তাদের আদায়কৃত অর্থ সম্পূর্ণভাবে আত্মসাৎ করে নিয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ছাত্রদের অভিভাবকবৃন্দ, যারা মিথ্যা মরীচিকার পেছনে পয়সা খরচ করেছেন; আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নটর ডেম কলেজ। কারণ, ততদিনে পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং তার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছিল। সরকার যদি কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করতেই চান তবে তার জন্য ভর্তি সংক্রান্ত পরিবর্তন বা প্রজ্ঞাপনের তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র একটি সরকারি অধ্যাদেশই সারাদেশের বিপুলসংখ্যক বিভিন্ন স্তরের কোচিং সেন্টার বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট। তাই, ২০০৩ সালে সরকারের এহেন হঠাৎ করে শেষ মুহূর্তে পাঠানো ভর্তি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি সকলেরই আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তদুপরি, ২০০৬ সালে আরও একটি অযৌক্তিক মৌখিক প্রজ্ঞাপন প্রদান করা হয়, যা হচ্ছে : ভর্তি সংক্রান্ত কোনো ধরনের পরীক্ষাই নেয়া যাবে না, অর্থাৎ ভর্তির একমাত্র মান নির্ণায়ক হবে ছাত্রদের এস.এস.সি.-তে প্রাপ্ত জি.পি.এ.-এর উচ্চতর ক্রম এবং আসনাতিরিক্ত সমাগমের ক্ষেত্রে ছাত্রদের বয়সভিত্তিক অগ্রাধিকার। ছাত্রদের বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকার বয়সাধিক্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সরকারি এ প্রচেষ্টায় কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ হলেও নটর ডেম কলেজে যথার্থ মানের ছাত্রের এবং তার সাথে সাথে যে উদ্দেশে এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলÑ তা যে ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এহেন অযৌক্তিক মান-নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার কারণে ঐতিহ্যবাহী নটর ডেম কলেজের পুরো শিক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আর ক্লাসগুলো পূর্বের ন্যায় আনন্দদায়ক নয়, কারণ অনেক ছাত্রেরই প্রতিটি বিষয়ে ভিত্তি এতো দুর্বল যে, মূল বিষয়ের আলোচনা বাদ রেখে শিক্ষকদেরকে সংজ্ঞামূলক জ্ঞান নিয়ে সময় খরচ করতে হচ্ছে Ñ যা ছাত্ররা এসএসসি স্তর থেকে নিয়ে আসার কথা। তদুপরি ক্লাসে উপস্থিত থেকেও শিক্ষকের পাঠদানে মনোযোগী না হওয়া বা বুঝতে চেষ্টা না করার প্রবণতা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি, কারণ বহু ছাত্রই অন্যান্য বছরের তুলনায় বয়োজ্যেষ্ঠ। তাই শ্রদ্ধার সাথে শিক্ষকদের কথা শোনার ও বাধ্যতার মনোভাব নিয়ে মেনে চলার প্রবণতা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম। কলেজের ক্লাস ও কুইজগুলোই হচ্ছে কলেজের প্রাণ, যা  ছাত্রদেরকে লেখাপড়া করতে উৎসাহ যোগায় এবং তাদেরকে ধীরে ধীরে মজবুত করে গড়ে তোলে। কলেজ এখানে প্রাইভেট পড়াকে কোনো গুরুত্ব দেয় না। কারণ ক্লাসেই সকল বিষয়ে বিসÍারিত পাঠদান করা হয়। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবিবেচক ভর্তি প্রক্রিয়ার দরুণ শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রসÍ হচ্ছে।

সরকারের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে নটর ডেম কলেজ একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া অনুমোদনের আবেদন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। প্রসÍাবিত পদক্ষেপগুলো হচ্ছেÑ ১. এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক পত্রিকা এবং কলেজের নোটিশ বোর্ড ও গেইটে নোটিশের মাধ্যমে ভর্তি সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়া হবে। কলেজের নিজস্ব অন্লাইনে ছাত্ররা ভর্তি ফরম ফিল-আপ করতে পারবে। ২. বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও কলা অনুষদে আলাদাভাবে মান নির্ণয় করা হবে এবং ভর্তি সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ৩. সকল ভর্তিচ্ছু ছাত্রকে ভর্তি ফরম ও পরীক্ষা বাবদ ফি দিতে হবে। ৪. নটর ডেম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে আসন সংখ্যা ১১৫০, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৫০ এবং কলা বিভাগে ৩৫০। জিপিএ-র উচ্চক্রম এবং বয়সের ভিত্তিতে প্রাথমিক নির্বাচন করা হবে। এ নির্বাচনে বিজ্ঞানের জন্য নেয়া হবে ৩০০০, ব্যবসায় শিক্ষার জন্য ১৫০০ এবং কলার জন্য ৫০০ ছাত্রকে। ৫. প্রাথমিক নির্বাচনের ফল ঘোষণার সাথে সাথে ছাত্রদেরকে লিখিত পরীক্ষা সংক্রান্ত রুটিন প্রদান করা হবে, যার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট দিনে, সময়ে ও স্থানে ভর্তিচ্ছু ছাত্রদেরকে উক্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। লিখিত পরীক্ষা দু’ঘন্টা সময়ের হবে এবং প্রতি ৩০ মিনিট পর পর নতুন প্রশ্নপত্র দেয়া হবে। পরীক্ষার হলে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অসদুপায় অবলম্বন ভর্তি বাতিলের কারণ বলে বিবেচিত হবে। বিঞ্জান বিভাগের প্রতিটি ছাত্রকে- বাংলা ৫০, ইংরেজি ৫০, অংক ৭৫ এবং তার তিনটি ঐচ্ছিক বিষয়ের উপর ৫০ নম্বর মানের পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। ব্যবসায় শিক্ষা ও কলা বিভাগের ছাত্রদের জন্য ইংরেজি ৫০, বাংলা ৫০ এবং সাধারণ গণিত ৫০ ও ঐচ্ছিক বিষয়ের উপর ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে। প্রশ্নপত্রেই উত্তর লিখতে হবে এবং তা পরিদর্শকের কাছে জমা দিতে হবে। ৬. এসব পরীক্ষার প্রতিটিতে ন্যূনতম পাসের মাত্রা নির্ধারিত থাকবে এবং যেসব ছাত্র শুধুমাত্র সব বিষয়ে এ মাত্রাটি অতিক্রম করতে পারবে তাকেই মৌখিক পরীক্ষার জন্য আহ্বান করা হবে। পরীক্ষার খাতা দেখা ও ফলাফল ঘোষণা সম্পূর্ণটাই অধ্যক্ষসহ পরীক্ষা কমিটির নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ৭. লিখিত পরীক্ষার ফলাফল নোটিশ বোর্ড এবং সংবাদ পত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে এবং ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি বিভাগে আসনের অতিরিক্ত কিছু ছাত্রকে প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য আহ্বান করা হবে। অর্থাৎ, বিজ্ঞান বিভাগে ১৫০০, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৯০০ এবং কলা বিভাগে ৫০০ জনকে প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট দিন, সময় ও কক্ষে তার এসএসসি পরীক্ষার মূল ট্রান্সক্রিপ্ট ও প্রশংসাপত্রসহ আসতে বলা হবে। ৮. প্রতিটি মৌখিক পরীক্ষা-বোর্ড কলেজের অধ্যক্ষ কর্তৃক গঠিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। তিন সদস্যবিশিষ্ট প্রতিটি বোর্ডের একজন নির্ধারিত চেয়ারম্যান থাকবেন। ছাত্রকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তার মনোভাব বা আচরণ লক্ষ্য করা হবে এবং প্রতিটি বিষয়ে মার্ক দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। ৯. মৌখিক পরীক্ষায় বিশেষ কতকগুলো দিক বিবেচনা করা হবে যেমন: ক. ছাত্রের আচার-ব্যবহার এবং কথা বলার ভঙ্গি। খ. ছাত্রের চাল-চলন, চেহারা বা পোষাকের অস্বাভাবিকতা। গ. উত্তর প্রদানের সঠিকতা ও দ্রুততা। তাছাড়াও এ পরীক্ষার ক্ষেত্রে কতকগুলো বিষয়কে মেনে চলা হবে, যেমন: ১. গ্রামের ছাত্রদের বা উপজাতীয়দের জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট কোটা থাকবে। ২. এ কলেজের শিক্ষক বা কর্মচারীদের সন্তানদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ৩. যেসব ছাত্র কোনো কাথলিক চার্চ-পরিচালিত স্কুল থেকে আসে তাদের ব্যাপারে বিশেষ বিবেচনা থাকবে।  ৪. ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তির ক্ষেত্রে “ও”-লেভেল করে-আসা ছাত্রদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং ভর্তি প্রক্রিয়া কিছুটা সহজতর করা হবে। ৫. মানবিক দিকগুলো বিশেষ বিবেচনা পাবে, যেমন পঙ্গু বা প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ৬. ভর্তি কমিটির এ বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার থাকবে। মৌখিক পরীক্ষায় নির্বাচিত প্রার্থীদেরকে ভর্তি ফরম দেয়া হবে এবং ফরমে উল্লে¬খিত তারিখের মধ্যে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ক্রমিক নম্বর অনুসারে বিজ্ঞান বিভাগে আসনের অতিরিক্ত ২০০, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২০০, এবং মানবিক বিভাগে ১৫০ জন ছাত্রকে অপেক্ষমান তালিকায় রাখা হবে। আসন শূন্য থাকা সাপেক্ষে ক্রম অনুসারে তাদেরকে ভর্তির সুযোগ দেয়া হবে।

নটর ডেম কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (১৯৪৯) আর্ত-মানবতার সেবার নিমিত্তে, সাধারণ গরীব অথচ মেধাবী ছাত্রদেরকে উন্নতমানের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে এবং সর্বোপরি সৎ মনোভাবাপন্ন ও মেধাবী কিছু ছাত্রকে এমনভাবে পঠন দান করতে, যাতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা তাদের উপর ন্যস্ত গুরুদায়িত্ব সততা ও কৃতিত্বের সাথে পালন করতে পারে। হলিক্রস সম্প্রদায় শ্রেষ্ঠ কলেজ প্রতিষ্ঠা করবে এবং এজন্য সেরা ছাত্রদেরকেই এখানে ভর্তি করতে হবে, এমন কোনো কথা শুরুতেও যেমন বলা হয়নি, আজও তেমন বলা হয় না। নটর ডেম এমন সেবা প্রদানে আগ্রহী যার ফলে দেশে কিছু সুনাগরিক গড়ে ওঠে। সুস্থ দেহ ও সুস্থ মনের অধিকারী সৎ সুনাগরিক প্রতিটি দেশেরই অমূল্য সম্পদ। সেই সম্পদ এ কলেজ এযাবৎ তৈরি করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সরকার কর্তৃক বার বার শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে দেয়া উচিত নয়। নটর ডেম কলেজ শ্রেষ্ঠই, তবে তা হয়েছে এখানকার উন্নত প্রশাসনিক অবকাঠামো, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দের নিরলস ও আন্তরিকতাপূর্ণ কর্মময় প্রচেষ্টার জন্য।

নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ, প্রাবন্ধিক ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও আসন্ন ছাত্রভর্তি প্রসঙ্গে বলেন, দেশের পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীর মেধাবী সন্তানদের সুযোগ দেয়ার জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নটর ডেম কলেজ এই ব্রত নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়ে ৬৫ বছর ধরে উন্নতমানের শিক্ষা দান করে আসছে। তিনি আরও বলেন, কলেজের নিজস্ব অন্লাইনে ভর্তি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানাচ্ছি। অন্লাইনে ছাত্ররা ফরম ফিল-আপ করার সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, জোর করে সরকারি অন্লাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়া হলে নটর ডেম কলেজের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বিপন্ন  হয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নটর ডেম শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সভাপতি ড. শাকির সবুর বলেন, যেহেতু নটর ডেম কলেজ সরকারের একটি টাকাও অনুদান হিসেবে নেয় না। নিজস্ব আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে দেশে শিক্ষাসেবা দিয়ে লক্ষ লক্ষ সোনার ছেলে গড়ে দিচ্ছে। সেই  কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কলেজের অন্লাইনে ফরম ফিল-আপ শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রভর্তির সুযোগ দিলে সরকার ও জাতির জন্য কোনো ক্ষতির কারণ দেখছি না। এতে আরও জাতি পাবে লক্ষ লক্ষ সোনার ছেলে। নটর ডেম শিক্ষা ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির মহাসচিব, কবি-সাংবাদিক বিপ্লব ফারুক বলেন, এবারও নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্রভর্তি করার ব্যাপারে বাধ সাধলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে এবারও হাইকোর্টে যাওয়া হবে সুবিচার পাওয়ার জন্য। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী, ড. কামাল হোসেন বলেন, নটর ডেম কলেজের নিজস্ব ভর্তি-পদ্ধতি অধিকার কেড়ে নেয়া হলে আমরা বসে থাকতে পারি না। প্রয়োজনে কলেজ গেইট বন্ধ করে দিয়ে গেইটেই অনশন শুরু করে দেব। তবুও নটর ডেম কলেজকে ধ্বংস করতে দেব না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যামেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম  চৌধুরী বলেন, ভর্তি-বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্লাইনে ভর্তিপদ্ধতিটাই বাজে পদ্ধতি। তিনি আরও বলেন, যে মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, সেই মন্ত্রণালয়ের অন্লাইনে ছাত্রভর্তির বিষয়টি স্বচ্ছ হতেই পারে না। আজ শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুর্নীতির জোয়ারে প্লাবিত। তিনি বলেন, নটর ডেম কলেজকে নিজের পায়ে হাঁটতে দিন। বাধ সাধলে এ জাতি নটর ডেম কলেজের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেবে আন্দোলনের মাধ্যমে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ