DailySangram-Logo-en-H90
ই-পেপার আজকের পত্রিকা

ইতিহাস-ঐতিহ্যে স্থাপত্য শিল্প

ইসলাম মুসলিমদেরকে শিখিয়েছে যে, মানুষ চাইলে তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই তার প্রতিপালকের নিকটবর্তী হতে পারে, তার সন্তুষ্টি পেতে পারে, যদি তা দীনের শিক্ষা ও বিধান অনুযায়ী আদায় করা হয়। সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এবং তার সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য বৈরাগ্য সাধনের প্রয়োজন নেই।

Printed Edition
Tomb_of_Shah_Rukn-e-Alam_2014-07-31

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

স্থাপত্য একটি শিল্প, এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক না থাকলেও এর সংজ্ঞা নিয়ে স্থাপত্যবিদগণের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপত্য শিল্পকলা এবং বিজ্ঞানের সমন্বয়। স্থাপত্যকে এ কারণেই সকল শিল্পকর্মের উৎস বা Mother of all arts বলা হয়েছে। স্থাপত্যের সংজ্ঞায় কোন কোন ঐতিহাসিক যেকোন নির্মিত বস্তুকে স্থাপত্য বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ কেউ সুদৃঢ় ও সুশোভিত প্রাসাদকে স্থাপত্য বলে চিহ্নিত করেছেন। স্থাপত্য শিল্প বুঝাতে ইংরেজিতে Architecture পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। যার শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ হলো, ‘‘ভবনের নকশা বা নির্মাণ-কৌশল বা নির্মাণ রীতি’’। এ প্রেক্ষিতেই ড. এ. কে. এম. ইয়াকুব আলী বলেছেন, সাধারণত Architecture বলতে আমরা মনুষ্য নির্মিত যে কোন প্রকারের স্বল্প পরিসরের কুঁড়েঘর বা প্রশস্ত অট্টালিকা বুঝি।

প্রফেসর ডব্লিউ. আর লেথাবি স্থাপত্যের সংজ্ঞায় লিখেছেন, Architecture is the practical art of building touched with emotion, not only past, but now and in the future.যদিও স্থাপত্য বলতে কেবল ইমারতেকই বোঝায় না, কারণ ভূমি পরিকল্পনা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া ছাড়াও অসাধারণ ভাস্কর্য চিত্রকলা এবং বিভিন্ন ধরনের নকশা বুঝায়। কিন্তু বর্তমানে প্রবন্ধে স্থাপত্য শিল্প বলতে সাধারণভাবে বাড়ি-ঘর, অট্টালিকা-প্রাসাদ, সুউচ্চ ও মনোরম স্থাপনাকে বুঝানো হচ্ছে। ভূমি পরিকল্পনা ভাস্কর্য, চিত্রকলা, নকশাসহ স্থাপত্য শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলিকে বুঝানো হচ্ছে না।

মানুষ যুুগে যুগে যেসব শিল্পের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো স্থাপত্য শিল্প। কারণ মানুষের এ পৃথিবীতে আগমনের পর হতেই শীতকালে ঠান্ডা হতে, গ্রীষ্মকালে গরম হতে, বর্ষাকালে বৃষ্টি হতে এবং রাতের অন্ধকারে পশু-প্রাণীর আক্রমণ হতে নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য এ শিল্পের প্রয়োজন হয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন উপাসনা, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা বা অন্য কোন প্রয়োজনে এক স্থানে একত্রিত হবার জন্যও তাদের এই স্থাপত্য শিল্পের প্রয়োজন হয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাস অধ্যয়ন করলে জানা যায় যে, মিসরী, ব্যাবিলিয়ন, গ্রিক, রোমান ও সাসানী ইত্যাদি জাতি এ শিল্পের প্রতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছিল। গ্রিক জাতি শিল্প- সংস্কৃতিতে অতি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। তারা স্থাপত্য শিল্পেও বেশ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিল। তারা এ শিল্পের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও শৈল্পিক দিকটির প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিল। এ শিল্পে নির্মাণের কৌশলও তারা আবিষ্কার করেছিল। অতঃপর প্রত্যেক জাতি ও গোষ্ঠী তাদের নিজেদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে স্থাপত্য শিল্প নির্মাণ করতে থাকে। ফলে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব স্থাপত্য শিল্প তৈরি হয়েছে এবং তাতে তাদের ধর্মীয় দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে সুস্পষ্টভাবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইসলাম ধর্ম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না। কারণ নবী স. বলেছেন, আমাকে বৈরাগ্যবাদ অবলম্বনের আদেশ দেয়া হয়নি।

ইসলাম মুসলিমদেরকে শিখিয়েছে যে, মানুষ চাইলে তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই তার প্রতিপালকের নিকটবর্তী হতে পারে, তার সন্তুষ্টি পেতে পারে, যদি তা দীনের শিক্ষা ও বিধান অনুযায়ী আদায় করা হয়। সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এবং তার সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য বৈরাগ্য সাধনের প্রয়োজন নেই। দুনিয়াদারী ছেড়ে দিয়ে ইবাদত-বন্দেগীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ার এবং দেহকে নানাভাবে কষ্ট দেয়ারও কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য আল্লাহ কর্তৃক মানুষের জন্য প্রদত্ত কোন নিয়ামতকেও হারাম করার কোন প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মীয় দর্শনে দেখতে পাই যে, স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভ করতে হলে বৈরাগ্য সাধনা করতে হবে। দুনিয়ার ভোগ বিলাস ত্যাগ করে পাহাড় পর্বতে চলে যেতে হবে। সেখানে রাত দিন স্রষ্টার উপাসনায় ব্যস্ত থাকতে হবে। দুনিয়ার সমস্ত ভোগ বিলাস ছেড়ে দিয়ে; মানবদেহকে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে স্রষ্টার ধ্যান উপাসনায় মগ্ন থাকলেই তবে পাওয়া যাবে স্রষ্টার সন্তুষ্টি। তাই এসব ধর্মে অনুসারীদেরকে দুনিয়ার সমস্ত ভোগ বিলাস ত্যাগ করে মানবদেহকে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে পাহাড়ে-পর্বতে উপাসনায় ব্যস্ত হতে দেখা যায়।

উপর্যুক্ত এই দর্শনের প্রভাব আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর স্থাপত্য শিল্পেও। বিশেষত তাদের ইবাদত বন্দেগী ও পূজার জন্য নির্মিত বাড়ি-ঘরে। তাই আমরা মুসলিমদের মসজিদগুলো দেখতে পাই যে, তা নির্মিত হয় ভিতর-বাইরে অতি সহজভাবে এবং সাদাসিধে করে, তাদের ধর্মের শিক্ষা ও ধর্মীয় দর্শনের আলোকে। তার অভ্যন্তর ভাগে থাকে না তেমন কোন কারুকার্য, যাতে ভিতরে সালাতরত মুসলিমদের মন সে দিকে মগ্ন হয়ে না পড়ে। আর তার বাহির ভাগ নির্মিত হয় ইসলামী দর্শনের আলোকে প্রায় মিনারা বা আযানখানা সহকারে। আর তাও নির্মিত হয় জনগণের সমাবেশ স্থলে, সড়কের পাশে, বাজারে, চৌরাস্তার মোড়ে এবং এমন সব স্থানে যেখানে সহজেই পৌঁছা যায়। আর তাতে রাখা হয় সামনের বা কিবলার দিক ছাড়া বাকি তিন দিকে পর্যাপ্ত পরিমাণের জানালা ও দরজা। যাতে তাতে প্রচুর পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। অতএব, মুসলিমরা তাদের দুনিয়াবী কর্মকা- সম্পন্ন করার পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় এবং দুনিয়াবী কর্মকা- একই সাথে তাদের প্রতিপালকের আদেশ-নিষেধ মতে আদায় করে তার নৈকট্য লাভ করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, অত:পর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।

আমরা যদি প্রাচীন মিসরীয় স্থাপত্য শিল্পগুলো দেখি তার সাথে গ্রিক স্থাপত্য শিল্পের তুলনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, এতদুভয়ের নির্মাণ কৌশলে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। প্রথমোক্তদের স্থাপত্য শিল্পগুলো যেমন আকারে বড়, তেমনি শক্ত মজবুতও বটে। তা থেকেই বুঝা যায় যে, তারা একটি ধর্মে দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাসী ছিল। তাদের জীবন-যাপন রীতি থেকে মনে হয়, তারা এ জীবনের পরে আরো একটি জীবনে বিশ্বাসী ছিল। অন্য দিকে গ্রিক জাতির স্থাপত্য শিল্পের দিকে তাকালে মনে হয়, তারা তা অতি সূক্ষ্মভাবে সুন্দর ও সুনিপুণভাবে তৈরি করেছে। কারণ তারা কেবল দুনিয়ার এ জীবনেই বিশ্বাসী ছিল। তাদের জীবনযাপন রীতিতে যুক্তির প্রখরতা ও বস্তুবাদী দর্শনের প্রতিফলন হয়েছে। মোটকথা হলো, যে কোন জাতির স্থাপত্য শিল্পে তাদের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় দর্শনের প্রতিফলন ঘটে। তেমনিভাবে শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি ও চিন্তা ভাবনার প্রতিফলনও ঘটে। আর যে যুগে তা নির্মিত হয়েছে সে যুগের মন মানসিকতা চিন্তা-ভাবনাও তাতে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক যুগের আলাদা বিশেষ স্থাপত্য শিল্প তৈরি হয়। তাতে তাদের চিন্তা দর্শন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটে এবং তাদের জীবনবোধ ও সৌন্দর্যবোধ প্রতিভাত হয়।

স্থাপত্য শিল্প সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক; নেতিবাচক নয়। ইসলাম মুসলিমদেরকে স্থাপত্য শিল্প নির্মাণের অনুমোদন দেয়। তাতে শৈল্পিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটানোর অনুমোদনও দেয়। বাড়ি-ঘর এবং অট্টালিকা কারুকার্যময় করার অনুমতিও দেয়। তবে তা সবই হতে হবে অহংকার প্রকাশ না করার ও বিলাসিতা প্রকাশ না করার শর্তে এবং অপব্যয় ব্যতিরেকে। আল কুরআন এবং মহানবীর হাদীসে এর প্রতি বার বার ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল-কুরআনে ‘হুসূন’ বা কিল্লা, সায়াসি বা দুর্গ, বুরুজ বা উচ্চ অট্টালিকা ও দুর্গ, কুসূর বা অট্টালিকা, গুরুফ, বা কক্ষ, জুদুর বা দেয়াল, র্সাহ বা প্রাসাদ, কুরা মুহাস্সানা বা ‘সুরক্ষিত জনপদ’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার হয়েছে। যেমন এক আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর। অর্থাৎ তোমরা সৃদুঢ় উচ্চ দুর্গে অবস্থান করলেও তোমাদের মৃত্যু অবশ্যই আসবে। তোমরা মৃত্যু থেকে কিছুতেই রেহাই পাবে না, পালাতে পারবে না। এ আয়াত থেকে প্রমাণ হয়, সুদৃঢ় উচ্চ দুর্গ ও অট্টালিকা নির্মাণ করা ও তাতে বসবাস করা বৈধ। আল্লাহ তা’আলা অপর এক আয়াতে বলেন, তাকে বলা হল, ‘প্রাসাদটিতে প্রবেশ কর’। অতঃপর যখন সে তা দেখল, সে তাকে এক গভীর জলাশয় মনে করল এবং তার পায়ের নলাদ্বয় অনাবৃত করল। সুলাইমান বললেন, ‘এটি আসলে স্বচ্ছ কাঁচ-নির্মিত প্রাসাদ। এ আয়াতটিও প্রমাণ করে যে, অতি উচ্চমানের শিল্পসম্মত সুরম্য বাড়ি ও প্রাসাদ নির্মাণ করা বৈধ। কারণ সুলাইমান আ. একটি স্বচ্ছ কাঁচের উচ্চমানের শিল্পসম্মত প্রাসাদ নির্মাণ করে তার তলদেশ দিয়ে পানি প্রবাহিত করেন। তা এমন সুকৌশলে নির্মাণ করেন যে, যারা এর সম্পর্কে অবগত নয়, তারা মনে করে যে, তা পানি। অথচ পানি এবং পথচারীর মধ্যে স্বচ্ছ কাঁচের আবরণ রয়েছে। ফলে তার পায়ে পানি লাগার কোন সম্ভাবনা নেই। এ থেকে বুঝা যায় যে, সুলাইমান আ. নির্মিত এ প্রাসাদটিতে অতি উচ্চমানের শিল্প নৈপুণ্যের সমাবেশ ঘটেছিল। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, এ জাতীয় শিল্পমানের প্রাসাদ তৈরি করা এবং প্রাসাদকে কারুকার্যময় করা, তাতে বসবাস করা ইসলামে বৈধ।

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, আর স্মরণ কর, যখন আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করলেন এবং তোমাদেরকে যমীনে আবাস দিলেন। তোমরা তার সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাড়ি বানাচ্ছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্র নিয়ামত সমূহকে স্মরণ কর এবং যমীনে ফাসাদকারীরূপে ঘুরে বেড়িয়ো না। উপর্যুক্ত আয়াতে ‘‘তোমরা তার সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাড়ি বানাচ্ছ’’ একথা বলার পর ‘‘সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহকে স্মরণ কর’’ এ কথা বলা থেকে বুঝা যায়, প্রাসাদ আল্লাহ তা’আলার একটি বড় নিয়ামত। প্রাসাদ তৈরি করা বৈধ না হলে তাকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হতো না।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ স. ও তাঁর হাদীসে মু’মিনদেরকে এমন একটি অট্টালিকার সাথে তুলনা করেছেন, যার একটি অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। তিনি বলেন, নিশ্চয় এক মু’মিন অপর মু’মিনের জন্য অট্টালিকা স্বরূপ; যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। রাসূলুল্লাহ স. তিনি সহ সকল নবী-রাসূলকে একটি সুউচ্চ ও সুন্দর অট্টালিকার সাথে তুলনা করে বলেন, তারা বললো, এ প্রাসাদের নির্মাণ কৌশল কতোই না চমৎকার হতো, যদি তাতে এই ইটটি বসানো হতো! অট্টালিকা নির্মাণ বৈধ না হলে রাসূলুল্লাহ স. কখনো নবী-রাসূলগণকে এবং মুসলিমদেরকে অবৈধ ও হারাম একটি জিনিসের সাথে তুলনা করতেন বলে মনে হয় না। ইসলামী শিল্পকলার কিছু কিছু পাঠক মনে করেন, বাড়িঘর ইত্যাদি সুনিপুণভাবে নির্মাণ করা, কারুকার্যময় করা, উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করা ইসলামী শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ ইসলাম দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতাকে অপছন্দ করে। ইসলাম মুসলিমদেরকে ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে ইবাদত-বন্দেগীতে ব্যস্ত হতে আহ্বান জানায়। কাজেই ইসলাম প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘরবাড়ি তৈরি এবং তাতে কারুকার্য করতে নিষেধ করে।

ইমাম কুরতুরী রহ. বলেন, উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ অনেকেই মাকরূহ বলে মনে করেন। এ মত পোষণকারীগণের মধ্যে বিশিষ্ট তাবি’ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (২১-১১০ হি.) রহ. অন্যতম। তাঁরা নবী স. এর নিম্নোক্ত হাদীসগুলো দ্বারা দলিল দিয়ে থাকেন। আল্লাহ কোন বান্দাহকে অপদস্থ করতে চাইলে তখন তার সম্পদ বাড়ি-ঘর, পানি ও মাটিতে ব্যয় করেন। অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ স. বলেন, যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি নির্মাণ করবে, কিয়ামত দিবসে সে তা তার ঘরের উপর বহন করে নিয়ে আসবে। ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, এটা আমারও অভিমত। কারণ রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, মুমিন যে অর্থই ব্যয় করে তার জন্য সে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান পাবে। তবে বাড়ি-ঘরের নির্মাণের জন্য যা ব্যয় করে বা আল্লাহর নাফরমানী করতে গিয়ে যা ব্যয় করে তার জন্য সে কোন উত্তম প্রতিদান পাবে না। রাসূলুল্লাহ স. আরো বলেছেন, আদম সন্তানের জন্য কেবল এ জিনিসগুলো ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার হক নেই, বসবাসের জন্য একটি বাড়ি, সতর ঢাকার জন্য একটি পোশাক এবং রুটির টুকরা ও পানি।

কাইস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খাব্বাব ইবনুল আরত রা.-এর কাছে তাঁকে অসুখের সময় দেখতে গেলাম। তখন দেখলাম যে, তিনি তাঁর একটি দেয়াল তৈরি করছেন। তখন তিনি বললেন, ‘মুসলিমকে সব কাজের জন্য প্রতিদান দেয়া হবে, কেবল এ মাটিতে যা করে তা ব্যতীত।’ ইতোমধ্যে তার পেটে সাতবার আগুনের ছ্যাঁকা (থেরাপী) দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বললেন, যদি রাসূলুল্লাহ স. আমাদেরকে মৃত্যুর জন্য দু‘আ করতে নিষেধ না করতেন, তবে আমি মৃত্যুর জন্য দু‘আ করতাম। (অপর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে) তারপর বলেন, আমাদের যেসব বন্ধু মারা গেছেন তাঁদের দুনিয়ার কোন কিছু তাঁদের ক্ষতি করতে পারেনি। আমরা তাঁদের পরে এমন কিছু পেয়েছি যা রাখার জন্য এ মাটি ছাড়া আর কিছু পাই না।

আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী স. বলেছেন, তোমরা বাড়ি-ঘর নির্মাণে হারাম থেকে বিরত থাকো। কারণ তা সর্বনাশের মূল ভিত্তি। ইবন হাজার আল আসকালানী রহ. বলেন, যে সব বাড়িঘর বসবাসের জন্য প্রয়োজন নয়, যা মানুষকে ঠা-া গরম থেকে বাঁচায় না, সে সব বাড়ি-ঘরের ক্ষেত্রেই হাদীসগুলোর উর্পযুক্ত বক্তব্যগুলো প্রযোজ্য। আনাস রা. থেকে একটি মারফু হাদীসে বর্ণিত আছে, ‘সব বাড়ি-ঘর তার মালিকের জন্য ক্ষতিকর বলে পরিগণিত হবে, তবে যা তার বসবাসের জন্য আবশ্যক তা ব্যতীত।

উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ ও তা কারুকার্যময় করা এবং তার সৌন্দর্য দেখে আনন্দ উপভোগ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ নয়; বৈধ। বরং তা কাক্সিক্ষত বিষয়ে পরিণত হয়, যদি অহঙ্কার প্রকাশ বা নিজেকে বড়লোক বলে জাহির না করে নির্মাণ করা হয়।

এদেশের স্থাপত্য শিল্প অবশ্যই ইসলামী স্থাপত্য শিল্প-নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মাণ করা বাঞ্চনীয়। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন স্থাপত্য কর্ম শিল্প বা সংস্কৃতির নামে তৈরি করা এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কখনই কাম্য হতে পারে না। এ প্রেক্ষিতে দেশের স্থাপত্য শিল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশের অধিকাংশ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধকে ধারণ করে এমন একটি আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। উল্লেখ্য যে, এ দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ হলেও অমুসলিম জনগোষ্ঠীর শিল্প, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে। যা বিশ্বধর্ম ইসলামের উদারতার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলামী নির্দেশনা মত স্থাপত্যশিল্প তৈরি করার তাওফীক দিন।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক