DailySangram-Logo-en-H90
ই-পেপার আজকের পত্রিকা

মানুষের বিশ্বাস অবিশ্বাস

মানুষ সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী। আল্লাহ বলেছেন, আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ বা সৃষ্টির সেরা। আরবীতে যাকে বলা হয়েছে “আশরাফুল মাখলুকাত” মানুষের এই শ্রেষ্ঠ হওয়ার পেছনে মৌলিক কারণ রয়েছে বিশ্বাস। বিশ্বাসে মানুষের মর্যাদা বাড়ে এবং কমে। বিশ্বাসে মানুষ জগৎ চালায়, জগতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়। তবু একটি প্রবাদ প্রথমেই স্মরণ করতে হয়- বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আমরা আলোচনায় সমৃদ্ধ হবো এই প্রবাদটি মানুষের জীবনের সাথে কেমন গুরুত্ব রাখে।

BA

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

মানুষ সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী। আল্লাহ বলেছেন, আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ বা সৃষ্টির সেরা। আরবীতে যাকে বলা হয়েছে “আশরাফুল মাখলুকাত” মানুষের এই শ্রেষ্ঠ হওয়ার পেছনে মৌলিক কারণ রয়েছে বিশ্বাস। বিশ্বাসে মানুষের মর্যাদা বাড়ে এবং কমে। বিশ্বাসে মানুষ জগৎ চালায়, জগতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়। তবু একটি প্রবাদ প্রথমেই স্মরণ করতে হয়- বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আমরা আলোচনায় সমৃদ্ধ হবো এই প্রবাদটি মানুষের জীবনের সাথে কেমন গুরুত্ব রাখে।

মানুষ সেরা হওয়ার কয়েকটি কারণও আছে। আল্লাহ মানুষকে সেসব গুণ দিয়েছেন যা অন্যদেরকে দেননি। যেমন বুদ্ধি। সব প্রাণী বিশ্বাস করে মানুষই সবার কর্তৃত্ব করার যোগ্যতা রাখে। হিংস্র পাণী, বৃহৎ প্রাণী এবং জগতের সকল সৃষ্টিকে একমাত্র মানুষই কৌশলে বশ করে তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে পারে। হাতিকে পরিচালনা করা, বাঘকে খাঁচায় বন্দী করা, পাহাড় জঙ্গল বা প্রকৃতিকে কাঁটছাঁট করে সাজিয়ে আয়ত্ব করা সবই বুদ্ধির কাজ। প্রবাদ আছে “বুদ্ধির জোরে, তেল কিনে ছালায় ভরে”। মানুষের বুদ্ধি দিয়েই জগৎ সুন্দর ও শোভাবর্ধিত হয়। একটি নর্দমাকে বাগানে পরিণত করে, একটি বাগানকে ফুলে ফলে ভরিয়ে তোলে। একটি অশিক্ষিত বর্বর জাতিকে জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রশংসিত করা সক্ষম।

বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন কিন্তু একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে আবার অর্জন করা তার বহুগুণ কঠিন। কাউকে অবিশ্বাস করার আগে তাকে জেনে বুঝে নেয়া জরুরী। যে আসলে অবিশ্বাস এর মত কোন কাজ হয়েছে কিনা। কারণ ক্ষমা ও ভালোবাসা অর্জনের চেয়ে বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন”।

“যে বিশ্বাস করতে পারে, সে অর্জন করতে পারে” বিশ্বাস জগতের সব কিছুর মূল। প্রত্যেক সন্তান তার মা বাবা, আত্মীয় স্বজনকে চিনে বিশ্বাসেরই ফলে। মানুষ ধর্ম পালন করে তাও বিশ্বাসেরই ফলে। নিশ্বাসই বিশ্বাস। বিশ্বাস না হলে নিশ্বাস নিয়েও মানুষ সন্ধিহান হতো। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী তাঁর “আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় প্রতিষ্ঠা” প্রবন্ধে বলেছেন,”সিংহশাবক যে ভেড়া না হইয়া সর্বদাই সিংহ হয় সে তাহার বিশ্বাসের গুণেই। আর মেষ শাবক যে সিংহ স্বভাব না হইয়া মেষ হয়, সেও তাহার বিশ্বাসের গুণে।”

বিশ্বাস মানুষকে সাহসী করে তোলে, সাহস পাহাড় সমুদ্র ভ্রমণে আগ্রহী করে। যে জন্ম থেকে পাহাড়ে ভ্রমণ করে সে আর সমতলে চলা লোকের বিশ্বাস ও সাহস কখনো এক হতে পারে না। যে কখনো পাহাড়ে ভ্রমণ করেনি সে পাহাড়ে হাঁটতেও কষ্ট হবে।

ধর্মীয় চেতনাও বিশ্বাসের মূল থেকে আগত। না দেখে না জেনে অদৃশ্য আকারহীন, নিরাকার, শুধু জগতের সৌন্দর্য দেখে এবং কতগুলো শৃঙ্খল নিয়ম দেখে পরকালকে বিশ্বাস করে নিজেকে একটি কালেমার বাণীতে আবদ্ধ করে বাধ্যতামূলক শৃঙ্খলিত জীবন গ্রহণ করার নাম বিশ্বাস বা বিশ্বাসী হওয়া।

কেউ একজন পীর সাহেবকে অনেক উপহার উপঢৌকন দিয়ে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন কিন্তু আরেকজন হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু দিয়ে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। তেমনি কেউ একজনের সরল সহজ কথা শুনে তাকে বিশ্বাস করে নিলো পরক্ষণে দেখা গেলো সেই ব্যক্তি এ রকম বহুজনকে একইভাবে বিশ্বাস করিয়ে বিশ্বাস ভঙ্গও করেছে। আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে বিশ্বাস না করাই ভালো।

“একজন ভালো বন্ধু ও ভালো মানুষ হওয়ার প্রথম শর্ত হল বিশ্বাসী হওয়া” প্রত্যেক শিশু আদর যতœ ও নিরাপত্তা পায় বলেই তাদের পরিবারকে বিশ্বাস করে। সকল দুর্যোগে দুর্ভোগে একমাত্র ভরসা পরিবার তা শুধু বিশ্বাসের বলে এবং পরিবারকে একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করে। পাখিরা যেমন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে নীড়ে ফিরে এসে বসে এবং নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে তেমনি মানুষ তার পরিবারকেও স্থায়ী নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে।

পরিবারে বিশ্বাস এ এক অলঙ্ঘনীয় সত্য। যখন বিশ্বাসের পরিবর্তে অর্থ সংসারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন আর বিশ্বাসে কাজ করে না। বিশ্বাসের ফলে একজন অপরিচিত আরেকজন অপরিচিতের সাথে মিলে মিশে বাকি জীবন কেটে দেয়। শুধু বিশ্বাসের ফলে সংসার চলে।

বিশ্বাস হলো সম্পর্ক আর সম্পর্ক হলো বিশ্বাস। যেখানে বিশ্বাস আছে সেখানে সম্পর্ক আছে। সেখানে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, প্রেম ভালোবাসা, পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন সব আছে। পরিবারেও কেউ যদি কাউকে বিশ্বাস না করে তাহলে সেখানে কেউ কেউ তখন পরিবারও ত্যাগ করে। তার মানে সম্পর্ক হয় এবং সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাসের ফলে।

প্রত্যেক মানুষের ভেতরে এক ধরনের গোঁড়ামি কাজ করে। যার মূলে আস্তিক আর নাস্তিকের আবিষ্কার। যে যেই দলের সে বিপরীত দলকে নাস্তিক, কাফির কত কিছু উপাধি দিয়ে থাকেন। বস্তুত মানবতার পক্ষে কথা বলতে গেলে ইসলাম ধর্মের উপর আর কোনো ধর্ম নেই। তাই যারা ইসলামে নেই তাদেরকে অন্ধ বলে। অন্ধত্ব নিয়ে কোরআনে কয়েকটি আয়াতও আছে। একমাত্র ইসলামই হলো মানবতার ধর্ম। ইসলামে সমতা আনার জন্য ধনী গরীবের ব্যবধান গুছানোর লক্ষ্যে দান সদকা ও যাকাত ফিতরা দিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সমাজে শান্তি বজায় থাকার জন্য কেউ কোনো অপরাধ করলে তার শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইসলাম জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা চালু রেখেছে। ইসলামে পারিবার থেকে রাষ্ট্র সবখানে নেতৃত্ব দেয়ার গুনাবলী রয়েছে।

ইসলামের বিপরীতে অন্য ধর্মে নিজের ইচ্ছার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এমনকি ইসলামী গ্রন্থ কোরআন ব্যতীত সব গ্রন্থের বিধি বিধানে কাঁটছাঁট করা হয়েছে। তাই ওসব গ্রন্থে সুবিধাবাদীদের ইচ্ছা পূরণের সুযোগ রয়েছে।

সবাই মনে করে আমার ছেলেটা রাজপুত্র আর অন্যেরটা অযোগ্য অথর্ব কুৎসিত। সব পরীক্ষাতে আমারটাই একমাত্র ফার্স্ট হওয়ার উপযুক্ত। আমার মেয়েটাই সেরা সুন্দরী পাশের বাড়ির মেয়েদের কি এত গুণ আছে? এই বিশ্বাস অন্ধবিশ্বাস। আমার সন্তানই ডাক্তার হোক, অন্যেরটা গোল্লায় যাক। বস্তুত এভাবে যে নিজেকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে সে অহংকারী। সে কাউকে বিশ্বাস করে না, তাকে কেউ বিশ্বাস করে না।

কাউকে ক্ষমা করে মহৎ হয়ে যাও। কিন্তু দ্বিতীয়বার বিশ্বাস করে বোকা হয়ো না। এসব বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে এক ধরনের রাজনীতি আছে। চোরকে বললাম চুরি কর গেরস্তকে বললাম সজাগ থাক”। এসব নীতি বাক্য প্রতারণা ও ঠকবাজের জন্য। ইসলাম তা অনুমোদন করে না।

পরিবারে বিশ্বাস এ এক অলঙ্ঘনীয় সত্য। যখন বিশ্বাসের পরিবর্তে অর্থ সংসারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন আর বিশ্বাসে কাজ করে না। বিশ্বাসের ফলে একজন অপরিচিত আরেকজন অপরিচিতের সাথে মিলে মিশে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়। শুধু বিশ্বাসের ফলে।

মানুষের বয়স, মানুষের ব্যবহার, মানুষের সততা, সত্য -মিথ্যা, বিদ্যা- বুদ্ধি কিছুই চোখে দেখা যায় না সব বিশ্বাসের ফলে মেনে নিতে হয়। এমনকি পরকালীন চিন্তা রুহ, ফেরেস্তা, কবর, পুলসেরাত জান্নাত, জাহান্নাম, কেয়ামত, বিচার সবই মানুষের বিশ্বাসের ফল। বিশ্বাসে মিলে শান্তি ও সুখের ঠিকানা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও

সাবেক অধ্যাপক